প্রতিদিনের তারাবীহ’র তেলাওয়াতকৃত আয়াতের তাৎপর্য : ২৩ তম রমজান

প্রকাশিত: ৫:৩৫ অপরাহ্ণ, মে ১৬, ২০২০

[পূর্ব প্রকাশের পর]

আজকে সালাতুত তারাবীহে পঠিতব্য অংশের পয়েন্টভিত্তিক কিঞ্চিত আলোকপাত

২৬ নং পারা-

সুরাহ আহকাফ : সুরায়ে আহকাফ মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৩৫ টি আয়াত ও ৪ টি রুকু রয়েছে৷ আহকাফ অর্থ বালুকাময় উঁচু উপত্যকা৷ এই সুরা শুরু হয়েছে কুরআনে কারীমের সত্যতা, তাওহিদ এবং হাশর দিবসের দলিলের মাধ্যমে৷ এবং ওই প্রতিমাগুলোর নিন্দা করে, যেগুলোকে মুশরিকরা তাদের উপাস্য বানিয়ে রেখেছে৷ অথচ এগুলো শুনেও না, দেখেও না, কোনো উপকার কিংবা ক্ষতি কোনোটাই করার সামর্থ রাখে না৷ উপাসনাকারীদের প্রার্থনা কবুলের কোনো ক্ষমতাও সেগুলোর নেই৷ (২-৬)

মুশরিকদের সামনে যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন নানা ধরনের সংশয় এবং অভিযোগ তারা উত্থাপন করে৷ কখনো কুরআনকে তারা যাদু বলে, কখনো নিজের বানানো বলে৷ কখনো ঈমানদারগণের বিষয়ে বলে, যদি ঈমান আনা ভালো কিছু হতো, তাহলে ফকীর, গরীব এবং শ্রমজীবী মানুষরা ঈমান গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগামী হতে পারত না৷ মুশরিকদের অভিযোগের আলোচনার পর তাদের দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হলো৷ (৭-১২)

সুরা আহকাফ আমাদের সামনে দুটি পরস্পরবিরোধী দৃষ্টান্ত পেশ করেছে৷ প্রথম দৃষ্টান্ত নেক সন্তানের৷ যার অন্তর ঈমানের নূরে আলোকিত৷ এবং সে সম্পূর্ণ শরীয়তের উপর অটল এবং দৃঢ়পদ৷ যখন তার পিতা-মাতা তাকে লালন-পালন করে যুবক বয়সে উপনীত করেন৷ সে শারীরিক এবং জ্ঞানগত দিক দিয়ে পূর্ণতায় পৌঁছে যায়, তখন সে আল্লাহর কাছে তিনটি দুআ করে-

  • প্রথম দুআ: হে আল্লাহ! তুমি আমাকে নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক দান করুন৷
    দ্বিতীয় দুআ: এমন আমল করা আমার জন্যে সহজ করে দিন, যে আমল করলে পরে আপনি সন্তুষ্ট হন৷
    তৃতীয় দুআ: আমার সন্তানদেরকে নেককার বানিয়ে দিন৷

এমন সন্তানের জন্যে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে৷ (১৫-১৬)

দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বদকার এবং নাফরমান সন্তানের৷ যার পিতা-মাতা তাকে ঈমান গ্রহণের দাওয়াত দেন, তখন সে জবাবে অহংকার করে বলে উফ্! উফ্! তোমরা আমাকে একথা বলছ যে, আমাকে আবার পুনরুত্থিত করা হবে? অথচ অনেক লোক আমার পূর্বে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে, তাদের কাউকে তো পুনর্জীবিত হতে দেখিনি (১৭)

প্রথম দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ঈমান ও হেদায়াতের, দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত হচ্ছে, কুফরি এবং নাফরমানির৷ প্রত্যেকেই যার যার আমলের প্রতিদান পাবে৷

এরপর হুদ আলাইহিস সালামের কওমের কাহিনি বিবৃত হয়েছে, যাদেরকে নাফরমানি এবং মিথ্যাচারের কারণে আসমানি আযাবের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল৷ তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা মেঘমালা পাঠালেন৷

যেহেতু কয়েকদিন ধরে লাগাতর প্রচণ্ড তাপদাহে পুড়ছিল পুরো এলাকা, তাই মেঘ দেখে তারা খুশিই হয়েছিল৷ বৃষ্টি আসার ব্যাপারে তারা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল৷ আনন্দে তারা ঘর হতে বের হয়ে এলো৷ কিন্তু পরক্ষণেই তীব্র গতিসম্পন্ন ঝড়-তুফান শুরু হয়ে গেলো৷

কওমে আ’দের লোকেরা শারীরিকভাবে অনেক মোটাসোটা ছিলো৷ বাতাসের কুণ্ডলী তাদের উপরে উঠিয়ে নিলো৷ আকাশের উপরে তাদের কীট-পতঙ্গের মতো মনে হলো৷ এরপর তাদের যমিনে ভূপাতিত করে মারা হলো৷ একেকটি লাশ একেকটি খেজুর বৃক্ষের মতো মনে হলো৷

আ’দ কওমের মর্মান্তিক ঘটনা শুনিয়ে মক্কাবাসীদের সতর্ক করে দেয়া হলো যে, তোমরা তাদের থেকে বেশি শক্তিশালী নও৷ যদি অবাধ্যতা আর নাফরমানি করো তবে তাদের মতো তোমরাও আল্লাহর আযাবে পতিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে৷ (২১-২৬)

সুরার শেষের দিকে বলা হচ্ছে, ‘যেই আল্লাহ আসমান এবং যমীন সৃষ্টির ক্ষমতা রাখেন, সেই আল্লাহ মৃতদেরকে আবার জীবিত করতে পারেন’৷ (৩৩)
একেবারে শেষ আয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লামকে হুকুম দেয়া হচ্ছে, ‘আপনি সবর করুন যেমন উচ্চ সাহসী রাসুলগণ সবর করেছেন৷ এবং ওদের বিষয়ে তড়িঘড়ি করবেন না। কারণ সবরের শেষ পরিণাম খুবই ভালো হয়ে থাকে’৷

সুরা মুহাম্মাদ : সুরা মুহাম্মাদ মদীনায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৩৮ টি আয়াত ৪ টি রুকু৷ আমাদের প্রিয় নবী ﷺ এর নাম উল্লিখিত হয়েছে যে চারটি সুরায়, তার অন্যতম হলো, এই সুরা৷ বাকি তিনটি হচ্ছে, আলে-ইমরান, আহযাব এবং ফাতহ৷ এই সুরার আরেক নাম সুরায়ে কিতাল৷ কেননা এই সুরাতে কাফিরদের সাথে কিতালের বিধানসমূহ বর্ণিত হয়েছে৷ মূলত এই সুরার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে, জিহাদ ও কিতাল৷ সুরার শুরুর দিকে কুফফার এবং মুমিনদের পার্থক্য বর্ণিত হয়েছে৷ কাফিররা বাতিলের অনুসরণ করে৷ আর মুমিনরা করে হকের আনুগত্য৷

যখন হক-বাতিল দুটি দলই মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, তখন তাদের মাঝে সাংঘর্ষিক অবস্থা সৃষ্টি হবে৷ লড়াইয়ের পরিবেশ তৈরি হবে৷ এটাই স্বাভাবিক নিয়ম এবং রীতি৷ তো আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বলছেন, ‘তারপর যখন তোমরা কাফেরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের গর্দান মার, অবশেষে যখন তাদেরকে পূর্ণরূপে পরাভূত কর, তখন তাদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল৷ তারপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর, না হয় তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ লও’৷(৪)

এই যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে তিনটি কাজ করা যেতে পারে৷ হয়ত অনুগ্রহ করে মুক্ত করে দেয়া যেতে পারে, নতুবা মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে, নতুবা বন্দীবিনিময় করে নিজেদের বন্দীদের তাদের কারাগার থেকে ছাড়িয়ে আনা যেতে পারে৷

আবার দাস বানানোর রীতিও সেই যুগে ছিলো৷ কারণ সে যুগে দাসি-বাঁদির ব্যাপক প্রথা ছিলো৷ যদিও ইসলাম এই প্রথাকে রেখে দিয়েছিল, কিন্তু কোনো সময়ই উৎসাহিত করেনি৷ বরং তাদেরকে মুক্ত করে দেয়াকে সর্বোচ্চ সওয়াব গণ্য করেছে৷

ইসলাম গোলাম আযাদ করার প্রতি এমন উৎসাহ প্রদান করেছে যে, রাসুল ﷺ এর কেবল একজন সাহাবি আবদুর রহমান বিন আউফ রা, ৩০ হাজার গোলাম খরিদ করে আযাদ করে দিয়েছেন৷ বিভিন্ন বড় বড় গোনাহের কাফফারা হিসেবে গোলাম আযাদ করাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে৷ তাদেরকে জাহিলিয়াতের যুগের যুলুম, নির্যাতন ও নিষ্পেষণ থেকে রক্ষা করে তাদের মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে৷

এই সুরায় বলা হচ্ছে, মুসলিমরা যদি দ্বীনের উপর অটল থাকে, দ্বীনের সাহায্যে তারা দাঁড়িয়ে যায়, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের সাহায্য করবেন এবং তাদের পা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন৷ (৭)

সেই ঈমানদারদের জন্যে প্রতিশ্রুত জান্নাতের কিছু আলোচনা করেছেন৷ ঈমানদারদের মোকাবেলায় মুনাফিকদের অবস্থাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, জিহাদের আয়াত শুনে ঈমানদারদের ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি পায় আর মুনাফিকরা মৃত্যুভয়ে মূর্ছাপ্রাপ্ত হয়ে যায়৷ (২০-২১)

জিহাদ ও আল্লাহর পথে খরচ করার উৎসাহ প্রদান করে শেষে ভীতি প্রদর্শন হিসেবে বলা হয়েছে যে, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও- তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন৷ এরপর তারা তোমাদের মতো হবে না৷ (৩৮)

সুরা ফাতহ : সুরা ফাতহ মদিনায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ২৯ টি আয়াত, ৪ টি রুকু রয়েছে৷ এই সুরা রাসুল ﷺ হুদায়বিয়া থেকে ফেরার পথে নাযিল হয়েছে৷ রাসুল ﷺ এই সুরা সম্পর্কে বললেন, আজ বিকেলে আমার উপর এমন এক সুরা নাযিল হয়েছে, যা আমার কাছে দুনিয়া এবং দুনিয়ার মধ্যবর্তী যা আছে, সব থেকে প্রিয়৷ (বুখারি, তিরমিযী)

হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং বাইয়াতে রিযওয়ানের সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট: মদিনায় একবার রাসুল ﷺ স্বপ্নে দেখলেন, মক্কায় প্রবেশ করছেন, বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করছেন৷ যখন রাসুল ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে এই স্বপ্নের বিবরণ দিলেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম খুব আনন্দিত হলেন৷ কেননা তারা জানতেন নবীর স্বপ্ন সত্যি হয়ে থাকে৷

রাসুলে আকরাম ﷺ ষষ্ঠ হিজরীর যুল-কায়দা মাসে ১৪০০ সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে উমরার নিয়তে মদিনা থেকে রওয়ানা দিলেন৷ যখন মক্কা এবং মদিনার মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছলেন, তখন বিশর বিন সুফিয়ান নামক ব্যক্তি এই সংবাদ দিলেন যে, মক্কাবাসী আপনাদের আগমনের সংবাদ পেয়ে যথারীতি যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে৷

এ অবস্থায় রাসুলুল্লাহ ﷺ হযরত উসমান রা,কে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠালেন, যাতে তিনি মক্কাবাসীকে এ কথা বলে আশ্বস্ত করেন যে, আমরা যুদ্ধের জন্যে আসিনি৷ উমরা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই৷ হযরত উসমান রা, সম্পর্কে এই সংবাদ চাউর হয়ে গেলো যে, তাঁকে শহীদ করে দেয়া হয়েছে৷ তিনি গাছের নিচে বসে সাহাবায়ে কেরাম থেকে ফিরে না যাওয়ার শপথ নিলেন৷ এই বাইয়াতকে ‘বাইয়াতে রিযওয়ান’ বলা হয়৷ কেননা শপথবদ্ধ সবার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার ঘোষণা যে, আমি তাদের উপর সন্তুষ্ট৷ (১৮) অবশ্য পরে উসমান রা, এর হত্যার সংবাদ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল৷

এরপর পরস্পর আলোচনার ধারাবাহিকতা জারি হলো৷ দশবছর পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির সন্ধিচুক্তি হলো৷ এই চুক্তির কিছু শর্ত বাহ্যত মুসলমানদের দুর্বলতা প্রমাণ করলেও আল্লাহ তাআলা এটাকে ‘ফতহে মুবীন’ বা প্রকাশ্য বিজয় আখ্যায়িত করেছেন৷ কারণ এর দ্বারা পরবর্তীর মহা বিজয়ের পথ সুগম হয়েছিল৷ এর পূর্বে যে বিজয় মুসলমানরা আর কোথাও অর্জন করেনি৷

তার একটা পরিসংখ্যানে বিষয়টি আরো ক্লিয়ার হয়ে আসবে যে, হুদায়বিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো কমবেশ ১৪০০ অথচ দুই বছর পর যখন মক্কা বিজয় হলো, তখন সেই সফরে মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো ১০ হাজার৷ এই পরিবর্তনের সুযোগ শান্তিচুক্তির দ্বারাই সৃষ্টি হয়েছিল৷ মুশরিক ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলামকে জানার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল৷

এই সুরায় দুই বিপরীতমুখী দলের আলোচনা করা হয়েছে।

প্রথমটি হচ্ছে, খাঁটি ঈমানদারগণের দল যারা নিজ ভূমি ছেড়ে অনেক দূর এবং নিরস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও ঝুঁকির মুখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লামের মোবারক হাতে জিহাদের বাইয়াত গ্রহণ করেছে৷ এবং তারা এই অঙ্গীকার করেছে যে, আপনার নেতৃত্বে হয়ত আমরা বিজয় অর্জন করব, নতুবা শহীদ হয়ে যাব৷ তবু ময়দান থেকে চলে যাব না৷ রাব্বে কারীম তাঁদের এই জযবা পছন্দ হলো, তিনি ঘোষণা করলেন: ‘যারা আপনার কাছে আনুগত্যে শপথ করে, তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে৷ আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর রয়েছে’৷ (১০)

একটু পর আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ: ‘আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল৷ আল্লাহ অবগত ছিলেন যা তাদের অন্তরে ছিলো৷ তারপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয়ের পুরস্কার দিলেন’৷ (১৮)

এখানে তারা বোনাস হিসেবে আরেকটি বিজয় পেয়ে গেলেন৷ সেটি হচ্ছে, খায়বারের বিজয়৷ এখানে ‘আসন্ন বিজয়’ দ্বারা খায়বার বিজয় উদ্দেশ্য৷

দ্বিতীয় দলটি হচ্ছে, ওই সব মুনাফিকদের যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে হুদায়বিয়ায় যায়নি৷ তাদের অপবিত্র ধারণা ছিলো মুহাম্মাদ এবং তার সঙ্গী-সাথীরা মক্কা থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসবে না৷ আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীকে এই ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে রাখলেন যে, আপনি ফেরার পর তারা না যাওয়ার নানান ওজর পেশ করবে৷

এই সুরায় ওই সত্য স্বপ্নের কথাও আলোচিত হয়েছে, যে স্বপ্ন রাসুল ﷺ মসজিদে হারামে প্রবেশের ব্যাপারে দেখেছেন৷ (২৭)

এই সুরার শেষের দিকে তিনটি বিষয় আলোচিত হয়েছে-

  • প্রথম: আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ কে হেদায়াত এবং সত্য দ্বীন দিয়ে এজন্য প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি এই দ্বীনকে সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী করে দেন৷ ইনশাআল্লাহ! কিয়ামতের পূর্বে সেই বিজয় আবার সূচিত হবে৷ জ্ঞানগত এবং দলিল-প্রমাণের আলোকে আল্লাহর ইচ্ছায় ইসলাম সর্বকালেই বিজয়ী বেশে আছে আলহামদুলিল্লাহ!
  • দ্বিতীয়: রাসলুল্লাহ ﷺর সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসা করা হয়েছে যে, তারা কাফিরদের মোকাবেলায় খুব কঠোর এবং পরস্পর নিজেদের মধ্যে সহানুভূতিশীল৷ এবং তাঁরা সব আল্লাহর সন্তুষ্টিকামী৷
  • তৃতীয়: শেষের দিকে তাঁদের সঙ্গে মাগফিরাত এবং মহা পুরস্কারের ওয়াদা করা হয়েছে৷ (হে আল্লাহ! তাদের মতো আমাদেরকে কবুল করুন)

সুরায়ে হুজুরাত

সুরায়ে হুজুরাত মদীনায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ১৮ টি আয়াত ও দুটি রুকু রয়েছে৷ ‘হুজুরাত’ ‘হুজরাহ’এর বহুবচন, অর্থাৎ ঘর বা কক্ষ৷ যেহেতু এই সুরায় ওই আগন্তুক গ্রাম্য বেদুইন যারা সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলো, তাদের ঘটনা বিবৃত হয়েছে যে, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লামকে হুজরার বাইরে থেকেই ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছিল এই বলে- হে মুহাম্মাদ! আমাদের দিকে বের হও! এই সুরায় এভাবে ডাকাডাকি করতে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে৷ এবং ঘরের বাইরে অপেক্ষা করার নির্দেশনা দেয়া হয়৷

তাছাড়া এই সুরায় উত্তম আখলাকের আলোচনাও এসেছে; এজন্য এই সুরাকে ‘সুরাতুল আখলাক ওয়াল আদাব’-ও বলা হয়৷ এই সুরায় মুমিনদেরকে আল্লাহ তাআলা পাঁচবার ‘হে ঈমানদারগণ’ বলে সম্বোধন করেছেন৷

সুরার শুরুতে আল্লাহ ও রাসূলের ব্যাপারে আদব শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে, মুমিনদের জন্য উচিত হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম জানার আগ পর্যন্ত নিজের রায় এবং সিদ্ধান্ত প্রকাশ না করা৷

তাছাড়া নিজের আমলি জিন্দেগীতে কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে বিমুখ হয়ে নিজের ফয়সালা নিজে না করা৷ আর মুসলমানদেরকে হুকুম দেয়া হচ্ছে, আল্লাহর রাসূলের সামনে নিজের আওয়াজকে নিচু রাখতে, উচ্চ না করতে৷ একে অপরকে যেভাবে ডাকা হয়, সেভাবে রাসূলকে না ডাকতে৷

সামাজিক বিষয়াবলী সম্পর্কে মুসলমানদেরকে গুরুত্বারোপ করে বলা হচ্ছে, উড়া কথা বিশ্বাস করো না৷ তোমাদের কাছে কোনো খবর এলে আগে তা যাচাই-বাছাই করো৷ এরপর সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসা করে বলা হচ্ছে, আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ঈমানের মহব্বত সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তা হৃদয়গ্রাহী করে দিয়েছেন৷ পক্ষান্তরে কুফর, পাপাচার ও নাফরমানির প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন৷

উড়া কথা বিশ্বাস করলে অনেক সময় পরস্পর লড়াইয়ের মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে৷ এজন্যে এই শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে যে, যদি কাউকে পরস্পর ঝগড়ায় লিপ্ত দেখ তবে তাদের মাঝে মীমাংসা করে দিও৷ কেননা দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান ধনী হোক কিংবা গরীব, আমীর হোক কিংবা ফকীর, কালো হোক কিংবা সাদা সবাই পরস্পর ভাই ভাই৷

এখন ছয়টি মন্দ স্বভাব চিহ্নিত করে দেয়া হচ্ছে, যেগুলোর কারণে পারস্পরিক সম্পর্ক প্রভাবিত হয় এবং এসব স্বভাবে লিপ্ত মানুষ আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় হিসেবে গণ্য৷

  • এক. একে অপরকে উপহাস করা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা৷ সাধারণ একজন মানুষকে নিয়ে তখনই উপহাস করা হয়, যখন তাকে তুচ্ছ ভাবা হয় এবং নিজেকে তারচেয়ে উত্তম ভাবা হয়৷ এজন্যে বলা হচ্ছে, যার সাথে তুমি উপহাস করছ, হতে পারে সে তোমার চেয়ে উত্তম৷
  • দুই. একে অপরকে দোষারোপ করা৷ দোষ খুঁজে বের করা৷ অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করা৷
  • তিন. কাউকে মন্দ নামে ডাকা৷ কিংবা কারো নাম বিকৃত করে ডাকা৷
  • চার. কারো ব্যাপারে কুধারণা করা৷ এমন ধারণা করা যে ধারনায় কারো প্রতি গোনাহ এবং দোষারোপ করা হয়৷ অথচ বাস্তবে সে সেই দোষে দোষী নয়৷
  • পাঁচ. মুসলমানদের গোপন দোষ এবং দুর্বলতা তালাশ করা৷
  • ছয়. একে অপরের গীবত ও দোষচর্চা করা৷ আল্লাহ তাআলা গীবত করাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন৷

আল্লাহ তাআলা এমন ঘৃণ্য বিষয়ের সঙ্গে গীবতকারীর তুলনা করলেন, যা উত্তম স্বভাবের মানুষের ঘৃণা লাগবেই৷ গীবতকারী অন্য কোনো জন্তুর নয়, বরং মানুষের গোশত খায়৷ তাও যে মানুষের গোশত খায়, সেও অন্য কেউ নয়, নিজের ভাই৷ ওই গোশত আবার মৃতের৷

পরস্পর সম্পর্ক নষ্ট ও বিভেদ সৃষ্টির অন্যতম কারণ বংশ মর্যাদা ও ধনসম্পত্তির গরিমা ও ঔদ্ধত্য৷ সুরায়ে হুজুরাত তারও জড় কেটে দিয়েছে৷ কেননা গোত্র, সম্প্রদায়, জাত-পাত, বংশ এসব কারো ইচ্ছাধীন নয়৷ তাই আল্লাহ তাআলার কাছে ওই ব্যক্তিই সম্মানিত এবং মর্যাদাবান, যার মাঝে তাকওয়া আছে৷ যে সব রকমের গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে৷

সবশেষে বলা হচ্ছে, শুধু মৌখিক এবং প্রকাশ্য ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়৷ আল্লাহর কাছে ওই ঈমান ধর্তব্য, যা অন্তরে বদ্ধমূল হয়৷ এবং মুমিনদেরকে আল্লাহর রাস্তায় জান-মাল কুরবানির প্রতি উৎসাহি করে তুলে৷

সুরা ক্বাফ

সুরা ক্বাফ মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৪৫ টি আয়াত ও ৪ টি রুকু রয়েছে৷ এই সুরায় ইসলামের মৌলিক আকিদার আলোচনা এসেছে৷ সুরার শুরুতে কুরআনে কারীমের আলোচনা করা হয়েছে৷ কসমের জবাব উহ্য রয়েছে৷ অর্থাৎ অবশ্যই কিয়ামতের দিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করব৷ এই সুরায় পুনর্জীবন ও একজন মানুষের নবী হিসেবে আগমনের উপর তারা অবাক হয়৷ অথচ আশ্চর্যজনক এমন মাখলুকাত আছে, যাদের দিকে গভীর খেয়াল করলেও আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রমাণ পাওয়া যায়৷

মানুষকে তার জবাবদিহিতা সম্পর্কে ধারণা দেয়া হচ্ছে যে, মানুষের অন্তরে যে ওয়াসওয়াসা এবং খেয়াল সৃষ্টি হয়, সব খবর আল্লাহ রাখেন৷ তাছাড়া দুইজন ফেরেশতা নির্ধারিত আছেনই৷ মৃত্যু এলেই কেবল ফেরেশতারা আমলনামা ভাঁজ করে রেখে দেন৷ সুরার শেষের দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লামকে মুশরিকদের বেহুদা কথাবার্তার উপর ধৈর্যধারণ, সকাল-বিকাল তাসবীহ এবং ইবাদতের উপদেশ দেয়া হয়েছে৷

শেষ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা যা বলে, তা আমি সম্যক অবগত আছি৷ আপনি তাদের উপর জোরজবরকারী নন৷ অতএব যে আমার শাস্তিকে ভয় করে, তাকে কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দান করুন’৷

সুরা যারিয়াত মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৬০ টি আয়াত এবং তিনটি রুকু রয়েছে৷ এই সুরায় কয়েকটি শপথ করা হয়েছে৷ প্রথমে বাতাসের শপথ করা হয়েছে৷ তারপর বোঝা বহনকারী মেঘের, তারপর মৃদু চলমান জলযানের৷ তারপর ফেরেশতাগণের, তারপর আসমানের কসম করে বলা হয়েছে ‘তোমরা তো মতবিরোধপূর্ণ কথা বলছ’৷ অর্থাৎ কিয়ামতের ব্যাপারে, কুরআন এবং কুরআন যিনি নিয়ে এসেছেন, তাঁর ব্যাপারে তোমরা মতবিরোধে লিপ্ত৷

তারপর মুত্তাকীদের উত্তম পরিণতি এবং উত্তম গুণাগুণের আলোচনা করা হয়েছে যে, তারা নেক আমল করেন, রাতে কম ঘুমান, রাতের শেষভাগে তাওবা-ইস্তেগফার করেন৷ তাদের সম্পদে যারা চায় এবং যারা চায় না, সবার হক রয়েছে৷

পারার শেষের দিকে ওই ফেরেশতাদের আলোচনা এসেছে যারা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কাছে মেহমান বেশে এসেছিলেন৷ তিনি তাদেরকে মানুষ মনে করে ভদ্রতাজনিত অভ্যাস হিসেবে পশু জবাই করে খানা তৈরি করে নিয়েছিলেন৷

[প্রতিদিন আসরের পর ইসলামী লেখক ও খতীব মুফতী জিয়াউর রহমান লিখিত ওই দিনের তারাবীহ’র আলোচনা প্রকাশ করা হয়। ধারাবাহিক এ লেখা নিয়মিত পড়তে পাবলিক ভয়েসের ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ ফলো করুন]

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

/এসএস

মন্তব্য করুন