আল্লামা ইকবাল : কাব্যদর্শনের বরপুত্র

আল্লামা ইকবালের জীবনী ও অবদান

প্রকাশিত: ৯:০৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২০
আল্লামা ইকবাল : জীবনী ও ‘খুদী’ দর্শন। ছবি : পাবলিক ভয়েস।

বিশেষ প্রতিবেদন-

“ওঠো দুনিয়ার গরীব ভুখারে জাগিয়ে দাও।
ধনীদের দ্বারে ত্রাসের কাঁপন লাগিয়ে দাও॥
কিষাণ-মজুর পায়না যে মাঠে শ্রমের ফল।
সে মাঠের সব শস্যে আগুন লাগিয়ে দাও॥”

প্রারম্ভিকতা : দুনিয়ার অন্যায়, অবিচার আর অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত বস্তুবাদী সভ্যতার খড়কুটায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া এক দ্রোহের ‘কবিনাম’ আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল। একাধারে কবি, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ পরিচয়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত এ বিশ্বজনীন ব্যক্তিত্বকে নিয়ে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যে আজও আগ্রহের কমতি নেই। পৃথিবীজুড়ে যে কয়টি নাম এক শব্দে পরিচিত তার মধ্য অন্যতম হলো ইকবালের নাম। ‘কবি ইকবাল’, ‘আল্লামা ইকবাল’ ‘গোলে লাহোর’ ‘ইকবাল-ই-লাহোরী’ এসব নামেই তিনি পরিচিত। তাঁর ফার্সি ও উর্দু কবিতা আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইকবাল তাঁর ধর্মীয় ও ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন। আধুনিক ভারত উপমহাদেশে তাঁর একটি বিখ্যাত চিন্তা দর্শন হচ্ছে ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন। এই চিন্তাই বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর নাম মুহাম্মদ ইকবাল হলেও তিনি আল্লামা ইকবাল হিসেবেই অধিক পরিচিত। তাঁর ফার্সি সৃজনশীলতার জন্য ইরানেও তিনি ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ। তিনি ইরানে ইকবাল-ই-লাহোরী নামে পরিচিত।

এই আর্টিকেলে আল্লামা ইকবালের জীবনের সকল দিক নিয়ে কিছু কিছু আলোচনা নিয়ে আসা হয়েছে।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন : আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল বর্তমান পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম তারিখ সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মতামত হলো- ৯ নভেম্বর, ১৮৭৭ সাল। পাকিস্তান সরকার এই তারিখটি গ্রহণ করে থাকেন। তার পিতার নাম শেখ নুর মোহাম্মদ এবং মাতার নাম ইমাম বীবী। কবির পিতা মাতা উভয়ই অত্যন্ত দ্বীনদার ও পরহেজগার মানুষ ছিলেন। কবির পূর্বপুরুষগণ কাশ্মীরবাসী সাপ্রু গোত্রীয় ব্রাহ্মণ পন্ডিত ছিলেন। তাঁরা সুলতান জয়নুল আবেদীন ওরফে বুদ শাহ (১৪২১-১৪৭৩ খৃঃ) এর রাজত্বকালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর দাদা শিয়ালকোটে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং ষাট বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।

শিক্ষা জীবন : পিতা নূর মোহাম্মদের ইচ্ছা ছিল পুত্রকে মাদরাসায় পড়ানোর কিন্তু উস্তাদ শামসুল উলামা মীর হাসানের পরামর্শে তাঁকে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করা হয়। প্রাইমারী শিক্ষা শেষ হলে তাঁকে শিয়ালকোট স্কচ মিশন স্কুলে ভর্তি করা হয়। এ স্কুল হতে তিনি ১৮৯৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন।

ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন প্রচন্ড মেধাবী। ১৮৮৮, ১৮৯১ ও ১৮৯৩ সালে যথাক্রমে প্রাথমিক বৃত্তি, নিম্ন মাধ্যমিক বৃত্তি ও প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি স্বর্ণপদক ও মাসিক বৃত্তি লাভ করেন। ১৮৯৩ সালে স্কচ মিশন স্কুল কলেজে উন্নীত হলে ইকবাল এখানে এফ. এ. শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৮৯৫ সালে অনুষ্ঠিত এফ.এ. পরীক্ষাতেও তিনি প্রথম বিভাগে পাস করেন এবং যথারীতি বৃত্তিসহ স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৮৯৫ সালে তিনি শিয়ালকোট হতে লাহোরে এসে লাহোর সরকারী কলেজে বি.এ ভর্তি হন।

লাহোর সরকারী কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি টি.ডব্লউ এর মত ভূবন বিখ্যাত একজন সুযোগ্য শিক্ষক পান যিনি ছিলেন আরবী ভাষায় সুপন্ডিত, দর্শনের অধ্যাপক ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক। প্রতিভাবান ইকবালকে ছাত্র হিসেবে পেয়ে আরনল্ড সাহেব তাঁকে আপন করে নিয়েছিলেন এবং মনের মত করে গড়ে তুলেছিলেন। ১৮৯৭ সালে তিনি আরবী ও ইংরেজিতে সমগ্র পাঞ্জাবে প্রথম স্থান নিয়ে বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। যে কারণে তিনি এবার দুটি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এরপর ১৮৯৯ সালে দর্শনশাস্ত্রে এম.এ পাস করেন। এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন। সাথে সাথে কর্মজীবনেও পা দিয়েছেন।

কর্মজীবন : ১৮৯৯ সালে তিনি লাহোর ওরিয়েন্টাল কলেজে ইতিহাস ও দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এর সামান্য কিছুকাল পরই তিনি লাহোর সরকারী কলেজ ও ইসলামিয়া কলেজের ইংরেজি ও দর্শনশাস্ত্রের খন্ডকালীন সহকারী অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এ সময়ে উর্দু ভাষায় অর্থশাস্ত্র সম্বন্ধে তাঁর সর্বপ্রথম পুস্তক রচনা করেন। তাঁর জীবন ছিল ছকে বাঁধা।

এ সম্বন্ধে ইসলামী বিশ্বকোষ লিখেছে, “তিনি ভোরে ওঠে ফজরের সালাত আদায় করতেন, অতঃপর উচ্চস্বরে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। তারপর কিছুক্ষণ শরীরচর্চা করতেন এবং কিছু না খেয়ে কলেজে যেতেন। দুপুরে বাড়ি ফিরে আহার করতেন। অনেক সময় গভীর রাতে ওঠে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতেন। একবার তিনি একাধারে দুই মাস এই রাত্রিকালীন সালাত আদায় করেন।

উচ্চশিক্ষা : ১৯০৫ সালে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মানসে লন্ডন যান। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হতে তিনি দর্শনশাস্ত্রে এম. এ ডিগ্রী লাভ করেন। এ সময় তিনি শিক্ষক হিসেবে পান বিশ্বখ্যাত দার্শনিক ড. এম সি ট্যাগার্টকে। এরপর তিনি পশ্চিম ইউরোপ ভ্রমণে বের হন। শেষে জার্মানীর মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারস্যের দর্শন শাস্ত্র বিষয়ক সন্দর্ভ লিখে ১৯০৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। এরপরের বছর লিংকন ইন হতে ব্যারিস্টারী পাস করেন। এ সময় তাঁর প্রিয় শিক্ষক স্যার আর্নল্ড লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবীর অধ্যাপক ছিলেন। তিনি বিশেষ কারণে কয়েক মাসের ছুটিতে গেলে ইকবাল ৬ মাসের জন্য তাঁর স্থানে আরবীর অস্থায়ী অধ্যাপক নিযুক্ত হন।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন : ১৯০৮ সালের ২৭ শে জুলাই তিনি দেশে ফিরে এলে লাহোরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁকে বিপুলভাবে সংবর্ধিত করেন। তিনি লাহোরে ফিরে স্বপদে পুনর্বহাল হন এবং সরকারের অনুমতিক্রমে আইনব্যবসা শুরু করেন। অবশ্য দেড় বছর পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে স্থায়ীভাবে তিনি আইনব্যবসা শুরু করেন। তবে একটা কথা জেনে রাখা দরকার, তিনি কখনই মাসিক খরচের পরিমাণ টাকা রোজগারের পর কোনও মোকদ্দমা গ্রহণ করতেন না।

কবি পরিচয়ের ইকবাল : ইকবালের কাব্য প্রতিভার মূল্যায়ন চাট্টিখানি বিষয় নয় কারণ তিনি এত কবিতা লিখেছেন এবং তাঁর কবিতার মান এতটাই উন্নত ছিলো যা নিয়ে আলোচনা করা কঠিনই বটে। কবি-জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে ইকবালেরর উপর উর্দু কবি “দাগ”-এর প্রভাব ছিল প্রবল। পরবর্তীতে “কবি গালিব” ও “কবি হালী”-এর প্রভাবে গতানুগতিকা ছেড়ে তাঁর কবিতা সম্পূর্ণ নতুন খাতে প্রবাহিত হয়।

ছাত্রাবস্থায় ১৮৯৬ সালে শিয়ালকোটের এক কবিতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর কবি প্রতিভার বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। এরপর তিনি বেশ কিছু কবিতা লিখে হায়দারাবাদের প্রখ্যাত ‘কবি দাগের’ নিকট পাঠিয়ে দেন সংশোধনের জন্য। কবি দাগ কিশোর কবির এ কবিতাগুলি পেয়ে মনোযোগ সহকারে পড়েন ও চমৎকার একটি মন্তব্য লিখে পাঠান। কবি দাগ লিখেছিলেন, ‘এ কবিতাগুলি সংশোধন করার কোন দরকার নেই। এগুলো কবির স্বচ্ছ মনের সার্থক, সুন্দর ও অনবদ্য ভাব প্রকাশের পরিচয় দিচ্ছে।’ কবি ইকবাল এ চিঠি পেয়ে তো খুব উৎসাহ পেলেন। তাঁরপর হতে চললো তাঁর বিরামহীন কাব্যসাধনা।

১৯০০ সালে তিনি লাহোরে অনুষ্ঠিত আঞ্জুমানে হিমায়েতে ইসলাম-এর বার্ষিক সাধারণ সভায় জীবনের প্রথম জনসমক্ষে তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘নালা ইয়াতীম’ বা অনাথের আর্তনাদ পাঠ করেন। কবিতাটি পড়ার পর চারিদিকে হইচই লেগে যায়। মানে কবিতাটি এত জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে, তাৎক্ষণিকভাবে কবিতাটি ছাপা হয় এবং এর প্রতিটি কপি সে সময় চার টাকা দামে বিক্রি হয়। বিক্রয়লব্ধ প্রচুর পরিমাণ টাকা ইয়াতিমদের সাহায্যার্থে চাঁদা হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯০১ সালে তিনি ছোটদের জন্য লেখেন-মাকড়সা ও মাছি, পর্বত ও কাঠবিড়ালি, শিশুর প্রার্থনা, সহানুভূতি, পাখীর নালিশ, মায়ের স্বপ্ন প্রভৃতি কবিতা।

এরপর তিনি দু’হাতে অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু ছিল, ‘স্বদেশপ্রেম, মুসলিম উম্মাহর প্রতি মমত্ববোধ, ইসলামের শ্বাশত আদর্শে তাওহীদভিত্তিক বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, জাতির উত্থান-পতন, দলীয় কলহ ও অন্তর্দ্বন্ধ নিরসন প্রভৃতি বিষয় কবিতায় স্থান পেতো। ঘুমন্ত মুসলিম জাতিকে তিনি বেলালী সুরে আহবান জানাতেন ক্লান্তিহীনভাবে। স্বকীয় আদর্শের সন্ধানে যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করে তোলাই তাঁর লক্ষ্য ছিল।’

রচনাবলী : ইকবাল গদ্য-পদ্য উভয় রচনাতেই ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তিনি ছিলেন মুক্তছন্দ কবি ও লেখক। তিনি লেখালেখি করেছেন বিভিন্ন বিষয়ের উপর। অর্থনীতির মত জটিল বিষয় থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিকতার মতো বিমূর্ত বিষয় পর্যন্ত উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। গ্রন্থ রচনা ছাড়াও তিনি বিস্তর প্রবন্ধ লিখেছেন। রাজনৈতিক প্রয়োজনে তৈরী করতে হয়েছে বিবৃতি, দিতে হয়েছে সাক্ষাৎকার। ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও পন্ডিতদের সাথে আজীবন চিঠিপত্র বিনিময় করেছেন তিনি। আল্লামা ইকবাল তার জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে রচনা করেন মাত্র ২৪টি কবিতা। তাও এর অধিকাংশই তার বন্ধু “মাখজান” সম্পাদক আব্দুল কাদিরের অনুরোধে।

১৯০১ সালে ‘হিমালাহ’ নামক কবিতাটি তৎকালীন সময়ের উর্দু ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ পত্রিকা ‘মাখযানে’ ছাপা হয়। এটিই পত্রিকায় প্রকাশিত কবির প্রথম কবিতা। মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে তিনি এসময় অনেকগুলো পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন।

কবি ইকবালের কিছু বিখ্যাত গ্রন্থ :

(১) ইলমুল ইকতিসাদ : ১৯০৩ সালে লাহোর হতে অর্থনীতির ওপর তাঁর প্রথম পুস্তক ‘আল ইলমুল ইকতেসাদ’ প্রকাশিত হয়। ১৯২৪ সালে ‘বাঙ্গেদারা’ বা ঘন্টাধ্বনি নামক তাঁর বিখ্যাত কবিতার সংকলন প্রকাশিত হয়। এ পর্যন্ত এ গ্রন্থটির বহু সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

(২) তারিখ-ই-হিন্দ : বইটির মূল কপির সন্ধান পাওয়া যায়না এখন। এর একটি সংস্করণ অমৃতসর থেকে প্রকাশিত হয়।

(৩) আসরার-ই-খুদী : ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আসরার-ই-খুদী’ বা ব্যক্তিত্বের গূঢ় রহস্য। এ কাব্যগ্রন্থটি ১৯২০ সালে ইংরেজি ভাষায় অনুদিত হয়ে প্রকাশিত হয়। অনুবাদ করেন ডঃ আর এ নিকোলসন। সাথে সাথে সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বে মহাকবি ও বিশ্বকবি আল্লামা ইকবালের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৫ সালে ‘আসরার-ই-খুদী’ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা হয়। বিশ্বের বহু ভাষায় এ কাব্যগ্রন্থটি অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে।

এই বই প্রকাশের পর সাড়া পড়ে যায় সর্বত্র। কিন্তু সূফী তরীকার অনুসারীরা এই পুস্তক প্রকাশকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে গ্রহণ করেননি। কেননা ইকবাল এই গ্রন্থে সূফী কবি হাফিজ শিরাজীর তীব্র সমালোচনা করে ৩৫টি কবিতা লিখেছিলেন। উত্তেজনা এতই চরম আকার ধারণ করেছিল যে, ইকবালের চিন্তাধারার সমালোচনা করেও খান বাহাদুর পীরজাদা মোজাফফর আহমদ ‘ফজলে রাজ-ই-বেখুদী’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা প্রকাশ করেন। ইকবাল পরবর্তী সংস্করনে উল্লেখিত ৩৫টি কবিতা বাদ দিয়ে দেন।

(৪) রমুযে বেখূদী : প্রকৃতপে আসরার-ই-খূদীরই ক্রম সম্প্রসারিত এই সংকলনটি ১৯১৮ সালে রমুযে বেখুদী নামে প্রকাশিত হয়। আর্থার জন আর্বারী এটি ইংরেজীতে অনুবাদ করেন।

(৫) পায়াম-ই-মাশারিক : এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯২৩। এ সময়ে ইকবাল কবি হিসেবে অর্জন করেছেন সর্বজন স্বীকৃতি। তাঁর কবিতা এগিয়ে চলেছে পূর্ণ-পরিনতির দিকে। তিনি এ কাব্যে পাশ্চাত্য দর্শনের পাশাপাশি প্রাচ্যের কোরআনী চিন্তার ফসলকেও তুলে এনেছেন। এই কাব্যাটি গ্যাটের চিন্তাধারার অনুসরণে রচনা করেন। এতে মোট আশিটি কবিতা সংকলিত হয়েছে।

(৬) বাঙ্গ-ই-দারা : ইকবালের কবি জীবনের শুরু উর্দু কবিতার হাত ধরে। আর এই কাব্যটি উর্দু কবিতা সংকলন। উর্দুতেই তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ দেশত্মবোধক এবং জনচিত্তে আগুন ধরানো কবিতাসমূহ। ১৯২৪ সালে তিনি বাঙ্গ-ই-দারা নামে এ সকল উর্দু কবিতার সংকলনটি প্রকাশ করেন। এ কাব্যের কবিতাগুলো দেশাত্ববোধক, প্রকৃতি প্রীতি ও ইসলামী অনুভূতি এই তিনটি অংশে বিভক্ত। ‘বাঙ্গেদারা’ বা ঘন্টাধ্বনি নামক তাঁর বিখ্যাত কবিতার সংকলনটি এ পর্যন্ত এ গ্রন্থটির বহু সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

(৭) যবুর-ই-আযম : ইকবালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফার্সী কবিতা সংকলন যবুর-ই-আযম। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়। এর দুটি অংশের প্রথম অংশে ুদ্র কবিতা ও গীত এবং দ্বিতীয় অংশের নাম গুলশান-ই-রাজ-ই-জাদীদ। এখানে ইকবাল তার বিশিষ্ট দার্শনিক ভঙ্গিতে বর্তমান পৃথিবীর সমস্যাবলীর

(৮) শিকওয়াহ : ১৯১১ ও ১৯১২ সালে পঠিত তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কবিতা ‘শিকওয়াহ’ বা অভিযোগ ও ‘জওয়াব-ই-শিকওয়াহ’ বা অভিযোগের জবাব উর্দু ভাষায় রচিত। এ দীর্ঘ দুটি কবিতার কাব্যগ্রন্থ দু’টির বাংলা ভাষায় একাধিক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

(৯) পায়াম-ই-মাশরিক : ১৯১২ সালে প্রকাশিত হয় ফারসী ভাষায় রচিত ‘পায়াম-ই-মাশরিক’ প্রাচ্যের বাণী কাব্যগ্রন্থটি। গ্রন্থটি আরবী, ইংরেজী, তুর্কী, জার্মান ও রুশ ভাষায় অনূদিত হয়।

(১০) দরবারে কালীম : ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘দরবারে কালীম’ বা মূসার লাঠির আঘাত কাব্যগ্রন্থটি। উর্দু ভাষায় রচিত এ কাব্যগ্রন্থটি আরবী ও রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েও প্রকাশিত হয়।

এছাড়াও আল্লামা ইকবালের রয়েছে আরও অসংখ্য গ্রন্থাদী। ইকবালের ‘খুদী দর্শন’ পৃথিবীর শ্রেষ্টতম দর্শন হিসেবে ধরা হয়।

আল্লামা ইকবালের ‘খুদী দর্শন’ :

প্রাচ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল কবি হিসেবে বেশি পরিচিত হলেও তিনি মূলত বড় মাপের একজন দার্শনিক। জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় হতে দর্শন বিষয়ক গবেষণায় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি তাঁর কবিতায়ও দর্শন-ভাবনার প্রকাশ সুস্পষ্ট। এমনকি ড. ইকবালকে ইসলামী দর্শনের প্রথম সার্থক ব্যাখ্যাকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্বের প্রায় ডজনখানেক ভাষায় অনূদিত আল্লামা ইকবালের “আসরারে খুদী” একটি বিখ্যাত দর্শননির্ভর কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থের জন্য বৃটিশ সরকার ইকবালকে “নাইট” উপাধিতে ভূষিত করে।

ইকবালের কবিতায় আল্লাহর প্রকৃতি, ভাগ্য-জীবন, আত্মাতত্ত্ব, রাজনীতি, শিক্ষা, ধর্মতত্ত্ব, নীতিবিদ্যা, সূফীতত্ত্ব, দেশ ও জাতি, প্রেম প্রভৃতি বিষয়াবলী প্রকাশিত হয়েছে। সাধনামুখর একজন জীবন দার্শনিক ইকবাল নিজের ক্ষুরধার কলমের সাহায্যে কাব্যকথায় সেগুলো প্রকাশ করেছেন সাবলিলভাবে। তাঁর প্রতিটি কবিতায় দর্শন ফুটে উঠেছে। ইকবালের দর্শন আবর্তিত হয়েছে আত্মাকে কেন্দ্র করে। মানবাত্মার বিকাশে আত্মার শক্তি নিয়ে নিরলস গবেষণা করেছেন আল্লামা ইকবাল। “আসরারে খুদি” কাব্যগ্রন্থ ইকবালের দার্শনিক ভিত্তি আত্মা কেন্দ্রীক অসাধারণ একটি কালোত্তীর্ণ কাব্যগ্রন্থ।

ইকবালের দর্শনের মূল কথা হলো ‘খুদী’ বা আত্মা। ইকবালের ‘খুদী’ অমর ও অবিনশ্বর। ইকবালের মতে, ‘খুদী’র বিলুপ্তি ইসলামের পরিপন্থি। ইকবাল বলেন, অতীন্দ্রিয় অনুভূতির (কাশফ) মাধ্যমে আমরা খুদীকে সরাসরি জানতে পারি। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিরাট কাজ ও গভীর অনুভূতির সময়ে খুদীর অস্থিত্ব প্রত্যক্ষ করা যায়। আমাদের সকল ক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই খুদীর প্রকাশ। আমাদের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, বিচার, বিবেচনা সিদ্ধান্তের মধ্যে খুদীই ক্রিয়াশীল।

ইকবালের খুদী কিন্তু আমিত্ব নয়। স্বকীয়বোধ, নিজেকে জানা, নিজের শক্তি বিষয়ে ওয়াকিফহাল হওয়া। নিজের আসল পরিচয় উপলব্ধি। নিজস্বতা বিষয়ক প্রতীতি। এটাই ইকবালের খুদীর মকসদ।

মানুষ যখন নিজেকে জানে, নিজের আত্মা ও সত্তা সম্পর্কে পরিস্বচ্ছ ধারনা হয়ে যায়, তখন মানুষ অমিত-তেজা ও অমৃত-তাজা হয়ে পড়ে। মানুষ যখন নিজেকে চিনে, তখন আল্লাহকে চিনে ফেলে। নিজের স্রষ্টা ও রবের পরিচয় নিজেকে চেনাতে নিহিত। সুরা হাশরের উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ বলেছেন_ ” যারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে যায়, আল্লাহ তাদের নিজেদের সত্তা হতে নিজেদের গাফিল করে দেন। “

কুরআন মজিদ নফস শব্দ ব্যবহার করেছে, যেটি ইকবাল ‘খুদী’ শব্দে তরজুমানি করেছেন। কুরআনের ভাষ্য মতে_ যারা আল্লাহকে ভুলে যায়, তারা নিজেকেও ভুলে যায়। এখানে নিজেকে ভুলে যাওয়া মানে, নিজের খুদী ভুলে যাওয়া। নিজের নিজস্বতা ভুলে গেলে মানুষ রূহানিয়াতের রস ও ঈমানিয়াতের রওনক হতে মাহরুম হয়ে যায়। বস্তুত খুদীকে ভুলে যাওয়া মানুষ অমানুষ এমনকি জানোয়ারে পর্যবসিত হয়ে যায়।

মহাকবি ইকবাল খুদীর বয়ানে ঈমানিয়াত ও রূহানিয়াতের কুশলী চাষবাস করেছেন। ইকবালের খুদী চিন্তা আত্মোপলব্ধির নির্ঝরিণী। ‘খুদী খুদা-শনাসির ঝরোকা’। খুদী আত্মমর্যাদা ও সম্মানবোধের প্রথম সবক। খুদী ঈমানের পাথেয়। খুদী রাহে জান্নাতের মশালচি।

ইকবাল পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মৌলিক দর্শন ও কাব্য পড়েছেন। মৌমাছির মতো সকল কাননের মধু আহরণ করে করে কবিতার মৌচাক বুনেছেন। তবে, তাঁর দার্শনিক গুরু ছিলেন হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালী। পাশ্চাত্যে তাঁর প্রিয় দার্শনিক ছিলেন জার্মান ভাববাদের জনক ইমানুয়েল কান্ট।

ইকবালের দার্শনিক সত্তায় তাঁদের সংমিশ্রণ ছিল। থাকাটা অসংগত নয়। ইকবালের চতুর্তত্ত্বের উৎস ওহীর উলুম। ইকবালিয়াতের মূলে চার বিষয় মূল-ফুল-

কুরআন মাজীদ,
বারগাহে মুস্তফা,
ইসলামী ফালসাফা ও
আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান।

খুদী কুরআন মজিদ হতে চয়িত মৌরস। মুসলমানরা সব হারিয়ে যখন দর-বদর হয়রান হয়ে বেঘোর ঘুরছিল। তখন আল্লামা ইকবাল খুদীর পয়গাম নিয়ে মুসলমানের আসল অনুসন্ধানের সূত্র বলেছেন। আল্লামা ইকবালের খুদী-চিন্তা আমাদের আপ্লুত করতে পারলে, আমাদের জীবন ও পৃথিবীর জীবন ভিন্নতর হতে বাধ্য। ইকবাল ও খুদী ফুল ও খোশবোর মতো ওৎপ্রোত বিষয়।

সূফী কবি রুমী ছিলেন ইকবালের কাব্যপথের সর্বশ্রেষ্ঠ আলোকবর্তিকা। আল্লামা ইকবাল “আসরারে খুদী” গ্রন্থে তাঁর উপর রুমীর আধ্যাত্মিক প্রভাবের বিবরণ দিয়ে রুমীর স্তুতি বর্ণনা করে লিখেছেন –

“রুমীর প্রতিভায় অনুপ্রাণিত আমি
আবৃত্তি করে যাই গোপন রহস্যের মহাগ্রন্থ।
আত্মা তাঁর জ্বলন্ত অগ্নিকু-
আমি শুধু স্ফুলিঙ্গ
যা জ্বলে ওঠে মুহূর্তের জন্য।”

আল্লামা ইকবালের মৃত্যু : ১৯৩৪ সালের জানুয়ারী মাসে তার গলায় এক অজানা রোগ হয়। লাহোর ও দিল্লীতে এ রোগের চিকিৎসা গ্রহণ করার পরও তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। এ সময় তিনি লাহোরের পাঠানকোটের কাছে জামালপুরে দারুল ইসলাম ট্রাস্ট ইন্সটিটিউট স্থাপন করেন। ইসলামের প্রচার-প্রসার এবং সামাজিক কাজে সহায়তা করাই ছিল প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য। একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে জনমত গঠন করতে প্রতিষ্ঠানটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত এই কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তার শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে ১৯৩৪ সালে আইন ব্যবসা বন্ধ করে দেন। কয়েক মাস গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কাটানোর পর ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল ভোর ৫টা ১৪ মিনিটে চতুর্দিকে যখন মসজিদের মিনার হতে ফজরের আযান হচ্ছিল ঠিক সে সময় তিনি মহান প্রভুর ডাকে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সরকারি অফিস-আদালত, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। কয়েকদফা জানাযার পর লাখো ভক্ত অনুরাগীকে কাঁদিয়ে রাত পৌনে দশটার দিকে লাহোর দুর্গ ও বাদশাহী মসজিদের প্রবেশদ্বারের মাঝখানে হাজুরীবাগে তাকে কবর দেয়া হয়। পরিশেষে আরশের মালিকের কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন তাঁর দোষত্রুটিকে ক্ষমা করে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করেন।

তিনি পাকিস্তানের জাতীয় কবি। আজ যে পাকিস্তানকে আমরা চিনি সেই পাকিস্তানের সাথে আল্লামা ইকবালের স্বপ্নের পাকিস্তানের মিল খুবই কম। অনেকটাই আমাদের দ্রোহের ও বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুলের দ্রোহ ও চিন্তার সাথে বাংলাদেশ মিলালেই এর জবাব পাওয়া যাবে।

আল্লামা ইকবাল, ভারতবর্ষের রাজনীতি ও পাকিস্তান সৃষ্টি :

প্রায় ৮ শত বছরের মুসলমানদের ভারত শাসনের গৌরবময় উজ্জ্বল স্বর্ণ দিন ইতিহাস এ কথা প্রমান করে বর্তমান ভারতবর্ষে যত দর্শনীয় স্থান রয়েছে সব মুসলমানদের হাতে গড়া। তাদের ছিল সুঠম অর্থনীতি। ছিল তাদের উন্নত শাসন ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে বাদশা আলমগীর সহ অন্যান্য শাসকের কথা কে-বা না জানেন। কিন্তু ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ব্যর্থতা তাদেরকে সম্মানের এ উচ্চতা থেকে অপমানের গভীরতায় ঠেলে দিয়েছে। আর তখন মুসলীমদের একদল লোক তাদের গদি রক্ষা ব্যস্ত হয়ে পড়েন ব্যস্ত। অন্যদিকে হিন্দুর মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অবস্থান নিতে থাকে।

বর্তমান ভারতে যত উন্নত প্রযুক্তির যুদ্ধ সরঞ্জাম আছে । এর অন্যতম অবদান বা কৃতিত্ব দিতে গেলে আবুল-কালাম আজাদকেই দিতে হবে। এমনকি এখনো ভারতে অর্থনৈতিক করিডোরে মুসলমানরাই রয়েছে। কিন্তু এরপরও ভারতের মুসলমানরা বারবার নির্যাতিত। তাদেরকে নির্মূল করার জন্য করা হচ্ছে নতুন নতুন আইন। এমনকি মুসলমানদের হৃদয়ের স্পন্দন বাবরী মসজিদকেও তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

আমরা যদি তখনকার দিনগুলির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবেন- ব্রিটিশরা মুক্তিযুদ্ধের জন্য মুসলমানদের দোষারোপ করে তাদের উপরে চালিয়েছেন নির্যাতনের স্টিমরোলার। ঠিক তখন হিন্দুরা তাদের চিরচরিত ভূমিকা পুনরাবৃত্তি করে বিদেশী লাল কর্তাদের প্রতি তাদের সম্পূর্ণ আনুগত্যের প্রমাণ পেশ করে যাচ্ছিল। এর ফলশ্রুতিতে দু’পক্ষের মধ্যে মুসলমানরা বৃটিশদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলো আর হিন্দুরা পেতে শুরু করলো নতুন নতুন জায়গীর।

তখন হিন্দু ও ব্রিটিশরা মিলে মুসলমানদের সকল স্তরের শিক্ষামূলক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, বাণিজ্যিক এবং ধর্মীয় স্বার্থের উন্নয়নের সমস্ত পথকে অবরুদ্ধ করে দিল। ককোনঠাসা মুসলমানদের পক্ষে এই প্রতিকূলতায় হতাশ হয়ে ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক ছিল। যার ফলস্বরূপ মুসলীমদের মধ্যে অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়ে ভয় ও কাপুরুষতায় আচ্ছাদিত করে রাখে।

মুসলমানদের মধ্যে এমন কোন নেতা ছিল না যারা তাদের অনুপ্রেরণা দিবে। তাদেরকে এই ঘোরতর অন্ধকার থেকে বের করে এনে দিকনির্দেশনা দিয়ে সচেতনতার ভোরের দিকে নিয়ে যাবে। যে তাদের হারিয়ে যাওয়া মাহাত্ম্য ফিরিয়ে আনবে।

ঠিক তখনই ওলামায়ে দেওবন্দ হয়ে উঠলেন দিশেহারা মজলুম মুসলিম জাতির কাণ্ডারী । তারই ধারাবাহিকতায় বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুললেন আল্লামা ইকবাল। মানুষকে দেখালেন আলোর মুখ। স্মরণ করিয়ে দিলেন তাদের জাতীয় সত্তা।

আল্লামা ইকবালের জীবন ছিল আপাদমস্তক কীর্তিমান এক মহাপুরুষের জীবন৷ জীবনের প্রতিটি লক্ষ্য ও দর্শনকে তিনি ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও তৎপরতার মাধ্যমে সফলতার মুখ দেখান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা বিশেষ করে মুসলমানদের দুঃখজনক চিত্র তাঁকে ব্যথিত করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়া ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুসলমানদের উত্তরণ আর সম্ভব নয়। মুসলমানদের প্রতিটি সমস্যায় গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে আমৃত্যু ভারতীয় রাজনীতির কঠিন মাঠে বিচরণ করেন তিনি।

১৯২৬ সালে তিনি পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ সালে বৃটিশ সরকার ভবিষ্যৎ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের পটভূমি তৈরির জন্য ‘সাইমন কমিশন’ প্রেরণ করলে কংগ্রেস দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে আল্লামা ইকবাল নওয়াব জুলফিকার আলী খান ও মাওলানা মোহাম্মদ আলীর সাথে যৌথভাবে এক বিবৃতি প্রকাশ করে কমিশনকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

তিনি মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলেন, যদি আমরা কমিশনকে সহায়তা না করি তবে বৃটিশরা মুসলমানদের স্বার্থকেই বিঘ্নিত করবে। আল্লামা ইকবালের এই ধারণা বৃটিশদের শাসন পরিচালনায় মুসলমানরা হারে হারে টের পেয়েছিল। বৃটিশরা সবসময় মুসলমানদের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করার কারণে মুসলমানদেরকেই প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করছে। যা তাদের দীর্ঘ দিনের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

মুসলমান শাসনের অবসানের পর কাশ্মীরের মুসলমানরা নানাবিধ নির্যাতন ও লাঞ্চনার শিকার হয়। অসহায় কাশ্মীরি মুসলমান ভাই-বোনদেরকে সহযোগীতা করার জন্য লাহোরে চলে আসা কাশ্মীরিরা আঞ্জুমান নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর আল্লামা ইকবাল এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যেহেতু তিনিও ছিলেন মূলত কাশ্মীরি। তাঁর পূর্বপুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েই কাশ্মীর ছেড়ে চলে আসেন।

১৯৩০ সালের দিকে মুসলমানদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন অত্যধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। ডোগরা মহারাজার ক্রমবর্ধমান জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদে লাহোরে সর্বভারতীয় কাশ্মীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে কাশ্মীর প্রশাসনের অন্যায় নির্যাতনের সমালোচনা করে প্রস্তাব গৃহীত হয়। আল্লামা ইকবাল এই প্রস্তাবের প্রতি একাত্মতা পোষণ করেন। এ সময় তিনি মুসলিম কনফারেন্সের সভাপতি ছিলেন। তিনি কাশ্মীরিদের সার্বিক সমস্যার কথা সরকারের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরেন। এর প্রেক্ষিতে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কাশ্মীরিদের সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হয়।

১৯৩২ সালে আলোয়ার রাজ্যের মহারাজা কর্তৃক নির্যাতিত মুসলমানগণ ‘খাদেমুল মুসলিমীন’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করালে মহারাজার সরকার এটিকে বেআইনি ঘোষণা করে। এ অন্যায় আদেশের প্রতিবাদে মুসলমানরা বিক্ষোভ করলে তাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে শহীদ হন প্রায় এক শত মুসলমান। এরপর শুরু হয় গণ-গ্রেফতার। বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালাতে থাকে মুসলমানগণ। এই অন্যায় আচরণের প্রতিকার চেয়ে আল্লামা ইকবাল ভাইসরয় লর্ড ওয়েলিংটনের নিকট একটি স্মারক লিপি পেশ করেন। পরিণতিতে মুসলমানগণ ফেরারি জীবন ছেড়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পায়।

১৯৩৬ সালে আল্লামা ইকবাল পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত হন। একই সালে পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ঘোষণা করা হয় তাঁকে। ১৯৩৮ সালে লাহোরে মসজিদের দখল নিয়ে শিখ-মুসলমান দাঙ্গার সময় আল্লামা ইকবাল মসজিদ পুনরুদ্ধারে শাহাদাত প্রত্যাশী মুসলমান যুবকদের উৎসাহ যোগান। এক কথায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

এরপরও কেউ কেউ আল্লামা ইকবালের রাজনৈতিক কার্যকলাপের সমালোচনা করেন। অবশ্য তৎকালীন পরিস্থিতির বিচারে একজন মুসলমানের এরচেয়ে কতটুকু বেশি করার সুযোগ ছিল তা কিন্তু প্রশ্ন সাপেক্ষ। সার্বিক বিবেচনায় ভারতীয় মুসলমানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে আল্লামা ইকবালের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলিম লীগের অধিবেশনে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করেন। এই দাবিই পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের সূচনা করে। আজকের ক্ষমতাধর মুসলিম পাকিস্তান রাষ্ট্রটির স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন আল্লামা ইকবাল।

একজন নেতা, লেখক কিংবা একজন দার্শনিকের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হয়তো সেটাই, যেদিন তিনি দেখতে পান, তাঁর মস্তিষ্ক-নিসৃত একটি চিন্তা পৃথিবীর বুকে বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে। আল্লামা ইকবালের জীবনে সেই মহানন্দের দিনটি তাঁর জীবদ্দশায় আসেনি৷ যেদিন দক্ষিণ-এশিয়ায় তাঁর স্বপ্নের স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন বস্তবে রূপ নেয়, দিনটি ছিল ১৯৪৭ সালের পয়লা আগস্ট। ইকবাল সে দিনটি পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেননি।

তবে তাঁর জীবনে একটি স্মরণীয় দিন ছিল সেটি, যখন জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণ বিদ্রোহ করেছিল বর্বর সামন্ত স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। তিনি সেই দিনটিতে দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁর আলাদা ‘মুসলিম হোমল্যান্ডের’ স্বপ্ন একদিন বাস্তবায়িত হবে।

একাধারে কবি, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞ আল্লামা ইকবাল ছিলেন প্রচণ্ড শিকড়-আকড়ে-থাকা মানুষ। যৌবনকাল কাটিয়েছেন ইউরোপের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে৷ কঠোর অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে জ্ঞানের রস নিংড়ে এনেছেন৷ কিন্তু ইউরোপের জীবনধারায় গা ভাসাননি। ১৯২৩ সালে বৃটিশ সরকার ইকবালকে নাইট খেতাব দিয়ে সম্মানিত করে। তাঁর এই নাইটপ্রাপ্তিতে ভক্ত-অনুরাগীদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। বিরুদ্ধবাদী কবিরা ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা লিখে তাঁকে আক্রমণ করেন। এমনকি তাঁর বন্ধুরা চিঠি লিখে তাঁর মতামত জানতে চান এবং আশ্বস্ত হতে চান ঘটনা যেন কোনো ক্রমেই তাঁর স্বাধীন মতামত প্রকাশে কিংবা কওমের প্রতি খেদমতে বাধার সৃষ্টি না করে। আল্লামা ইকবাল বাকি জীবন কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন যে, তিনি কখনো দুর্দশাগ্রস্থ মুসমানদের কথা ভুলেননি। সকল বিবাদ-বিসংবাদের ঊর্ধ্বে গিয়ে নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষগ্রহণ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের চিন্তা তাঁকে কখনো স্বার্থপর ও বিলাসী হয়ে উঠতে দেয়নি। তিনি সারাজীবন একজন দুঃখী মানুষ ও একটি অবরুদ্ধ পাখির বেদনায় কেঁদেছেন। হিন্দুস্তানের মাটির পক্ষে গেয়ে গেছেন নিষ্কলুষ প্রেমের গান। এজন্যই তিনি ইউরোপমুখী ‘প্রফেসর ইকবাল’ না হয়ে হয়ে উঠেছেন আমাদের ‘আল্লামা ইকবাল’।

তিনি সিনাটান করে বলেছেন –

“মুসলিম হ্যাঁয় হাম ওয়াতন হ্যায় সারা জাহান হামারা, চীন ও আরব হামারা-হিন্দুস্তান হামারা।
তাওহীদ কী আমানত সিনো মে হামারা, আসান নেহি হ্যাঁয় মিটানা-নাম ও নিশান হামারা”

ইতিকথা : ইতিহাসে কাব্য দর্শনে মুসলমানদের বরপুত্র ছিলেন তিনি। তাঁর ইতিহাস চর্চা মুসলমানদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে। উনবিংশ শতাব্দীর এই দার্শনিক ও কবির কাছ থেকে ইউরোপীয়রা অনেক কিছুই গ্রহণ করে তাদের আধুনিক দর্শন সাজিয়েছে কিন্তু আমরা মুসলমানরা তাঁর দর্শন কনতটু গ্রহণ করেছি তা আমরা জানি। অনেকে ইকবালচর্চার এক লাইনও হয়ত আত্মস্থ করেনি। যুগ শতাব্দির ইতিহাসের পাঁতায় অমর থাকুক এই মহান বরপুত্র এই কামনা থাকবে।

তথ্যসূত্র :
-আল্লামা ইকবাল গবেষণা অভিসন্দর্ভ : লাহোর ইউনিভার্সিটি
-আল্লামা ইকবাল সংসদ পত্রিকা, জুলাই-ডিসেম্বর, ৯৪ ইং ঢাকা।
-ইকবাল প্রতিভা-গোলাম রসুল, ই:ফা: বাংলাদেশ।
-ইকবালের রাজনৈতিক চিন্তা ধারা-মুহাম্মদ আব্দুর রহীম ই:ফা: বাংলাদশে।
-মুসলিম ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন-ড: আমিনুল ইসলাম, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
-মুসলিম দর্শনের ভূমিকা-ড. রশীদুল আলম ।
-মহাকবি ইকবাল-ফাহমিদুর রহমান।
-মহাকবি ইকবালের “খুদী” : রুকন রাশনান লুবান
-সেরা মুসলিম মনীষীদের জীবন কথা, লেখক : নাসির হেলাল
-উইকিপিডিয়া, ইন্টারনেট আর্টিকেল।

[লেখাটির কিছু অংশ সংগ্রহ করেছেন ‘মাহিন মহসিন’। সম্পাদনা : হাছিব আর রহমান]

মন্তব্য করুন