করোনা প্রতিরোধে যেসব ভুল ধারণা ভাইরাল

মাহিন মাহিন

মুহসিন

প্রকাশিত: ৫:২৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ১২, ২০২০

গত ডিসেম্বরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। তবে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ভাইরাসটি নির্মূলের প্রতিষেধক আবিষ্কারের দাবি এসেছে। কিন্তু সেসব দাবি বাস্তবতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া ঘরোয়া পদ্ধতিতে ভাইরাসটি প্রতিরোধ করা যায় এমন কিছু উপায়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগেরই বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। ভিত্তিহীন এসব উপায়গুলোর মধ্যে ক্লোরিন-মিশ্রিত পানিতে গোসল, ১৫ মিনিট পর পর পানি পান, রসুন খাওয়ার বিষয়গুলো রীতিমতো ভাইরাল হয়েছে।

রসুন

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উপায়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয়েছে বেশি বেশি রসুন খাওয়া। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ না শুনে অনেকে রসুন খাওয়াও শুরু করেছেন। সম্প্রতি চীনের এক নারী একসঙ্গে দেড় কেজি রসুন খেয়ে গলার প্রদাহ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অতিরিক্ত রসুন খেলে করোনাভাইরাস ধ্বংস হবে না। ভাইরাসটি শ্বাসনালীতে আক্রমণ করে। তাই রসুন নিয়ে যেই মতবাদ তৈরি হয়েছে তা ভুল।

গরম পানি পান

জাপানি এক চিকিৎসকের বরাতে বিগত কিছুদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা প্রচার হচ্ছে যে, ১৫ মিনিট পর পর গরম পানি পান করুন। এতে করে গলা ভেজা থাকবে আর ভাইরাস মুখ দিয়ে প্রবেশ করলেও পানির সঙ্গে পাকস্থলিতে চলে যাবে।

ধারণাটি ভুল। পানি পান করা অবশ্যই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে ভাইরাস পানির সঙ্গে পাকস্থলিতে চলে যাবে তা বৈজ্ঞানকভাবে প্রমাণিত নয়।

ঘরে তৈরি হ্যান্ড স্যানিটাইজার

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে হ্যান্ড স্যানিটাইজার একটি কার্যকর উপাদান। বিশ্বের যেসব রাষ্ট্রে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে সেখানেই হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ কারণেই অনেকেই মদ্যজাত দ্রব্য দিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরির পরামর্শ দিচ্ছেন।

লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের অধ্যাপক স্যালি ব্লুমফিল্ড জানান, মদ্যজাত পণ্য দিয়ে কার্যকর হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করা সম্ভব নয়। এসব স্যানিটাইজার দিয়ে ঘরের মেঝে ও আসবাবপত্র পরিষ্কার করা সম্ভব। কিন্তু শরীরে এর ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ। এতে চামড়ায় জ্বালাপোড়াসহ বিভিন্ন ধরনের অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

‘আশ্চর্য’ দ্রবণ

ভাইরাস নির্মূলে এক ইউটিউবার দাবি করেন, ক্লোরিন ডাই অক্সাইড মিশ্রিত একটি দ্রবণ পান করলে দূর হবে করোনাভাইরাস। এই মিশ্রণের নাম মিরাকল মিনারেল সাপ্লিমেন্ট’ বা এমএমএস। বিষয়টি বেশ প্রচারও করেছে ওই ইউটিউবারের ভক্তরা।

এ দাবিকে অযৌক্তিক বলে উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)। তারা বলছে, ক্লোরিন মিশ্রিত ওই পানীয় পান করলে বমি, ডাইরিয়া, পানিশূন্যতাসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। তাই সবাইকে ওই পানীয় পান থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

রূপামিশ্রিত দ্রবণ পান

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরো একটি বিষয় বেশ ভাইরাল হয়েছে। তা হচ্ছে- রুপামিশ্রিত দ্রবণ যা সিলভার কোলয়েড নামে পরিচিত। তা পান করলে ১২ ঘণ্টার মধ্যেই করোনাভাইরাস নির্মূল হতে পারে।

সিলভার কোলয়েডের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রূপার কণা জীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করে। তবে এটি করোনাভাইরাসের ওপর এখনো পরীক্ষা করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি ব্যবহারে করোনাভাইরাস মরে যাবে এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে এর ব্যবহারে কিডনি নষ্ট, হৃদরোগ, শরীরের চামড়া নীল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশে বেড়ে যায়।

গরমে করোনা মরে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে গরমে করোনা মরে যায়। এ নিয়ে তর্কও হচ্ছে অনেক। অনেকে গরম পানি পান, গরম পানিতে গোসল করার পরামর্শ দিচ্ছেন। আবার অনেকে বলছেন কড়া রোদে থাকলে করোনাভাইরাস মরে যায়।

আবার ইউনিসেফের বরাতে প্রচার হচ্ছে আইসক্রিম থেকে দূরে থাকুন। এসব তথ্যগুলো শেয়ার করছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।

ইউনিসেফের এক কর্মী বলেছেন, গরম পানিতে গোসল, গরম পানি খাওয়া, রোদে থাকা কিংবা আইসক্রিম থেকে দূরে থাকা কোনোটিই ইউনিসেফ থেকে বলা হয়নি। এটি স্রেফ মানুষের মন গড়া কথা যা ভাইরাল হয়েছে।

অন্যদিকে, গরমে করোনাভাইরাস মরে যায় বিষয়টিও সম্পূর্ণ সঠিক নয়। করোনাভাইরাস ৭০ ডিগ্রি তাপে মারা যায়। সেই পরিমাণ গরম পানিতে গোসল করলে শীরের চামড়ার অনেক ক্ষতি হবে। আবার ৭০ ডিগ্রি তাপের পানি পান করাও কষ্টকর।

রোদে করোনাভাইরাস টিকে না এ তথ্যটিও সঠিক নয়। যদি তাই হতো- তাহলে আরব দেশগুলোতে এই ভাইরাস এতো ছড়াতে পারতো না।

তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মোতাবেক, ৭০ ডিগ্রি তাপের পানিতে গোসল করা বা পান করা অসম্ভব হলেও জামা কাপড় ও বিছানার চাদর পরিষ্কার করা সম্ভব। এতে করে ভাইরাসের সংক্রমণ কিছুটা হলেও কমানো যাবে।

মাহিন মুহসিন/পাবলিকভয়েস

মন্তব্য করুন