করোনায় কেমন আছে বিশ্ববিদ্যালয় : শিক্ষার্থীদের চিন্তা বাসা ভাড়া

প্রকাশিত: ৮:৪০ অপরাহ্ণ, মে ১৩, ২০২০

নাজমুল হাসান :

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা সন্তান। আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো সম্পূর্ণ আবাসিক না হওয়ায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে মেস বাসা বা কটেজ ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়। এসব শিক্ষার্থীদের অনেকেই টিউশন বা পার্টটাইম কোনো জব করে তাদের মাসিক খরচ মেটান। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ও শ্রমিকরা যেমন কাজ হারিয়ে বিপাকে পড়েছে তেমনি বিপাকে পড়েছে টিউশন বা পার্টটাইম জব করে পড়ালেখার খরচ চালানো মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীরা।

করোনা ভাইরাসের প্রকপে দেশে লকডাউন চলছে। অসহায় হতদরিদ্র মানুষ অনাহারে দিন-রাত যাপন করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছুটি ঘোষনা করা হয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে।

উপার্জনের উৎস বন্ধ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কটেজের ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। নিজেদের উপার্জন তো বন্ধ রয়েছেই, করোনা ভাইরাসে লকডাউনের কারনে অর্থনীতির বিপর্যয়ে অনেক শিক্ষার্থীদের মা-বাবার আয় রোজগারও বন্ধ রয়েছে। পরিবারের কাছ থেকে খরচ টাকাও নিতে পারছেন না তারা। বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে নানা রকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদেরকে। আবার মাসের মাঝেই চলে আসার কারনে অনেকেই টিউশনের ফি বা বেতন পায়নি।

তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে যেন প্রশাসন ও মালিক পক্ষ বাসা ভাড়া মওকুফ করে দেন এমনটাই দাবি শিক্ষার্থীদের। কারন যেখানে মানুষ তাদের জীবন-মরণের ভয়ে চিন্তিত। সেখানে বাসা ভাড়া নিয়ে চাপ প্রয়োগ তাদেরকে মানসিকভাবে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে।

সার্বিক এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের সাথে পাবলিক ভয়েস এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তারা তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এস ইন এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এর শিক্ষার্থী মোঃ মশিউর আলম বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সারা বিশ্ব এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। বাংলাদেশেও Covid-19 এর জন্য সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ছে। এই দুর্যোগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথমেই সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেন। তারই প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা যারা টিউশন করে অর্থ উপার্জন করতো তা বন্ধ হয়ে যায়, তা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মেসের ভাড়া পরিশোধ করতে হয় যা এই মহামারীতে খুবই কষ্টদায়ক। তাই সকল বাসার মালিকরা যদি আরেকটু মানবিক হয়ে বাসার ভাড়া মওকুফ করেন তাহলে শিক্ষার্থীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে।
“সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমারা পরের তরে”।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগ মাস্টার্সের শিক্ষার্থী খান মোস্তাইন আহম্মদ দিপু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেশের প্রান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। নিম্ন এবং নিম্ন-মধ্য আয়ের পরিবারগুলো থেকে উঠে এসে শিক্ষার্থীরা এই বিদ্যাপিঠগুলোকে মুখরিত করেছে।সেইসব সাহসী শিক্ষার্থীদের জীবনের গল্প আমাদের অজানা নয়। নিজ পরিবার থেকে নামমাত্র টাকা নিয়ে পড়ালেখার খরচ যোগানো সেইসব শিক্ষার্থীদের অর্থনীতির সিংহভাগই যে নির্ভর করে টিউশনি থেকে প্রাপ্ত অর্থের উপর তা বলা বাহুল্য। এখানকার ৭৫-৮০ ভাগ শিক্ষার্থীদের খরচ চালানোর মূল মাধ্যম হলো টিউশনি। কারণ পড়ালেখার পাশাপাশি টিউশনি ব্যাতিত অন্য কোন মাধ্যমে অর্থ উপার্জন যেমন দুষ্কর তেমন চিন্তার অবকাশ ও নেই।

মোস্তাইন দিপু আরও বলেন – প্রতিবছর হলের ধারণ ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয় মতিহারের সবুজ চত্ত্বর আমাদের প্রিয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। অগত্যা বাধ্য হয়েই আমাদেরকে মেস অথবা বাসাবাড়িই বিকল্প হিসাবে বেছে নিতে হয় আবাসস্থল হিসাবে। আর বাধ্য হয়ে আবাসস্থল মেস কিংবা বাসাবাড়ি বেছে নেয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়, বলা যায় বৃহৎ অংশ।

সারাদেশের এই অচলাবস্থার মধ্যে শিক্ষার্থীদের টিউশনির সুযোগটুকুও পুরোপুরি স্থগিত যার কারনে আমাদের জীবনে নেমে এসেছে নিদারুণ দুর্দশা। লক-ডাউন দ্রুত কার্যকর হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বাসায় চলে গেছেন; অনেকে আবার এই অবস্থার মধ্যে আটকা পড়ে আছেন রাজশাহীতেই,পরিবার পরিজন থেকে দূরে। পরিস্থিতি যাইহোক মেস/বাসা মালিকদের দৌরাত্ম তো থেমে নেই! বাড়িওয়ালার চাহিদা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা পরিশোধ করতে বারবার তাগিদ দিচ্ছেন। পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে নমনীয় প্রতিটি ক্ষেত্রে, সরকার দিচ্ছেন নানা রকম ভর্তুকি আর প্রনোদনা সেখানে এই মেস মালিক বা বাড়িওয়ালারা যদি একটু নমনীয়তা দেখিয়ে কয়েক মাসের জন্য ভাড়া মওকুফ করেন তাহলে কিছুটা স্বস্তি হয়তো এনে দিতে পারে সেইসব সাময়িক টিউশনি হারানো শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন আন্তরিকতার সাথে বিষয়টি আমলে নিয়ে একটি শিক্ষার্থী বান্ধব সিদ্ধান্ত নিবেন বলে আশা করছি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর এইচ তাম্মান বলেন, ‌দেশের এই দুর্যোগকালে যেসব শিক্ষার্থীরা মেসে ভাড়া রয়েছেন তাদের সবারই অর্থ উপার্জনের পথটা এখন বন্ধ। অন্যদিকে দেশে লকডাউন চলমান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ রয়েছে। কিন্তু উপার্জনের উৎস বন্ধ থাকা সত্ত্বেও আমাদেরকে নিয়মিত বাসা ভাড়া দিতে হচ্ছে যা আমাদের জন্য বেশ কষ্টদায়ক। তাছাড়া যারা এই মহামারীতে নিজেদের বাড়িতে যেতে পারে নি তাদের জন্য তো এই বিষয়টি অনেক পীড়াদায়ক। এসকল দিক বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ যদি কয়েকমাসের ভাড়া মওকুফ করে দেয়, তবে আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাইজুল ইসলাম ফাহিম বলেন, দেশের এই দুর্বিষহ পরিস্থিতি বিবেচনা করে মেস মালিকদের উচিত ছাত্রদের কথা ভাবা- এইমূহুর্তে ছাত্রদের জীবনই সংকটের মুখে, তারা কিভাবে বাসা ভাড়া দিবে এটিও বিবেচনা করতে হবে। আমরা আশা করি তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের ৩য় বর্ষের এক মেয়ে শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের গ্যাস, কারেন্ট বিল দিতে হচ্ছে না, আমরাও থাকছি না। এমন ও নয় আমরা সীট নিয়ে রেখেছি বলে তারা অন্য কোথাও ভাড়া দিতে পারছেন না, এটা ওনারা এখন পারবেনও না। আমরা শিক্ষার্থীরা অযথাই এতোগুলো মাসের ভাড়া দেয়াটা সবার জন্যই কষ্টের। এর সাথে বিশেষত কষ্টের যারা টিউশনি করে- ভাড়া দেওয়ার বন্দোবস্ত করে আসছিলাম। এছাড়াও মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের অভাব নেই আমাদের বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে। এই দ্রব্যমূল্য অপ্রতুলতার দিনে ভালোভাবে বেশ কয়েক মাস পরিবারের সবাইকে নিয়ে খেয়ে বাঁচাটাই যেখানে চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। এর উপর এই বাড়তি মেস ভাড়া সবার জন্যই দুঃসহ একটি ব্যাপার। ভাড়া মওকুফ করে মানবিকতার পরিচয় দিক মেস হোষ্টেলসহ আবাসিক বাসা মালিকগণ।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো: নাহিদুজ্জামান নাহিদ বলেন, দেশের বর্তমান সময়ের মহামারির সংকটকালে মেসের ভাড়ার কথা চিন্তা করাটা আমাদের জন্য দুরহ: ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। করোনার থাবায় পুরো দেশের সামাজিক অবস্থা নাজেহাল হয়ে আছে। এদিকে দেশে রয়েছে লকডাউন চলমান। সবাই কর্মহীন হয়ে পড়ে আছে। প্রতিটি পরিবারের আয়ের উৎস বন্ধ। পরিবারে নেই কোনো উপার্জন। কেউ দু’মুঠো খেতে পাচ্ছে কেউ বা আছে অনাহারে । বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনও কিছু শিক্ষার্থী আছে যাদের বাড়ি থেকে টাকা দিতে না পারায় তারা নিজে টিউশনি করে খরচ চালাতো এমনকি পরিবারকে খরচের জন্য টাকা পাঠাতো। এখন তাদের কোনো টিউশনি নেই। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার কারনে কয়েকমাস থেকে আমরা বাড়িতে আছি। ক্যাম্পাস চলাকালে একটা পথ ছিলো কিন্তু এখন সেটাও বন্ধ। এ অবস্থায় তারা তাদের মেসের ভাড়া কিভাবে পরিশোধ করবে? এই মহামারিতে আমাদের সমস্যার কথা চিন্তা করে যদি মেসের মালিক কর্তৃপক্ষ কয়েক মাসের ভাড়া মওকুফ করে দেই তাহলে আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে এবং মানসিক চাপ কমবে।

# প্রতিবেদনটি করেছেন পাবলিক ভয়েসের বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের প্রধান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান।

#এইচআরআর/সম্পাদনা/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন