স্বাগতম হে রমজানুল মোবারক : এবারেই হোক আপনার জীবনের সেরা রমজান

প্রকাশিত: ১২:২৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৪, ২০২০

স্বাগত মাহে রমযান। আজকে বাংলাদেশে রমযানের চাঁদ দেখা গেলে কাল থেকে রোজা শুরু হহবে। আরব বিশ্বসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গতকাল দেখা গিয়েছে মাহে রমজানের চাঁদ। শুরু হয়ে গেছে রমযান মাস। বাংলাদেশে চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত সন্ধ্যার পরই জানা যাবে। সাধারণত সৌদি আরবে রোজা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই বাংলাদেশেও রমজানের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে দুই তরুণ আলেম লিখেছেন পাবলিক ভয়েসে।

পবিত্র রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে যাত্রাবাড়ীর মাদরাসাতু সালমানের মুফতি ও মুদাররিস নাজমুল ইসলাম কাসিমী লিখেছেন –

স্বাগতম হে রমজানুল মোবারক

রমজান বরকতময় মাস । আল্লাহর প্রিয় বান্দারা পুরো বছর এ মাসের অপেক্ষারত থাকেন। আর যখনি তা আসে, সবাই এতো পরিমান খুশি হয় যে, যেমন নাকি সে হারানো কি পেয়েছে। এ মাসের গুরুত্বও অনেক বেশি। কেননা, যখন এ মাসের পূর্বের মাস তথা- রজম মাস শুরু হতো, তখন নবি সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসের অধির আগ্রিহে দিন কাটাতেন। এবং সবসময় এ দোআ করতেন- ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাব ওয়া শা’বান, ওয়া বাল্লিগনা রামাজান’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদেরকে রজব ও শা’বানে বরকত দিন এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন। (আল মুজামুল আওসাত,৪/১৮৯ হাদিস নং ৩৯৩৯; মাজমাউয যাওয়ায়েদ,২/১৬০)।

শাবান মাসে মদিনায় রোজা ফরজ সংক্রান্ত আয়াত নাজিল হয়- “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো যেভাবে তা ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা সংযমী হও। (সুরা বাকারা, আয়াত-১৮৩)। সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সেই মাসকে পায় সে যেন রোজা রাখে’।

মানুষ যে জিনিসের অপেক্ষমাণ থাকে যখন তা সামনে আসে তখন তার স্বাদ ইচ্ছেমত আস্বাদন করে। অন্যরকম এক অনুভূতি জন্ম নেয়। নিজের মাঝে অনেক আনন্দ ফিল করে। তখন সবসময় ভাবে কি কই জানি এর মূল্যায়নে কমতি হয়ে যাচ্ছে(!) যতেষ্ট মূল্যায়ন হচ্ছে না। আর যদি তার আগমন হয় অনেক বরকত সঙ্গে নিয়ে?। সুতরাং তারাই বড় ভাগ্যবান যারা এ পূন্যময় মাসে নিজেদের মূল্যাবান টাইমগুলো ইবাদতে ব্যয় করে। এবং তারা কতো অভাগা যারা এরকম বরকতমাখা মাস পাওয়ার পরও নেকি কামানো থেকে বঞ্চিত থাকে। রাসূলের ভাষায়- ‘দূর্ভাগ্যবান সেই যে এ বরকতের মাসেও আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত থাকে’ মুসনাদুশ শামিন,৩/২৭১ হাদিস নং২২৩৮)।

এ মাসের অনেক ফজিলত রয়েছে যদি সংক্ষেপে বলতে হয় তাহলে বলা যাবে, এ মাসেই পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এ মাসটি হলো বিশেষত আল্লাহর অনুসরণ ও ইবাদতের। তাতে এমন একটি রাত আছে,-যেটাকে শবে কদর বলে। যে রাত্রিতে আল্লাহ পাক অগণিত মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। এ মাসেই আল্লাহ পাক বান্দার উপর রহমত নাযিল করেন। অসংখ্য জাহান্নামিকে মুক্তি দান করেন। হযরত শাহ্ ইবনে সা’দ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি কারিম (সা.) এরশাদ করেছেন- বেহেশতের ৮টি দরজা রয়েছে। এর মধ্যে ১টি দরজার নাম রাইয়ান। রোজাদার ব্যতিত আর কেউ ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।(বুখারি; মুসলিম) বিখ্যাত হাদিস বিশারদ সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, হুজুর (সা.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসের রোজা রাখবে তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে রমযান মাসের রাতে এবাদত করে তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে কদরের রাতে ইবাদত করে কাটাবে তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (বুখারি, মুসলিম) হাদিসে আরো এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন- রোজা ছাড়া আদম সন্তানের প্রত্যেকটি কাজই তার নিজের জন্য। তবে রোজা আমার জন্য। আমি নিজেই এর পুরস্কার দেব। রোজা (জাহান্নামের আজাব থেকে বাঁচার জন্য) ঢাল স্বরুপ। সুতরাং রোজা ও রমজানকে যাবতীয় গোনাহ থেকে পাক রাখতে হবে।

মিথ্যা, প্রতারণা, গীবত, অশ্লীলতা, সুদ, ঘুষ, হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা, ঝগড়া-বিবাদসহ সকল অন্যায় থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষত চোখের গোনাহ থেকে নিজেদেরকে সযত্নে ফিরিয়ে রাখতে হবে। আজকাল অনেক রোজাদার সময় পার করার উদ্দেশ্যে টিভির সামনে বসে সিনেমা-নাটক দেখায় মগ্ন থাকে। এ অভ্যাস বর্জন করতে হবে। সময় পার করার জন্য কোনো উত্তম পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

সময় আল্লাহপাকের অনেক বড় নিয়ামত। নানাবিধ নেক আমলের রুটিন দ্বারা রমজানের দিনগুলো সাজিয়ে নিলে, সময় কত দ্রুত ফুরিয়ে যাবে তা টেরও পাওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত আমল যেমন- যিকির, তিলাওয়াত ইত্যাদির পাশাপাশি দ্বীনি মজলিসের ব্যবস্থা করা এবং তাতে শরিক হওয়াও কর্মসূচিতে রাখা যেতে পারে। দোয়া করি আল্লাহ আমাদের সবাইকে পুরো মাস তার সন্তুষ্টি মোতাবেক ত্রিশটি রোজা রাখার তাওফিক দান করুন।

তরুণ আলেম, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট এইচ এম আবু বকর লিখেছেন –

এবারেই হোক আপনার জীবনের সেরা রমাদান

বিশ্বের এই চরম ক্রান্তিলগ্নে রমাদানকে স্বাগত জানাবে বিশ্ববাসী। রমাদানের রহমত ও বরকত লাভে ধন্য হয়ে পৃথিবী আবারও ঘুরে দাঁড়াবে – এই স্বপ্ন দেখে হতাশ হৃদয়ে প্রশান্তির বাতাস বইছে তাওহীদে বিশ্বাসী সকল মুমিনের। অমুসলিমরাও এবার যুগপৎ মুসলিমদের এই বার্ষিক বিগ ফেস্টিভ্যাল ইবাদাতের আশীর্বাদ কামনা করছেন। কোভিড ১৯ এর কারণে এবারের রমাদান আয়োজনের দিক থেকে উৎসবমুখর না হলেও তাৎপর্যপর্যের বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোভিড ১৯ এর কারণে জনজীবনে স্বস্তি নাই, গতি নাই জীবনযাত্রায়। কিন্তু পার্থিব কোলাহলমুক্ত এই সময়টা একজন প্রকৃত মুমিনের জন্য হতে পারে ইবাদতের সেরা সময়। অফিস, আদালত, ব্যাবসা, রাজনীতিসহ বাইরের জঞ্জাল মুক্ত এবারের রমাদানকে চমৎকার পরিকল্পনার আলোকে ঢেলে সাজালে এটি জীবনের সেরা রমাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সচেতন করণার্থে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা ব্যস্ততার আগেই অবসরতাকে মূল্যায়ন করো।’ সহীহ বুখারী। অতএব করোনাকালীন এই চমৎকার অবসরতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের পরকাল নির্মাণে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারি।

প্রিয় পাঠক, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদানের ফজিলত সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন, ‘যে লোক এই মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে রোযা রাখবে মহান আল্লাহ তার পূর্ববর্তী সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিবেন।’ সহীহ বুখারী। রোজার পাশাপাশি তারাবীহর প্রতি উৎসাহিত করে তিনি বলতেন, ‘যে ব্যক্তি রমাদানের রাতে ঈমানের সঙ্গে নেকির আশায় তারাবীহর সালাত আদায় করে তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ মুসলিম।

সুতরাং রমাদানের মৌলিক দুটি ইবাদাত তথা দিনের রোজা ও রাতের তারাবীহর সালাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে রমাদানে আমাদের করণীয় তালিকাটি হতে পারে এমন,

ক. ৫ ওয়াক্ত সালাত ও তারাবীহ জামাতে আদায় করা। মসজিদের জামাতে বাধ্যবাধকতা থাকলে ঘরের ছোটোবড়ো সকল সদস্যকে নিয়ে ৫ ওয়াক্ত সালাত ঘরেই আদায় করুন। সেক্ষেত্রে বাবা কিংবা সংসারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ইমামতের জিম্মাদার হতে পারেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেউ হাফেজে কুরআন থাকলে ঘরে অবশ্যই তারাবিহর সালাতে খতমে কুরআনের আয়োজন করুন। একাধিক ঘর বা ফ্ল্যাটের লোকজনকে নিয়েও এই আয়োজন হতে পারে।

খ. জামাতে সালাত আদায়ের পরে কিছুক্ষণ দরসুল হাদীস হতে পারে। রমাদানের ফজিলত, তিলাওয়াতের ফজিলত ও সময় যাপনের নির্দেশনামূলক হাদীসের পাঠ বেশি হওয়া উচিত হবে।

গ. দিনের অবসর সময় ব্যক্তিগত তিলাওয়াত, ঘরের লোকদের তিলাওয়াত শুদ্ধ করণ, সিরাত অধ্যয়ন, বুযূর্গানে কেরামের রমাদান পালন সংক্রান্ত বইসহ যেকোনো প্রশংসনীয় অধ্যয়নে ব্যয় করা যেতে পারে। তবে কখন কোন আমল করা হবে এমনকি কতটুকু সময় হবে অবশ্যই তার সময়সূচি নির্দিষ্ট থাকা চাই।

ঘ. মিথ্যা কথা, চোগলখোরি, ঝগড়াঝাটি, বেপর্দা চলাফেরা বর্জনের অঙ্গিকার ব্যক্ত করা। কেননা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যাক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তাঁর এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নাই।’ সহীহ বুখারী।

ঙ. মোবাইল, ফেইসবুক, ইউটিউব, টুইটারসহ সোস্যাল মিডিয়ায় সময় নষ্ট করা যাবেনা। কেননা এমন অবসর ও মুক্ত রমাদান আমাদের জীবনে আর নাও আসতে পারে তাই আমলের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দার দুটি পা ততক্ষণ পর্যন্ত নড়াতে পারবে না; যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, তোমার জিন্দিগি কোথায় ব্যয় করেছ? জ্ঞানানুসারে কি আমল করেছ? সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছ আর কিসে খরচ করেছ এবং তোমার শরীরকে কী কাজে নিঃশেষ করেছ?’ তিরমিজি।

চ. সাধ্যানুযায়ী প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নেওয়া। যাতেকরে আমাদের আশপাশের কেউ না খেয়ে না থাকে। কেননা ভোগ নয়, ত্যাগই রমাদানের আসল শিক্ষা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে লোক একজন রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার জন্য সেই রোজাদারের মতই সওয়াব লিখা হবে। কিন্তু তাতে মূল রোজাদারের সওয়াব হতে এক বিন্দুও কম করা হবে না।’ নাসাঈ, তিরমিজী। এছাড়াও তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে পরিতৃপ্তির সাথে ভোজন করায় আল্লাহ তাআলা তাকে আমার হাউজ হতে পানি পান করাবেন। ফলে জান্নাতে পবেশ করা পর্যন্ত সে কোন তৃষ্ণার্ত হবে না।’ মিশকাতুল মাসাবীহ।

আলোচ্য বিষয়ের বাইরেও আপনি নিজেকে কিংবা পরিবারের সদস্যদেরকে বিভিন্ন ফজীলতপূর্ণ ছোটোবড়ো আমলের চ্যালেঞ্জ দিতে পারেন। কর্পোরেট কোম্পানিগুলো হরেকরকম চ্যালেঞ্জ করে থাকে, যেগুলোর তুলনা আখেরাতের আমলের সাথে একদমই গৌণ। সুতরাং আমরা ওসব চ্যালেঞ্জ নয় বরং নিজের চরিত্র, আমল, সালাত, তিলাওয়াত, রোজাসহ ব্যাক্তি ও পারিবারিক জীবনকে সুন্দর করার চ্যালেঞ্জ নিতে পারি। সেটা হতে পারে অন্য কারোর সাথে কিংবা নিজেকেই নিজে ছাড়িয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ। রমাদান আমাদের মাঝে এই শিক্ষা নিয়েই আসে। ব্যস্ত জীবনে আমল ও আখলাকের চর্চা করাই রমাদানের আসল উদ্দেশ্য। মহান আল্লাহ রমাদানের প্রকৃত উদ্দেশ্য আমাদের জীবনে ধারন করার তাওফিক দিন।

আরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন