“বাঙ্গালীয়ানা ইসলাম” : মতামত

প্রকাশিত: ১০:২৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ১২, ২০২০

বাঙ্গালীয়ানা হলো, বাঙ্গালীসুলভ কাজকর্ম, চিন্তাভাবনা বা আচার-আচরণ।

বাঙ্গালী একটি ভাষাভিত্তিক জাতির নাম। যারা বাংলা ভাষায় কথা বলে। যারা সহজ, সরল ও আলগোছে জীবন উপভোগ করে। যারা বিত্তের চেয়ে চিত্তের এবং বৈভবের চেয়ে গুনকে বেশী মর্যাদা করে। যারা রোজকার খাদ্য যোগার হলেই ক্ষান্ত দিয়ে চিত্ত বিনোদনে মত্ত হয়। সেজন্য তাদের অলস খেতাবও জুটেছে। যদিও বাঙ্গালী “অলসতা” এর জন্য দুর্ভিক্ষের শিকার হয়নি কোনদিন।

বাঙ্গালী অনেক সময়ই চড় একটা খেয়ে মুখ বুজে চলে এসেছে অধিকতর ঝামেলা এড়ানোর জন্য। যদিও বাঙ্গালী জালিমের অতি বাড়ন্ত ফনা মুচড়ে দিয়েছে বারংবার।

এগুলো বাঙ্গালীর আবহাওয়া, উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সহজতা সৃষ্ট স্বভাব চরিত।

এই বাংলায় ইসলাম এসেছে ইসলামের সূচনালগ্নেই। ১০০০ শতাব্দিতে ইসলাম এসেছে মজলুমের উদ্ধারকর্তা হিসেবে। এরপর থেকে এই বাংলায় ইসলাম তার মৌলিকত্ব ঠিক রেখেই স্থানিক হয়েছে। মানুষের হাড়ি থেকে রাজনীতি সবকিছুতেই দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

বাঙ্গালী যতটা সমাজকেন্দ্রীক ততটা রাষ্ট্রকেন্দ্রীক না। রাষ্ট্র ক্ষমতায় কে এলো আর কে গেলো সেটা নিয়ে বাঙ্গালী খুব বেশি মাথা গরম করেনি, যতক্ষণ না তার মাথায় বাড়ি পড়েছে। তারচেয়ে বরং বাঙ্গালী তার পরিবার ও সমাজ নিয়েই বেশি নিমগ্ন থেকেছে। “ঘরকুনো বাঙ্গালী” নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হলেও আদতে এটা বাঙ্গালীর চিরন্তন স্বভাব। সমাজে ‘মাথা কাটা যাওয়া’ এর ভয় বাঙ্গালী সর্বদাই করেছে।

সেই তুলনায় রাষ্ট্রে কি পাল এলো না সেন এলো নাকি পাঠান, আফগান বা মোঘল এলো তাতে বাঙ্গালীর কিছু আসে যায় নাই। পাল, সেন, মোঘল, খান, পাঠান বা আফগানরা রাষ্ট্র নিয়ে যতই বাহাদুরি করুক সমাজে তারা বাঙ্গালীয়ানার মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারেনি বরং বাঙ্গালীরাই তাদের পরিবর্তন করে তাদের স্বভাব-চরিত্রে বাঙ্গালীয়ানা এনেছে। যারা বাঙ্গালির সামাজিক স্বভাব-চরিত্র আত্মস্ত করেনি বাংলা তাদেরকে ইতিহাস থেকে ছুড়ে মেরেছে।

বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে, বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে মুসলিম দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ভূখন্ড। বিচ্ছিন্ন এই ভূখন্ডে ইসলামের এমন একক বিস্তার সকল নৃতাত্ত্বিকদেরকেই ভাবিয়েছে।

বাংলায় ইসলাম বাজিমাৎ করার মুল কারণও এখানে লুকায়িত। ইসলাম এখানে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রশক্তি হয়ে আসেনি বরং ইসলাম এখানে এসেছে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে। এর নেতৃত্ব দিয়েছেন একদল সামাজিক নেতা।

ইতিহাসের সত্য ভাষ্য হলো, এদেশে ইসলামের বিস্তার হয়েছে সুফি, দরবেশ ও পীর-ফকিরদের মাধ্যমে।

এই সুফি, দরবেশ ও পীর-ফকিরগন এদেশের মানুষের স্বভাব-চরিত্র ও মানসিকতা বুঝে ইসলামের মৌলিকত্ব ঠিক রেখে, ইসলামকে বাঙ্গালীয়ানা করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেন। সুফি, দরবেশ ও পীর-ফকিরদের ইসলামকে বাঙ্গালীয়ানা করার এই কৌশলের কারণেই এখানকার মানুষের কাছে ইসলামকে পরদেশি বলে মনে হয়নি বরং এই ভূখন্ডে জন্ম নেয়া কোন ধর্ম বলেই মনে হয়েছে। সেজন্য দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহন করেছে।

এই পদ্ধতি এতোটাই কার্যকর হয়েছে যে, মানুষ তার চিন্তা-ভাবনা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি আচরন, কথা, সংস্কৃতি, উৎসব এমনকি রাজনৈতিক মুক্তি সংগ্রামেও ইসলামকে ভিত্তি করে পথ চলেছে। ইসলামের ছায়াতলেই আশ্রয় নিয়েছে। ইসলামবোধ ও ইসলামের স্বাতন্ত্র্যবোধ তাদের কাছে এতোটাই প্রবল হয়েছে যে, তারা শব্দ চয়নেও ভিন্নতা এনেছে। পানি আর জলের পার্থক্য কেবলই ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবোধ থেকে উদ্ভূত।

তাই ইতিহাস ও বাস্তবতার আলোকে স্বীকার করতেই হবে যে, গত হাজার বছর ধরে বাঙ্গালী তার সামাজিক ও চারিত্রিক স্বাতন্ত্র্য ঠিক রেখেই দৃঢ়ভাবে মুসলমান। বাঙ্গালীর এই ইসলাম চর্চা সভ্যতার ইতিহাসে আলাদা একটি পরিভাষা তৈরি করেছে। “বাঙ্গালী মুসলমান”।

ইসলামের মৌলিকত্ব ঠিক রেখে স্থানীয় স্বভাব-চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে ধারন করার এক অসামান্য ঘটনার ভাব প্রকাশক পরিভাষা এই বাঙ্গালী মুসলমান।

ইসলামের জ্ঞানতত্ত্বে গভীরতা আছে এমন যে কেউ এটা জানেন যে, ইসলাম চিরকালীন একটি ধর্ম। সেকারণেই যেকোন সমাজ ও সামাজিক বৈচিত্রকে ধারন করার এক বিস্ময়কর ক্ষমতা ইসলামের রয়েছে। শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি বলেছিলেন, কোরআনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, কোরআন সর্বকালে সার্বজনীন। সেই বৈশিষ্ট্যেরই অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো, বাঙ্গালীয়ানা আর ইসলাম মিলেমিশে একাকার হওয়া।

ইসলামের বাঙ্গালীয়ানা রুপ হলো একটি প্রেমময়, শান্তিময় ও আধ্যাত্মবাদ প্রভাবিত ইসলাম। এখানে ইসলাম যতটা না আইনের সমষ্টি, তারচেয়ে বেশি ভক্তির সমষ্টি। এখানে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক যতটা না শাসকের, তারচেয়ে বেশি প্রেমের। রাসূল সঃ যতটা না বিধান প্রবর্তক, তারচেয়ে বেশি ভালোবাসার পাত্র। ইসলাম এখানে যতটা না অনুসৃত, তারচেয়ে বেশি আশ্রয়ের স্থল, সাহসের উৎস, বিপদের ভরসা, বিপ্লবের চেতনা। ইসলাম এখানে যতটা না রাজনৈতিক, তারচেয়ে বেশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচারের সূত্র। ইসলাম এখানে পরম যত্নে লালিত এক আরাধ্য ধন। পরমাত্মাকে পাওয়ার মাধ্যম। আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার উপায়। এবং নিবৃত্তে, নির্জনে, হতাশায়, আশায়, আনন্দে বা দুঃখের একান্ত সঙ্গী।

এখানকার ইসলাম পাপীকে শাস্তি দেয়ার বদলে পাপীর সংশোধনে বেশী মনোযোগী। এখানকার ইসলাম পাপীকে দুরে সরিয়ে দেয়ার বদলে কাছে টেনে মায়া নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পাপী এখানে শত্রু না বরং ঘনিষ্ঠজন। পাপীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম না বরং পাপীর প্রতি মমতাই এখানকার ইসলামের রীতি। বাঙ্গালীয়ানা ইসলাম, ইসলাম বিরুদ্ধ কর্মকান্ডে যতটা ক্ষুব্ধ হয়, তার চেয়ে বেশি ব্যথিত হয়। এই চিন্তা প্রবল থাকে যে, “আহারে! ইসলামের বিরোধিতা করে লোকগুলো গুনাহগার হচ্ছে! ওদের কি উপায় হবে?”

বাঙ্গালীয়ানা ইসলামে এমনকি পতিতালয়কেও শহরের বাহিরে ছুড়ে নিষিদ্ধ পল্লীতে পরিনত করা হয় না বরং ব্যথিত হৃদয়ে তাদের হেদায়েতের জন্য অবিরাম প্রচেষ্টা চালানো হয়। পানশালা এই ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্র। কারণ মদপ্য লোকগুলোরই তো বেশি হেদায়েত প্রয়োজন।

এখানে শিরকের উৎখাত হয়েছে একাত্ববাদের সৌন্দর্যে। পুরোহিতরা এখানে হেরেছে সুফিদের আচার মাধুর্যে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের অপরিহার্যতা এখানে প্রমানিত হয়েছে উদাহরন সৃষ্টি করে।

এখানকার সুফিরা মানব সেবাকে আল্লাহ প্রাপ্তির মাধ্যম মনে করতেন। সেই মানব হিন্দু কি মুসলমান তা বিবেচনা না করেই তারা নিজেদের উজার করে মানবের জন্য কাজ করেছেন। মানব সেবায় তারা এতো বেশি নিমগ্ন ছিলেন যে, সুফিদের কেন্দ্র করেই এখানে সভ্যতা গড়ে উঠেছে। বন-জঙ্গলে মানুষের আবাদ তারা করেছেন কেবল মানব প্রেম দিয়ে। এই সুফিগন একই সাথে ধর্মীয় গুরু, সামাজিক প্রধান, রাজনৈতিক নেতা ও সভ্যতার কেন্দ্র। এই পীর, দরবেশ ও ফকিররা জালিমের বিরুদ্ধে ছিলেন প্রতিবাদী। অত্যাচারী জমিদার, সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ অপশক্তির বিরুদ্ধেও তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

সুফি, পীর-দরবেশ ও ফকির প্রভাবিত বাঙ্গালীর এই ইসলাম ইসলামের সার্বজনীনতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এর বৈশিষ্ট্য একান্তই বাঙ্গালীর নিজস্ব। এটা বাঙ্গালীয়ানা ইসলাম।

ইসলামের মৌলিকত্ব ঠিক রেখে বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই “বাঙ্গালীয়ানা ইসলাম” উদ্ভুত নীতিমালাই বাংলাদেশের জন্য একমাত্র যথার্থ নীতি।

এই লেখকের আরও লেখা পড়ুন : 

মাও. মামুনুল হকের ঐক্য আহ্বান; শেখ ফজলুল করীম মারুফের বিশ্লেষণ

ধর্ষণ রাজনীতি; শেখ ফজলুল করীম মারুফ

ইসলামী শরিয়ায় নারী : তরুণ দুই বিশ্লেষকের মতামত

মন্তব্য করুন