করোনা প্রতিরক্ষায় দৈহিক রোগ নিয়ন্ত্রণে যা খাবেন

এ খাবারগুলো খাবেন নিয়মিত

প্রকাশিত: ৩:১৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৮, ২০২০

বিশ্বব্যাপী চলছে করোনা ভয়াবহ ছোবল। করোনাভাইরাসে সৃষ্ট কোভিড-১৯ এমন একটি রোগ যার কোন প্রতিষেধক এখনও আবিস্কার হয়নি। কবে আবিস্কার হবে তাও জানে না। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন স্বাস্থ্য গবেষণা ও পুষ্টিবীদরা করোনা প্রতিরক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে দৈহিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দিয়েছেন।

করোনাভাইরাস প্রতিরক্ষার প্রথম ধাপ হলো ব্যক্তিগত সচেতনতা গড়ে তোলা এবং প্রত্যেকের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্থাৎ ইমিউন সিস্টেম বাড়িয়ে তোলা। এর ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের যে মারাত্মক লক্ষ্মণ অর্থাৎ শ্বাসযন্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্রের সংক্রমণ, সেগুলো সহজে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সহজভাবে বললে, যেকোনো ভাইরাস হলো প্রোটিন যুক্ত অণুজীব, যার কারণে মানুষ জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট এমনকি মারাত্মক নিউমোনিয়ায় (নতুনভাবে) আক্রান্ত হতে পারে। তা ছাড়া এই ভাইরাস ভয়ংকর প্রাণঘাতী রোগ তৈরি করতে পারে খুব সহজে। তাই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বেশি পরিমাণে অ্যান্টি–অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে প্রতিদিন।

সামগ্রিক ও সবচেয়ে উপকারী তিনটি খাবার-

কালোজিরা : কালোজিরা বা নাইজেলা সিডে ১৫টি অ্যামোইনো এসিড আছে। এছাড়াও কালোজিরায় ২১ শতাংশ প্রোটিন রয়েছে ও ৩৮ শতাংশ শর্করা আছে। নিয়মিত কালোজিরা সেবনে স্পার্ম সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং স্পার্মের গুনাগুণ বাড়ে। এছাড়াও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় কালোজিরা একটি অব্যার্থ সমাধান।

কালোজিরার গুনাগুন সম্পর্কে মহানবী স. এর একটি হাদীস রয়েছে। হাদীসটি হলো— আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: এ কালোজিরা সাম ব্যতীত সমস্ত রোগের নিরাময়। আমি বললাম: সাম কি? তিনি বললেন: মৃত্যু!” [বুখারী: ৫৬৮৭]

খেজুর : সুস্বাদু আর বেশ পরিচিত একটি ফল, যা ফ্রুকটোজ ও গ্লাইসেমিক সমৃদ্ধ। এটি রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়ায়। খেজুরের পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে বলা হয় চারটি বা ৩০ গ্রাম পরিমাণ খেজুরে আছে ৯০ ক্যালোরি, এক গ্রাম প্রোটিন, ১৩ মিলি গ্রাম ক্যালসিয়াম, ২.৮ গ্রাম ফাইবার এবং আরও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। খেজুর শক্তির একটি ভালো উৎস। তাই খেজুর খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরের ক্লান্তিভাব দূর হয়। আছে প্রচুর ভিটামিন বি, যা ভিটামিন বিসিক্স মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। একই সাথে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে খেজুরের বিকল্প নেই।

মধু : করোনাভাইরাস যেহেতু একটি ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসজনিত অসুখ তাই মধু হলো করোনা প্রতিরক্ষায় একটি উত্তম খাদ্য কারণ এতে রয়েছে- অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদান। এছাড়াও মধুতে রয়েছে- ভিটামিন বি১, ভিটামিন বি২, ভিটামিন বি৩, ভিটামিন বি৫, ভিটামিন বি৬, আয়োডিন, জিংক, কপারসহ দৈহিক রোগ প্রতিরোধের অনন্য সব উপাদান।

এছাড়াও কিছু গবেষণা সংস্থা ও পুষ্টিবীদদের পরামর্শ দেওয়া হলো। এ খাবারগুলো দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং করোনা ভাইরাস প্রতিরক্ষায় জোর ভূমিকা রাখে বলে একমত হয়েছেন তারা।

বাংলাদেশের বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধানের পরামর্শ :

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে অ্যান্টি–অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ যে খাবারগুলো বেশি করে খেতে হবে, সেগুলো হলো –

বিটা ক্যারোটিন: উজ্জ্বল রংয়ের ফল, সবজি। যেমন গাজর, পালংশাক, আম, ডাল ইত্যাদি।

ভিটামিন এ: গাজর, পালংশাক, মিষ্টি আলু, মিষ্টিকুমড়া, জাম্বুরা, ডিম, কলিজা, দুধজাতীয় খাবার।

ভিটামিন ই: কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, পেস্তাবাদাম, বাদাম তেল, বিচিজাতীয় ও ভেজিটেবল অয়েল, জলপাইয়ের আচার, সবুজ শাকসবজি ইত্যাদি।

ভিটামিন সি: আমলকী, লেবু, কমলা, সবুজ মরিচ, করলা ইত্যাদি।

এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে উদ্ভিজ্জ খাবারই হলো অ্যান্টি–অক্সিডেন্টের সবচেয়ে ভালো উৎস, বিশেষ করে বেগুনি, নীল, কমলা ও হলুদ রংয়ের শাকসবজি ও ফল।

যে ধরনের খাবারগুলো আপনার প্রয়োজন, সেগুলোর তালিকা দেওয়া হলো-

১. সবজি: করলা (বিটা ক্যারোটিনসমৃদ্ধ), পারপেল/লাল পাতা কপি, বিট, ব্রোকলি, গাজর, টমেটো, মিষ্টি আলু, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি।

২. শাক: যেকোনো ধরনের ও রঙের শাক।

৩. ফল: কমলালেবু, পেঁপে, আঙুর, আম, কিউই, আনার, তরমুজ, বেরি, জলপাই, আনারস ইত্যাদি।

৪. মসলা: আদা, রসুন, হলুদ, দারুচিনি, গোলমরিচ।

৫. অন্যান্য: শিম বিচি, মটরশুঁটি, বিচিজাতীয় খাবার, বার্লি, ওটস, লাল চাল ও আটা, বাদাম।

৬. টক দই: এটি প্রোবায়োটিকস, যা শ্বাসযন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্র সংক্রমণের ঝুঁকি প্রতিরোধ করে। অন্যদিকে শাকসবজি, ফল, বাদামজাতীয় খাবার শরীরে নিউটোভ্যাক্স ভ্যাকসিনের অ্যান্টিবডি প্রক্রিয়াকে উন্নত করে, যা স্টেপটোকোক্কাস নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

৭. চা: গ্রিন টি, লাল চায়ে এল-থেনিন এবং ইজিসিজি নামক অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট থাকে, যা আমাদের শরীরে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনেক যৌগ তৈরি করে শরীরে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।

৮. এ ছাড়া ভিটামিন বি-৬, জিংক–জাতীয় খাবার (বিচিজাতীয়, বাদাম, সামুদ্রিক খাবার, দুধ ইত্যাদি) শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির কোষ বৃদ্ধি করে। তাই এ ধরনের খাবার বেশি খেতে হবে।

৯. উচ্চ মানের আমিষজাতীয় খাবার (ডিম, মুরগির মাংস ইত্যাদি) বেশি করে খেতে হবে।

১০. অ্যান্টি–অক্সিডেন্টের খুব ভালো কাজ পেতে হলে খাবার রান্নার সময় অতিরিক্ত তাপে বা দীর্ঘ সময় রান্না না করে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় রান্না করতে হবে।

ভারতের বিখ্যাত আয়ুর্বেদিক পথ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘চরক ফার্মা’র কয়েকজন বিশেষজ্ঞ গবেষক ও চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক যে খাবারগুলো খেতে হবে সেগুলো হচ্ছে-

মুগ ডাল : খুব সহজেই হজম হয় মুগ ডাল। প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ পুষ্টিতে ভরপুর এই দানা শস্যটি শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে দারুণ কার্যকরী।

সবুজ শাক : পালংশাক, কারিপাতা, লাউশাক, কলমিশাক খেতে পারেন। আমাদের ক্যালসিয়াম ও আয়রনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের জোগান দেয় সবুজ শাক। এগুলো মশলায় হালকা ঝলসে নিলে দারুণ উপাদেয় হতে পারে বলে জানাচ্ছেন ভেষজ বিশেষজ্ঞ গবেষক ও চিকিৎসকরা।

হলুদ : হাজার বছর ধরে হলুদ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর দায়িত্ব পালন করে আসছে। হলুদ তরকারির শুধু রং বদলাতেই ব্যবহার করা হয় না। এর ব্যাপক ভেষজগুণ রয়েছে। বাড়তি সতর্কতা আকারে অনেকে নিয়মিত এক টুকরো কাচা হলুদ খেয়ে থাকেন।

ডাল : প্রোটিনের দারুন উৎস হচ্ছে ডাল। এটা এমন একটি উদ্ভিজ্জ প্রোটিন যা সবার জন্যই উপকারী। এ ছাড়া এতে নানা ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকায় নিয়মিত ডাল খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। মসুর, মুগ, মাসকলাই, ছোলা ও খেসারির ডাল শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। এছাড়া এতে থাকা পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম এবং ফাইবার উচ্চ রক্তচাপ কমাতে ভূমিকা রাখে।

গোল মরিচ ও জিরা : গোল মরিচ ক্রনিক সর্দি-কাশি থেকেও রক্ষা করে। ছোট্ট এই কালো দানার অসীম গুণ। আর জিরা হজমে সাহায্য করে, অতিরিক্ত ওজন কমায় ও লিভার ভালো রাখে।

মৌসুমী ফল : কমলালেবু, পেঁপে, আঙুর, আনার, তরমুজ, জলপাই, আনারস ইত্যাদি ফল আমাদের হাতের নাগালেই থাকে। করোনাভাইরাসজনিত কোভিড-১৯ বা যেকোনো রোগ দানা বাধার আগেই যেন আমাদের শরীর প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে এজন্য এসব ফল খেতে হবে। এর মধ্যে পেপে হজমে দারুণ কার্যকর। আর আনারসে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ এবং সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ফসফরাস। এসব উপাদান আমাদের দেহের পুষ্টির অভাব পূরণে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়াও আনারসে রয়েছে ব্রোমেলিন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাংগানিজ।

ভিটামিন সি : আমলকি, লেবু, কমলা, কাচা মরিচ, করলা এগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বাড়ায়।

এ ছাড়াও ভারতের আর একটি পথ্য প্রতিষ্ঠান সংক্ষিপ্ত যে সব পরামর্শ দিয়েছেন তা হলো –

১. ঘি ও মধু খেলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। ২. ডাল, দানা শস্যজাতীয় খাবার, রাজমা যেমন উপকার করবে, তেমনই পাতে রাখুন বেশি সিদ্ধ করা মাংস, মাছ ও ডিম। ৩. হাফ বয়েল ডিম পোচ ও অমলেট খেতে পারেন। ৪. লবণ ছাড়া বাদাম, আমন্ড ও ছোলা খান। ৫. সজনে ডাঁটা ও সজনে ফুল যে কোনও ভাইরাস ঠেকাতে সক্ষম। ৬. টকদই, সবুজ শাকসবজি ও ফলে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এসব খাবার খেতে পারেন। ৭. লাল বাদামি ও কালো চালের ভাত খেতে পারেন। ৮.প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন।

যেসব খাবার সম্পূর্ন বাদ দিতে হবে :

সব ধরনের কার্বনেটেড ড্রিংকস, বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, তামাক, সাদাপাতা, খয়ের ইত্যাদি। এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় বাধা দিয়ে ফুসফুসে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়, ঠান্ডা খাবার, আইসক্রিম, চিনি ও চিনির তৈরি খাবার (যা ভাইরাসের সংক্রমণে সহায়তা করে)। এছাড়াও অতিরিক্ত চিনি ও লবণ মেশানো খাবার খাবেন না। বাদ দিন প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার। জাঙ্ক ফুড ও তেলে ভাজা খাবার তো একেবারেই খাওয়া যাবে না।

আরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন