বাংলাদেশে ইসলামী ঘরানার মানুষ ওভার সেনসেটিভ

প্রকাশিত: ৮:১৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২০

লোকটি জীবনে প্রথমবার শহর ঘুরে এসে বন্ধুদের কাছে শহরের গল্প বলছিল; ‘শহরের মানুষ চালাক হলেও তার সাথে চালাকিতে পেরে উঠেনি। বন্ধুরা কৌতূহলি হয়ে জানতে চাইলো ঘটনা কী? লোকটি জানাল, শহরে অনেক উঁচু উঁচু দালান আছে। সে একটি দালানের নিচে দাঁড়িয়ে ফ্লোরগুলো গুনতে ছিল,

এক তলা
দুই তলা
তিন তলা…

বিল্ডিং থেকে একলোক বেরিয়ে এসে বলল, কয়তলা গুনেছো? আমি বললাম কেন? সে বলল, এখানে প্রতি তলা গণনার জন্য পাঁচ টাকা করে দিতে হয়। তুমি কয়তলা গুনেছো?
আমি ঝটপট বললাম একুশ।
সে বলল, একশ পাঁচ টাকা বের করো।
আমি একশ টাকার একটি নোট বের করলাম। সে বলল, ঠিকাছে। পাঁচটাকা ডিসকাউন্ট।
আমি আসলে গুনেছিলাম একান্ন তলা, হাহাহা। লোকটিকে কীভাবে বোকা বানালাম, চিন্তা করো…

গল্পটি পুরনো। অনেকেই জানেন। জানা গল্প আবার জানানোর কারণ, আমাদের গল্পের মতো আচরণ।


বাংলাদেশে মিডিয়ার সাথে ইসলামি ঘরানার সম্পর্কটা বেশ অদ্ভুদ অথবা পানির মতো পরিস্কার। এই সম্পর্ক নির্ভর করে টিআরপি এবং ইআরপির উপর। টিআরপি মানে টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট। ইআরপি স্ট্যান্ড ফর ইমোশন রেইজিং প্লান।

একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে টিকে থাকতে হয় টিআরপির উপর ভিত্তি করে। যার টিআরপি বেশি, তার বিজ্ঞাপনও ততো বেশি। টিআরপি বাড়ানোর জন্য সুন্দর প্রোগ্রামিং-এর সাথে সাথে অসুন্দর অনেক প্লানিং-ও করতে হয়। এরমধ্যে খুব কমন একটি প্লান হলো এমন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্টিকে একটু খোঁচা দেওয়া, যারা একটু সেনসেটিভ প্রজাতির! তারপর বসে থাকো। আর কিছুই করার দরকার নেই। যা করার ওরাই করে দেবে। আফসোস! ন্যাড়া দ্বিতীয়বার বেলতলায় যায় না, আর আমরা বেলতলাতেই বসে থাকি!


সময়, সময়, সময় টিভি, একাত্তর টেলিভিশন অথবা অন্যকেউ ইসলাম, মুসলমান বা ইসলামী কোনো নেতার বিরুদ্ধে যে প্রতিবেদন করে, অথবা টকশোতে নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত ওয়ান সাইটেড খিস্তি, এগুলো যে তারা ইচ্ছে করেই করে- আমরা সেটা বুঝেও বুঝি না।

বাংলাদেশে ইসলামী ঘরানার মানুষ একটু ওভার সেনসেটিভ। ঘুমন্ত চ্যানেলকে জাগিয়ে তুলতে হলে অথবা মৃতপ্রায় চ্যানেলকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এই প্রজন্মকে আঘাত করতে হবে। তাহলেই পালটা আঘাত করবে তাঁরা। তাদের টেলিভিশনের রেটিং বাড়বে। কেউ তাদের গালি দেবে, কেউ দেবে উস্কানি। কেউ বলবে ভালো খবর, কেউ বলবে খবর আছে। যে যাই বলুক, সবগুলো থেকেই তাদের জন্য ভালো ব্যাপার। মনস্তাত্ত্বিক এই লড়াইয়ে তারা জিতলেও জিত, হারলেও জিত। এ লড়াইয়ে তাদের হারানোর কিছু থাকে না।

আমরা এমন এক প্রজাতি, কাউকে সাইজ করার জন্য আরো উপরে উঠিয়ে দিই। এভাবে সাইজ করতে পেরে আমরাও খুশি, যাকে সাইজ করলাম, তারাও খুশি। যাকে বলে উইন উইন সিচুয়েশন। কিন্তু আসলেই জিতল কে? হারছে কারা?


যদি প্রশ্ন করি এই সময়ে বাংলাদেশের মানুষ টেলিভিশন বেশি দেখে, নাকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি থাকে, শতকরা আটানব্বইজনই হয়তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা বলবেন। যে নিউজগুলো টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রকাশ করে সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ না কেউ প্রকাশ করে ফেলে। যেগুলো কোনো চ্যানেল প্রকাশ করে না, সেগুলোও ফেইসবুকে পাওয়া যায়। তাহলে ব্রডকাস্টিং পপুলারিটি এবং ব্যাপকতার বিচারে কোনটি বেশি ইফেক্টিভ?

তাহলে কোন চ্যানেল কী বলল- কী আসে যায়! করুক না বকওয়াস যেমন খুশি। পাত্তা দেওয়ার দরকার কী। ওরা এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। মানুষ আজকাল আর তাদের সংবাদের জন্য অপেক্ষা করে না। উলটো তাদেরকে দেখা যায় অনলাইনের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রচার করতে। তাহলে বিরোধিতার নামে তাদের হাত ধরার দরকার আছে? ওরা এখন টিকে থাকার জন্য ফেইসবুক আর ইউটিউবের সাহায্য নিচ্ছে। একটি পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন চ্যানেল হওয়ার পরও তাদেরকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রোগ্রাম লাইভ করতে হচ্ছে। তাহলে কোথায় আছে তাদের অবস্থান?


তারমানে গালি দিলে সহ্য করতে হবে? অপবাদ দিলে চুপ করে বসে থাকতে হবে? এটা কি সম্ভব?
না, এটাও সম্ভব না। আমরা মানুষ, রক্ত-মাংসের তৈরি। রাগ আসবে। মেজাজ খারাপ হবেই। শুধু প্রতিবাদের ধরণটা পালটে দিতে হবে। এমন সবকিছু থেকে দূরে থাকতে হবে যেগুলো তাদেরকে আলোচনায় নিয়ে আসে কিংবা তাদের রেটিং বাড়তে থাকে। দেশে আইন আছে। আইনের মাধ্যমে জবাব দেওয়াই বেটার। লাখ লাখ মানুষ যদি প্রতিবাদের নামে তাদের আপত্তিকর নিউজ শেয়ার করতে থাকেন, তাহলে তাদের লাভ হলো না ক্ষতি?

ব্রডকাস্টিং-এর দুনিয়ার তারা এখন হারানো দিনের গানের মতো। উঠে দাঁড়াতে স্ট্রেচার লাগে। আমরা কেন স্ট্রেচার হবো? তাঁরা তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে আমাদের ব্যবহার করতে চায়। আমরা কেন ব্যবহৃত হবো?


বাংলাদেশের কোনো টেলিভিশন চ্যানেল যখন অস্তিত্ব সংকটে ভোগে, তখন তারা ইসলামকেই বেছে নেয়। ইচ্ছা করেই আঘাত করে। এই আঘাতটা কখনো করে স্বভাবে, মাঝেমধ্যে অভাবে। অভাব হলো টিআরপির, আর স্বভাবটা সেই আগের মতো।

আমরা ব্যবহৃত হই। হৈ চৈ করে তাদের পারপাস সার্ভ করে দিই। তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাওয়ার পর ছোট্ট করে বলে, উই আর সরি। আমরা খুশি হই। ব্যাটারা ভয় পেয়েছে। মাফ চেয়েছে। আমরা জিতেছি। চোখটা বন্ধ করে দেখতে পারলে পরিস্কার দেখা যাবে এখানে কিন্তু জয়ীরাই পরাজিত।

ইসলামিস্টদের একটি মিডিয়া দরকার- যেটা কোনোদিনই হবে না। সুতরাং আফসোস করে গলা ভেঙে লাভ নাই। দুধের স্বাদ ঘোলেই মিটুক।

লেখক: রশীদ জামীল
প্রবাসী লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট

মন্তব্য করুন