রসহীন ঈদুল ফিতরে স্বাগতম

কাল পবিত্র ঈদুল ফিতর

প্রকাশিত: ৭:৩১ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০

শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে। কাল পবিত্র ঈদুল ফিতর। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন নিয়ম কানুনের মধ্য দিয়ে ঈদুল ফিতর পালিত হবে কাল। 

মুসলমানদের বার্ষিক সর্ববৃহৎ সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর সমাগত। বাংলাদেশে চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে কাল পালিত হবে ঈদুল ফিতর। ঈদ মানে খুশী-আনন্দ।

তবে এ বছর আমরা আনন্দে নাই। আমরা এমন একটা সময় অতিক্রম করছি যখন এ পৃথিবীতে মনুষ্য প্রাণীরা বড় বেকয়দায় আছে। বাঁচন-মরণ সমস্যা। এর চেয়ে বড় সমস্যাও পৃথিবীতে আর নাই।

হাদীসে পড়েছি, নিজের চেয়েও আল্লাহ-আল্লাহর রাসুল (সঃ) কে ভালবাসতে হবে। একজন প্রকৃত মুমিনের ভাবনা ও বিশ্বাসে সেটাই থাকে। সেজন্যই আল্লাহ ও তদীয় রাসুল (সঃ) কে কেউ বিন্দুমাত্র অবমাননা করলে তখন সবাই গর্জে উঠে। এটা অবশ্য মুসলমান মাত্রই করে। যারা আল্লাহ ও রাসুল সঃ কে মহব্বত করে না, অথচ মুসলমান তারা আসলে নন-মুসলিমের জিন বহন করছে। ওদের দেহে শয়তানের হাড্ডি!

বলছিলাম আল্লাহ ও রাসুল সঃ কে ভালবাসার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে বেশী প্রাধান্য দিতে হবে। এটা জানি। তবে মানুষ সবচেয়ে বেশী ভালবাসে নিজকে অর্থাৎ নিজের জীবনকে। সেক্ষেত্রে তার ধন-সম্পদ ও স্ত্রী সন্তান-সন্ততির সিরিয়াল আরো পরে। এখনকার সময়ে সেই ‘নিজ’ এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়।

‘করোনা’ নামক অতি ক্ষুদ্র ভাইরাসটি বিশ্বময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কখন কার ফুসফুসে ঢুকে ওটাকে বিনষ্ট করে দেয়, সে চিন্তায় অস্থির। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জীবাণু যাতে নাক-মুখ দিয়ে না ঢুকতে পারে সেজন্য মাস্ক ব্যবহার ও হাত ধুইতে পরামর্শ দিয়েছে। আর আদালতি চিকিৎসা মতে- গরম পানি খাও, ভাইরাস মরে যাবে। চা খাও। মসলা দিয়ে গরম পানি খাও, ভাপ নাও সমস্যা হবে না।

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সৃষ্ট ব্যাধি কভিড নাইনটিনের কোন সুখবর নাই। ভয়াল ধরনের তথ্য। গত এক সপ্তাহের আইইডিসিআরের তথ্য যথাক্রমে অদ্য থেকে। আক্রান্তঃ ১৮৭৩, ১৬৯৪, ১৭৭৩, ১৬১৭, ১২৫১, ১৬০২, ১২৭০, ১৫৩২। আর মৃত্যুঃ ২০, ২৪, ২২, ১৬, ২১, ২১, ১৪, ২৮। আসল কথা- এ দেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় আজ বাদে কাল ঈদ। ঈদ মানেই নতুন জামাকাপড় কেনা, ফিরনি সেমাই আর পোলাও-রোস্ট খাওয়া। এবারে এসব কিছুই হবে না। কারণ দুইটা। এক- জীবন নিয়ে আতঙ্ক। দুই- অর্থ কষ্ট।

জগতের ইতিহাসে আদৌ নজির আছে কি? এ ভূ-মন্ডলে ঈদের সময়ে এমন পরিস্থিতি ইতোপূর্বে ঘটেছে কি-না! আমরা এমন বিরল ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে রইলাম।

আজ এমন দূঃসময়ে ঈদের আগমনে কোন আবেদন নাই। কারো মন-প্রাণ আনন্দ উৎসব করতে সায় দিচ্ছে না। পরিবেশ আজ ভিন্নতর। ঈদের আবার বাজার কিসের? কোটি কোটি পরিবারে আজ বাড়ীর ছোট্ট সদস্যটির জন্যও একটি জামা বা গেঞ্জিও কেনা হবেনা।

হ্যাঁ আমরা তো কেউই আনন্দে নাই। জোর করে তো আনন্দ করা যায় না। সারাক্ষণ অভুক্ত থাকা ব্যক্তিকে রোজা বা দিনব্যাপী উপবাস থাকার ফযিলাত বলতে যাওয়া তো বৃথা কর্ম।

করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশে দেশে ঈদের নামাজকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। ইসলামের সুতিকাগার সৌদি আরবে ঈদের নামাজ হবে না। তবে মসজিদের মাইকে শুধুমাত্র তাকবীর বলতে অনুমতি দিয়েছে সরকার‌। বাংলাদেশে ঈদগাহে ঈদের নামাজ হবে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে পড়ার হুকুম আছে। ঈদের নামাজ মানে ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে জামাতে পড়া। খোলা জায়গায় পড়া। সেটা সম্ভব না হলে মসজিদে আদায় করতে হবে। এমনটাই জেনে আসছিলাম ছোটকাল থেকে।

অথচ আজকাল ঈদের নামাজ ঘরে ঘরে পড়ার কথা শুনতেছি। একা একা। এ যেন চিপসের বিজ্ঞাপনের মত। “একা একা খেতে চাও? দরজা আটকিয়ে খাও!”

বলুন তো! এতে ঈদের স্প্রীট থাকলো কই?

অন্ততঃ আড়াই যুগ আগের ঘটনা। আমি ঝালকাঠী ইসলামিয়া মাদরাসায় এক রোজার মাসে অবস্থান করছিলাম। এক রাতে সাহরীর টাইমে মাদ্রাসার বারান্দায় শুয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে ঘুম থেকে জাগানোর কসরত করতেছিলাম। এই উঠো না কেন? সাহরী খাবা না? রোযা রাখবা না? আড়মোড়া ভেঙে তার জবাবঃ “মুই তো রোযাই।” অর্থাৎ নতুন করে রোযা রাখার দরকার কি? আমি তো সারাদিন না খাইয়াই থাকি!

ঈদকেন্দ্রিক আনন্দ আগে করেছি। বেঁচে থাকলে আগামীতে করা যাবে। এবারে না হয় রসকষহীন ভাবে ঈদের দিনটা কাটাই! সর্বদা দোয়া মুনাজাতে ব্যস্ত থাকি। রহম করো আল্লাহ?

তবুও সুন্নাত হিসেবে উচ্চারণ করতে হচ্ছে- “তাকাব্বালাহু মিন্না ওয়া মিনকুম”। ঈদ মুবারাক।

লেখকঃ কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সচিব, বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা বোর্ড।

মন্তব্য করুন