সারা বিশ্বে একই দিনে ঈদ : ইমাম আবু হানিফার মাজহাব বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: ১২:০১ পূর্বাহ্ণ, মে ২৫, ২০২০

সারাবিশ্বে একই দিনে ঈদ পালন বিষয়ে কিছু আলোচনা আছে ইসলামী বিশ্লেষকদের মধ্যে। আজকে এই লেখায় আমরা আলোচনা করবো এ বিষয়ে ইমামে আজম আবু হানিফা রহ.-এর মাযহাব বিষয়ে।

মূলত আবদুল রশিদ বুখারি রাহি.-এর “খুলাসাতুল ফতোয়া” এর একটি ইবারতের কারণে প্যাচটি লেগেছে৷ সে ইবারতের কারণে কেউ কেউ বলেন, ইমাম আবু হানিফার মত হলো, সারা বিশ্বে একই দিনে ঈদ এবং রোজা রাখা হবে৷ সেখানে বলা হয়েছে,

صام أهل بلدة ثلثين يوما للرؤية، وأهل بلدة أخرى تسعة وعشرين يوما للرؤية، فعليهم قضاء يوم، ولا عبرة لاختلاف المطالع في ظاهر الرواية

অর্থাৎ যদি কোন শহরের লোকজন চাঁদ দেখে ৩০ টি রোজা পূর্ণ করে, অপর আরেকটি শহরের লোকজন চাঁদ দেখে ২৯ টি রোজা রাখে, তাহলে তারা একটি রোজার কাজা করবে৷ জাহিরুর রেওয়ায়াহ অনুযায়ী চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য নয়৷ (খুলাসাতুল ফতোয়া: ১/২৪৯)

আবদুর রশিদ বুখারি রাহিমাহুল্লাহ ইন্তেকাল করেছেন ৫৪২ হিজরিতে৷ তিনিই প্রথম জাহিরুর রেওয়ায়াহ হিসেবে এ মাসআলা উল্লেখ করেছেন৷ তারপর কেউ কেউ তার অনুসরণ করে সেটাকে উল্লেখ করেছেন৷ আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি রাহি. ও উল্লেখ করেছেন৷

চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য না হওয়া হানাফি মাজহাবের জাহিরুর রেওয়ায়াহ নয়৷ ইমাম মুহাম্মাদ লিখিত ছয়টি কিতাব হলো জাহিরুর রেওয়ায়াহ৷ ছয়টি কিতাব হলো,কিতাবুল আসল,অপর নাম আল মাবসুত, আলজামিউস সগির, আলজামিউল কাবির, আসসিয়ারুস সগির, আসসিয়ারুল কাবির ও আযজিয়াদাত৷

ছয়টি কিতাবই এখন পাওয়া যায় আলহামদুলিল্লাহ৷ কিন্তু ছয় কিতাবের কোন কিতাবেই এ ধরণের কোন মাসআলা উল্লেখ করা হয়নি৷ সুতরাং এটা দৃঢ়তার সাথে বলা যায় যে, উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য না হওয়াকে হানাফি মাজহাবের জাহিরুর রেওয়ায়াহ বলার সুযোগ নেই৷

বাকি ইমাম আবু ইউসুফ রাহি. এর একটি বক্তব্য কেউ কেউ উল্লেখ করে থাকেন-

أبو يوسف في الأمالي : لو أن أهل بلدة صاموا للرؤية تسعة وعشرين يوما، وأهل بلد ثلاثين يوما للرؤية، فعلى من صام تسعة وعشرين يوما قضاء يوم.

আবু ইউসুফ রাহ.‘আলআমালী’ নামক বইয়ে বলেন,, কোন শহরবাসী যদি চাঁদ দেখে ২৯ রোজা রাখে, আর অন্য শহরের লোকেরা চাঁদ দেখেই ৩০ রোজা রাখে তাহলে ২৯ ওয়ালাদেরকে একটি রোজা কাজা করতে হবে। (উয়ূনুল মাসাইল পৃ.৩৮)

এখানে ইমাম আবু ইউসুফ রাহি. সারা বিশ্বে একই দিনে রোজা এবং ঈদ করার কথা বলেননি, বরং এক শহরের খবর অন্য শহরে গেলে যারা ২৯ টি রোজা রেখেছে, তাদের একটি কাজা করার কথা বলেছেন৷ প্রশ্ন হলো, এ বিধান নিকটবর্তী শহরের জন্য নাকি দূরবর্তী শহরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য?

ইমাম আবু ইউসুফ রাহি. এর এ বক্তব্য নিকটবর্তী শহরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য৷ হাজার বছর আগে হানাফি ফকিহগণ সেটার সমাধান করে দিয়েছেন৷

ইমাম কুদুরি রাহি. (৪২৮ হি.) বলেন,

إذا كان بين البلدتين تفاوت لا تختلف فيه مطلع الهلال، فأما إذا بعد أهل البلدين من الآخر بعدا كثيرا لم يلزم أهل أحد البلدين حكم الآخر، لأن مطالع البلاد تختلف.

অর্থাৎ যদি দুই শহরের মাঝে দূরত্ব এই পরিমাণ হয় যে, উদয়স্থল ভিন্ন হয় না, তাহলে কাজা করবে৷ তবে যদি উভয় শহরের মাঝে দূরত্ব বেশি হয়, তাহলে এক শহরের বিধান অপরের শহরের উপর প্রযোজ্য হবে না৷ কারণ, শহরের উদয়স্থল ভিন্ন হয়৷ (শারহু মুখতাসারিল কারখি, কিতাবটির মাখতুতা মক্কার উম্মুল কুরা লাইব্রেরীতে রয়েছে৷ মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক সাহেব মাওলানা তহা হুসাইন দানিশ এর মাধ্যমে মাখতুতা সংগ্রহ করেছেন এবং মিলিয়ে দেখেছন৷ বাবুল ইতকাফের দুই পৃষ্ঠা আগে মাসালাটি উল্লেখ করা হয়েছে)

ইমাম হুসামুদ্দিন শহিদ রাহি. (৫৩৬ হি.) বলেন,

صام أهل بلدة الرؤية ثلثين يوما وبلدة أخرى تسعة وعشرين يوما فعلم من صام تسعة وعشرين يوما فعليهم قضاء يوم، لأن الذين صاموا ثلثين يوما رأوا هلال رمضان قبلهم بليلة والعمل بقول من رأى لا بقول من لم ير، هذا إذا كان بين البلدتبين تقارب بحيث لا تختلف المطالع، وإن كانت تختلف لا يلزم أهل أحد من البلدتين حكم الآخر.

অর্থাৎ কোন শহরের অধিবাসীরা যদি চাঁদ দেখে ত্রিশ দিন রোজা রাখে আর অন্য শহরের অধিবাসীরা উনত্রিশ দিন রোজা রাখে অতপর উনত্রিশ রোজা আদায়কারীগণ তা জানতে পারে তাহলে তাদেরকে একটি রোযা কাযা করতে হবে৷কারণ যারা ত্রিশ রোযা রেখেছে তারা একরাত আগে চাঁদ দেখেছে। আর আমল তো তাদের কথা অনুসারেই হওয়া চাই যারা (চাঁদ) দেখেছে৷ তাদের কথা অনুসারে নয় যারা দেখেনি৷ । এ (বিধান) ঐ ক্ষেত্রে যখন দুই শহর কাছাকাছি হয়,এদের উদয়স্থল আলাদা না হয়। উদয়স্থল আলাদা হলে কোনো শহরের বিধান অন্য শহরের জন্য অবশ্যঅনুসরণীয় হবে না। (আলফাতাওয়াল কুবরা পৃ. ১৬, মাখতুতা মাকতাবায়ে রেযা, রামপুর, হিন্দুস্তান, মাওলানা আবদুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ এ কিতাবের মাখতুতা সংগ্রহ করেছেন৷ )

ইমাম ওয়ালওয়ালিজি রাহি. (৪৬৭ হি.) বলেন,

هذا إذا كان بين البلدتين تفاوت بحيث لا تختلف المطالع، فإن كانت تختلف لا يلزم أحد البلدين حكم الآخر.

অর্থাৎ, এ বিধান এমন দুই শহরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে দুই শহরের উদয়স্থল ভিন্ন নয়৷ যদি উদয়স্থল ভিন্ন হয়, তাহলে এক শহরের বিধান অপর শহরের উপর প্রযোজ্য হবে না৷
(আলফাতাওয়াল ওয়ালওয়ালিজিয়্যাহ ১/২৩৬)

হেদায়ার লেখক ইমাম মারগিনানি (৫৯৩ হি.).বলেন,

هذا إذا كان بين البلدين تقارب، بحيث لا تختلف المطالع، فإن كان يختلف لا يلزم أحد البلدين حكم الآخر.

অর্থাৎ ইমাম আবু ইউসুফ রাহি. এর এ বক্তব্য নিকটবর্তী দুটি শহরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে দুই শহরের উদয়স্থল ভিন্ন হয় না৷ যদি উদয়স্থল ভিন্ন হয়, তাহলে এক শহরের বিধান অপর শহরের উপর প্রযোজ্য হবে না৷ (আততাজনিছু ওয়াল মাজিদ. ২/৪২৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)

মাওলানা আবদুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ হানাফি মাজহাবের আরও বেশ কিছু প্রাচীন কিতাবের পাণ্ডুলিপি অনুসন্ধান করে আবু ইউসুফ রাহি. এর এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন৷ আবু ইউসুফ রাহি. এর বক্তব্য দ্বারা এমন নিকটবর্তী দুটি শহর উদ্দেশ্য, যাদের উদয়স্থল এক৷ দূরবর্তী শহরের বেলায় এ বিধান প্রযোজ্য হবে না৷

এরপরও যদি কেউ বলেন, ইমাম আবু হানিফা রাহি. এর মতে সারা বিশ্বে এরই দিনে রোজা এবং ঈদ পালন করতে হবে, তাহলে সেটা স্পষ্ট ভুল এবং মিথ্যাচার৷ আল্লাহ আমাদের সুমতি দান করুন৷

মন্তব্য করুন