করোনা সারাতে এবার ‘শিশু কথা বলা’ ও আজানের গুজব

গুজব রোধে এগিয়ে আসুন

প্রকাশিত: ১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৭, ২০২০

রাত ১০ টায় হঠাৎ করেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় আজান দেওয়া ও ‘সদ্য ভূমিষ্ট শিশু’ কথা বলার গুজব রটেছে। মসজিদে মসজিদে দেওয়া শুরু হয়েছে আজান। অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে পাবলিক ভয়েসের অফিসেও ফোন করে জানতে চেয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে কে বা কারা গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে যে, জন্মের ৫ মিনিট পর এক শিশু বলেছে আদা, লং, গোলমরিচ ও কালোজিরা দিয়ে চা বানিয়ে খেলে মরণঘাতী করোনাভাইরাস হবে না। এ কথা বলার পরপরই শিশুটি মারা যায়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে এমন কথা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

এ ছাড়াও ওই সদ্য ভূমিষ্ট বাচ্চা মসজিদে সম্মিলিতভাবে আজান দিতে হবে বলেছে এবং আজান দিয়ে নফল নামাজ পড়তে হবে এমন গুজবও ছড়ানো হয়েছে দেশজুড়ে। অনেক মসজিদেই আজান দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও ছড়িয়ে পড়েছে এ কথা। এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা হৈচৈ। কেউ বলছেন শিশুটি বগুড়ায় জন্ম নিয়েছে, আবার কেউ বলছেন রংপুরে, কেউবা বলেছেন নীলফামারী-লালমনিরহাটের কথা, কেউ বলছে ফেনীর। তবে আসলে শিশুটি কোথারও না।

আরও পড়ুন : ট্রল, গুজব, করোনাভাইরাস ও আমাদের দায়বোধ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম তার ফেসবুকে এমনি এক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে লিখেছেন- আজ রাত ৯ টা ১০ মিনিটে আমার এক নিকটাত্মীয় ফোন করে বললেন, ‘বাবা সাইফুল, দ্রুত একটু আদা, কালোজিরা ও গুলমরিচ খেয়ে নেও’।

আমি বললাম, কেন খাব? তিনি বললেন, ‘বগুড়ায় একটা শিশু জন্মের পর বলেছে আদা, গুলমরিচ আর কালোজিরা খেলে করোনাভাইরাস হবে না। এই তিনটা কথা বলে শিশুটা মারা গেছে। এখনও শিশুটার জানাজা হয়নি। বগুড়ার সবাই এগুলো খাচ্ছে। আমরাও খাচ্ছি। তুমিও খেয়ে নাও’।

আমি বললাম, এটা গুজব। মিথ্যাচার। এগুলো ঠিক নয়। তিনি বুঝতে চাইলেন না। আমাদের গ্রামাঞ্চলে এভাবেই সহজেই গুজব ছড়ানো হয়। মানুষদের বোকা বানানো হয়। সতর্ক থাকুন, গুজবে কান দেবেন না। গুজব বড় ধরনের মিথ্যাচার, বড় ধরনের পাপাচার। গুজব ছড়াবেন না, গুজব বিশ্বাসও করবেন না।

শুধু সাইফুল নয়, এমন অনেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে এমন ঘটনার কথা তুলে ধরে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। পাবলিক ভয়েসের ফোনে এবং এই প্রতিবেদকের কাছেও অনেকে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি মহল এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে থাকেন। তবে এতে তাদের কী লাভ হয় এটা জানা যায়নি। এর আগেও নানা বিষয়ে গুজব ছড়ানো হয়েছে। এসবের বৈজ্ঞানিক বা ধর্মীয় কোনো ভিত্তি নেই। তাই গুজবে কান না দিয়ে করোনাভাইরাস প্রতিরক্ষায় সকলকে সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানান বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার তালক শাখাতী রিফুজি পাড়া জামে মসজিদের প্রাক্তন ইমাম ছমির উদ্দিন বলেন, আদা, লং বা লবণ দিয়ে আমরা এমনিতেই অনেক সময় চা খাই। ৪-৫ দিন আগেও এক পীর মারা যাওয়ার সময় এভাবে চা খেতে বলেছেন-এমনি এক গুজব ছড়িয়েছিল তার এলাকায়। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তিনি মারা যাননি। তাই এসব নিছক গুজব ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই নয় দাবি করে তিনিও সচেতন থেকে নিজ নিজ ধর্ম পালনের কথা জানান।

এর আগেও দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থানকুনি পাতা খেলে করোনা সেরে যাবে এমন গুজবও ছড়ানো হয়েছিলো। এবং অনেকেই ভোর রাতে উঠে বাগানে বাগানে থানকুনি পাতা খুঁজে খেয়েছেনও! পরে দেখা গেছে এটা নিছক গুজব।

আরও পড়ুন : থানকুনি পাতায় করোনা সারে: রাতভর গুজবে নির্ঘুম দেশবাসী

মসজিদে আজান দেওয়া বিষয়ে তরুণ আলেম মুফতী নাজমুল ইসলাম কাসিমী বলেন, এ ধরণের গুজবে বা মহামারিিিতেত আজান দেওয়া বিদয়াতের অন্তর্ভূক্ত।

তিনি পাকিস্তানের করাচির একটি ফতোয়ার উদৃতি দিয়ে বিশ্লেষণ করে বলেন, মহামারী কেন্দ্র করে আযান দেওয়া বিদআত! মহামারীর প্রাদুর্ভাবের প্রাক্কালে আজান দেওয়া ইসলামি শরিয়তমতে সুন্নাত বা মুসতাহাব নয়। বরং অসংখ্য আলেমের মতে, এটি জায়েয নয়।

ফকিহুন নফস মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. লিখেছেন, “মহামারী, প্লেগ ইত্যকার রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় কোনো বিশেষ নামায হাদিসে প্রমাণিত নেই। এ সময় আযান বলার কথাও কোনো হাদিসে বর্ণিত নেই। কাজেই এ ধরনের পরিস্থিতিতে আযান বা জামাতকে সাওয়াবের কাজ, বা সুন্নত, বা মুসতাহাব বিশ্বাস করা বাস্তবতার পরিপন্থী।”

(ফতোয়ায়ে রশিদিয়া, কিতাবুল ইলম) হযরত আশরাফ আলি থানভি রহ. থেকেও অনুরূপ ফতোয়া রয়েছে। দেখুন, আগলাতুল আওয়াম, পৃষ্ঠা : ৩৪

তবে প্রায় প্রায়ই এই ধরণের গুজব সৃষ্টি দেশের বিভিন্ন বিষয়ে একটি হুমকির মত। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে মানুষের মধ্যে গণ সচেতনতা আনা খুবই দরকার বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন