তৃণমূলে প্রশাসনের চাপ: কী ভাবছে বেফাক-হাইয়া?

কওমি মাদরাসা-করোনাভাইরাস

প্রকাশিত: ৬:৫৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৮, ২০২০

শাহনূর শাহীন, পাবলিক ভয়েস: বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়ে গোটা পৃথিবীকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে মহামারী করোনাভাইরাস। ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৭ হাজার। বাংলাদেশেও আজ বুধবার এ ভাইরাসে আক্রান্ত একজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে জাতীয় রোগতত্ত্ব বিভাগ (আইসিডিডিআরবি)। এছাড়া আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে আছে ১৪ জন।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে প্রকোপ প্রতিরোধে গত সোমবার (১৬ মার্চ) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার বৈঠকের পর দেশে সব ধরণের সভা-সমাবেশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বৈঠকের পর ওইদিন দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপু মনি। তিনি দেশের সমস্ত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ১৭ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেন। শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার পর পিএসসি, ঢাবি, জবি, জাবি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের চলমান পরীক্ষা ও ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করে। শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ত্যাগ করার নোটিশও জারি করে প্রতিষ্ঠানগুলো।

অন্যদিকে দেশের আলিয়া মাদরাসাগুলোও সরকারি ঘোষণার আলোকে সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হলেও কওমি মাদরাসাগুলো নিয়েছে কিছুটা কৌশলী অবস্থান।

গতকাল মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সকালে রাজধানীর কাজলায় বেফাক কার্যালয়ে জরুরি বৈঠকে বসে ‘আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ ও ‘বেফাকুল মাদারিসিলি আরাবিয়া বাংলাদেশ’ এর শীর্ষ  নেতৃবৃন্দ।

প্রথমে সকাল ১০টায় বৈঠকে বসে হাইয়াতুল উলইয়ার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণ। কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ এ অথরিটি সংস্থার ভারপ্রাপ্ত কো-চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস এর সভাপতিত্বে বৈঠকে সংস্থাটির প্রায় শীর্ষ সকলেই উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে শেষে ৩টি সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। পাবলিক ভয়েসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন হাইয়াতুল উলইয়ার সদস্য মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু। এরপর দুপুরে বেফাকের বৈঠক শেষেও আনুষ্ঠানিকভাবে ৩টি  সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়।

ঘোষণা পত্রে বলা হয়,

১. পরীক্ষার আগে মাদরাসার সকল নিয়মিত ক্লাস বন্ধ থাকবে।

২. সকল পরীক্ষা পূর্ব ঘোষিত রুটিনে যথা সময়ে অনুষ্ঠিত হবে।

৩. প্রত্যেক শিক্ষার্থী যার যার মতো করে পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।

বেফাক-হাইয়ার এই সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা ও বিশ্লেষণ শুরু হয়। কওমি মাদরাসাগুলো সাধারণত আবাসিক হয়ে থাকে। এবং পরীক্ষার আগে নির্দিষ্ট একটা সময় এমনিতেই ক্লাস বন্ধ থাকে।

এরমধ্যে বেফাকের অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কেন্দ্রীয় পরীক্ষা ২৮ মার্চ থেকে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে বাধ্য হয় মাদরাসাগুলো চালু রাখা নিয়ে সারাদেশে নানান প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

বুধবার সকালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাদরাসাগুলোতে এসে অভিভাবকরা ক্ষোভ ও আশঙ্কার কথা প্রকাশ করছেন বলে এই প্রতিবেদকের কাছে খবর আসতে থাকে। বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাপ আসে বলেও খবর আসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের থেকে। কিছু কিছু মাদরাসা ইতোমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে বন্ধ ঘোষণাও করা হয়েছে।

রাজধানীর ‘জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া, ঢাকা’ এর সকল বিভাগের ছাত্রদের ছুটি দিয়েছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। এমনকি নোটিশে কোনো শিক্ষার্থী মাদরাসায় অবস্থান করতে চাইলে দরখাস্ত লিখে মুহতামিমের মঞ্জুরিসহ বিভাগীয় প্রধানের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

এছাড়াও কিশোরগঞ্জের আয়েশা সিদ্দীকা রা. মহিলা মাদরাসাসহ দেশের বিভিন্ন মাদরাসা বন্ধ ঘোষণার খবর পাওয়া গেছে।

রাজধানী ও মফস্বলের দুটি মাদরাসা বন্ধের প্রাতিষ্ঠানিক নোটিশ

জামালপুর জেলার বকশিগঞ্জ উপজেলার ‘দারুল উলুম উঠানোরপাড়া শহীদ স্মৃতি কওমী মাদরাসা’র মুহতামিম  হাফেজ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম ‘ইক্বরা নূরাণী তালিমুল কুরআন শিক্ষাবোর্ড’র মহাসচিব।

তিনি জানান, ইক্বরা বোর্ড সরকারি সিদ্ধান্তের আলোকে অধিভুক্ত সকল প্রতিষ্ঠান ৩১ তারিখ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলেও তিনি জানান।

মাওলানা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সোমবার রাষ্ট্রীয় ঘোষণার পর থেকেই আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম। অভিভাবকরাও এসে শঙ্কা প্রকাশ করছিলেন। পরে আজ (মঙ্গলবার) আমরা ইক্বরা বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বোর্ডের আওতাধীন প্রাথমিক ও প্রি-প্রাথমিক বিভাগ এর শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়েছি।

কিন্তু বেফাক অন্তুর্ভুক্ত কিতাব বিভাগ বন্ধ করিনি। বেফাকের সিদ্ধান্তের দিকেই আমরা তাকিয়েছিলাম। এবং গতকালকে (মঙ্গলবার) বেফাক ঘোষিত সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরাও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে প্রতিমুহুর্ত শঙ্কা ও চাপ অনুভব করছি’।

আরো খবর: ‘ইক্বরা নূরাণী তালিমুল কুরআন বোর্ড বাংলাদেশ’

ওই মাদরাসারই এক শিক্ষক জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাদরাসাগুলো মনিটরিং করা হচ্ছে। স্থানীয় শীর্ষ আলেমদের উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাদরাসা ছুটি দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।

এসব বিষয়ে পাবলিক ভয়েসের পক্ষ থেকে বেফাক ও হাইয়াতুল উলইয়ার শীর্ষ একাধিক দায়িত্বশীলের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হয়।

গতকাল মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) বৈঠকের পর থেকেই বেফাকের মহাসচিব ও হাইয়াতুল উলইয়ার ভারপ্রাপ্ত কো-চেয়ারম্যান আল্লামা মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস এর সাথে বেশ কয়েকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়।

কথা বলতে চাই জানিয়ে মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে কল করা হলেও মোবাইল রিসিভ করেননি কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ অথরিটি সংস্থার এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে কোনা সাড়া পাওয়া যায়নি হাইয়াতুল উলইয়ার ভাইস চেয়ারম্যান আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউ এর।

এছাড়াও যোগাযোগ করা হয় হাইয়াতুল উলইয়ার সদস্য ও বেফাকের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক এর সাথে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এ সংক্রান্ত বক্তব্য জানতে চাইলে বেফাক মহাসচিব হুজুরের সাথে কথা বলুন’।

সবশেষে আমরা মুঠোফোনে মুখোমুখি হই হাইয়াতুল উলইয়ার সদস্য ও বেফাক এর সহ-সভাপতি মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু’র সাথে। ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে বাসে বসেই দীর্ঘ সময় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু

মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন

শুরুতে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক ছুটি না দিয়ে ক্লাস-বন্ধ পরীক্ষা চালু এই বিষয়টার দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তিনি বলেন, আসলে ক্লাস তো এমনিতেই বন্ধ আছে। পরীক্ষা প্রস্তুতির স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের সারা বছরের পরিশ্রম শেষে চূড়ান্ত পরীক্ষার সাথে অনেক কিছু্ জড়িয়ে থাকে সেসব বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

হাইয়াতুল উলইয়ার পরীক্ষা এমনিতেই সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞাকৃত সময়ের পরে হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে ১ এপ্রিল থেকে অনুষ্ঠিতব্য এইসএসসি পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়নি। বেফাকের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ২৮ মার্চ থেকে।

কিন্তু ক্লাস বন্ধ-পরীক্ষা চলবে এমন সিদ্ধান্ত শুনিয়ে কৌশলে সরকারি সিদ্ধান্তকে এড়িয়ে যাওয়া হলো কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে এখানে এড়ানো না এড়ানোর কোনো বিষয় নেই। শিক্ষার্থীর সুবিধার কথা বিবেচনা করে নানান দিক ভেবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সরকার ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে উল্লেখ্য করে বেফাকের পরীক্ষাগুলো মাত্র তিন/চারদিন পিছিয়ে দেয়া যেতো কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীরা আছে। বিভিন্ন বিভাগে পরীক্ষাও চালু। তো এগুলো শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার ভবিষ্যদের কথা চিন্তা করে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এখন পর্যন্ত যে কয়জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে তার সবাই ঢাকায় অবস্থান করছে। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীদের জন্য রাজধানীতে অবস্থান করা ঝুঁকিপূর্ণ কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে ঝুঁকি তো সব জায়গায়ই আছে। এই যে আমি বাসে করে ঢাকা থেকে সিলেট যাচ্ছি।

প্রতি বছর সড়ক দূর্ঘটনায় কয়েক হাজার মানুষ মারা যায় আমাদের দেশেই। সড়কে চলা তো করোনাভাইরাসের চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এখন আমি তো ভ্রমণ ছেড়ে দিতে পারি না’।

কিছু কিছু মাদরাসা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণার দৃষ্টি আকর্ষণ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান নিজেদের সিদ্ধান্তে মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ চাপ প্রয়োগের ব্যাপারে আমাদের কাছে এখনো কোনো তথ্য আসেনি। আপনার থেকেই প্রথম শুনলাম’।

এলাকা ও প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ্য করে প্রশাসনের চাপের কথা জানালে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে কেউ বোর্ডে অবহিত করলে দায়িত্বশীলগণ করণীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন’।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাজধানীতে প্রতিষ্ঠানগুলো নজরদারি বা কোনো নির্দেশনা আসলে বা পরিস্থিতির অবনতি হলে বেফাক বা হাইয়া কী করবে এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সেক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ইমারজেন্সি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে’।

জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া মাদরাসা বন্ধ হওয়ার কথা তুলে ধরলে তিনি বলেন, ‘এটাসহ প্রায় অর্ধশত মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের অবস্থা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কেননা, এমন হতে পারে কোনো কোনো মাদরাসার স্থানসংকুলান কম। সেসব প্রতিষ্ঠান চাইলে প্রাতিষ্ঠানিক এখতিয়ারে শিক্ষার্থীদের ছুটি দিতে পারে’।

বেফাকের সিদ্ধান্তের আগে তৃণমূলের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপালের নিজস্ব একটা এখতিয়ার আছে।

তিনি চাইলে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর তাছাড়া পরীক্ষা-ক্লাস সময় এগুলো তো বোর্ড নিধারণ করে দেয় না। এটা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব এখতিয়ার। প্রতিষ্ঠান চাইলে শিক্ষার্থীদের সুবিধামতো যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে’।

/এসএস

মন্তব্য করুন