মাহমুদুল হাসান : প্রাণীদের আপন যিনি

প্রকাশিত: ৪:২৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৮, ২০২০

করোনাভাইরাস বিপর্যয়ে বাংলাদেশ অনেকটাই অঘোষিত লকডাউন অবস্থায় আছে। বন্ধ হয়ে গেছে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বন্ধ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও। পুরো ঢাকা যেন চুপচাপের নগরীতে পরিণত হয়েছে। কোথাও কোলাহল নেই। মানুষের ভীড় নেই। যেই ঢাবি ক্যাম্পাস ২৪ ঘন্টা গমগম করতো ছাত্র-ছাত্রীদের কোলাহলে সেই ক্যাম্পাসে এখন রাজ্যের শূণ্যতা বিরাজ করছে।

এই শূণ্যতার মাঝে বিশাল হৃদয়ের পরিচয় দিয়েছেন ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মাহমুদুল হাসান।

যোগাযোগ বৈকল্য ডিপার্টমেন্টের ২০১৬-১৭ সেশনের ছাত্র মাহমুদুল হাসান বন্ধ হয়ে যাওয়া ঢাবি ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে প্রতিদিনই খাবার দিচ্ছেন কুকুর বিড়ালকে। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় রাস্তার এই কুকুরগুলো খাবারের অভাবে ভুগছিলো। মাহমুদুল হাসান তাঁর কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে কুকুরগুলোকে নিয়মিত খাবার দিচ্ছেন গত কয়েকদিন ধরে। প্রতি দৈনিক প্রায় ৫০টি কুকুরকে তারা খাবার দিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

মাহমুদুল হাসানসহ আরও অনেকেই নিজ উদ্যোগে এই কাজটি করছেন। প্রাণীদের প্রতি অসম্ভব সুন্দর মানবিক এই দিকটি নিয়ে আমরা পাবলিক ভয়েসের পক্ষ থেকে এ পর্বে মুখোমুখি হয়েছিলাম মাহমুদু্ল হাসানের। তিনি এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন পাবলিক ভয়েসের প্রতিবেদকের সাথে।

আসুন জেনে নেই এই ব্যাতিক্রমধর্মী উদ্যোগ সম্পর্কে মাহমুদুল হাসানের চিন্তাধারা।

পাবলিক ভয়েস : আসসালামু আলাইকুম ও রহমাতুল্লাহ, কেমন আছেন?

মাহমুদুল হাসান : ওয়ালাইকুমুচ্ছালাম ও রহমাতুল্লাহ। ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ।

পাবলিক ভয়েস : আমরা জেনেছি আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের টিএসসিসহ বিভিন্ন এলাকায় কুকুরসহ বিভিন্ন প্রাণীকে খাবার দিচ্ছেন।

মাহমুদুল হাসান : জ্বি, আমার নিজ উদ্যোগে কয়েকজন মিলে এই কাজটি করছি।

পাবলিক ভয়েস : ক্যাম্পাসে কবে থেকে প্রাণীদের খাবার দিচ্ছেন?

মাহমুদুল হাসান : গত সপ্তাহ খানেক ধরেই আমরা ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে কুকুরদের খাবার দিচ্ছি।

পাবলিক ভয়েস : এই ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তা কেন এলো?

মাহমুদুল হাসান : আপনারা জানেন করোনা ভাইরাসের কারণে আমাদের ক্যাম্পাসকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে আমাদের হলের ক্যান্টিন সহ সকল খাবারের দোকানগুলোই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একদিন রাতে ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখি কুকুরগুলো না খেতে পেরে একেবারে মৃতপ্রায়। খাবারের দোকানগুলো বন্ধ থাকায় ওরা ওদের খাবার পাচ্ছিল না। সেইদিন থেকেই এই উদ্যোগ।

পাবলিক ভয়েস : এই কাজে আর কাদেরকে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন ?

মাহমুদুল হাসান : সাথে অনেককেই পেয়েছি। কাজ করতে গিয়ে দেখেছি অনেকগুলো গ্রুপই কাজ করছে নিজ নিজ পরিসরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল লাভারস নামে একটা গ্রুপ অনেক সহযোগিতা করেছে। বিশেষ করে ফারজানা আপুর ভূমিকাটা অনেক বেশি। সাথে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আল আমিনের পরিশ্রমের কথা বলে শেষ করা যাবে না। রান্না করা, বাজার করা থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়ায় ওর অনেক পরিশ্রম রয়েছে। এবং ইশা ছাত্র আন্দোলন এর তিতুমীর কলেজের সাবেক সভাপতি জাহিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমীর ভাইর সহযোগিতাও পেয়েছি।

পাবলিক ভয়েস : দৈনিক কতটি প্রাণীকে খাবার দিচ্ছেন?

মাহমুদুল হাসান : প্রতিদিন গড়ে ৫০ টির মতো কুকুরকে খাবার দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। তবে খাবার কি পরিমাণে সংগ্রহ করতে পেরেছি তার উপরও নির্ভর করে বিষয়টা।

পাবলিক ভয়েস : ক্যাম্পাস প্রশাসনের কোন সহযোগিতা আছে কি না?

মাহমুদুল হাসান : না। তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি। প্রশাসনের কোনো উদ্যোগও চোখে পরেনি।

পাবলিক ভয়েস : খাবারের খরচ হয় কেমন, জোগাড় হচ্ছে কোথা থেকে?

মাহমুদুল হাসান : প্রতিদিন ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকার মতো খরচ হয়৷ নিজেরাই খরচ করি। সাথে অন্যান্য অনেক প্রাণী প্রেমিকরাও খাবার ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে থাকে।

পাবলিক ভয়েস : প্রাণীদের প্রতি এমন মায়ার আলাদা কোন কারন?

মাহমুদুল হাসান : দেখুন, আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আমারা সকল প্রাণীর জিম্মাদার। যেসকল প্রাণী আমাদের হাজারো উপকার করে, আমাদেরও উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের যত্ন নেয়া। আর এজন্যই ইসলাম ‘খেদমতে খালকের’ কথা বলে। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক রা. বলেছিলেন, ‘ফুরাত নদীর তীরে যদি কোনো কুকুরও মারা যায়, তাহলে আমি ওমরকে জবাবদিহিতা করতে হবে’। আর এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য থেকেই আমরা প্রাণীদের পাশে দাড়ানোর চেষ্টা করেছি।

পাবলিক ভয়েস : অন্যদের প্রতি কোন উপদেশ/অনুরোধ?

মাহমুদুল হাসান : অন্যদের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে আপনারা দয়া করে আপনাদের আশে পাশের প্রাণীদের কোনভাবেই কষ্ট দিবেন না। তাদের যত্ন নেবার চেষ্টা করুন। অবলা এবং অসহায়দের পাশে দাঁড়ান। যে মানুষগুলো অসহায় রয়েছে, তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করুন। সকলের সুস্থতা কামনা করি এবং সকলের দোয়া চাই।

পাবলিক ভয়েস : আমাদের পাবলিক ভয়েস পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি শুভ কামনা। আপনি যে মহৎ কাজটি করছেন এজন্য আমরা আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। আশা করবো আপনার এই কাজ আপনি ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাবেন। অন্তত যতদিন করোনাভাইরাস আতঙ্কে ঢাকা স্থবির থাকবে ততদিন।

মাহমুদুল হাসান : আমার পক্ষ থেকেও আপনাদের প্রতি রইলো শুভকামনা। পাবলিক ভয়েসের প্রতি একরাশ ভালোবাসা। সবাইকে সাথে নিয়ে নিউজ পোর্টালটি এগিয়ে যাবে দূর্বার গতিতে এই আশা রাখছি।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পাবলিক ভয়েসের নির্বাহী সম্পাদক হাছিব আর রহমান

মন্তব্য করুন