ওমর খৈয়াম : প্রেম, বিরহ, যৌবনের অমর মহাকবি

প্রকাশিত: ৫:৪২ অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০২০

– ফাইজুল ইসলাম ফাহিম

“আমার আজের রাতের খোরাক তোর টুকটুক শিরিন ঠোঁট” – মহাকবি ওমর খৈয়াম।

৮৭২ বছর পরও ওমর খৈয়াম স্বমহিমায় উজ্জ্বল। ওমর খৈয়ামকে আমরা কবি হিসেবে জানি।

দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেলের মতে, ওমর খৈয়ামই বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একইসাথে গণিতবিদ ও কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আসলে কবি শব্দটা বড় অপবাদের না। এর জন্য মানুষের অন্যান্য গুণগুলো চাপা পরে যায়। আজ আমরা শুধু কবি ওমর খৈয়ামকে নিয়েই কথা বলবো।

ওমর খৈয়াম। যার সম্পূর্ণ নাম গিয়াসউদিন আবুল‌ ফাতেহ ওমর ইবনে ইব্রাহিম আল-খৈয়াম নিশাপুরী। তিনি ছিলেন পারস্যের প্রেম ও বিরহের একজন কবি, গণিতবিদ, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ। তিনি পঞ্চম শতকের শেষের দিকে ইরানের নিশাপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন তাঁবু কারিগর ও মৃৎশিল্পী। ছোটবেলায় তিনি বালি শহরে সে সময়কার বিখ্যাত পণ্ডিত শেখ মুহাম্মদ মানসুরীর তত্ত্বাবধানে শিক্ষাগ্রহণ করেন।

ওমর খৈয়ামের শৈশবের কিছুটা সময় কেটেছে অধুনা আফগানিস্তানের বালক শহরে। সেখানে তিনি বিখ্যাত মনীষী মোহাম্মদ মনসুরীর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে তিনি খোরাসানের অন্যতম সেরা শিক্ষক হিসেবে বিবেচিত ইমাম মোয়াফ্ফেক নিশাপুরির শিক্ষা গ্রহণ করেন। জীবনের পুরো সময় জুড়ে ওমর তার সব কাজ করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। তিনি দিনের বেলায় জ্যামিতি ও বীজগণিত পড়াতেন। সন্ধ্যা হলে মালিক-শাহ-এর দরবারে পরামর্শ প্রদান এবং রাতে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি জালালি বর্ষপঞ্জি সংশোধন করতেন।

ওমর খৈয়াম এখন পর্যন্ত অমর হয়ে আছেন তার কবিতা সমগ্রয়। যা ওমর খৈয়ামের ‘রূবাইয়াত’ নামে পরিচিত। কাব্য-প্রতিভার আড়ালে তার গাণিতিক ও দার্শনিক ভূমিকা অনেকখানি ঢাকা পড়েছে। মার্কিন কবি জেমস রাসেল লোয়েল- ওমর খৈয়ামের রুবাই বা চতুষ্পদী কবিতাগুলোকে বলেন ‘চিন্তা-উদ্দীপক পারস্য উপসাগরের মনিমুক্তা।’

ওমর খৈয়াম ঠিক কতগুলো রুবাই লিখে গেছেন তার সঠিক হিসাব কারো জানা নেই। তার অমর গ্রন্থ ‘রুবাইয়াৎ-ই-খৈয়াম’-এ ৭২২টি রুবাই পাওয়া যায়। তার এই রুবাই বা চতুষ্পদী কবিতাগুলো প্রথমবারের মত ইংরেজিতে অনূদিত হয় ১৮৫৯ সালে।

এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ডের এই অনুবাদের সুবাদেই ওমর খৈয়াম বিশ্বব্যাপী কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। এ অনুবাদের মাধ্যমে ফিটজেরাল্ড নিজেও খ্যাতিমান হয়েছেন। তার এই অনুবাদ গ্রন্থ দশবার মুদ্রিত হয়েছে এবং ওমর খৈয়াম সম্পর্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার প্রবন্ধ ও বই লিখিত হয়েছে। বাংলায় প্রথম ‘রুবাইয়াৎ-ই-খৈয়াম’ অনুবাদ করেন বাংলাদেশের জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

প্রিয় কবি নজরুল ওমর খৈয়ামের একটি রুবাইয়ের অনুবাদ করেছেন,

‘এক সোরাহী সুরা দিও, একটু রুটির ছিলকে আর- প্রিয়া সাকী তাহার/ সাথে একখানি বই কবিতার- জীর্ণ আমার জীবন জুড়ে, রইবে প্রিয়া আমার সাথ/ এই যদি পাই চাইব নাকো তখৎ, আমি শাহানশার!’

জীবনে সময়ের প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে লিখেছেন,

নগদ যা পাও হাত পেতে নাও
বাকীর খাতা শূণ্য থাক
দূরের বাদ্য লাভ কী শুনে
মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক।

বিরহের বিষাদে তিনি লিখেছেন –

“হায়রে হৃদয়, ব্যথায় যে তোর ঝরিছে নিতুই রক্তধার,
অন্তরে নেই তোর এ ভাগ্য বিপর্যয়ের যন্ত্রণার।
মায়ায় ভুলে এই সে কায়ায় আনলি কেন রে অবোধ
আখেরে যে ছেড়ে যেতে হবেই এ আশ্রয় আবার। (কাজী নজরুল ইসলাম)

ওমর খৈয়াম শরাবপ্রেমী ছিলেন কিন্ত মাতাল ছিলেন না। কেননা তিনি নিজেই বলেছেন,

“যদিও মদ নিষিদ্ধ ভাই, যত পার মদ চালাও তিনটি কথা স্মরণ রেখে; কাহার সাথে মদ্য খাও মদ পানের কি যোগ্য তুমি? কি মদই বা করছ পান?
জ্ঞান পেকে না ঝুনো হলে মদ খেয়ো না এক ফোঁটাও।”

সুরাসক্ত কবি ওমর খৈয়াম দেখেছেন পৃথিবীর মানুষ যেসব পাপ করে তার তুলনায় মদ্যপানের পাপ অতি নগণ্য। অবশ্যই তিনি এই মদ খাওয়াকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছেন, যদি এর চেয়ে ভালো কিছু করার থাকে। এখানেই আমাদের ওমর খৈয়ামের যত রহস্য অনুদঘাটিত। তিনি নিজেই আবার বলেন,

“দোষ দিও না মদ্যপায়ী তোমরা, যারা খাও না মদ ভালো করার থাকলে কিছু মদ খাওয়া মোর হত রদ
মদ না পিয়েও, হে নীতিবিদ, তোমরা সে সব কর পাপ
তাহার কাছে আমরাও শিশু, হই না যতই মাতাল বদ।’

ওমর ছিলেন জ্ঞানমার্গের কবি। তাঁর কবিতায়.. ‘ইউসুফ জোলেখার প্রেমালাপ নই, লাইলি মজনুর ন্যায় প্রেমের জন্য আত্মবিসর্জন নাই। প্রাচ্যদেশীয় চিরন্তন বাঁধাগত বিশ্বপতির স্তবকও ইহাতে নাই। ইহাতে আছে সেই তথ্য যাহা যুগযুগান্ত ধরিয়া মানুষের চিন্তাকে বিব্রত, হৃদয়কে আলোড়িত করিয়া আসিতেছে সেই তত্ত্ব যা পৃথিবীর জন্মকাল হইতে আজ পর্যন্ত কেহ মীমাংসা করিতে পারে নাই…।’

ওমারের পরবর্তী কবিরা, যেমন হাফিজ, অনেকেই তাঁরই সুরে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। কিন্তু হৃদয় তাঁদের সন্দেহের দোলায় কখনো দোলেনি, তাই তাঁদের অবস্থান ভক্তিমার্গেই সীমাবদ্ধ।

১১৩১ সালের ৪ ডিসেম্বর ওমর খৈয়াম তার জন্মস্থান নিশাপুরে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি মৃত্যুর আগে এমন একটি বাগানে তাকে সমাহিত করার কথা বলে গিয়েছিলেন, যেখানে বছরে দু’বার ফুল ফোটে। সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়েছিল। দীর্ঘকাল তার কবরের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

১৯৬৩ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে তার কবর খুঁজে পাওয়া যায় এবং তা নিশাপুরে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে সে স্থানটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

ওমর খৈয়ামের কবরের নামফলকে লেখা আছে,
‘আয় দিল চুন জামানা মীকুনাদ গম নাকাৎ
নাগাহ দে রওয়াদ যে তন রুয়ানে পাকাৎ
বর সবজা নেশীন ও খোশ্ জী রোসে চন্দ্
যাঁ পেশকে সব্জা বর দমদ আয খাকাৎ। ’

‘রে মন, জামানা যখন তোমাকে দুঃখ দেবে এবং প্রাণ পাখিও দেহ পিঞ্জর ছেড়ে যেকোনো মুহূর্তে পাখা মেলতে পারে তখন এই সবুজের ওপর দুটি দিন  ফূর্তিতে কাটাও- তোমার সমাধির উপর সবুজ ঘাস গজাবার পূর্বে। ’

যদিও অনেকে বলে তিনি নাস্তিক ছিলেন, কিন্তু এটা ভ্রান্ত ধারণা। তিনি বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্ত ধর্মান্ধতার বিপক্ষে ছিলেন। ফরাসী শব্দগুলোর অর্থ অনুবাদে পাওয়া দুষ্কর। সেজন্য বলা হয়ে থাকে কবি সুরাপ্রেমিক না হয়েও মদ, শরাব, নারী কবিতার উপমায় ব্যবহার করেছেন। আসল সত্য কে-ই বা জানে। পাঠক না ওমর খৈয়াম, সে প্রশ্ন পাঠকের কাছে।

লেখক : ফাইজুল ইসলাম ফাহিম, শিক্ষার্থী আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন : আল্লামা ইকবাল : কাব্যদর্শনের বরপুত্র

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন