প্রতিদিনের তারাবীহ’র তেলাওয়াতকৃত আয়াতের তাৎপর্য : ২৪ তম রমজান

প্রকাশিত: ৫:১৫ অপরাহ্ণ, মে ১৭, ২০২০

[পূর্ব প্রকাশের পর]

আজকে সালাতুত তারাবীহে পঠিতব্য অংশের পয়েন্টভিত্তিক কিঞ্চিত আলোকপাত

২৭ নং পারা

২৬ তম পারার শেষের দিকে ওই ফেরেশতাদের আলোচনা হয়েছিল, যাদেরকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম অন্য সাধারণ মেহমান মনে করে নিয়েছিলেন৷ পরে যখন বুঝতে পারলেন যে- এরা তো ফেরেশতা; তখন তাদের জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কী কাজে এসেছেন? তারা বললেন, আমরা লূত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের উপর পাথরবৃষ্টি বর্ষণ করে তাদের ধ্বংস করে দেয়ার জন্যে এসেছি৷ কওমে লূতের আলোচনা ছাড়াও এই সুরায় ফেরাউন, আ’দ, সামুদ এবং কওমে নূহের পরিণতির আলোচনা এসেছে৷

এরপর আসমান-যমীন সৃষ্টির আলোচনা এবং এই তথ্যও প্রদান করা হলো যে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসকে জোড়া জোড়া করে সৃষ্টি করেছেন৷ সুরার শেষের দিকে জিন এবং মানবজাতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যের দিকে আলোকপাত করলেন৷ আর সেই উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করা৷

এই সংবাদও প্রদান করা হলো যে, সমস্ত মাখলুকাতের রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ তাআলা নিয়েছেন৷ কাফির মুশরিকদেরকে কিয়ামতের দিনের শাস্তির ভয় প্রদর্শন করা হলো৷

সুরা তূর মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৪৯ টি আয়াত ও দুটি রুকু রয়েছে৷ এই সুরার শুরুতে পাঁচটি কসম করে বলা হচ্ছে, নিঃসন্দেহে আপনার প্রতিপালকের শাস্তি সংঘটিত হবেই৷ এতে একটুও এদিক-সেদিক হবে না৷ মাগরিবের নামাযে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুরা তূর পাঠ করছিলেন৷

জুবাইর ইবনে মুত’য়িম রা. কুফর অবস্থায় নামাযের তিলাওয়াত শুনছিলেন৷ যখন এই আয়াতের পাঠ শুনলেন, ‘আপনার পালনকর্তার শাস্তি অবশ্যম্ভাবী’৷ তিনি বলেন- ‘এই অংশ শুনা মাত্রই আমার ভেতরটা যেন ফেটে যাচ্ছিলো’৷ সুতরাং আযাব নাযিল হওয়ার ভয় তাঁকে ইসলাম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে৷

এরপর মুত্তাকিদের স্থায়ী ঠিকানা জান্নাতের আলোচনা এসেছে৷ সেখানে তাদের জন্য রমনী, সুস্বাদু ফল, গোশতের মতো নিয়ামত প্রস্তুত রয়েছে৷ তারা পরস্পর কথাবার্তার এক প্রসঙ্গে বলবে- আমরা ইতোপূর্বে নিজেদের বাসগৃহে ভীত-কম্পিত ছিলাম৷ তারপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন৷ আমরা পূর্বেও আল্লাহকে ডাকতাম৷ তিনি সৌজন্যশীল, পরম দয়ালু৷ (২৬-২৮)

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতের ব্যাপারে মুশরিকদের অবস্থান পরিষ্কার করা হয়েছে যে, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে, তাঁকে তারা গণক এমনকি পাগলও আখ্যা দিয়েছে৷ আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দিলেন যে, আপনি দাওয়াত ও নসিহতের ধারাবাহিকতা জারি রাখুন৷ তারা আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না৷

সুরার শেষের দিকে মুশরিকদের বাতিল ধারণার মূলোৎপাটন করে দেয়া হয়েছে৷ আল্লাহর একত্ব ও উপাস্য হওয়ার দলিল পেশ করা হয়েছে৷ ওই নির্বোধদের নিন্দা করা হয়েছে, যারা ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর মেয়ে বলে নাউযুবিল্লাহ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে ধৈর্যধারণ ও আল্লাহর তাসবীহ ও প্রশংসা করার হুকুম দেয়া হয়েছে৷ এবং এও সুসংবাদ দেয়া হলো যে, আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করবে৷ আর যালিমদেরকে শাস্তির মুখোমুখি করবেন৷ দুনিয়ার শাস্তিও আখেরাতের শাস্তিও৷

সুরা নাজম :

সুরা নাজম মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৬২ আয়াত ও তিনটি রুকু রয়েছে৷ এই সুরার শুরুতে অস্তগামী তারকার কসম করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতার বিবরণ দেয়া হয়েছে৷ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু’জিযা মেরাজের আলোচনা এসেছে৷

এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাদশাহীর আশ্চর্যজনক বিষয়াবলী দেখিয়েছেন৷ জিবরীল আলাইহিস সালামকে তাঁর আসল আকৃতিতে দেখেছেন, জান্নাত, জাহান্নাম, বায়তুল মা’মুর, সিদরাতুল মুনতাহাসহ আল্লাহর অপার নিদর্শনাবলী প্রদর্শন করেছেন৷

এই সুরা মুশরিকদের নিন্দা করেছে, যারা লাত, উযযা এবং মানাত নামক প্রতিমার পূজা করত এবং ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা আখ্যায়িত করত (নাউযুবিল্লাহ!)৷ এই সুরায় কিয়ামতের আলোচনা এসেছে৷ যেদিন ভালো-মন্দ সব আমলের পুরোপুরি বদলা দেয়া হবে৷ মুত্তাকিদের বেলায় বলা হয়েছে যে, তারা বড় গোনাহ এবং অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকে আর কাফিররা ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়৷

  • এই সুরায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষ স্বতন্ত্রভাবে নিজের আমলের দায়িত্বশীল নিজেই৷ কাজেই কারো গোনাহের দায়ভার অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া যাবে না৷ চেষ্টা অনুযায়ী মানুষের প্রাপ্তি যোগ হবে৷ আর মানুষ নিজের প্রশংসা নিজে করার ব্যাপারে এখানে নিষেধাজ্ঞা এসেছে৷

এই সুরায় আল্লাহর কুদরত ও একত্বের কিছু দলিল পেশ করা হয়েছে৷ যেমন তিনিই হাসান ও কাঁদান, তিনিই মারেন ও বাঁচান এবং তিনিই সৃষ্টি করেন যুগল পুরুষ ও নারী৷ পুনরুত্থানের দায়িত্ব তাঁরই৷ তিনিই ধনবান করেন ও সম্পদ দান করেন৷ তিনিই নাফরমান সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছেন৷ সুরার শেষের দিকে কুরআনে কারীম সম্পর্কে মুশরিকদের দৃষ্টিভংগীর আলোচনা এসেছে, ‘তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? এবং হাসছ, কাঁদছ না? তোমরা ক্রীড়া-কৌতুক করছ৷ অতএব আল্লাহকে সিজদা কর এবং তাঁর ইবাদত কর’৷ (৫৯-৬২)

সুরায়ে কামার :

সুরায়ে কামার মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৫৫ টি আয়াত ও তিনটি রুকু রয়েছে৷ এই সুরায় ওয়াদাও রয়েছে সতর্কবাণী রয়েছে৷ মুমিনদের জন্যে সুসংবাদও রয়েছে, কাফিরদের জন্যে ভীতি প্রদর্শনও রয়েছে৷ নসিহত ও শিক্ষামূলক আলোচনা, নবুওয়াত, রিসালাত, পুনরুত্থান ও কিয়ামত সংঘটিত হওয়া, বিচার-ফয়সালা ও তকদিরের মতো মৌলিক আকিদার আলোচনাও রয়েছে৷

সুরার শুরুতেই কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া এবং চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়ার আলোচনা এসেছে৷ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তি ও এরপরের যুগ শুরু হওয়া কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার আলামত৷ এক হাদীসে এসেছে- ‘‘আমি এবং কিয়ামত এক সাথে প্রেরিত হয়েছি। একথা বলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতের শাহাদাত আঙ্গুল এবং মধ্যমা আঙ্গুলকে একত্রিত করে দেখালেন’’ (বুখারী ও মুসলিম)

চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়া রাসুলে আকরাম ﷺ এর প্রসিদ্ধ মু’জিযা৷ যখন মক্কাবাসী রাসুল ﷺ এর কাছে তাঁর রিসালাতের স্বপক্ষে কোনো নিদর্শন চাইল, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর সত্যতার প্রমাণস্বরূপ চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করে দেখিয়ে দিলেন৷

রাসুল ﷺ এর হাতের ইশারায় চাঁদটা দুই টুকরো হয়ে গেলো৷ কিন্তু যাদের ভাগ্যে হেদায়াত নেই, তাদের কথাই আল্লাহ তাআলা বলছেন: “তারা যদি কোনো নিদর্শন দেখে তবে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এটা তো চিরায়ত যাদু৷” (৩)

আল্লাহ তাআলা প্রিয় নবীকে বললেন, আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন৷ এবং কিয়ামতের ভয়ানক দিনের অপেক্ষা করুন, যেদিন তারা ভয়ার্ত চেহারায় কবর থেকে উঠবে৷ চেহারায় অপদস্থতার চাপ পরিলক্ষিত হবে৷ দৌড়তে থাকবে আর বলতে থাকবে, এটা বড় কঠিন দিন৷

এরপর মক্কার কাফিরদের ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যে, পূর্বের সম্প্রদায়ের ন্যায় তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব চলে আসতে পারে৷ কেননা পূর্বের সম্প্রদায়ের মতো তোমরাও সেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছ৷ এখানে যে সমস্ত ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের কাহিনি আলোকপাত করা হয়েছে, প্রত্যেকবার একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে- তারপর কেমন কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী?

আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আমি কুরআনকে বোঝার জন্য সহজ করে দিয়েছি৷ অতএব কোনো চিন্তাশীল আছে কি? এখানে সহজ করে দেয়ার মানেই হচ্ছে, তিলাওয়াত করার জন্য, হিফয করার জন্য, নসিহত গ্রহণ এবং এর উপর আমল করার জন্য সহজ করে দেয়া হয়েছে৷

সুরার শেষের দিকে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি’৷ প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টির ক্ষেত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভারসাম্য রক্ষা করা কেবল খালিকের পক্ষেই সম্ভব৷ এটাই তার কুদরতের বড় দলিল৷ তাছাড়া মানুষের সবকিছু আমলনামায় লিপিবদ্ধ থাকার কথাও এসেছে৷ তাই ছোট থেকে ছোট কোনো গোনাহকেই তুচ্ছ মনে করা ঠিক নয়৷

সুরা আর-রাহমান :

সুরা আর-রাহমান মদীনায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৭৮ টি আয়াত ও তিনটি রুকু রয়েছে৷ এই সুরার আরেক নাম উরুসুল কুরআন বা কুরআনের নববধূ৷ এই সুরায় আল্লাহ তাআলা তাঁর নিয়ামতের বিস্তারিত আলোচনা করেছেন৷

প্রথম নিয়ামত হিসেবে কুরআন নাযিল হওয়া এবং কুরআনের তা’লীমের বিষয় বিবৃত হয়েছে৷ নিঃসন্দেহে এই কুরআন মানুষের জন্যে মহা নিয়ামত৷ প্রত্যেক জিনিসের একটা কি একটা বিকল্প থাকে, কিন্তু কুরআনের কোনো বিকল্প নেই৷ কোনো বস্তুগত নিয়ামত এর ধারেকাছেও যেতে পারবে না৷ কুরআনের একেকটি আয়াত এমনকি একেকটি হরফ দুনিয়া এবং এর ভেতর যা কিছু আছে, সব থেকে উত্তম৷

আল্লাহ তাআলা এই সুরা করেছেন তাঁর প্রধানতম সিফাত ‘রাহমান’ বলার মাধ্যমে৷ যেন জানিয়ে দেয়া হলো সমস্ত নিয়ামত, বিশেষত কুরআনের মতো নিয়ামত প্রাপ্তি তাঁর রাহমান সিফাতের বদৌলতে হয়েছে৷

এরপর বিশ্বজগতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন নিয়ামতের আলোচনা হয়েছে৷ সূর্য, চন্দ্র আল্লাহর হিসাব মতো তাদের কক্ষপথে বিচরণ করছে৷ তারকা, গাছগাছালি আল্লাহর সামনে সিজদারত রয়েছে৷ যমীনকে বিছানাসদৃশ বিছিয়ে রাখলেন৷ নানা প্রজাতির ফলমূল, সুগন্ধি ফুল, শস্য, তরিতরকারি যেগুলো থেকে মানুষ উপকৃত হয়৷ মানুষকে মাটি থেকে জিন জাতিকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন৷ মিঠা এবং লোনাপানি সমুদ্রে তার তার জায়গামতো পাশাপাশি প্রবাহিত হয়৷ সমুদ্র থেকে উৎপন্ন হয় মোতি ও প্রবাল৷ পাহাড় সদৃশ জাহাজ যা দরিয়ায় চলাচল করে৷

জিন এবং মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলছেন, ভূমণ্ডলের প্রান্ত অতিক্রম করা যদি তোমাদের সাধ্যে কুলায়, তাহলে অতিক্রম করো৷ কিন্তু ছাড়পত্র ব্যতিত তোমরা তা অতিক্রম করতে পারবে না৷ (৩৩)

দুনিয়াবী নিয়ামতের বিবরণের পাশাপাশি পরকালীন নিয়ামত এবং শাস্তির কথাও আলোচিত হয়েছে৷ জাহান্নামের ভয়াবহতার বিষয় উল্লিখিত হয়েছে৷ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও ধোয়ার কুণ্ডলী ছাড়া হবে৷ আকাশ বিদীর্ণ হবে, রক্তবর্ণে রঞ্জিত চামড়ার মতো হয়ে যাবে৷ সেদিন অপরাধির পরিচয় তার চেহারা থেকেই পাওয়া যাবে৷ পা ও চুল ধরে জাহান্নামের দিকে টেনে নেয়া হবে৷ এটাই জাহান্নাম, যাকে অপরাধীরা মিথ্যা বলত৷

‘অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে?’ আল্লাহ তাআলার মাখলুকাত ও বিস্ময়কর সৃষ্টির আলোচনার অধিনে এই আয়াতটি এনেছেন ৮ বার৷ এরপর জাহান্নামের শাস্তির আলোচনার অধিনে এনেছেন ৭ বার৷ জান্নাতের নিয়ামতরাজির আলোচনার অধিনে এই আয়াত এসেছে ৭ বার৷ আমাদের অনেকেরই জানা জাহান্নামের দরোজা ৭ টি এবং জান্নাতের দরোজা ৮ টি৷

সুরার শেষ আয়াতে বলা হলো, ‘কত পূণ্যময় আপনার পালনকর্তার নাম, যিনি মহিমাময় ও মহানুভব’। এই নাম দ্বারা ওই নামই উদ্দেশ্য যে নাম দ্বারা সুরা শুরু হয়েছে৷ যেন পুনরায় এ কথাই বলা হচ্ছে, আসমান-যমীনের সৃষ্টি, জান্নাত-জাহান্নামের অস্তিত্বসহ এই সুরায় যা কিছু আলোচিত হয়েছে, সব এই ‘রাহমান’র রহমতের সুফল৷

সুরা ওয়াকিয়া :

সুরা ওয়াকিয়া মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৯৬ টি আয়াত ও ৩ টি রুকু রয়েছে৷ এই সুরাকে সুরাতুল গণি বলাও হয়৷ হযরত ইবনে মাসউদ রা, বলেন: যে ব্যক্তি প্রতিরাতে সুরা ওয়াকিয়া তিলাওয়াত করবে, তাকে কখনো অভাবের মুখোমুখি হতে হবে না৷

এই সুরায় বর্ণিত হয়েছে, যখন কিয়ামত কায়েম হবে, তখন যমিনে ভূকম্পন শুরু হবে৷ পাহাড়-পর্বত ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে৷ ইরশাদ হচ্ছে-
إِذَا وَقَعَتِ الْوَاقِعَةُ لَيْسَ لِوَقْعَتِهَا كَاذِبَةٌ

অর্থ: যখন কিয়ামতের ঘটনা ঘটবে যার বাস্তবতায় কোন সংশয় নেই। (১-২)

  • আর মানুষ তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে৷
    এক- আসহাবুল-ইয়ামিন বা ডানপন্থি, যারা জান্নাতি হবে৷
    দুই- আসহাবুশ-শিমাল বা বামপন্থি, যারা জাহান্নামি হবে৷
    তিন- সাবিকুন, তারা ওই সমস্ত বিশেষ মুমিন-মুসলমান, যারা নেক আমলের দিক দিয়ে অন্যদের চেয়ে অগ্রগামি হবে৷

মানুষের তিনভাগের আলোচনার পর আলাদাভাবে প্রত্যেকের প্রাপ্য পুরস্কার কিংবা শাস্তির আলোচনা হয়েছে৷ (১-৫৬)

এরপর জান্নাত ও জান্নাতের নিয়ামতরাজির আলোচনা৷

তারপর এই সুরায় আল্লাহ তাআলা অস্তিত্ব, একত্ব ও পরিপূর্ণ কুদরতের দলিল পেশ করা হয়েছে৷ পরকাল এবং আমলের হিসাব হওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে৷ তিনি তো সেই আল্লাহ, যিনি পানির ফোটা থেকে মানুষ সৃষ্টি করতে পারেন৷ মাটিতে প্রোথিত বীজ থেকে বৃক্ষ উৎপন্ন করেন৷ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, বৃক্ষ থেকে আগুন সৃষ্টি করেন৷ মৃত মানুষকে আবার জীবন দান করতে পারেন৷

কুরআনের মহত্বের বিবরণ দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা নক্ষত্রের আস্তাচলের শপথ করেছেন৷ এই শপথের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেন-

وَإِنَّهُ لَقَسَمٌ لَّوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ

অর্থ: নিশ্চয় এটা এক মহা শপথ-যদি তোমরা জানতে।

শপথ করার পর এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ فِي كِتَابٍ مَكْنُونٍ لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ
تَنْزِيلٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ.

অর্থ : নিশ্চয় এটা সম্মানিত কোরআন, যা আছে এক গোপন কিতাবে, যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না। এটা বিশ্ব-পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। (৭৭-৮০)

আল্লাহ তাআলা এখানে নক্ষত্রের কসম করে কুরআনের মহত্ব বর্ণনা করেছেন৷ বস্তুত কুরআনের সাথে মিল রয়েছে৷ নক্ষত্ররাজি যেমন পথিকের জন্য জল-স্থলের অন্ধকারে আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে, ঠিক তদ্রূপ কুরআনের আয়াতসমূহের মাধ্যমেও জাহিলিয়াত ও গোমরাহীর অন্ধকার থেকে হেদায়াতের উপাদান পাওয়া যায়৷

সুরার শুরুতে যে তিন দলের পুরস্কার ও শাস্তির সংবাদ দেয়া হয়েছে, শেষের দিকে এসে আল্লাহ তাআলা সেই সংবাদের সত্যতার বিষয়টি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছেন-

إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ حَقُّ الْيَقِينِ فَسَبِّحْ بِاسْمِ رَبِّكَ الْعَظِيمِ

অর্থ: এটা ধ্রুব সত্য। অতএব, আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামে পবিত্রতা ঘোষণা করুন। (৯৫-৯৬)

সুরা হাদীদ :

সুরা হাদীদ মদিনায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ২৯ টি আয়াত ও ৭ টি রুকু রয়েছে৷ হাদীদ মানে লোহা৷ যেহেতু এই সুরায় আল্লাহ তাআলার বিস্ময়কর সৃষ্টি লোহার আলোচনা এসেছে, তাই এই সুরার নামকরণ ‘হাদীদ’ করা হয়েছে৷

প্রথমত এই বিশ্বজগতে যা কিছু আছে, সবকিছু যে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি ও তাঁরই মালিকানায়, সেই আলোচনা৷ জগতের সবকিছু- মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা, পাথর, জিন, ফেরেশতা, জড়পদার্থ এবং উদ্ভিদ সবাই আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও তাসবিহ পাঠ করে৷ তাঁর মহত্ব ও বড়ত্বের স্বীকার করে৷ যখন কোনোকিছুই ছিলো না, তখনও তিনি ছিলেন৷ যখন কোনোকিছু থাকবে না, তখনও তিনি থাকবেন৷ তিনি সবকিছুর উপর বিজয়ী, তাঁর উপর কেউ বিজয়ী হতে পারে না৷ তিনি এতই প্রকাশ্য যে, প্রত্যেক বস্তুর মধ্যেই তাঁর অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটে৷ আর তিনি এতই লুক্কায়িত যে, কোনো জ্ঞান-বুদ্ধি তাঁর বাস্তবতা পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না৷ কোনো ইন্দ্রিয় তাঁকে অনুভবের ভেতর নিয়ে আসতে পারবে না৷ (১-৬)

এরপর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমান আনা ও দীনের বিজয় ও প্রতিষ্ঠার জন্য জান-মাল উৎসর্গ করার হুকুম দেয়া হয়েছে৷ বলা হচ্ছে-

وَمَا لَكُمْ أَلَّا تُنفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

অর্থ: কি ব্যাপার যে, তোমরা আল্লাহর পথে খরচ করছো না, অথচ যমীন ও আসমানের উত্তরাধিকার তাঁরই৷ (১০)

এরপর সম্পদ আল্লাহ তাআলাকে ঋণ প্রদান করার প্রতি উৎসাহিত করা হচ্ছে, এই ঋণ বান্দার নিজের স্বার্থেই-

مَّن ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضَاعِفَهُ لَهُ وَلَهُ أَجْرٌ كَرِيمٌ﴾

অর্থ: এমন কেউ কি আছে যে আল্লাহকে ঋণ দিতে পারে? উত্তম ঋণ যাতে আল্লাহ তা কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে ফেরত দেন৷ আর সেদিন তার জন্য রয়েছে সর্বোত্তম পুরস্কার৷ (১১)

ঈমানদারদের সতর্ক করা হচ্ছে যে, তারা যেন ইয়াহুদ-নাসারাদের মতো দুনিয়ার জীবন ও তার বাহ্যিক চাকচিক্যে ধোকায় না পড়ে৷ তাই ইরশাদ হচ্ছে-

أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ ۖ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ

অর্থ: যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবর্তীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসে নি? তারা তাদের মত যেন না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের উপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, তারপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী। (১৬)

এরপর আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার জীবনের বাস্তবতার বিবরণ দিচ্ছেন-

اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ ۖ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا ۖ وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ ۚ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ

অর্থ: তোমরা জেনে রাখ, পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা এবং ধন ও জনের প্রাচুর্য ব্যতীত আর কিছু নয়, যেমন এক বৃষ্টির অবস্থা, যার সবুজ ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, এরপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পাও, এরপর তা খড়কুটো হয়ে যায়। আর পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়। (২০)

এরপর আল্লাহ তাআলার মাগফিরাত ও জান্নাত অর্জনের হুকুম দেয়া হচ্ছে-

سَابِقُوا إِلَىٰ مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا كَعَرْضِ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أُعِدَّتْ لِلَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ ۚ ذَٰلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ ۚ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ

আয়াত-২১ অর্থ : তোমরা অগ্রে ধাবিত হও তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে, যা আকাশ ও পৃথিবীর মত প্রশস্ত। এটা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণের প্রতি বিশ্বাসস্থাপনকারীদের জন্যে। এটা আল্লাহর কৃপা, তিনি যাকে ইচ্ছা, এটা দান করেন। আল্লাহ মহান কৃপার অধিকারী। (২১)

আর যা বিপদ-মুসিবত তোমাদের আসে, সবই পূর্ব নির্ধারিত৷ (২২)

এরপর আল্লাহ তাআলার এক বিস্ময়কর নিয়ামত লোহার আলোচনা করেন-

وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ

অর্থ: আর আমি নাযিল করেছি লৌহ, যাতে আছে প্রচন্ড রণশক্তি এবং মানুষের বহুবিধ উপকার। এটা এজন্যে যে, আল্লাহ জেনে নিবেন কে না দেখে তাঁকে ও তাঁর রসূলগণকে সাহায্য করে। আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী।

  • আয়াতে লোহা নাযিল করার দুটি রহস্য উল্লেখ করা হয়েছে৷
    এক. এর ফলে শত্রুদের মনে ভীতি সঞ্চার হয় এবং এর সাহায্যে অবাধ্যদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান ও ন্যায়নীতি পালনে বাধ্য করা যায়৷
    দুই. এতে আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ নিহিত রেখেছেন৷ দুনিয়াতে যত শিল্পকারখানা ও কলকব্জা আবিষ্কৃত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হবে, সবগুলোর মধ্যে লৌহের ভূমিকা সর্বাধিক৷ লোহা ব্যতিত কোনো শিল্প চলতে পারে না৷

আবার এর দ্বারা ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার কথাও এসেছে৷ যারা অবাধ্য ও হঠকারী, যারা ন্যায়-নীতি অনুযায়ী কাজ করতে সম্মত হয় না, তাদেরকে স্বাধীন ছেড়ে দেয়া হলে দুনিয়াতে ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করা সুদূরপরাহত হবে৷ তাদেরকে বশে আনা লৌহ ও তরবারির কাজ, যা শাসকবর্গ অবশেষে বেগতিক হয়ে ব্যবহার করে৷ (মা’আরিফ থেকে সংক্ষেপিত)

সুরার শেষের দিকে আল্লাহকে ভয় ও রাসুলের ﷺ উপর ঈমান আনয়নকারির জন্য ডাবল পুরস্কার ও আল্লাহর পক্ষ হতে এমন নুর প্রদানে প্রতিশ্রুতি, যে আলোয় ভর করে মুমিন চলাফেরা করবে৷ (২৮)

[প্রতিদিন আসরের পর ইসলামী লেখক ও খতীব মুফতী জিয়াউর রহমান লিখিত ওই দিনের তারাবীহ’র আলোচনা প্রকাশ করা হয়। ধারাবাহিক এ লেখা নিয়মিত পড়তে পাবলিক ভয়েসের ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ ফলো করুন]

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

/এসএস

মন্তব্য করুন