রমজান-কোয়ারেন্টাইন : কেমন কাঁটছে ক্যাম্পাস সতীর্থদের সময়

করোনায় যেমন কাঁটছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের

প্রকাশিত: ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ, মে ১৬, ২০২০

তানিয়া আক্তার

পুরো বিশ্ব করোনাভাইরাস নামে অদৃশ্য এক মহামারিতে বিপর্যস্ত। ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের সকল দেশই এখন এই মহামারির ভয়াল থাবা সামাল দিতে ব্যস্ত। করোনা ভাইরাসের অবাধ বিস্তার ঠেকাতে বিশ্বব্যাপী সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনসমাগম নিষিদ্ধ রয়েছে। বর্তমানে অন্যদেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে এই ভাইরাসটি সবে শিশু মাত্র। সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত বছরের ডিসেম্বরে প্রথম চীনে পরিচয় ঘটে এই কালগ্রাসী করোনাভাইরাসের। এর পরেই বিশ্ববাসীর মাঝে এক অজানা আতঙ্কের আবির্ভাব ঘটে। বাংলাদেশও এই আতঙ্ক ও ভয়ে দিন-রাত কাঁটাচ্ছে মানুষজন।

দেশের এই দূর্যোগকালীন মুহূর্তের শুরুর দিকে এক ঝাঁক তরুণ শিক্ষার্থী তাদের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রোজেক্ট, পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। ইবোলা, নিপা ভাইরাসের মতো প্রতিরোধযোগ্য ভেবেই হয়তো নিশ্চুপ শিক্ষার্থীরা ছুটির আগের দিবা-রাত্রি জেগে প্রোজেক্ট লিখছিল। এর মধ্যেই প্রথম দিকে ১৫ দিনের ছুটির নির্দেশনা দিয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কে জানতো যে এই ১৫ দিনের ছুটি হবে অনির্দিষ্ট কোন সময়ের জন্য।

ঘরবন্দি হয়ে যখন উর্ধ্বশ্বাসে ক্যাম্পাসে ফেরার আকুল অপেক্ষায় দিন আর কাটছিলো না, ঠিক তখনই মাহে রমজানের শুভাগমন। সবুজ শ্যামল দেশের লাল মাটির সবুজ ক্যাম্পাসে চষে বেড়ানো মাটির ফুলগুলো এখন নিয়মিত লকডাউন মেনে আসছে। চলমান এই সংকটকে মোকাবেলা করতে অনেক শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবী হয়ে পাড়া প্রতিবেশির ঘরে খাবার পৌছে দিচ্ছে। কেউ আবার পরিবারের সাথে দীর্ঘদিন একসাথে কাটানোর একটা উপযুক্ত সময় পেয়েছে। আবার পরিবারের আর্থিক সংকটকে কাটিয়ে উঠতে নিজ প্রচেষ্টায় কিছু একটা কাজ করার চেষ্টা করছে।

পুরনো অভ্যাসের নব চর্চা করার সুযোগ হাতিয়ে নিয়েছে কেউ কেউ। অনলাইন ক্লাস, বই পড়া থেকে শুরু করে ধর্মীয় বিষয়গুলো নিয়মিত চর্চা করে আসছে। সুন্দর আর অসুন্দরের মিলনমেলায় করোনা মহামারির এই মুহূর্তে শারীরিক আর মানসিক প্রেসারকে কিভাবে মোকাবেলা করছে তারা ? কোয়ারেন্টাইন আর রমজান মিলিয়ে কেমন যাচ্ছে ক্যাম্পাসের প্রিয়জনদের সাথে কাটানো সময়গুলো ? এসব নিয়েই আলাপ করার সুযোগ হয়েছিলো কয়েকজনের সাথে।

সেই আলাপের ভিত্তিতেই ক্যাম্পাস সতীর্থদের হোম কোয়ারেইন্টেইন ও মাহে রমাজানে কাটানো মুহূর্তগুলো তুলে ধরা হলো।

ক্যাম্পাস সতীর্থ জোবায়ের আহমেদ জানান, “মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভাল আছি আমি এবং আমার পরিবার। আমি গত মার্চ মাসের ১৮ তারিখ থেকেই হোম কোয়ারেন্টাইনে আছি। একটি চলন্ত ইঞ্জিন হঠাৎ করে বন্ধ অবস্থায় পড়ে থাকলে যেমন তা ঝং ধরে যায় তেমনি আমারও ঐ পড়ে থাকা ঝং ধরা ইঞ্জিনের মতই লাগছে এই হোম কোয়ারান্টাইনের মূহুর্তগুলো। তার পরেও ভাল কিছু করে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কোয়ারেন্টাইনে অতিবাহিত দিনগুলো যেভাবে কাটছে –
১। নিজে সচেতন থাকার চেষ্টা করছি, পরিবার এবং পাড়া প্রতিবেশিদেরকে সচেতন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
২। পরিবারের বিভিন্ন কাজে সাধ্যমতো সহযোগিতা করতেছি।
৩। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছি ও রোজা রাখছি।
৪। নিয়মিত মহান আল্লাহর মধুর বাণী কোরআন তেলাওয়াত করছি (আলহামদুলিল্লাহ ইতোমধ্যে একবার খতম হয়ে গেছে)।
৫। বাড়ির বাচ্চাদেরকে মাঝে মাঝে পড়াশুনা দেখিয়ে দিচ্ছি।
৬। বিভিন্ন সংগঠনের সাথে অডিও এবং ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে মিটিং-আলাপন করছি।
৭। অনেক মিস করছি প্রিয় ক্যাম্পাস, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধুবী এবং ছোট-বড় ভাই বোনদেরকে। সর্বোপরি সকলের জন্য প্রার্থণা ও মঙ্গলকামনা করছি যেন সবাই সুস্থ থাকে এবং প্রত্যাশায় আছি কবে আবার দেখা হবে প্রিয় মুখগুলোর সাথে।”

ফাতেমা তুজ জোহরা জানান, “প্রথমে ইতিবাচক ব্যাপারগুলো নিয়ে বলছি – পরিবারের সবার সাথে আছি, অফুরন্ত সময় পাচ্ছি। কোনো কিছুতে চিন্তা করতে হচ্ছে না। নিজের জন্য হালকা স্কিল উন্নত করার চেষ্টাসহ, বই পড়া, ধর্মীয় ব্যাপারগুলো প্রাকটিস করার চেষ্টা করছি। মাঝে মাঝে রান্না করা, মায়ের কাজে সাহায্য করা। এইতো এইগুলো নিয়ে কেটে যাচ্ছে সময়।

সমস্যার ব্যাপার হলো- প্রতিদিনের শৃঙ্খলার ব্যাপারটা হারিয়ে ফেলেছি। প্রচুর অলস সময় কাটাচ্ছি, চাইলেও এক্টিভ হয়ে তেমন কিছু করতে পারছি না। অলসতা, চাপা আতঙ্ক আর আবদ্ধ সামাজিক প্রেক্ষাপট সব মিলিয়ে মানসিক দিক থেকে বোধ হচ্ছে বেশ ভাটায় আছি । আলহামদুলিল্লাহ অচিরেই সুন্দর,কর্মচঞ্চল,স্বাভাবিক হোক আমাদের পৃথিবী, মহান আল্লাহর কাছে আন্তরিক প্রার্থনা।

মাহফুজ আকবর জানান, “পুরো হোম কোয়ারেনটাইনেই আছি। মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত লাগে, পুরুষমানুষ বেশি ঘরে থাকতে পছন্দ করে না। তবে খারাপ লাগলেও ঘরে থাকাটা জরুরী এখন। ভালো লাগে, নামাজের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছি। কিছুটা পড়াশোনাও করেছি যা আগে করা হত না। সারাদিন নির্ধারিত জায়গায় চলাফেরার কারনে স্বাস্থ্য বেড়ে যাচ্ছে, যা সুস্থ্য থাকার ক্ষেত্রে বড় বাধা। পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারছি। তবে সহপাঠীদের আর ক্যাম্পাসকে অনেক মিস করছি।

আখতারুজ্জামান তানভীর জানান, “কোন কাজেই পূর্ণ মনোযোগ নেই যা কিছু করছি মূলত সময়টাকে নিজের করে নেওয়ার জন্য। যেন হতাশায় কোনভাবে না পড়ি। যতই দিন যাচ্ছে কাজের শৃঙ্খলা হারিয়ে ফেলছি। তারমাঝে ও কিছু করার চেষ্টা করছি। যেমন –

১. IELTS এর অনলাইন প্রিপারেশন নিচ্ছি।
২. পরিবারের সাথে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করছি।
৩. পুরনো বন্ধুদের সাথে ভিডিও কনফারেন্সে অথবা মুঠোফেনে যোগাযোগ হচ্ছে।
৪. পুরনো কিছু বই পড়ার সুযোগ পেয়েছি।

বুশরা জাহান তালুকদার জানান, “বাসা থেকে বাহিরে বের হতে পারছি না প্রায় ১ মাস ১৩ দিন। বাসায় যেভাবে দিন কাটাচ্ছি :
সকালে কোরআন তেলাওয়াত করি। দুপুরের নিয়মিত কাজগুলো সেরে ঘুমানো। তারপর বিকালে উঠে ইফতারি তৈরি করা। মাগরিবের নামাজ পড়ে সন্ধ্যায় তালিম করি তারপর আবার তারাবিহ্ নামাজ আদায় করা হয়। হোম কোয়ারেন্টাইনের একদিকে ভালো যে, পরিবারের সাথে ভালো একটা সময় ব্যয় করছি। এত কিছুর পরও একটানা দীর্ঘসময় বাসায় থেকে বিরক্তি হয়ে যাচ্ছি। জানি না আর কতদিন এইভাবে থাকব।

লেখক: তানিয়া আক্তার, লোক প্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
সম্পাদনায়: নাজমুল হাসান, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্বিদ্যালয়।

#এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন