করোনা প্রতিরক্ষা ও সরকারী ব্যবস্থাপনা : আমাদের করণীয় কী

করোনা সতর্কতা

প্রকাশিত: ১:২৯ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০২০

বাংলাদেশ সরকার করোনা প্রতিরক্ষায় যা কিছু এতদিন ধরে করেছে এবং এখনও যা করছে এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা বা সক্ষমতা আমাদের এদেশের সরকারের নেই এটাই বাস্তবতা। তবে সেনাবাহিনী নামিয়ে দেওয়ার বিষয়টি খুবই ভালো লেগেছে। এটাই শেষ সমাধান ছিলো আমাদের জন্য। আরও আগেই সেনাবাহিনী নামানো বা অঘোষিত কারফিউ জারী করার দরকার ছিলো কি না তা আলোচনা সাপেক্ষ বিষয়।

আসলে এদেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অসচেতন, হুজুগে, গুজবে জাতীর বিষয়ে এরচেয়ে বেশি কিছু আপনি আমি হলেও করতে পারতাম না। সরকারের সমালোচনায় তাই আত্মতৃপ্তি বা খেদ ঝাড়ার বাইরে তেমন লাভ নেই। খুব হইচই এবং ‘এই চাই, সেই চাই’ টাইপের যেই সোশ্যাল মিডিয়া আলোচনা হচ্ছে এগুলারও খুব একটা দাম নেই।

সক্ষমতা, জাতীয় সচেতনতা এসবের খুব ভ্যালু থাকে। যেই সক্ষমতা, মেরুদন্ড বা সচেতনতা আমাদের নেই। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ আসার পর এটা কখনই ছিলোও না আমাদের।

সামাজিক, রাষ্ট্রিয় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের দেশের প্রশাসন এবং রাষ্ট্রযন্ত্র বিভিন্ন কারনেই ব্যার্থ। বাজেভাবে ব্যার্থ। এক কথায়ই ব্যার্থ। এখানে কোন যুক্তি তর্কের সুযোগ নেই। ব্যার্থতাই সত্য। তবে এই ব্যার্থতা নিয়েই আমাদের চলাচল। সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী এবং আমলারা মূলত তাদের এই ব্যার্থতাটা সবচেয়ে ভালোভাবে জানে। এ কারণেই তাদের মুখ থেকে যে কোন জাতীয় দুর্যোগে ওসব অসহ্য মার্কা কথাবার্তা বের হয়ে থাকে। করোনা ইস্যূতে যে কথাবার্তা সর্বোচ্চ লাগামহীন হয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী, সেতুমন্ত্রী যেসব কথাবার্তা বলতেছেন তা অনেকটাই অসহ্য মার্কা কথা।

এর দ্বারাই বুঝা যায় সরকারের এসব লোক আসলে ক্যামাফ্লোজের আশ্রয় নিচ্ছে তাদের ব্যার্থতা ঢাকার জন্য। কিন্তু তাদের ব্যার্থতা এতে ঢাকছে তো না-ই বরং আরও প্রকট হচ্ছে এইটুকু বুঝার ক্ষমতা তাদের কেন নেই এই হিসেব আমি মেলাতে পারিনি। তবে ঝিমিয়ে পড়া, নেতিয়ে পড়া এই জাতীকে এমন মূর্খ এবং ব্যার্থতায় ভরা লোকজনই নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্য (!)।

তবে সরকারের ব্যার্থতা নিয়ে আপনি যেভাবে কথা বলবেন তেমনিভাবে এদেশের জনগণের হুজুগ এবং গুজব রটানোর দক্ষতা, দাড়ি-টুপিওয়ালা কিছু হুজুরদের আচরণ বিশেষ করে কিছু বক্তাশ্রেণীর কথিত আলেমদের বাড়াবাড়ি নিয়েও আপনাকে কথা বলতে হবে। করোনা ইস্যূতে তারা জনগণের মধ্যে যে অসচেতনতার বীজ ঢুকিয়ে দিয়েছে তার জন্য তাদের ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেওয়া উচিত তা আপনাকে বলতে হবে।

শুরু থেকেই কেন মানুষ সতর্ক ছিলো না এই কথা বলতে হলে আপনাকে কওমী, আলিয়া, জামায়াত, মাজার পূজারী অনেক বক্তাদের লিস্ট নিয়ে আসতে হবে যারা শুরু থেকেই করোনা বিষয়ে উল্টা পাল্টা বক্তব্য দিয়েছে। অনেকে ভ্যাকসিন আবিস্কার করেছে, কেউ করোনার সাক্ষাৎকার নিয়েছে, কেউ কোরআনের কসম খেয়েছে ‘করোনা কোন মুসলমানের হবে না’ বলে, আবার কেউ কেউ মাহফিল বন্ধ করলে করোনা আসার বদ দোয়াও করেছে দেখেছি।

এসব মাল এবং টাল জাতীয় বক্তাদের বাড়াবাড়ি জনগণকে অবশ্যই নিরুদ্বিগ্ন থাকতে সহায়তা করেছে। এখন যদি আল্লাহর রহমতে বড় ধরণের কোন ‘করোনাক্রাশ’ বাংলাদেশে না হয় তাহলে যেভাবে এই বক্তারা বাহবা নেবেন তেমনিভাবে যদি আল্লাহ না করুক বাংলাদেশে করোনা কোন বড় ধরণের ক্রাশ তৈরি করে ফেলে তাহলে এরা সেই দায়ভারও অনেকাংশেই নিতে হবে। এদের কথায় এরা ভাবে আল্লাহ তায়ালার উপর তাওয়াক্কুল করে ফেলেছে কিন্তু আদতে যে এরা আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করে ফেলেছে এটাই জানে না।

তবে লকডাউন, সামাজিক দুরত্ব তৈরি, অফিস আদালত এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে ফেলে দেশে অনেকটাই কারফিউ ধরণের যে অবস্থা সৃষ্টি করা হচ্ছে তাতে পরিস্থিতি ভিন্ন দিক থেকে আরও খারাপের দিকে যাবে হয়ত। ক্ষুধা-মন্দায় গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হবে হয়ত। অলরেডি শহর এবং শহরতলিতে এর প্রভাব শুরু হয়েছে।

২৪ তারিখ অর্থাৎ কাল থেকেই একটি অঘোষিত জরুরী অবস্থার মধ্য দিয়ে যাবে দেশ। সামনের এই কিছুদিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালার উপর পূর্ণ আস্থা বিশ্বাস রেখে আমরা অবশ্যই নিজ নিজ স্থান থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের বিকল্প নেই এখন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্তসহ নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে অবশ্যই সতর্কতামূলক কিছু কার্যক্রম যার যার স্থান থেকে নিতে হবে কারণ এসব পরিবারে সতর্কতামূলক ব্যাবস্থা খুবই কম থাকে।

সতর্কতা তাওয়াক্কুল পরিপন্থী নয়, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলুন’

আমি আমার পরিবারের ব্যাপারে চেষ্টা করছি, আপনিও আপনার পরিবারের ব্যাপারে চেষ্টা করুন।

ভয় পাচ্ছি রিকশাওয়ালা, দিনমজুর কৃষক এবং অসহায় লোকদের ব্যাপারে। এরা কী খাবে, কী অবস্থায় থাকবে ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। তাদের দিকে আমরা সকলে নজর দিবো আশা করি। যেহেতু একটি ব্যার্থ সরকারের পক্ষে কখনওই সম্ভব না এভাবে জনে জনে খবর নেওয়া, সহায়তা করা তাই সচেতনতায় থেকে, সতর্কতার সাথে ‘কমিউনিটি চেইন’ তৈরি করে তাদের সহায়তা করা জরুরী সবার জন্য।

বিশেষ করে নিম্নোলিখিত কাজগুলো সবাই করবেন :

১. সব সময় আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা রাখুন এবং সকল সতর্কতা অবলম্বন করুন। বিশেষ করে হাদিসে বর্ণিত দোয়াসমূহ পড়ুন।

২. সর্বদা হাত মুখ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখবেন।

৩. হোম কোয়ারেন্টাইন অর্থাৎ এক কথায় নিজেকে ঘরে বন্দি করে রাখবেন।

৪. কোলাহল এবং জনসমাগমে যাবেন না। প্রয়োজনে বাইরে বের হলে হাতে গ্লাবস এবং মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন।

৫. অসুস্থতার উপসর্গ তথা জ্বর, কাশি দেখলেই ভয় পাবেন না। ডাক্তাররা চিকিৎসা না দিতে চাইলেও নিজ থেকেই জ্বর কাশির ওষুধ খেয়ে নেবেন। একান্ত বাধ্য হলে প্রশাসনের সহায়তা নেবেন। কোন মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না।

৬. নিজ নিজ এলাকার প্রশাসন এবং সরকারী দপ্তর থেকে দেওয়া যোগাযোগের নাম্বার সংগ্রহে রাখুন। অযথা নয় বরং একান্ত প্রয়োজনে তাদেরকে নক করুন।

৭. সেনাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সহায়তা করুন। তাদেরকে বিরক্ত করবেন না। তাদের নির্দেশনা মেনে চলবেন।

৮. করোনা বিষয়ে সতর্কতামূলক প্রতিটি কার্যক্রম বিশেষ করে মিডিয়ার (৭১ টিভির মত কিছু ধর্মবিদ্ধেষী মিডিয়া ব্যাতিত) সতর্কতামূলক কার্যক্রম ফলো করুন এবং সেগুলো মেনে চলুন।

৯. আপনার আশেপাশের মানুষকে সচেতন করুন। কেউ আক্রান্ত হলে মানবিক দৃষ্টিতে তাঁকান। তাঁর সহায়তা করুন কারন এই রোগ বেশিরভাগই (৯৫%) সুস্থতাযোগ্য।

করোনা মানেই মৃত্যু নয় : আরিফ আজাদ

১০. সরকারের সমালোচনা করে সময় নষ্ট করার চেয়ে নিজ উদ্যোগে যে কোন সচেতনতামূলক কাজ করুন। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর খোঁজ নিন।

ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে রক্ষা করবেন।

লেখক : হাছিব আর রহমান। নির্বাহী সম্পাদক, পাবলিক ভয়েস টোয়েন্টিফোর ডটকম।

আরও পড়ুন : 

করোনা ভাইরাস হতে বাঁচতে শাইখ সুদাইসের নির্দেশনা

করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে দোয়া-তাওবার আহ্বান আল্লামা বাবুনগরীর

করোনা : আল্লামা তাকী উসমানী ও বেফাক পাকিস্তানের বিশেষ নির্দেশনা (ভিডিও)

মন্তব্য করুন