প্রতিদিনের তারাবীহ’র তেলাওয়াতকৃত আয়াতের তাৎপর্য: ২৬ তম রমজান

প্রকাশিত: ৫:৩০ অপরাহ্ণ, মে ১৯, ২০২০

[পূর্ব প্রকাশের পর]

আজকে সালাতুত তারাবীহে পঠিতব্য অংশের পয়েন্টভিত্তিক কিঞ্চিত আলোকপাত

২৯ নং পারা

সুরা মুলক

সুরা মুলক মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৩০ টি আয়াত ও দুটি রুকু রয়েছে৷ সুরায়ে মুলকের ফযীলত সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস এসেছে৷ এক হাদীসে রাসুলে আকরাম ﷺ ইরশাদ করেন, কুরআনে কারীমে ৩০ আয়াত-বিশিষ্ট একটি সুরা রয়েছে, যে সুরা তার পাঠকের জন্য সুপারিশ করবে৷ তাই তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে৷ (আবু দাউদ)

এই সুরাকে মানি’আ এবং মুনজিয়াও বলে৷ কেননা এই সুরা তিলাওয়াত করলে কবরের আযাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়৷

এই সুরায় বলা হয়েছে আসমান-যমীনের রাজত্ব একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে৷ তাঁর হাতেই জীবন-মরণ, সম্মান-অসম্মান, সচ্ছলতা-অসচ্ছলতা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সব ব্যবস্থা৷ তিনি সবকিছুর খবর রাখেন, জানেন৷ কোনো কিছুই তাঁর জানার বাইরে নয়৷

যমীনে চলাফেরার জন্যে তিনিই পথ তৈরি করেন৷ আকাশে উড়ন্ত পাখ-পাখালিকে তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন৷ তিনিই রিযিক প্রদান করেন৷ সৃষ্টিজগত থেকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অস্তিত্বের দলিল প্রদান করা হয়েছে৷ আসমানের ছাদ, সারি সারি তারকা, যমীনের বিছানা, চলন্ত নদী সবই এক আল্লাহর অস্তিত্বের সংবাদ প্রদান করে৷ (৩-৫)

কিয়ামত দিবসের মিথ্যা প্রতিপন্নকারী লোকদের উত্তপ্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরিণতির কথা আলোচিত হয়েছে- ‘যখন তারা তথায় নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তার উৎক্ষিপ্ত গর্জন শুনতে পাবে৷ ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে’৷ (৭-৮)

মানব সৃষ্টিতে আল্লাহ তাআলার শক্তি ও জ্ঞানের কতিপয় বিকাশ বর্ণনা করা হয়েছে-

قُلْ هُوَ الَّذِي أَنشَأَكُمْ وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ ۖ قَلِيلًا مَّا تَشْكُرُونَ

অর্থ: আপনি বলুন, আল্লাহ তাআলাই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের কর্ণ, চক্ষু, ও অন্তর বানিয়েছেন, কিন্তু তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না৷ (২৩)

যখন এই আযাবকে তারা খুব কাছে থেকে দেখবে, তখন কাফেরদের চেহারা বিবর্ণ হয়ে যাবে৷ ইরশাদ হচ্ছে-

فَلَمَّا رَأَوْهُ زُلْفَةً سِيئَتْ وُجُوهُ الَّذِينَ كَفَرُوا وَقِيلَ هَٰذَا الَّذِي كُنْتُمْ بِهِ تَدَّعُونَ

অর্থ: যখন তারা সেই প্রতিশ্রুতিকে আসন্ন দেখবে তখন কাফেরদের মুখমন্ডল মলিন হয়ে পড়বে এবং বলা হবে: এটাই তো তোমরা চাইতে। (২৭)

সুরা কলম

সুরা কলম মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৫২ টি আয়াত ও দুটি রুকু রয়েছে৷ সুরার শুরুতে আল্লাহ তাআলা কলমের কসম করেছেন এজন্যই এ সুরার নামকরণ করা হয়েছে ‘কলম’৷ এতে ‘কলম’ আল্লাহ তাআলার বড় নিয়ামত হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়েছে৷ হাদীসেও কলমের গুরুত্বের কথা বিবৃত হয়েছে৷

ইবনে আব্বাস রা, থেকে বর্ণিত আছে যে, সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলা যে জিনিস সৃষ্টি করেছেন সেটি হচ্ছে ‘কলম’৷ এই কলমই কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে বা ঘটবে, আল্লাহর হুকুমে সব লিখে দিয়েছে৷ এরপর আল্লাহ তাআলা দোয়াত সৃষ্টি করলেন- যা কলমেরই একটা অংশ৷ যা আজ সারা দুনিয়ায় জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচারের প্রধান মাধ্যম৷

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদা, উত্তম চরিত্র ও মহৎ গুণাবলীর আলোচনা এসেছে৷ আল্লাহ তাআলা কসম করে তো প্রথমেই বললেন, আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহে আপনি উন্মাদ নন৷ আপনার জন্য অবশ্যই রয়েছে অশেষ পুরস্কার৷ আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী৷ (২-৪)

আয়েশা রা. কে রাসুল ﷺ এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাবে বললেন, তাঁর চরিত্র তো কুরআন৷ (মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ)
কুরআনে যা কিছু বলা হয়েছে, রাসুলের জীবনে তার সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়িত হয়েছে৷

রাসূল ﷺ এর জীবন ছিলো, কুরআনে কারীমের প্রায়োগিক তাফসির বা ব্যাখ্যা৷ আর সেটা হবে না-ই বা কেন? রাসুল ﷺ কে তো চারিত্রিক উৎকর্ষের পূর্ণতা দানের জন্যেই প্রেরণ করা হয়েছে৷

রাসুল ﷺ ইরশাদ করেন:

إنما بعثت لأتمم مكارم الأخلاق

অর্থ: আমি উত্তম আদর্শ পরিপূর্ণ করার জন্যেই প্রেরিত হয়েছি। (আহমাদ ও হাকিম)

রাসুল ﷺ এর উত্তম চরিত্রের আলোচনার পর তাঁর বিরুদ্ধবাদিদের হীন চরিত্র, অশালীনতা ও বক্র চিন্তাধারা, অতিরিক্ত কসমকারী, অশালীনতা, পরনিন্দাকারি, চোগলখোরি, ভালো কাজে বাধার সৃষ্টিকারি, কঠোর স্বভাবি, সীমালঙ্ঘনকারি গোনাহগারদের কঠোর নিন্দার আলোচনা করা হয়েছে এবং তাদের আনুগত্যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে৷ (১০-১৪)

এই সুরার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাগানওয়ালার কাহিনি৷ এই কাহিনি আরবে খুবই প্রসিদ্ধ ছিলো৷ এই বাগান ইয়ামনের কাছাকাছি অঞ্চলে অবস্থিত ছিলো৷ বাগানের মালিক এর উৎপাদন থেকে একটা অংশ গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতো৷

কিন্তু বাগানের মালিক মারা যাওয়ার পর তার ছেলেরা যখন উত্তরাধিকারসূত্রে এর মালিক হলো, তখন থেকে এর উৎপাদন থেকে গরিবদের বঞ্চিত করে সম্পূর্ণ ফসল নিজেদের ঘরে উঠিয়ে নেয়ার নিয়ম চালু করে দিলো৷ তাদের এই হীন কাজের উপর আল্লাহ তাআলা বেজায় অসন্তুষ্ট হলেন৷ শেষপর্যন্ত পুরো বাগানকেই ধ্বংস করে দিলেন৷ (১৭-৩৩)

এই ঘটনায় শিক্ষার উপাদান রয়েছে৷ যারা নিজেদের সম্পদ থেকে একাই উপকৃত হতে চায়৷ তাদের কার্পণ্য এটা সহ্য করতে পারে না যে, অন্যরা তাদের সম্পদ থেকে উপকৃত হোক৷ এই শিক্ষণীয় ঘটনা আলোচনার পর মুত্তাকিদের পুরস্কারের আলোচনা এসেছে৷

এই সুরার তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু হচ্ছে, আখেরাতের অবস্থার বিবরণ৷ ইরশাদ হচ্ছে-

يَوْمَ يُكْشَفُ عَنْ سَاقٍ وَيُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ

অর্থ: গোছা পর্যন্ত পা খোলার দিনের কথা স্মরণ কর, সেদিন তাদেরকে সেজদা করতে আহবান জানানো হবে, অতঃপর তারা সক্ষম হবে না। (৪২)

দুনিয়াতে তাদের (কাফিরদের) সিজদাহ করার এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল৷ কিন্তু তারা করে নি৷ কিয়ামতের দিন তারা সিজদাহ করতে চাইবে, কিন্তু তারা সিজদাহ করতে সক্ষম হবে না৷ ‘পায়ের গোছা খোলা’ দ্বারা কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতা উদ্দেশ্য৷ সুরার শেষের দিকে মুশরিকদের পক্ষ থেকে কষ্ট ও নির্যাতনের উপর ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়া হয়েছে৷

সুরা হাক্কা

সুরা হাক্কাহ মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৫২ টি আয়াত ও ২ টি রুকু রয়েছে৷ কিয়ামতের বিভিন্ন নামের মধ্যে ‘হাক্কাহ’ও একটি অন্যতম নাম৷ ‘হাক্কাহ’ অর্থ হচ্ছে, বাস্তবায়নাধীন৷ যেহেতু কিয়ামত একদিন বাস্তবায়িত হবেই, তাই এর নাম ‘হাক্কাহ’ নামকরণ করা হয়েছে৷

এই সুরার আসল বিষয়বস্তু রাসুল ﷺ এর সত্য নবি হওয়ার বর্ণনা৷ সুরার শুরুতে কিয়ামতের ভয়াবহতা, কওমে আ’দ-সামুদের খারাপ পরিণতির বিবরণ৷ (১-১২)

এরপর ওই সমস্ত ঘটনার বিবরণ, যা কিয়ামতের আগে সংঘটিত হবে৷ যেমন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, পাহাড়-যমিন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে৷ আসমান বিদীর্ণ হয়ে যাবে৷ ফেরেশতারা যমিনে নেমে আসবেন৷ (১৩-১৭)

যখন কিয়ামত কায়েম হয়ে যাবে, মানবকুলকে আল্লাহ তাআলার সামনে পেশ করা হবে৷ যারা নেককার হবে, তাদের আমলনামা ডানহাতে দেয়া হবে৷ তখন আনন্দের অতিশয্যে তারা অন্যদেরকে দেখাবে৷ বলবে-

هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ

‘নাও, তোমরাও আমলনামা পড়ে দেখ’ (১৯)। এরপর তাদের জন্য বরাদ্দকৃত জান্নাতের নিয়ামতরাজির আলোচনা করা হয়েছে৷

আর গোনাহগারদের আমলনামা যখন বামহাতে দেয়া, তখন তারা আক্ষেপ করে বলবে, আফসোস! আমলনামা যদি আমাদের দেয়াই না হতো৷

وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِشِمَالِهِ فَيَقُولُ يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيَهْ وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ يَا لَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ مَا أَغْنَىٰ عَنِّي مَالِيَهْ ۜ هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهْ

অর্থ: যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে সে বলবে, হায় আমায় যদি আমার আমল নামা না দেয়া হতো। আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব! হায়, আমার মৃত্যুই যদি শেষ হতো আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো উপকারে আসল না৷ আমার ক্ষমতাও বরবাদ হয়ে গেল (২৫-২৯)।  এরপর তাদের ৭০ হাত জিঞ্জির দিয়ে টেনে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপের আলোচনা করা হয়েছে৷

এরপর নাফরমান বান্দাদের পরিচয় প্রদান করা হচ্ছে-

  • এক. তারা আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান রাখে না৷
    দুই. তারা গরিব-মিসকিনদের খাওয়াতে উৎসাহিত করা৷

নেককার এবং নাফরমানদের পরিণামের আলোচনার পর আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন কুরআনে কারিমের সত্যতার উপর শপথ করছেন-

فَلَا أُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُونَ وَمَا لَا تُبْصِرُونَ إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ ۚ قَلِيلًا مَا تُؤْمِنُونَ وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنٍ ۚ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ تَنْزِيلٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ

অর্থ: তোমরা যা দেখ, আমি তার শপথ করছি, এবং যা তোমরা দেখ না, তার৷ নিশ্চয়ই এই কুরআন একজন সম্মানিত রসুলের আনীত। এবং এটা কোন কবির কালাম নয়; তোমরা কমই বিশ্বাস কর। এবং এটা কোন অতীন্দ্রিয়বাদির কথা নয়; তোমরা কমই অনুধাবন কর। এটা বিশ্বপালনকর্তার কাছ থেকে অবতীর্ণ। (৩৮-৪৩)

সুরা মা’আরিজ

সুরা মা’আরিজ মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৪৪ টি আয়াত ২ টি রুকু রয়েছে৷ মা’আরিজ অর্থ সিঁড়ি বা উঁচু স্তর৷ সুরার শুরুতে বলা হয়েছে, মক্কার কাফিররা রাসুল ﷺ কে দীনের দাওয়াত দেয়ার কারণে মশকরা করত৷ বলত, যে আযাবের ভয় দেখাচ্ছেন, তা তাড়াতাড়ি নিয়ে আসুন৷ নাউযুবিল্লাহ! (১-৩)

এরপর এই সুরায় কিয়ামতের দৃশ্যের বিবরণ দেয়া হয়েছে৷ সেখানে অপরাধিদের অবস্থার বর্ণনা করা হচ্ছে৷

[প্রতিদিন আসরের পর ইসলামী লেখক ও খতীব মুফতী জিয়াউর রহমান লিখিত ওই দিনের তারাবীহ’র আলোচনা প্রকাশ করা হয়। ধারাবাহিক এ লেখা নিয়মিত পড়তে পাবলিক ভয়েসের ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ ফলো করুন]

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

/এসএস

মন্তব্য করুন