চরমোনাই তরিকা : নারীরা উপেক্ষিত কেনো?

প্রকাশিত: ৫:৪০ অপরাহ্ণ, মার্চ ১১, ২০২০
চরমোনাই তরিকা : নারীরা উপেক্ষিত কেনো ? ছবি : পাবলিক ভয়েস

পলাশ রহমান : বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি, একটি অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, থানা, ওয়ার্ড পর্যায়ে অত্যান্ত সুসংগঠিত এই সংগঠন। চরমোনাইর মরহুম পীর সাহেব সৈয়দ ইসহাক (রহ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন সারা দেশে ওয়াজ মাহফিল এবং মসজিদ ভিত্তিক হালকায় জিকিরের আয়োজন করে। এর নিজস্ব প্রকাশনা আছে। নিয়মিত বই পুস্তক এবং পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। দুস্থ মানুষের সেবায় ফান্ড গঠন করা হয়। মাদরাসা মক্তব প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা হয়। অর্থাৎ এটাকে শতভাগ দীন প্রচারের মিশন বলা যায়।

কিন্তু একটা বিষয়ে এই মিশনের উদাসীনতা চোখে পড়ে গোড়া থেকে। তা হলো নারীদের জন্য আলাদা কোনো কর্মসূচি বা সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামাজিক, পারিবারিক এবং রাজনৈতিক পরিমন্ডলে এক ভয়াবহ সংস্কৃতি চালু হয়েছে। ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মকে ধর্মকর্ম থেকে দুরে সরানো হচ্ছে। শিক্ষা সিলেবাস এমন ভাবে সাজানো হয়েছে, হচ্ছে যে- শিক্ষার্থীরা যেনো ধর্মবিমুখ হয়ে বেড়ে ওঠে। এর ফলে দেশের যুবসমাজ বিপথগামী হচ্ছে। সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক অনাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। দূর্নীতি অব্যাবস্থাপনা অক্টোপাসের মতো খামচে ধরেছে মনুষত্যের ললাট। আদর্শ, নৈতিকতা, মূল্যবোধ নামক শব্দগুলো শিকেয় উঠার উপক্রম হয়েছে। এই আত্মঘাতি অবক্ষয় থেকে দেশ ও জাতীকে উদ্ধার করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কিন্তু তা এই মুহুর্তে অসম্ভব প্রায়। কারন দেশের শাসকশ্রেণী ধর্মীয় আদর্শের বেপারে ভয়ঙ্কর রকমের উদাসীন। বরং তাদের হাত ধরেই জাতী ধর্ম শিক্ষা ভুলে ভোগবাদী অসভ্যতায় অভ্যস্ত হচ্ছে। মাদকে নীল হচ্ছে। এই মহাসংকটময় মুহুর্তে দেশের আলেম ওলামা এবং ধর্মীয় আদর্শ ধারণকারী, নৈতিক চেতনা লালনকারী মানুষদের পরিকল্পিত ভূমিকা থাকা খুব জরুরী।

আরও পড়ুন : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সর্বোচ্চ নেতৃত্বগুনে উন্নীত একটি দল

ভয়াবহ গতিতে ধাবমান আত্মঘাতি অবক্ষয় রোধ করতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভালো মানুষ তৈরীর কাজ শুরু করা দরকার। শিক্ষায় ধর্মীয় মূল্যবোধ, আদর্শ প্রাধান্য দেয়া দরকার। কিন্তু আপাতত তা সম্ভব হচ্ছে না। কারন চালকের আসনে যারা বসে আছেন তারা নিজেরাই ধর্মীয় আদর্শ বিমুখ। নৈতিকতার সাথে, মূল্যবোধের সাথে তাদের পরিচয় কম। সুতরাং জাতীকে উদ্ধার করতে হলে এই মুহুর্তে অত্যান্ত পরিকল্পিত এবং সংগঠিত ভাবে কাজ করা দরকার। আর এ কাজের সূচনা করতে হবে পরিবার থেকে। পরিবারিক শিক্ষা থেকে বিদেশি সংস্কৃতি সরিয়ে ইসলামের মৌলিক আদর্শের অনুপ্রবেশ ঘটাতে হবে। নারীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় আদর্শের চর্চা বাড়াতে হবে। ঘরে ঘরে যদি একজন করে ধর্মীয় আদর্শ সচেতন মা বা বোন তৈরী করা যায় তবেই এই মাহাদূর্যোগ থেকে আপাত উদ্ধার পাওয়া সম্ভব।

আগেই বলেছি বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি একটি সুসংগঠিত সংগঠন। এর মৌলিক কার্যক্রম হলো বিপথগামী মানুষদের সাথে ধর্মীয় আদর্শের পরিচয় ঘটানো। কিন্তু এই কার্যক্রম শুধু ঘরের বাইরে পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ঘরের ভেতরে প্রতিজন মা, বোনের আঙ্গিনায় পৌছে দিতে হবে। একজন মা যদি ধর্মীয় চেতানা বোঝেন, লালন করেন তবে সন্তানরা বিপথগামী, মন্দ মানুষ হওয়ার সম্ভবনা কম থাকে। তাছাড়া দেশে এখন ১১ কোটি ভোটার যার প্রায় অর্ধেক নারী। দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে এই বিষয়টি উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন :ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনী ইশতেহার (সম্পূর্ণ)

এখন তথ্য প্রযুক্তির সময়। মানুষের হাতে হাতে স্মার্ট ফোন, ইন্টারনেট। এই সুযোগ ব্যাবহার করছে অনেক বিকৃত চেতনার মানুষ। তারা ইসলামের নামে, ধর্মের নামে মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌছে দিচ্ছে। বিশেষ করে কোমল মনের নারীরা তাদের দারা বেশি মিসগাইড হচ্ছেন। এই অশুভ তৎপরতা রোধ করতে যদি হকপন্থী আলেমগণ এগিয়ে না আসেন, উদাসীনতা দেখান তবে কেউই দায়মুক্ত থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি যদি পরিকল্পিত ভাবে নারী কার্যক্রম বাড়াতে পারে তবে এই সংগঠন আর প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর আলো ছড়িয়ে পড়বে দেশের প্রতিটি স্তরের মানুষের মধ্যে। ঘরে ঘরে ধর্মীয় আদর্শের ভালো মানুষ তৈরী হবে। সমাজের কথিত উঁচু তলায় বা শিক্ষীত পাড়ায় ইসলামের সঠিক আদর্শ পৌছে যাবে তরতর করে। আর তা সম্ভব হলে অদুরভবিষ্যতে যে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সর্বোচ্চ সহায়ক হবে।

বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটির প্রকাশনা তালিকায় নারী সিলেবাস অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। ঘরে ঘরে ইসলামের নারী অধিকার পৌঁছে দেয়া দরকার। মুজাহিদ কমিটির নারী শাখা থাকা দরকার। তাদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়ান পৌছানো এবং চর্চার অভ্যাস বাড়ানো দরকার। একজন নারীর আদর্শ জীবন পরিচালনার জন্য যা যা দরকার হয় সবকিছু থাকা প্রয়োজন। এ কাজে প্রাথমিক ভাবে দেশের মহিলা মাদরাসাগুলোর শিক্ষার্থীদের কাজে লাগানো যেতে পারে। তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন : সিটি নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ : দলের প্রতি ১২ টি প্রশ্ন

মোদ্দাকথা হলো- বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটির কাজের পরিধি বৃদ্ধি করা দরকার। এটাকে শুধুমাত্র একটা ধর্মীয় সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়া দরকার। এর অধিনে দাতব্য বা সেবামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা দরকার। মিশনারী কার্যক্রম শুরু করা দরকার। শুধু মাদরাসা নয়, ধর্মীয় আদর্শের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা দরকার। দেশের প্রতিটি জেলা থানা পর্যায়ে অল্প মূলের চিকিৎসা বেসা নিশ্চৎ করতে হাসপাতা, চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা দরকার। অসহায় দরিদ্রদের জন্য অল্প খরচে সুসম খাবার ও পানির ব্যাবস্থা করা দরকার। বিধবা নারী, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধি, হিজরা, বেদে, উপজাতীদের জীবন মান উন্নয়ন এবং সামাজিক বৈষম্য দুর করতে কার্যক্রম শুরু করা দরকার। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা দরকার। সর্বপরি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা জাগিয়ে তুলতে এই সংগঠনের কার্যক্রম থাকা দরকার। আর এসব বাস্তবায়নের জন্য দরকার একজন সত্যিকারের ভালো এবং সুশিক্ষিত সেক্রেটারী জেনারেল।

লেখক : ইতালি প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক

এই লেখকের আরও লেখা পড়ুন 

গাজী আতাউর রহমানরা কেনো পিছিয়ে থাকবেন!

চরমোনাই তরিকা এবং জিকিরের লাফালাফি

সিটি নির্বাচন : শিরদাড়া টান করে কথা বলেছেন ইসলামী আন্দোলনের নেতারা

একঝাঁক সৈয়দ বেলায়েত, সিদ্দিকী, মিছবাহ ও নেছার উদ্দিন চাই!

ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াতী মাস এবং চরমোনাইর মাহফিল

এটিএম হেমায়েত উদ্দিন রহ. এর মৃত্যু ও তার দলের প্রতি কিছু খোলা প্রশ্ন

শুভকামনা ডাকসুর ইসলামপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য

ডাকসু নির্বাচন: ইসলামপন্থীদের অংশগ্রহণ ও আশঙ্কা

জলবায়ু কর্মসূচি পালন করুক ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ

 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না

হালজমানার ওয়াজ ও জামায়াত প্রসঙ্গ

কাদিয়ানিদের ব্যাপারে সামাধানে আসুন

রে বাটপার থেকে জুতার বাড়ি!

 

একটি হাস্যোজ্জল ছবি এবং পদদলিত জাতীয় বিবেক

উপজেলা নির্বাচন, কী করবে ইসলামপন্থীরা?

কেনো তিলে তিলে হত্যা করা হচ্ছে বাবুনগরিকে ?

 

রাজনৈতিক সংকটের দেশ ইতালি!

নিউজিল্যান্ড থেকে ইউরোপ : মুসলিম অভিবাসীরা কেমন আছে?

কথিত জঙ্গিবাদ ও আমাদের আলেমদের ভূমিকা

রোহিঙ্গা : বিষয়টা হেলাফেলার পর্যায়ে নেই

 

[পাবলিক ভয়েসের মতামত বিভাগে প্রকাশিত যে কোনো লেখার দায় লেখকের নিজের। পাবলিক ভয়েসের সম্পাদনা পরিষদ এ লেখার দায় গ্রহণ করে না। তাই এই লেখার জন্য পাবলিক ভয়েসের সম্পাদনা পরিষদকে দায়ী করবেন না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে পাবলিক ভয়েসের সম্পাদনা পরিষদের নীতির সাথে অসামঞ্জস্য লেখাও এখানে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। কেবল ধর্ম এবং রাষ্ট্রবিরোধী কোনো লেখা প্রকাশ করা হয় না। চাইলে আপনিও তথ্য বা যুক্তিসমৃদ্ধ লেখা এখানে পাঠাতে পারেন।]

মন্তব্য করুন