প্লাজমা ব্যাংক করবে পুলিশ হাসপাতাল, প্রত্যেক রোগীকে দেয়া হবে থেরাপি

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি

প্রকাশিত: ১:৫৪ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০২০

করোনা চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপিতে প্রাথমিক সাফল্য আসায় এ পদ্ধতিতে আরো বড় পরিসরে প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল। এ লক্ষ্যে একটি সমৃদ্ধ প্লাজমা ব্যাংক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ইতোমধ্যে করোনা থেকে সেরে ওঠা পুলিশ সদস্যদের প্লাজমা দিতে উদ্বুদ্ধ করতে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। প্লাজমা দাতাদের আর্থিক সম্মানী ও সম্মাননা স্মারক দেয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন থেকে কারোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে কারও পরিস্থিতি জটিল হতে শুরু করলেই তাকে প্লাজমা দেয়া হবে। কারণ ভেন্টিলেটরে থাকা বেশ কয়েকজন সংকটাপন্ন পুলিশ সদস্যের ওপর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগে বিস্ময়কর ফল পাওয়া গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি হাসান উল হায়দার বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে প্লাজমা থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করেছি। এটি আরও বড় আকারে শুরু করতে চাই। এ জন্য প্লাজমা ব্যাংক তৈরি বা ডোনারদের উৎসাহিত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এছাড়া কারোনা আক্রান্ত প্রতিটি পুলিশ সদস্যের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ জন্য এখন পর্যন্ত পুলিশে মৃত্যুর হার আমরা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখতে পেরেছি।’

সূত্র জানায়, রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে কাউন্টার টেরোরিজম (সিটিটিসি) এর একজন ইন্সপেক্টর সংকটাপন্ন অবস্থায় ভেন্টিলেটরে ছিলেন। চিকিৎসকরা তার বাঁচার আশা অনেকটা ছেড়েই দিয়েছিলেন। রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থা জানানো হলে সিটিটিসি’র প্রধান মনিরুল ইসলাম শেষ চেষ্টা হিসেবে তাকে প্লাজমা থেরাপি দেয়ার অনুরোধ করেন।

এরপর ঢাকা মেডিকেলের সহায়তায় সংগৃহীত প্লাজমা দেয়া হলে ভেন্টিলেটরে থাকা সিটিটিসি’র ইন্সপেক্টরের শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হয়। তাকে এখন কেবিনে স্থানান্তরের প্রস্তুতি চলছে।

এ ঘটনা পুলিশ বাহিনীতে আশার সঞ্চার করছে। প্লাজমা থেরাপির বিষয়ে পুলিশের উচ্চপর্যায়কে জানানোর পর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, এখন থেকে সব সংকটাপন্ন করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যকে প্লাজমা দেয়া হবে।

ইতোমধ্যে কয়েকশ’ পুলিশ সদস্য করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠায় তাদের কাছ থেকে প্লাজমা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের প্লাজমা দিতে এগিয়ে আসার জন্য উদ্বুদ্ধকরণের অংশ হিসেবে পুরস্কার ও সম্মাননা দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশ যেহেতু একটি শৃঙ্খলা বাহিনী, তাই সেরে ওঠা সদস্যদের কাছ থেকে প্লাজমা সংগ্রহ করা কঠিন হবে না। পুলিশের সংগৃহীত অতিরিক্ত প্লাজমা কোভিড-১৯ চিকিৎসায় নিয়োজিত অন্য হাসপাতালেও প্রয়োজনে সরবরাহ করা হবে।

এদিকে দেশে প্লাজমা চিকিৎসায় গঠিত কারিগরি কমিটির সভাপতি ঢাকা মেডিকেলের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এ খান যুগান্তরকে জানিয়েছেন, সারা বিশ্বেই প্লাজমা থেরাপি করোনার অন্যতম প্রধান চিকিৎসা হয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে পৃথিবীর ৬০টি দেশে করোনা আক্রান্তদের ওপর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্লাজমার গুরুত্ব বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে আইসিইউ বা ভেন্টিলেটরের সংখ্যা খুবই কম। সব মিলিয়ে সারা দেশে ৫শ’র কাছাকাছি। এর মধ্যে সব বর্তমানে কার্যকর অবস্থায় নেই। কিন্তু কোভিড-১৯ রোগীদের তিন থেকে ৫ শতাংশের ভেন্টিলেটর প্রয়োজন হচ্ছে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্লাজমা দিলে রোগীর ভেন্টিলেটর নির্ভরশলীতা অনেকটাই কমে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশে প্লাজমা গুরুত্বপূর্ণ। এখন ডোনার প্রয়োজন। মানুষকে প্লাজমা দিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বোঝাতে হবে, ‘একজনের প্লাজমায় অন্তত ৩ জনের জীবন বাঁচতে পারে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উপসর্গহীন। অর্থাৎ যাদের শরীরে অ্যান্টিবডি বেশি তারা করোনায় খুব বেশি আক্রান্ত হন না। উপসর্গহীন করোনা থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের প্লাজমায় যেহেতু সর্বোচ্চ মাত্রায় অ্যান্টিবডি থাকে, তাই তাদেরকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ জন্য আমেরিকায় সবার অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এতে একসঙ্গে দুটি কাজ হয়ে যাচ্ছে।

প্রথমত, নাগরিকদের একটি বড় অংশকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে যাদের করোনা সংক্রমণের ভয় নেই। আবার তাদের কাছ থেকে উচ্চ অ্যান্টিবডি সমৃদ্ধ প্লাজমাও সংগ্রহ করা হচ্ছে। আমেরিকায় ইতোমধ্যে ২০ হাজার রোগীর ওপর প্লাজমা সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. খালেদ মো. ইকবাল যুগান্তরকে বলেন, ইতোমধ্যে ইমার্জেন্সি ড্রাগ হিসেবে প্লাজমা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)। এছাড়া চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতে প্লাজমার সফল প্রয়োগ চিকিৎসকদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালেও রোগীদের ওপর প্লাজমা প্রয়োগ করে আমরা দেখতে পাচ্ছি সংকটাপন্ন রোগীর অবস্থা দ্রুত উন্নতি হচ্ছে।’

তবে বাংলাদেশে এখনও বড় আকারে রোগীদের ওপর প্লাজমা প্রয়োগ না করায় চিকিৎসকদের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন চিকিৎসক যুগান্তরকে বলছেন, সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে করোনা চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করা হলেও বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে।

প্লাজমা সংক্রান্ত কারিগরি কমিটি এপ্রিলে প্রটোকল চূড়ান্ত করলেও প্লাজমা প্রয়োগের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এখনও মেলেনি। অথচ প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল বড় হচ্ছে। কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে তেমন কোনো চিকিৎসাই হচ্ছে না। এসব হাসপাতালে প্লাজমা থেরাপি শুরু হলে অন্তত কিছু মানুষের প্রাণ বাঁচানো যেত।

অবশ্য সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় বসে না থেকে বেশ কিছু হাসপাতাল নিজস্ব উদ্যোগে ইতোমধ্যে করোনা রোগীদের ওপর প্লাজমা প্রয়োগ শুরু করেছে। রাজধানীর ৪টি হাসপাতাল প্লাজমা প্রয়োগ করে সফলতাও পেয়েছে প্রথম ধাপে। এগুলো হল ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল (সাবেক এ্যাপলো), স্কয়ার, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ।

দ্বিতীয় ধাপে– এখন ঢাকা মেডিকেলে ৪৫ জন রোগীর ওপর বড় পরিসরে প্লাজমা প্রয়োগের ট্রায়াল শুরু করতে যাচ্ছে। এ জন্য সস্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করছে ঢাকা মেডিকেলের কয়েকজন চিকিৎসক।

শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক যুগান্তরকে বলেন, প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের ফলে সংকটাপন্ন রোগীর ভেন্টিলেটর থেকে ফিরে আসার সম্ভাবনা ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ। সব থেকে বড় কথা প্লাজমার তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

প্রসঙ্গত প্লাজমা থেরাপি একটি প্রাচীনতম চিকিৎসা পদ্ধতি। যেখানে করোনা থেকে সেরে ওঠা মানুষের রক্ত থেকে প্লাজমা বা রক্তরস নিয়ে আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্রয়োগ করা হয়। এতে রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। যুগান্তর অনলাইন এর সৌজন্যে।

/এসএস

মন্তব্য করুন