ট্রল, গুজব, করোনাভাইরাস ও আমাদের দায়বোধ

করোনাভাইরাস

প্রকাশিত: ৬:১১ অপরাহ্ণ, মার্চ ২১, ২০২০
ছবি : পাবলিক ভয়েস

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যতোটা না সচেতন মানুষের পদচারণা; তারচে হাজারগুণ বেশি অসচেতন, মূর্খ, গুজবি, হুজুগি ও বিকৃত রুচি-মানসিকতার মানুষের পদচারণা। কিছু মানুষের কাজই হলো কাউকে অপদস্ত করা, অপমান করা, হাসি ঠাট্টা করা, সিরিয়াস কোনো বিষয়কে হেসে উড়িয়ে দেয়া।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ট্রল’ তেমনই একটি পরিচিত শব্দ। সেলিব্রেটি নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা থেকে শুরু করে এমপি-মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, বিশিষ্ট ব্যক্তি, নারী-শিশু, বৃদ্ধ কেউ বাদ যায় না ট্রলবাজদের ট্রল থেকে।

যেকোনো মানুষের যেকোনো কাজে ভুল হতেই পারে। এরকম বিষয়ে ব্যক্তি অপমানিত হবে, লজ্জিত হবে এমন কোনো কাজ করা সামাজিক দৃষ্টিতেও হীনমন্যতার পরিচায়ক। আর কারো নাম, কর্ম বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ট্রল করা বা উপহাস করা তো মারাত্মক অপরাধ। ইসলামে রয়েছে এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা।

পবিত্র কোরআনে কারীমে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর সম্প্রদায়কে বিদ্রুপ না করে। হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা করো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না। ঈমানের পর মন্দ নাম কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তাওবা করে না, তারাই তো জালিম’। (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১১)

শুধু যে জীবিত মানুষকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হয় এমন নয়। কিছুদিন আগেও দেশের বিশিষ্ট দুই রাজনৈতিক নেতার অসুস্থতা ও মৃত্যু নিয়েও ফেসবুকাররা মারাত্মক রকমের ট্রলবাজি করেছে। যেটা স্বাভাবিক রুচিবোধেরও খেলাফ। বিবেকবোধ আছে এমন কেউ ওরকম জঘন্যরকম ট্রলবাজি কোনোভাবেই করতে পারে না।

তাই বলে মৃত মানুষকে নিয়েও? বিকৃত চর্চা করতে করতে আমাদের মগজে পঁচন ধরেছে। পুরো সোশ্যাল কমিউনিটি এ রোগে কমবেশি আক্রান্ত। হয়তো আমি, আপনিও কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত হয়ে আছি এই ‘ট্রল’ রোগে।

কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখুন, কাউকে ট্রল করার পর ওই ব্যক্তি বা পরিবার কী পরিমাণ বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। এটা যদি আমার আপনার পরিবারের কারো সঙ্গে হয় কেমন লাগবে ভেবেছেন কখনো?

অথচ কোনোভাবে মানুষের সম্মানহানি করায় ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পনেরশত বছর আগে মানবতার নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের সম্মান নিয়ে খেলা করতে নিষেধ করে গেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কোনো ভাই যাতে করে অন্য মুসলিম ভাইকে ছোট না করে অর্থাৎ তার মান ও সম্মান ক্ষুণ্ন না করে। কেননা প্রত্যেক মুসলিম এর প্রতি অন্য ভাই এর রক্ত, মাল ও সম্মানকে ক্ষুণ্ন করা হারাম করা হয়েছে। (রক্ত দ্বারা উদ্দেশ্য হত্যা করা)’। [সহীহ মুসলিম-৪/১৯৮৬, হাদীস-২৫৬৪]

ধারণাবশত আমরা কতজনকে কত কী বলে ফেলি অথচ ধারণা প্রসুত কথা বলাকে মহান রব্বে কাবা আপন মৃত ভাইয়ের গোস্ত খাওয়ার সাথে তুলনা করে চরম তীরস্কার করেছেন।

সুরা হুজুরাতের ১২ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা হতে বিরত থাকো। কারণ কোনো কোনো ধারণা পাপ। তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং তোমাদের কেউ যেন অন্যের গীবত না করে। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে ভালবাসো? বস্তুতঃ তোমরা এটাকে ঘৃণাই করো। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ তওবা কবুলকারী, দয়ালু’।

এতো সতর্কতা আর হুশিয়ারির পরও আমরা প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছি এহেন জঘনকর্ম। পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। মহামারী করোনাভাইরাসের আঘাতে পুরো দুনিয়া অচল হয়ে পড়েছে।

এই আধুনিক উৎকর্ষতার যুগেও পারস্পরিক যাতায়াত যোগযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিমুহুর্ত বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা সবাই। বিপদের ডঙ্কা আমাদের মাথার ওপরে ঝুলছে অথচ আমরা এটা নিয়েও ট্রল করা নিয়ে ব্যস্ত আছি।

করোনাভাইরাস নিয়ে, আক্রান্ত ব্যক্তি নিয়ে, প্রতিরোধে করণীয় বিষয়বস্ত নিয়ে প্রতিনিয়ত সতর্কতার পরিবর্তে ঠাট্টা বিদ্রুপ ছড়িয়ে যাচ্ছি আমরা। যার ফলে মানুষের চোখের আড়াল হয়ে যাচ্ছে সতর্কতার বার্তাগুলো।

করোনাভাইরাস নিয়ে, মাস্ক নিয়ে আমাদের দেশে ট্রল কম হয়নি। কেউ কেউ এটাকে প্রতিবাদ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করলেও আদতে যারা এসব করে তারা কখনো শুদ্ধাচার করে না। তারা সব সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ট্রলবাজিতেই মেতে থাকে।

আর এক শ্রেণির লোক আছে যারা গুজব ছড়াতে পটু। গুজব ছড়িয়ে হাজার-হাজার মানুষকে বিভ্রান্ত করে তারা পৈচাশিক আনন্দ পায়। এইতো গত এক রাত। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) রাতে সারাদেশে ভয়ানক গুজব ছড়িয়ে পড়ে। প্রসিদ্ধ এক বা স্থানভেদে একাধিক পীর সাহেবের নামে গুজব ছড়ানো হয়েছে, ‘ফজরের আগে থানকুনি পাতা খেলে করোনাভাইরাস হবে না’।

কতোটা নির্বোধ আর মূর্খ হলে আমরা এমন অদ্ভুত কথায় বিভ্রান্ত হতে পারি তা বিস্ময়কর। এটা যে নিছকই গুজব ছিলো তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকার কথা ছিলো না। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, জানাশোনাওয়ালা শিক্ষিত সচেতন মানুষও বিভ্রান্ত হয়েছে এই গুজবে। এমনকি ওই রাতের পর বুধবার রাতেও কিছু মানুষ এই গুজবে ভরসা রেখেছিলো।

শুধু আমাদের দেশেই নয়; বহির্বিশ্বেও কিছু কিছু গুজব ছড়িয়েছে। সেসব আবার প্রতিষ্ঠিত হুয়ে আমাদের দেশের মূলধারার সংবাদ মাধ্যমেও এসেছে। যা কিনা পরে জানা গেছে পুরোটাই গুজব।

কিন্তু সব গুজবই আমাদের জন্য ক্ষতিকর। আর সব ট্রলবাজিও আমাদের জন্য কখনো কখনো প্রত্যক্ষ না হলেও অলটাইম পরোক্ষভাবে ক্ষতিকর। সুতরাং আসুন আমরা গুজব আর ট্রল থেকে নিজেদের বিরত রাখি অন্যদেরকেও বিরতা রাখতে সচেষ্ট হই।

মনে রাখবেন করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে। করোনাভাইরাস অন্যান্য মরণব্যাধী রোগের মতো প্রাণঘাতী নয়। করোনা হলেই মৃত্যু অবধারিত এমন নয়, কিন্তু স্থবির হয়ে যাবে আপনার জীবন। শুধু তাই নয় গোট পরিবারের স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যহত হবে। যেটা হচ্ছে এখন বিশ্বব্যাপী।

আর সবচে বড় সমস্যা হলো আমাদের দেশে করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথ নয়। এটা কেবল সরকার বা ব্যবস্থপনার কারণেই নয় বরং আমাদের খেয়ালিপনা আর অসেচতনার জন্যেও। আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থাও অপ্রতুল। ভাইরাস চিহ্নিত করণ ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত না। নাই বললেই চলে।

তবে আশার কথা হলো, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ‘ড. বিজন কুমার শীল’ করোনা চিহ্নিত করণ কীট আবিষ্কার করেছেন।

গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের দাবি অনুযায়ী যদিও সরকারে স্বাস্থ্য দপ্তরের অবহেলাজনিত কারণে উৎপাদনে যেতে কিছুটা দেরি হচ্ছে। তবে খুব শ্রীঘই হয়ে যাবে। সে পর্যন্ত ভালো থাকুন সবাই, ভালো থাকুক বাংলাদেশ। বিরত থাকুন ট্রল আর গুজব থেকে। আর হ্যাঁ, আরেকটা কথা; আপনিও চলার পথে এমন কিছু ধারাবাহিতা রেখে যাবেন না যাতে মানুষ আপনাকে নিয়ে ট্রল করার সুযোগ পায়, কিংবা বাধ্য হয়।

লেখক: শাহনূর শাহীন
কবি ও সংবাদকর্মী, যুগ্ম সম্পাদক পাবলিক ভয়েস
shahnurshaheen@gmail.com

মন্তব্য করুন