টুঙ্গিপাড়ার খোকা: বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু

মুজিববর্ষ

প্রকাশিত: ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০২০

খোকা তো খোকাই। ওই বয়সী পাঁচ-দশটা ছেলেপুলের মতো আকার-আকৃতি হলেও প্রকারে অন্য ধাঁচে গড়া। অনেক সাহসী। অনেক স্বপ্ন বুকে। তখন তার বয়স আঠারো। ক্লাস নাইনে পড়ে। তার স্কুলের একজন শিক্ষক হামিদ স্যার খোকার জীবনের বাঁক বদলে দিয়েছিলেন।

হামিদ স্যার খুব ভালো শিক্ষক ছিলেন। তিনি ক্লাসে শুধু পাঠ্যবইই পড়াতেন না, ছাত্রদের শোনাতেন নানা রকম গল্প। দেশের গল্প। ইতিহাসের গল্প। বাঙালির অতীতের গল্প। বাঙালির ঐতিহ্য আর বীরত্বের গল্প।

তিতুমীর, হাজী শরীয়ত, এমনকি ওইসময়ের মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ বসু, ক্ষুদিরাম বসু কিংবা মাস্টারদা সূর্য সেনের গল্প। আর তখন খোকার মনেও স্বপ্ন বাসা বাঁধে, দেশের মানুষের দুঃখ মুছে দেয়ার জন্য যুদ্ধ করার।

খোকা তখন নবম শ্রেণিতে। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক আর খাদ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে তাদের আন্দোলনে তাকে সঙ্গে নেয়ার আবেদন জানিয়েছিল নির্ভয়ে।

খোকা কলকাতা যেতে চায়। খোকা বলে, আমি আপনাদের আন্দোলনের কথা জানি।

স্যার, কবি নজরুল যেখানে থাকেন, সুভাষ বসু যেখানে থাকেন- আমি সেখানে যেতে চাই। অনেকবার পালিয়েও যেতে চেয়েছিলাম।

নেতা হোসেন সোহরাওয়ার্দী আঁতকে উঠেছিলেন সেদিন। অমন কাজ করতে বারণ করেছিলেন। বলেছিলেন, এন্ট্রান্স পাস করে কলকতায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে। কলেজে ভর্তি করে দেয়ার কথাও বলেছিলেন।

খোকার জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। বাবা লুৎফর রহমান কোর্টে কাজ করেন। খোকা গোপালগঞ্জ হাইস্কুলে পড়ে হোস্টেলে থেকে। লুৎফর রহমান সাহেবের পূর্বপুরুষরা বাংলা মুলুকে এসেছিলেন বাগদাদ থেকে। ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য শেখ বংশের পূর্বপুরুষ শেখ বোরহান উদ্দিন বঙ্গদেশে এসে শেষ পর্যন্ত ওই টুঙ্গিপাড়া গ্রামেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

শেরেবাংলা ফজলুল হক জানতে চেয়েছিলেন খোকার গ্রামের নাম।

খোকা হাসিমুখে বলেছে, টুঙ্গিপাড়া। খুব সুন্দর গ্রাম। দক্ষিণে মধুমতি, উত্তর ও পূর্বে বাগিয়াতি নদী। পশ্চিমে টুঙ্গিপাড়া খাল। চারপাশে সবুজের সমারোহ।

খুবই বিনীতভাবে খোকা আমন্ত্রণ জানায়, যাবেন স্যার আমাদের গ্রামে? চক চক করে উঠে খোকার চোখ। বলে, আমাদের গ্রামটা না খুব সুন্দর। ‘নাজির সাহেব’ বললে আমার বাবাকে এলাকার সবাই চেনেন। আমার মা খুব ভালো রান্না করেন। পাড়া-পড়শিরা আমার মা সায়েরা খাতুনের রান্নার খুব তারিফ করেন। মায়ের হাতের রান্না না খেয়ে আমাদের বাড়ি থেকে কেউ যেতে পারে না।

অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা। তার কত কাজ। ইচ্ছে করলেই, কোথাও যাবেন বললেই তো আর যাওয়া যায় না। বাঁধা কর্মসূচি। নিয়মকানুন আছে।

মিট্ মিট্ করে হাসছিলেন তখন শেরেবাংলা। বললেন, যাব। ঠিক যাব। আবার এলে সময় করে একদিন অবশ্যই যাব তোমাদের বাড়িতে।

খোকার দাওয়াত রক্ষা করতে সেদিন টুঙ্গিপাড়া যাওয়া হয়ে উঠেনি শেরেবাংলা একে ফজলুল হক অথবা গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। আর আজ বাঙালি জাতির ত্রাতা হিসেবে সেখানে শান্তিতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন সেই খোকা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, মহামানব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

প্রতিদিন কত মানুষের ঢল সেখানে। বাংলার পুণ্যভূমি এখন টুঙ্গিপাড়া।

বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তার একটি লেখায় বলেছেন, ‘আমার আব্বার নানা শেখ আবদুল মজিদ আমার আব্বার আকিকার সময় তার নাম রেখেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আমার দাদির দুই কন্যা সন্তানের পর প্রথম পুত্রসন্তান আমার আব্বা। আর তাই আমার দাদির বাবা তার সব সম্পত্তি দাদিকে দান করেন। নাম রাখার সময় বলে যান, মা তোর ছেলের নাম এমন রাখলাম, যে নাম জগৎজোড়া বিখ্যাত হবে।’

সত্যি হয়েছে তার নানার কথা। আজ মুজিবুর রহমানের খ্যাতি জগৎজোড়া।

দুই.

গোপালগঞ্জ মিশনারি হাইস্কুল থেকে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে এন্ট্রান্স পাস করে শেখ মুজিব কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষে অবস্থান করে তিনি লেখাপড়া করতেন। এখান থেকেই ১৯৪৪ সালে শেখ মুজিব আইএ এবং ১৯৪৭ সালে বিএ পাস করেন।

এ সময় দেশ বিভাগের পর বঙ্গবন্ধু ঢাকায় এসে মোগলটুলির কর্মী ক্যাম্পে অবস্থান নেন। বাবার ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ সময় তিনি গ্রেফতার হন এবং ১৯৫২ সালের শেষ সময় পর্যন্ত কারাগারে বন্দি জীবনযাপন করেন। মহান ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সব আন্দোলনেই তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তিন.

গণতন্ত্র, স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও ন্যায়ের সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ পর্যন্ত তার জীবনের অমূল্য ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারের অন্ধকারে বন্দিজীবনের যাতনা ভোগ করেন। সারা জীবন তিনি গ্রেফতার হন অসংখ্যবার।

স্কুলের ছাত্র অবস্থায় কারাগারে আটক ছিলেন ৭ দিন। এটাই তার জীবনের প্রথম কারাবাস। বাকি ৪ হাজার ৫৭৫ দিন অর্থাৎ প্রায় ১৪ বছর কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। কারাগারে বন্দি থেকেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

১৯৪৮ সালের ১১ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পাঁচদিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর আটক হয়ে মুক্তি পান ১৯৪৮ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান ২৮ জুন।

ওই দফায় তিনি ২৭ দিন কারাভোগ করেন। একই বছরের ১৯৪৯ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন এবং ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন কারাগারে ছিলেন।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হয়। সেসময়ে বঙ্গবন্ধু ২০৬ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করার পর বঙ্গবন্ধু ১১ অক্টোবর গ্রেফতার হন।

এ সময়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি আবারও গ্রেফতার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ জুন। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন।

এরপর ’৬৪ ও ’৬৫ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ছয় দফা দেয়ার পর জাতির পিতা যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই গ্রেফতার হয়েছেন। ওই সময় তিনি ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন।

এরপর ৬৬ সালের ৮ মে আবারও গ্রেফতার হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। সর্বশেষ এ দফায় তিনি কারাগারে ছিলেন ২৮৮ দিন।

চার.

একজন আদর্শ বাঙালি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতি ছিল দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। স্কুলজীবন থেকেই তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন। যখন একটু বড় হলেন, তখন বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে লাগলেন।

আর যখন নেতা হলেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন বাংলার মানুষের মুক্তির একমাত্র উপায় হল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাহুগ্রাস থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে মুক্ত করা। আর তাই দেশের মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন বাংলার গ্রামে গ্রামে, পথে-প্রান্তরে।

এ সময়ে শহর-বন্দর, গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ তাকে ভালোবেসে নানান নামে ডেকেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ‘মুজিব ভাই’ ডাকটি।

১৯৬৬ সাল থেকে তার নামের আগে তরুণসমাজ ‘সিংহশার্দূল’, ‘বঙ্গশার্দূল’ ইত্যাদি খেতাব জুড়ে দিতে থাকে। তবে ‘মুজিব ভাই’, ‘শেখের বেটা’, ‘বাংলার মুজিব’, ‘শেখ মুজিব’, ‘বঙ্গশার্দূল, ‘সিংহশার্দূল’- এসব ছাপিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার বন্ধু। বাংলাদেশের মানুষের বন্ধু। আর সবকিছু ছাপিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন ‘বঙ্গবন্ধু’।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র সব সময়ই তাকে ঘিরে রেখেছিল। সংগ্রাম-আন্দোলনে জেগে ওঠা বাংলার মানুষকে দাবিয়ে রাখতে তাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বারবার কারাগারে পাঠায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। দায়ের করা হয় একের পর এক মিথ্যা মামলা। তেমনই এক মামলা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা।

১৯৬৮ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অভিযোগ আনে, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং কয়েকজন সাধারণ সৈনিক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ববাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।

এই মিথ্যা মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। পরে ৩৫ জন আসামির সবাইকে পাকিস্তান সরকার গ্রেফতার করে।

বাঙালির প্রাণের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতারের পর ফুঁসে ওঠে বাংলার মানুষ। তৎকালীন শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে ছাত্র-জনতা। উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো দেশ। আন্দোলনের তীব্রতায় কেঁপে ওঠে স্বৈরাচারের আসন। মামলা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অভিযুক্তদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী।

১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬ দফা দাবি পেশ করেন। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ এই ৬ দফা দেয়ার কারণেই বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জনকে ফাঁসি দেয়ার লক্ষ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হয়।

এই ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় ১৯৬৯-এর ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু কার্যালয়ে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহরুল হককে ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে নির্মমভাবে হত্যা করে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। কিন্তু এই সান্ধ্য আইন ভেঙে রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল করে বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ।

১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সেনারা বেয়নেট চার্জ করে নির্মমভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে হত্যা করে। ওই হত্যাকাণ্ডের পর আইয়ুব খান আবারও সান্ধ্য আইন জারি করে। এর প্রতিবাদে ২০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা মশাল আর মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। স্বৈরাশাসক আইয়ুব খান সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।

২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টনের জনসমুদ্র থেকে প্রিয়নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ গ্রেফতার করা সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয় ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। আর এই আলটিমেটামে বাধ্য হয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দিকে বিনা শর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হন আইয়ুব খান।

২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করতে রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।

সেখানে তৎকালীন ডাকসুর ভিপি, বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সহচর তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার প্রস্তাব করলে হাত তুলে বিপুল উল্লাসে জনতা তা সমর্থন করে। তখন থেকে বাংলার জনগণের কাছে শেখ মুজিবুর রহমান পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে।

পরবর্তী সময়ে এ সম্পর্কে তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, সেদিন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

১৯৮৭ সালের ৩১ জুলাই দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায় প্রকাশিত কলামিস্ট ওবায়দুল কাদেরের (ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী) এ বিষয়ে এক লেখায় পাওয়া যায়, “১৯৬৯ সালে লক্ষ মানুষের সমাবেশে মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত হন।

অবিস্মরণীয় গণবিস্ফোরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে সে আন্দোলনের অগ্রণী বাহিনী ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে সদ্য কারামুক্ত শেখ মুজিবকে রেসকোর্সের স্বতঃস্ফূর্ত বিশাল জনসমুদ্রে ডাকসুর সহসভাপতি ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা তোফায়েল আহমেদ ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত করেন।’’

‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি প্রথম কার মাথায় এসেছিল, এ প্রশ্নের জবাব পেতে হলে খানিকটা পেছনে যেতে হয়। তখন সম্ভবত ১৯৬৭ সাল। ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ ‘প্রতিধ্বনি’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করত। ওই পত্রিকার একটি সংখ্যায় ছাত্রলীগের রেজাউল হক মুশতাক ‘সারথী’ ছদ্মনামে ‘আজবদেশ’ শীর্ষক একটি লেখা লেখেন।

লেখার শেষদিকে ‘বঙ্গশার্দূল’ শেখ মুজিবের পাশে প্রথম ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তী সময়ে একই পত্রিকায় ১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাসের সংখ্যায় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রস্তাবিত পূর্ব বাংলার মুক্তিসনদ ৬ দফা’ শিরোনামে একটি লেখা ছাপা হয়। অবশ্য তখন এটা কারও দৃষ্টি কাড়েনি। কিন্তু বিষয়টি নিষ্ঠাবান কিছু ছাত্রনেতার মনে ধরেছিল।

টুঙ্গিপাড়ার সেই দুরন্ত কিশোর খোকা- তার সংগ্রামী চেতনা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি গভীর নিষ্ঠার কারণে বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু হয়েছেন। বাঙালির মুক্তির দিশারি হয়ে তিনি একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন, যার নাম বাংলাদেশ।

শুধু তা-ই নয়, আমাদের বঙ্গবন্ধু কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, কালক্রমে এবং শহীদ হওয়ার পরও তিনি এখন বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত ও দলিত গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা। স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্বাধীনতার স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এখন বিশ্ববন্ধু। আমার একটি কবিতার উচ্চারণ :

‘বঙ্গবন্ধু, যুগস্রষ্টা, হে মহামানব,
তোমার অমূল্য দান বাঙালির এই দেশ-
স্বাধীন সার্বভৌম এই বাংলাদেশে
অনন্তকাল শোনা যাবে
বাঙালির জীবনের জয়গান।
চিরজীবী বাংলাদেশে জয় বাংলা আমার স্লোগান।’

লেখক: রফিকুল হক দাদুভাই
কবি, জনপ্রিয় ছড়াকার ও সাংবাদিক

মন্তব্য করুন