বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক ও কয়েকটি কথা

প্রকাশিত: ১:২২ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৮, ২০২০
বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক ও কয়েকটি কথা : সগির আহমদ চৌধুরী। ছবি : পাবলিক ভয়েস

প্রথমে নিজের সম্পর্কে একটি ভূমিকা বলি, আমি এই মুহূর্তে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কোনো পর্যায়ের দায়িত্বে নেই। বিভিন্ন সময় আমি যেসব মতামত প্রকাশ করি তার অনেকগুলো খোদ ইসলামী আন্দোলনের চিন্তা-চেতনা ও নীতিগত অবস্থানেরও পরিপন্থী হয়ে থাকে।

আমার খুব ভালো লাগে যে, আন্দোলনের কর্মি-সমর্থকরা আমার সবগুলো বক্তব্য গ্রহণ করেন না; কিছু গ্রহণ করেন, কিছু কিছু বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং কিছু কিছু বক্তব্যের বিরোধিতাও করেন। অর্থাৎ অন্ধভাবে অনুসরণ যা সেটি তাঁদের মধ্যে নেই বা কোনটি গ্রহণযোগ্য ও কোনটি প্রত্যাখ্যাত হবার উপযুক্ত তা পরখ করার ক্ষমতা দলের সাধারণ কর্মি-সমর্থকদের আছে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করেছি, আমার ব্যক্তিগত কিছু মতামতের জন্য তত্ত্বগতভাবে আমার সাথে তর্কে না এসে অনেক মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দলকে ঘায়েল করেন, অথচ আমার মতামত যেমন দলের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, তেমনি সেসব বক্তব্য নিয়ে খোদ দলের মধ্যেও বিরোধিতা রয়েছে। আমি এটাকে বেইনসাফি মনে করি।

এখন আসি মূল কথায়: বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে। আমি আমার স্বাধীন মতামত পেশ করছি। তুরস্কে আতাতুর্ক, পাকিস্তানে বাবায়ে কওম এবং ভারতে বাপুজি থাকতে পারলে বাংলাদেশে জাতির জনক থাকতে আপত্তি কোথায়? তুরস্কে মোস্তাফা কামালের মতো ব্যক্তির সাথে ইসলামপন্থিরা সমঝোতা করে নিয়েছে, জাতির পিতা হিসেবে মেনে নিয়েছে, তার সম্মান ও মর্যাদা বহাল রেখেই সামনে এগুনোর পথ বেঁচে নিয়েছে।

পড়ুন: থানকুনি পাতার যাদুকরি কিছু ঔষধি গুন

হিন্দু ভারতে খোদ ওলামায়ে কেরামও মহাত্মা গান্ধীকে দেশের বাপুজি হিসেবে সম্মান করেন, পাকিস্তানে কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ রহিমাহুল্লাহকে বাবায়ে কওম হিসেবে ধার্মিক-অধার্মিক সকলেই মানেন তাহলে বাংলাদেশে এতো আপত্তি কেন? ব্যক্তিজীবনে বঙ্গবন্ধু ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন, পাকিস্তানের জন্য লড়াইয়ের প্রথম কাতারের ছাত্রসেপাহসালার ছিলেন, তিনি যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছেন তার যে ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন তাতে তাঁকে মুরতাদ বলার কোনো অবকাশ নেই।

স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পার হতে চললেও স্বাধীনতার এই মহান নেতাকে এখনও অস্পৃশ্য, অশ্রদ্ধেয় ও অম্মানের দৃষ্টিতে উপস্থান কতোটা যৌক্তিক? আর এভাবে একজন জাতীয় নেতাকে নিয়ে বিতর্ক করে আপনি কতোটা সফল হতে পারেন? একটা সমঝোতায় আসা উচিত নয়?

তিনি বাংলাদেশের স্থপতি এই অর্থে তাঁকে জাতির পিতা মেনে নেওয়া উচিত। তাঁর জীবনে ইসলামের জন্য অনেক অবদান আছে, আপনি সামনে এগুতে চাইলে তাঁর জীবেনর পজিটিভ বিষয়গুলো সামনে আনতে পারেন। সেগুলোকে ভিত্তি করেই আপনার নিজের চিন্তা-চেতনার অনুকুলে সেগুলোর ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেন। অর্থাৎ তাঁকে বিতর্কিত না করেও বরং তাঁকেই আশ্রয় বানিয়ে এগুনোরও সুযোগ আছে।

আরো পড়ুন: সংশোধিত ঘোষণা: মসজিদে নববী ও হারামে নামাজ চালু থাকবে

যেভাবে তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের প্রথম পর্যায়ের জিন্দেগীকে হাতিয়ার বানিয়ে এরদোয়ান সেগুলো ইসলামের স্বার্থে ব্যবহার করছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এখনও যারা বিতর্ক করেন তারা আসলে স্বাধীনতা বিরোধী প্রেতাত্মাদের প্রোপাগাণ্ডার শিকার। তাদের মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশ আর দ্বিতীয়বার কখনো পাকিস্তানের অধীন হবে না, বাংলাদেশে পাকিস্তানের পরাজয়ের মনোদুঃখ ও মনোবেদনা এখন অন্তত ঝেড়ে ফেলুন, সেই দুঃখের প্রতিশোধ বঙ্গবন্ধুর ওপর আর কতো দিন ঝাড়বেন? এবার ক্ষান্ত দিন।

স্বাধীন বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, বিমানবন্দরে নেমেই ভারতীয় বাহিনীকে দেশে ফেরত পাঠিয়েছিলেন, ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে ইসলামাবাদে গিয়ে ওআইসির মিটিংয়ে হাজির হয়েছিলেন। ভারত বিরোধী বঙ্গবন্ধুকে সামনে আনতে পারেন এখন, তাঁর স্বাধীনচেতা মানসিকতা, সাহসিকতা ও বলিষ্টতার ইতিহাসকে কাজে লাগাতে পারেন।

আমাদের সৌভাগ্য বাংলাদেশে আমরা একজন বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলাম, আমরা স্বাধীন হয়েছি। যদি ফিলিস্তিন, কাশ্মীর ও আরাকানে কোনো বঙ্গবন্ধু থাকতো সেসবও আজ স্বাধীন হয়ে বিশ্বমানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতো।

একজন বঙ্গবন্ধুর কতোটা প্রয়োজন সেটা আমরা না বুঝলেও, তাঁর কদর আমরা অনুধাবন করতে না পারলেও ফিলিস্তিন, আরকান ও কাশ্মীরী জাতি তাঁদের মাঝে একজন বঙ্গবন্ধুর শূণ্যতা ঠিকই বুঝে।

মুজাহিদ সগির আহমদ চৌধুরী
আলেম, লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট

মন্তব্য করুন