বৃদ্ধাশ্রম : বাবা-মা সন্তানের বোঝা নয়

প্রকাশিত: ৭:০৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৫, ২০২০

মো. রবিউল ইসলাম : ‘জীবন-সংগ্রামের শেষ সময়টাকে চার দেয়ালের মধ্যে সন্তানদের অবহেলা-অনাদরের মধ্যে কাটাতে হবে জানলে সংগ্রামটা অন্যভাবে রচনা করতে চাইতাম’ এমনটাই বলছেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকা এক বৃদ্ধ।

সন্তান বড়ই নিষ্ঠুর হয়ে দাঁড়িয়ে যায় যখন তার মা-বাবাকে বোঝা মনে করে। মা-বাবার মৃত্যুটাকে সাধারণ মনে করা হয়।বলতে পারেন মা-বাবার মৃত্যুটি অপেক্ষার একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিচয় করিয়ে দিতে চায়। এ জীবন বড়ই বেদনার যখন সন্তান দ্বারা মা-বাবা নিগৃহীত হয়।

আমাদের সমাজের সভ্যতা ও আধুনিকতার একটা বিশাল মাইলফলক হিসেবে ধরা যায় “বৃদ্ধাশ্রম”। যেখানে বৃদ্ধ মা-বাবার মাথা গোজার ঠাঁই করে দেয় সন্তানেরা। সন্তানের উদ্দেশ্য শুধু একটাই আর সেটা হলো মা বাবার সেবা-শুশ্রুষা যেনো নিজের হাতে করতে না হয়। এগুলো করলে হয়তো সমাজ আর আধুনিক সভ্যতা খিলখিলিয়ে হাসতে চাইবে। রসিকতা করবে।

আমাদের দেশের বৃদ্ধাশ্রম দু প্রকারের হয়। একটা শহরের আর আরেকটা গ্রাম্য। তবে উভয় স্থানেই কম-বেশি থাকতে পারে।

বৃদ্ধাশ্রমের একটা প্রকার হচ্ছে বৃদ্ধ বা বৃদ্ধাদের আশ্রম বা আশ্রয়ের স্থানকে বলা হয়। এখানে বৃদ্ধ মা-বাবাদেরকে কোনো শ্রম দিতে হয়না। গায়ের শক্তি থাকুক আর না থাকুক। এই আশ্রমে মা-বাবারা অন্য সেবক-সেবিকা দ্বারা পরিচালিত হয়।খাওয়া, ঘুম, হাঁটা-চলা, ঔষধ, ব্যায়াম সবকিছু ভাড়ায় পাওয়া যায় বলা যায়। হয়তো কোনো কোনো সন্তান প্রতিদিন অফিস বা কাজ শেষে দেখা করে যায়। আবার কেউ তিনমাস, ছয় মাসেও দু একবার এসে দেখে যায়। মা বাবার সাথেও ফোনে এতো যোগাযোগ করেনা সন্তানেরা যতোবার যোগাযোগ করে আশ্রমের কর্মকর্তাদের সাথে। এখান মা বাবাদের হাত খরচের জন্যেও অর্থ প্রদান করে সন্তানেরা।

বৃদ্ধাশ্রমে মা-বাবারা ঠাঁই পায় কেন : সন্তানের স্ত্রীর বিলাসীতা ,ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া (বেশিরভাগ)। সন্তানের ভালো কাজকর্ম বা টাকা পয়সার নেশায় ঘরে পর্যাপ্ত সময় না দেবার কারনে। সন্তান চায়না মা-বাবার বৃদ্ধ বয়সের অনাকাংখিত ভুল বা আচার-আচরণ তার নিজের সন্তানদের অন্তরায় হোক।

কিছু বৃদ্ধাশ্রম নির্মম হয়ে থাকে বেশি। ছেলে শহরে চলে যাবার পর,ভালো চাকরি পাবার পর কিংবা বিদেশে যাবার কারনে মা বাবার দেখ-ভাল করতে গ্রামের বাড়ির প্রায় পরিত্যাক্ত কক্ষটাকে বানানো হয় একটা আশ্রম এর স্থান।

এই আশ্রমের মা বাবারা ঠিকমতো চাহিদা অনুযায়ী খাবার পায়না, উপযুক্ত বিছানা পায়না, ঔষধপত্র, হাটাচলার পরিবেশ পায়না। কখনও কখনও দিনের বেলায় ঘরটা অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে আবার কখনও কখনও রাতে আলোকিত থাকে। অবহেলা অনাদরের মধ্যে কাটে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের শেষভাগের জীবন। মরে যাবার আগ পর্যন্ত কোনো কোনো বাবা মা চিকিৎসাতো দুরের কথা পাশের কম দামী ডাক্তারদেরও চিকিৎসা পাবার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে সন্তানদের কাছ থেকে।

এই বৃদ্ধাশ্রমের প্রকারটার নাম দিয়েছি আমি গ্রাম্য বৃদ্ধাশ্রম।

বৃদ্ধাশ্রম শহর বা গ্রামে এখন আটকে থাকেনা। সময়ের সাথে সাথে মানুষের হিংস্রতা ও উপযুক্ত সামাজিক শিক্ষার অভাবে বৃদ্ধাশ্রমের উৎস বলে আমি মনে করি। এছাড়া সামাজিক স্ট্যাটাস এর লেভেল লাগানো নিচুমনের ছেলে বা মেয়েদের বিবাহ করার ফলে বৃদ্ধাশ্রমের পরিচিতি লাভ পায়। পশ্চিমা সংস্কৃতিদের সাথে তাল মিলিয়ে সোশ্যাল মাধ্যম ও মিডিয়া মাধ্যমগুলোতে ডুবে যাওয়াটাও অন্যতম কারণ বলে মনে করি।

আমাদের উচিত পাড়া-পড়শীদের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা।খোঁজ খবর নেয়া। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সাথে কথা বলা। এতে করে সহজেই কোনো অলিখিত বা অজানা বৃদ্ধাশ্রমের আগমন ঘটবে না।

লেখক : এ্যাক্টিভিস্ট

মন্তব্য করুন