২০২০-২১ অর্থ বছরের জন্য ইশা ছাত্র আন্দোলনের বাজেট প্রস্তাবনা

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্ধের দাবি

প্রকাশিত: ১০:১৮ অপরাহ্ণ, মে ১২, ২০২০

আসন্ন বাজেটকে উপলক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে কোভিড-১৯ সৃষ্ট বৈশ্বিক বিপর্যয়কে সামনে রেখে ২০২০-২১ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করেছে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন।

আজ ১২ মে ২০২০ইং মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় রাজধানীর পুরানা পল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি এম. হাছিবুল ইসলামের সভাপতিত্বে সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল করীম আকরাম বাজেট প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।

প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ বাজেট পাবলিক ভয়েসের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।

খাতওয়ারি বাজেট প্রস্তাবনা ও উক্ত বাজেট বাস্তবায়নে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের সুপারিশমালা নিম্নরূপ:

০১. স্বাস্থ্য

ক) ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য স্বাস্থ্যখাতে মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ করতে হবে।
খ) জেলা পর্যায়ে প্রয়োজন মোতাবেক বাজেট বরাদ্দের জন্য জেলাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রত্যেক জেলায় একটি করে মেডিকেল কলেজ স্থাপন করতে হবে।
গ) বিশেষত ঔষধ উৎপাদন ও বিতরণ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয়ে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও দূর্নীতি রোধ করতে হবে।
ঘ) এক্ষেত্রে এডিপিতে (অর্থাৎ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) নির্দিষ্ট প্রকল্পের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
ঙ) প্রকল্পগুলির জন্য বরাদ্দের সাথে সম্পর্কিত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি), অ-সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, সম্প্রদায় ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা উন্নয়ন ও বিকাশ এবং নার্সিংও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা।

০২. কৃষি

ক) কৃষি খাতে নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে আগামী অর্থবছরে মোট বাজেটের ৫% বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।
খ) এছাড়াও বাণিজ্যিক কৃষির যে নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে তাতে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। তাই উৎপাদক ও ভোক্তা পর্যায়ে সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তুলে উৎপাদিত পণ্যের মজুদ বৃদ্ধি ও এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে রাখতে হবে। বিশেষত কৃষি উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ কে বিশেষ প্রাধান্য দিতে হবে। ন্যায্যমূল্যে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করতে হবে।
গ) রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার কৃষকের জন্য আলাদা ‘কৃষিবাজার’ প্রতিষ্ঠা এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এর জন্য প্রতিটি ইউনিয়ন হিমাগার ও খাদ্য গুদাম গড়ে তুলতে হবে।
ঘ) সরকার প্রতিবছর কৃষিখাতে সার, সেচ ও বিদ্যুৎ ভর্তুকি, নগদ সহায়তা ও প্রণোদনা হিসেবে যে অর্থ ব্যয় করে; তার সিংহভাগই খরচ হয় প্রভাবশালী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষকদের পেছনে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক সবসময় এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত ও উপেক্ষিত থাকেন। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি ভর্তুকি ও প্রণোদনার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সর্বাধুনিক পযুক্তির ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে এনআইডি নাম্বার কে ব্যাংক একাউন্টে রূপান্তর করা যেতে পারে।

০৩. শিক্ষা

শিক্ষাখাতে এই অবহেলার দরুণ গুণগত শিক্ষা ক্ষেত্রে আমরা ক্রমন্নয়ে পিছিয়ে পড়ছি। ইউনেস্কোর মতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হতে হবে জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ২০ শতাংশ এবং বার্ষিক জিডিপির ৬ শতাংশ; কিন্তু আমরা এখনো তা থেকে যোজন যোজন দূরে। তাই-
ক) ২০২০-২১ অর্থবছরে বৈশ্বিক মানদণ্ডে শিক্ষার সর্বোচ্চ গুণগত মান নিশ্চিতকল্পে মোট বাজেটের ২৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে।
খ) শতভাগ ডিজিটাল ক্লাস ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম পরিচালনায় বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে।
গ) আলিয়া ও কওমিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধশালী করতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।
ঘ) গ্রাম ও শহরের শিক্ষবৈষম্য শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে।
ঙ) কারিগরী, ভোকেশনাল ও পযুক্তি শিক্ষায় বরাদ্দ দ্বিগুণ করতে হবে।

০৪. সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা

ক) সামাজিক সুরক্ষাখাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিলো খুবই নগণ্য। যা ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ঘোষিত মোট জিডিপির ২.৩ শতাংশেরও কম। তাই সামাজিক সুরক্ষা খাতে জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্রে উল্লেখিত মোট জিডিপির ৩ শতাংশ নিশ্চিত করতে হবে।
খ) আয় বৈষম্য নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
খ) সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা।
গ) এছাড়াও বেকার ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, শিশু প্রতিপালন ভাতা, আবাসন সুবিধা, (বেকার জনগোষ্ঠীর অথবা কম আয়ের জনগোষ্ঠীকে বসবাসের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান) আয় সহায়ক ভাতা ও স্বাস্থ্য ভাতা নিশ্চিত করতে হবে।
ঘ) অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এর ক্ষেত্রে নিম্নআয়ের মানুষ তথা দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থানকারীদের জন্য নগদ প্রণোদনা, খাদ্য সহায়তা প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি ছোট স্বল্পপুঁজির ক্ষেত্রে বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে।

০৫. শ্রম ও কর্মসংস্থান

ক) বেকারত্ব নিরসনে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ২০২০-২১ অর্থবছরে গুরুত্ব দিতে হবে।
খ) বিশেষত প্রবাসী ফেরত বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৃষিখাতের গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
গ) গ্রামীণ কৃষিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারদের শহরমুখী প্রবণতা কমাতে হবে।
ঘ) ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
ঙ) তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বেকারত্ব দূরীকরণে বিশেষ প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ দিতে হবে
চ) বাজেট বরাবরই নারী উদ্যোক্তাদের উপেক্ষা করা হয়। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং নারীদের দ্বারা পরিচালিত কর্পোরেট ও কোম্পানিগুলোর কর হ্রাস করতে হবে।
ছ) জাতিসংঘের মাধ্যমে বিদেশে কর্মরত প্রবাসীদের স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে অবস্থান বহাল রাখতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে।
জ) ব্যক্তি পর্যায়ে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি করতে হবে।
০৬. গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়ন
ক) গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নে বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিতে হবে।
খ) গবেষণায় উৎসাহ প্রদান করতে বিশেষ প্রণোদনা সহায়তা প্রদান করতে হবে।
গ) দক্ষতা উন্নয়নে ইউনিয়ন ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

০৭. জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা

ক) এ খাত কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে সর্বোচ্চ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
খ) গ্রীন হাউজ গ্যাস নিরসনে বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে।
গ) এ খাতে বিশেষ মনিটরিং টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
ঘ) দেশের দক্ষিণাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বিশেষ স্কিম চালু করতে হবে।

বাজেট বাস্তবায়নে নিয়ে আমাদের সুপারিশমালা

১. পুরো অর্থনীতি শুধু গার্মেন্টস (RMG) নির্ভর না হয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামশ নিয়ে অর্থনীতিকে টেকসই করতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে ঢেলে সাজাতে হবে।
২. অর্থনীতির শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বাজারে শুধু নতুন অর্থ সরবরাহ না করে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে।
৩. কোভিড-১৯ কে বিবেচনায় নিয়ে করমুক্ত আয়ের সীমা আড়াই লাখ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা করতে হবে। এছাড়াও ১০, ১৫ এবং ২০ শতাংশের প্রথম পর্যায়ের আয়কর আদায়ের পরিমাণ কমিয়ে তা যথাক্রমে ৫, ১০ এবং ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।
৪. কর ফাঁকি বন্ধ করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। ৬৮ শতাংশ করদাতা করের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। এজন্য ঘইজ এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম নয়; বরং দেশব্যাপী তাদের কার্যক্রম বাস্তবায়নে কার্যকরী পরিকল্পনা নিতে হবে।
৫. কালোটাকা সাদা করার ব্যবস্থা বাতিল করে আয়কর আদায় ও খেলাপি ঋণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৬. অনুন্নয়ন ব্যয়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে।
৭. প্রায়োগাধিকার ভিত্তিক প্রজেক্ট বাছাই পূর্বক এডিপি (ADP) বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান- এগুলোকে প্রয়োগাধিকারভিত্তিতে বিশেষ প্রাধান্য দিতে হবে।
৮. নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ সচল রাখতে হবে। আমদানির ক্ষেত্রে খাদ্যসামগ্রীর করের হার কমাতে হবে।
৯. বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের কর ফাঁকি বছরে ১২ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল কর ফাঁকি রোধ করে কর আদায় করতে হবে।
১০. জনপ্রশাসনে বাজেট কমিয়ে ১২ শতাংশ রাখতে হবে। এছাড়াও প্রশাসনিক ব্যয়, মন্ত্রী-আমলাদের বেতন কমিয়ে শতকরা ৬০ শতাংশ খরচ কমাতে হবে। সরকারি গাড়ির জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও আনুষঙ্গিক ব্যয় শতকরা ৫০ শতাংশ কমাতে হবে।
১১. বিদেশে টাকা পাচার রোধ, ঋণক্ষেলাপী বন্ধ এবং সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে ১০ টাকার জিনিস হাজার টাকায় ক্রয়ের মত জালিয়াতি বন্ধ করতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

/এসএস

মন্তব্য করুন