মসজিদ উন্মুক্ত’র বিবৃতি দেওয়া ১৫ আলেমকে ডাকা হয়নি ইফা’র মিটিংয়ে

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি

প্রকাশিত: ২:৫৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৯, ২০২০

বিশেষ প্রতিবেদন-

করোনাভাইরাসে সৃষ্ট মহামারি ও বিপদসঙ্কুল সময়ে গণজমায়েত এড়াতে ‘মুসুল্লী সীমিত করে দিয়ে মসজিদে জামাতে নামাজ পড়া’ নিয়ে ‘ধর্ম মন্ত্রনালয় থেকে জারিকৃত নির্দেশনার বিষয়ে’ মসজিদ উম্মুক্ত করে দেওয়ার আহবান জানিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন আলেমের নামসহ একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রকাশিত বিবৃতি বিষয়ে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে- বিবৃতিতে নাম থাকা আলেমদের কাউকেই করোনা পরিস্থিতিতে মসজিদে নামাজ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দু’টি মিটিংয়েই দাওয়াত দেওয়া হয়নি। যেটা তরুণ ও প্রবীণ আলেমদের মাঝে অনেকেই ভালোভাবে দেখেননি।

মসজিদ খোলা রাখার আহবান জানিয়ে প্রকাশিত বিবৃতিটি দেখুন

মসজিদ উম্মুক্ত রাখার আহবান জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া আলেমগণ হলেন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি ও চট্টগ্রাম বাবুনগর মাদরাসার পরিচালক মাওলানা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব ও দারুল উলূম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর সহকারী মহাপরিচালক আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ও হাটহাজারী মাদরাসার প্রধান মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামী, বারিধারা মাদরাসার মহাপরিচালক ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী, জামিয়া নুরিয়া কামরাঙ্গীচর মাদরাসার মহাপরিচালক ও খেলাফত আন্দোলনের আমীর আল্লামা শাহ আতাউল্লাহ হাফেজ্জী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের একাংশের সভাপতি মুফতী ওয়াক্কাস, জামিয়া ইউনুসিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মহাপরিচালক মাওলানা মুফতী মুবারকুল্লাহ, মারকাজুল উলুম খুলনার মহাপরিচালক মুফতী গোলাম রহমান, কামরাঙ্গীচর মাদরাসার শায়খুল হাদীস মাওলানা সোলায়মান নোমানী, কামরাঙ্গীচর মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা ইসমাঈল বরিশালী, কামরাঙ্গীচর মাদরাসার খন্ডকালীন শায়খুল হাদিস মাওলানা শেখ আজীমুদ্দীন, কামরাঙ্গীচর মাদরাসার প্রধান মুফতী মাওলানা মুজিবুর রহমান, কামরাঙ্গীচর মাদরাসার নাজিমে তালিমাত মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, শায়খুল হাদিস শাইখ নাসিরুদ্দিন ও মুফতী ওমর ফারুক বিন মুফতী নুরুল্লাহ। বিবৃতিতে নাম থাকা ১৫ জন আলেমের ৭ জনই দেশের ঐতিহ্যবাহী এক মাদরাসার শিক্ষক বলে জানা গেছে পাবলিক ভয়েসের অনুসন্ধানে।

যদিও এর আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব আলেমই সম্মিলিতভাবে জানিয়েছিলেন, করোনাভাইরাসের এই উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াই জনগণের কর্তব্য। গত ৬ এপ্রিল এ বিষয়ে দেশের প্রথম সারির দু’জন মুফতী (মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ, মুফতী দেলোয়ার হোসেন) ভিডিও বার্তায় বিষয়টি পরিস্কার করেছিলেন এবং আরো একাধিক আলেমের সাথেও এ বিষয়ে পাবলিক ভয়েসের পক্ষ থেকে মতামত নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিলো।

মসজিদে নামাজ পড়া নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিষয়ে দেশের শীর্ষ আলেমদের মতামত দেখুন

তারা জানিয়েছিলেন, ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে এই সিদ্ধান্তের আগে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে দুই দফা মিটিং করা হয়েছিলো এবং সেই মিটিংয়ে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বেশিরভাগ আলেমকেই রাখা হয়েছিলো। দুটি মিটিংয়েই আলেমদের পক্ষ থেকে সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, করোনা পরিস্থিতি খারাপ দিকে গেলে সরকার জনগণের কল্যানে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যা শরিয়ত বহির্ভূত হবে না।

অপরদিকে পাবলিক ভয়েসের অনুসন্ধানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রাপ্ত দুই মিটিংয়ে ওলামায়ে কেরামের উপস্থিতি তালিকা সংগ্রহ করে দেখা গেছে দুটি মিটিংয়েই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বেশিরভাগ আলেমগণ উপস্থিত ছিলেন।

ইফা’র প্রথম মিটিং :

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডেপুটি ডিরেক্টর মাওলানা ড. মুশতাক আহমদের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত প্রথম মিটিংয়ের বিষয়ে ইফা থেকে প্রাপ্ত স্বাক্ষরিত কপিতে দেখা গেছে সে মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন, ফরিদাবাদ মাদরাসার মহাপরিচালক ও হাইয়াতুল উলয়ার কো-চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, মারকাযুদ দাওয়ার প্রধান মুফতী আবদুল মালেক, শায়খ জাকারিয়া রিসার্স সেন্টারের প্রধান মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, মিরপুর আকবর কমপ্লেক্সের প্রধান মুফতি দিলাওয়ার হুসাইন, জামিয়া রাহমানিয়া মাদরাসার প্রধান মাওলানা মাহফুজুল হক, ঢাকা নেসারিয়া কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা কাফিলউদ্দীন সরকার, ইদারাতুল উলুম আফতাবনগর মাদরাসার মুহতামিম মুফতি মুহাম্মাদ আলী, এছাড়াও ছিলেন মাওলানা মিজানুর রহমান, মাওলানা আবদুর রাজ্জাক, মাওলানা সাইফুল ইসলাম, শায়খ আহমাদুল্লাহ-সহ প্রমুখ ওলামায়ে কেরাম।

ইফা’র মিটিংয়ে আলেমদের উপস্থিতিতে সিদ্ধান্তের কপি।

ইফা’র দ্বিতীয় মিটিং :

পরবর্তিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে গত ২৯ মার্চ ধর্ম মন্ত্রনালয়ের সচিবের উপস্থিতিতে দ্বিতীয় দফা আরেকটি মিটিং আহ্বান করা হয়। যেখানে আরো ব্যাপকভাবে আলেমদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিলো। যে মিটিংয়ে প্রায় ৫৮ জন আলেমের উপস্থিতি তালিকা স্বাক্ষরিত হয়েছিলো। প্রথম মিটিংয়ে উপস্থিত হওয়া আলেমগণ ছাড়াও এই মিটিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন, যাত্রাবাড়ি মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা মাহমুদুল হাসান, শোলাকিয়া জাতীয় ঈদগাহের প্রধান ইমাম আল্লামা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ, চরমোনাই কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল অধ্যক্ষ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী, দারুল উলুম রামপুরা মাদরাসার প্রধান মুফতী ইয়াহইয়া মাহমুদ, সরকারী মাদরাসা-ই-আলিয়ার উপাধ্যক্ষ মুহাম্মদ আবদুর রশীদসহ প্রায় ৫৮ জন আলেম।

দ্বিতীয় মিটিংয়ে উপস্থিত আলেমদের স্বাক্ষরিত কপি।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত :

দুইদফা মিটিংয়ে প্রাপ্ত সিদ্ধান্ত অনুসারে গত ৬ এপ্রিল ধর্ম মন্ত্রনালয় থেকে এক নির্দেশনায় জানানো হয়, করোনাভাইরাসে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে যেকোনো ধর্মীয় গণজমায়েতমূলক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। সেই ধারাবাহিকতায় মসজিদে সীমিত আকারে জামাত অনুষ্ঠিত হবে। তবে মসজিদ বন্ধ হবে না। আজান হবে এবং পাঁচওয়াক্তে পাঁচজন ও জুমায় ১০ মুসুল্লীর সমন্বয় জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত সিদ্ধান্ত দেখুন

সরকার ঘোষিত নির্দেশনার বিষয়ে দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার প্রধান ও দেশের শীর্ষ আলেম আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীও বিষয়টি খোলাসা করে অফিসিয়াল বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি জানান ‘সরকার কর্তৃক গৃহিত সিদ্ধান্ত যথার্থ ও শরিয়ত উপযোগী।

এরপর একই দিনে চরমোনাই পীরের পক্ষ থেকেও মসজিদে জামাত বিষয়ে আলেমদের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়।

কিন্তু পরবর্তিতে ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের অফিসিয়াল মেইল থেকে প্রেরিত এক বিবৃতিতে ১৫ জন আলেমের নাম দিয়ে জানানো হয়, তারা সরকারের সিদ্ধান্তে একমত নন। বরং মসজিদ উম্মুক্ত করে দেওয়ার পক্ষে তারা। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াসহ অনেকের মাঝে মতভেদপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়।

উক্ত বিবৃতি বিষয়ে পাবলিক ভয়েসের অনুসন্ধানে বিবৃতিদাতাদের মাঝে একাধিক আলেমদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে বিবৃতিটি সঠিক এবং উক্ত বিবৃতি তারা দিয়েছেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এমনটিই নিশ্চিত হওয়া গেছে।

কিন্তু সরকারী নির্দেশনা ও মসজিদে নামাজ বিষয়ে আলেমদের পূর্ববর্তি একটি সিদ্ধান্ত থাকা সত্বেও নতুন করে এমন বিবৃতি কেন দেওয়া হলো এ নিয়ে পাবলিক ভয়েসের পক্ষ থেকে বিবৃতিদাতা আলেমদের সাথে পূনরায় বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে এবং কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। তারা বিবৃতির সত্যতা স্বীকার করেছেন তবে এ বিষয়ে তাদের থেকে নতুন করে কোনো মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে অনেকে মনে করেন, বিবৃতিদাতা আলেমদের ইফার মিটিংয়ে ডাকা হলে তাদের মতামত তারা সেখানে প্রকাশ করতে পারতেন। তাহলে বর্তমানের এই বিরোধ দেখা দিতো না। এমন শীর্ষস্থানীয় আলেমদের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মিটিংয়ে না ডাকা দুঃখজনক। এটা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।

এছাড়াও নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন আলেম জানিয়েছেন, মসজিদ উম্মুক্ত করে দেওয়ার আহবান জানিয়ে প্রকাশ করা বিবৃতি কেবলমাত্র একটি আহবান। সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আহবান জানানো যেকোনো নাগরিকের সাধারণ অধিকার। তাই এটা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার কিছু নেই।

তবে এ বিষয়ে পাবলিক ভয়েসের সাথে আলাপকালে তরুণ আলেম, লেখক ও সাংবাদিক দ্বিমত পোষণ করে বলেন, রাষ্ট্রীয় এসব বিষয়ে দেশের সব আলেমকেই যে ডাকতে হবে বিষয়টা ঠিক নয়। দেশের ক্রান্তিকালে বরং সব আলেমদের প্রতিনিধি হিসেবে শীর্ষ পর্যায়ের উল্লেখ্যসংখ্যাক আলেম-ওলামা নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া অধিক যুক্তিযুক্ত।

[প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিষয়ে আরও কিছু ডকুমেন্ট]

২৯ মার্চের মিটিংয়ে উপস্থিত আলেমদের একাংশ

২৯ মার্চের মিটিংয়ে উপস্থিত আলেমদের একাংশ

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন