করোনাভাইরাস: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন মডেল অধিক কার্যকর হবে?

চিন নাকি দক্ষিণ কোরিয়া

প্রকাশিত: ১০:৪৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০২০

আল্লাহর অতিক্ষুদ্র মাখলুক, যাকে দেখতে শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের প্রয়োজন হয়। তার সংক্রমণে অর্থনৈতিক, সামরিক এবং স্যানিটেশন ব্যাবস্থায় উন্নত দেশসমুহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মাখলুকটি ভয়ঙ্কররুপ ধারণ করে ছড়িয়ে পড়ছে জনপদে।

এটি কোনো সীমানা, রাজনৈতিক নীতি, সামাজিক মূল্যবোধের তোয়াক্কা করছে না। কোনো কিছুতে তাকে আটকানো যাচ্ছে না। কারণ, আমরা আল্লাহর হুকুম অমান্য করে মানুষ, প্রাণীজগত এবং প্রকৃতি বিনাশী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছি। দাম্ভিকতা দেখাচ্ছি। যার ফলে জলে স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ছে।

এ বিপর্যয় শুধু করোনাভাইরাসের নয়। যে কোনো মহামারি, দুঃশাসন, দূর্নীতি, সন্ত্রাস, খুন-ধর্ষণ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ঝড়-সাইক্লোন, খরা-বন্যা, ভূমিকম্পসহ সব দূর্যোগই প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করা, আল্লাহর বিধান অমান্য করার ফল। এগুলো অবশ্যই আমাদের হাতের কামাই।

আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা ও শাস্তি দেন ফিরে আসার জন্য। পাপ পঙ্কিলতা ছেড়ে তাওবা এবং হেদায়েতের পথে আসার জন্য। আল্লাহ বলেন, জলে স্থলে যে বিপর্যয় (মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ) তা মানুষের কৃতকর্মের ফল। যার ফলে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তিনি আস্বাদন করান, যাতে তারা (আল্লাহর পথে) ফিরে আসে।

বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছিল তা দেখো। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক। (আল কোরআন, সূরা রুম, আয়াত-৪১-৪২)।

  • মহামারি থেকে উত্তরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ও তাতক্ষণিক অন্তত তিনটি কৌশল গ্রহণ করা জরুরী

১) আল্লাহর কাছে আত্নসমর্পণ করা।
২) মানুষ, প্রাণীজগত এবং প্রকৃতি বান্ধব পলিসি নির্ধারণ করা।
৩) যারা কার্যকরভাবে এই বিপর্যয় মোকাবেলা করছে, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তা গ্রহণ করা যায় কিনা বিবেচনা করা।

ইউরোপসহ অনেক দেশ চিনের অনুসরণে সবকিছু লকডাউন করে দিয়েছে। নাগরিকগণ সচেতনভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনে চলে গিয়েছে। যারা এর গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করছে না তাদের বাধ্য করা হচ্ছে। বিভিন্ন রকমের দন্ড দেয়া হচ্ছে। শুধুমাত্র দক্ষিণ কোরিয়া আলাদা কৌশলে করোনা মহামারি মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। তারা রাষ্ট্রের সামগ্রিক কর্মকান্ড বন্ধ না রেখে, প্রযুক্তির উপর প্রচুর নির্ভর করেছে। নাগরিকদের প্রাইভেসির বিষয়টি নিদারুণভাবে উপেক্ষা করছে।

আমাদের মত উন্নয়নশীল, সামাজিক নিরাপত্তাহীন (নাগরিকদের স্বাস্থ্য, অর্থনৈতীক নিরাপত্তা বলয়), ক্ষুদ্র আয়তনের অসচেতন বিপুল জনগোষ্ঠির এই দেশে কোন মডেল বেশি কার্যকর হবে তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়।

ইউরোপে সবকিছু বন্ধ থাকলেও তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় দ্রুত আসবে না। কারণ, তাদের শক্ত স্যোশাল ব্যাবস্থা রয়েছে। কিন্তু করোনা বিপর্যয় মোকাবেলা করতে সবকিছু লকডাউন করে সামাজিক, অর্থনৈতীক বিপর্যয় কি আমরা সামাল দিতে পারবো? সে সক্ষমতা, আন্তরিকতা কি আমাদের আছে? ইউরোপ বা চিনের লকডাউন ব্যাবস্থা কি আমাদের জন্য কার্যকর হবে? নাকী নতুন কোনো বিপর্যয় ডেকে আনবে? এই ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার পদ্ধতি গ্রহণ করা যায় কিনা দেশের দায়িত্বশীল ব্যাক্তিদের ভেবে দেখার অনুরোধ করবো।

আইসোলেশন না 3T সিষ্টেম?

প্রায় সমস্ত ইউরোপীয় দেশগুলিতে কোডিভ -১৯ বিস্ফোরণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সকল ধরনের কর্মকান্ড বন্ধ করে দেওয়ার ক্রমাগত চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ইতালির পরে অন্যান্য ইইউ দেশগুলিও এক এক করে জনগণের চলাচলে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা প্রয়োগ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সাম্প্রতিক বন্ধ ঘোষণা করেছে। তারা চিনের উহান অঞ্চলটির মতো ‘বিচ্ছিন্ন’ পদ্ধুতি গ্রহণ করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনাভাইরাসের দ্রুত বিস্তার সত্ত্বেও, শহর বা অঞ্চলগুলির সামগ্রিক কর্মকাণ্ড বন্ধ ছিল না। জনগণকে উপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো ছাড়াও (মুখোশ এবং জীবাণুনাশক ব্যবহার বা নিরাপদ শারীরিক দুরত্ব ব্যবস্থাসমূহ, যদিও ব্যক্তির মধ্যে শারীরিক দূরত্ব সংস্কৃতির অংশ), সরকার কেবল গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাবলিক স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাণিজ্যিক ও রাষ্ট্রিয় কর্মকান্ড কোনো পরিবর্তন হয়নি।

দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের কৌশলটি তিনটি পদক্ষেপ অনুসরণ করেছে ( Trace, Test and Treat):

দক্ষিণ কোরিয়া ছিদ্রপথ বন্ধের কৌশল বেশী ব্যাবহার করেছে। সংক্রমণের সংখ্যা জানা এবং তারপরে রোগ নির্ণয়ের আগের দিনগুলিতে সংক্রামিত ব্যক্তির সাথে কার কার যোগাযোগ হয়েছে তা নির্ণয় করার জন্য প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়েছে। যারা আক্রান্তের সংস্পর্শে এসেছেন তাদের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে বার্তা পাঠানো হয়েছে এবং তাদের পরীক্ষা চালানোর জন্য চাপ দেয়া হয়েছে।

হাসপাতাল সিস্টেমের পূনর্গঠন করা হয়েছে, যাতে সকল সংক্রামিত ব্যাক্তিকে যত্নের সাথে চিকিৎসা দেয়া যায়। যাদের মধ্যে ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশ পায়নি এবং পেয়েছে এরকম পার্থক্য করে কেসের তীব্রতার উপর নির্ভর করে তাদের প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কার্যকর ব্যাবস্থা নেয়া হয়েছে।

২০২০ সালের ১৩ মার্চ দক্ষিণ কোরিয়ায় কোভিড -১৯ টেস্টের সংখ্যা ছিল ২৪৮,৬৪৭। যেখানে মোট জনসংখ্যা হল ৫ কোটি । ইটালিতে একই সময়ে ৬ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৮৬০০০ এর চেয়ে সামান্য বেশি পরিমাণ ছাড়িয়েছে। যা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলির তুলনায় অনেক বেশি।

এই 3T মডেল কি অনুসরণ করা যেতে পারে?

দক্ষিণ কোরিয়ার কৌশল কীভাবে কাজ করে? চেককেন্দ্রগুলো দেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলজুড়ে অবস্থিত বা দেশের প্রধান সড়কগুলিতে যানচলাচলের সময় থামিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

যদি কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হয়, প্রযুক্তি ব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের আগের দিনগুলিতে তার গতিবিধি এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়াগুলি নির্ণয় করা হয়। উদাহরণস্বরূপ টেলিফোন কথাবার্তা, মোবাইলের gps সিষ্টেমের মাধ্যমে, কিংবা ক্রেডিট কার্ডের লেনদেনের ধরণ দেখার মাধ্যমে।

তারপরে যারা সংক্রামিত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন তাদেরকে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে করণীয়, বর্জনীয় এবং অন্যান্য তথ্যে সম্বলিত একাধিক বার্তা পাঠায়। যে তথ্যটি জানানো হয় তা হচ্ছে সংক্রামিত ব্যক্তির বয়স, লিঙ্গ এবং কোন স্থানগুলিতে (উদাহরণস্বরূপ- রাস্তা, ভবন, রেস্তোঁরা, সিনেমা, ইত্যাদি) দিনের কোন সময়ে তিনি উপস্থিত ছিলেন।

এরপর বলা হয়- দয়াকরে আপনি আপনার ক্লিনিকাল চেকের জন্য ওমুক কেন্দ্রে যান। ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক হেলথ দ্বারা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত সাইটে তথ্যসমূহ সংগ্রহ ও প্রকাশ করা হয়। যেখানে সংক্রামিত ব্যক্তিদের চলাচল এবং সম্ভাব্য যোগাযোগের সমস্ত তথ্য সংগ্রহ এবং সংগঠিত করা হয়।

একবার চিহ্নিত হয়ে গেলে কোভিড -১৯ সংক্রামিত জনগোষ্ঠীকে বাকী জনগোষ্ঠী থেকে আইসোলেশন (বিচ্ছিন্ন) করা হয়। চিকিৎসা প্রয়োজন ব্যক্তিদের হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বাকিরা তাদের হোম কোয়ারান্টাইনে বা আইসোলেশন সুবিধাসম্বলিত ক্যাম্পে আলাদা করে রাখা হয়।

যাইহোক, সংক্রামিত ভূ-স্থান সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ এবং সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করা প্রয়োজন, যাতে করোনাভাইরাস ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া জনগোষ্ঠীকে বিশেষভাবে সতর্ক করা যায়। কিন্ত এমন ব্যক্তিরা আছেন যারা বিশ্বাস করেন এতে মানুষের প্রাইভেসি লংঘন হয়।

বিপর্যয়গ্রস্ত জনপদে জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় সুরক্ষা জন্য ব্যক্তিগত গোপনীয়তার উপর সাময়িক হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক প্রাইভেসি আইনে অনুমোদন দেওয়া আছে। তবে এগুলি অবশ্যই সুনির্দিষ্ট এবং ট্রানজিশনাল পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।

লেখক: কামরুল হাছান
প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার ও বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন