‘হিন্দুত্ববাদী ভারতের অঘোষিত উপনিবেশ বাংলাদেশ’ : মাহমুদুর রহমান

প্রকাশিত: ৫:৩৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ৯, ২০২০
ছবি : পাবলিক ভয়েস ডেস্ক

হাছিব আর রহমান

দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান প্রায় দেড় বছর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন।

ভিডিওর শুরুতে তিনি দেশের বর্তমান অবস্থা ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমালোচনা করে বলেন, আপনাদের সাথে যোগাযোগের তো আর কোন উপায় নেই কারণ প্রতিদিন সকালে যে পত্রিকা দেশ-বিদেশের প্রকৃত সংবাদ এবং দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদের মনের কথাগুলো নিয়ে আপনাদের দোরগোড়ায় হাজির হতো সেই আমার দেশ পত্রিকা আজ শেখ হাসিনার পুলিশের বুটের নিচে চাপা পড়ে আছে।

আরও পড়ুন : আলেম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে : মাহমুদুর রহমান

ভিডিও বার্তায় তিনি বাংলাদেশকে হিন্দুত্ববাদী ভারতের অঘোষিত উপনিবেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, এ দেশের অনেকেই ৯০ শতাংশ মুসলমানদের দেশে হিন্দুত্ববাদের জয়গান গায় আর ইসলামকে প্রতিহত করতে চায় এবং সমাজ থেকে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পূর্ণভাবে উঠিয়ে দিতে চায়। অপরদিকে ক্ষমতাসীনরা ধারণা করছেন, তারা শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে যদি দিল্লি তাদের পাশে থাকে।

বাংলাদেশে মূল্যবোধ বলে আর কিছু বাকি রাখা হয়নি উল্যেখ করে তিনি বলেন, সামাজিক ন্যায়-নীতি, মূল্যবোধ সম্পূর্ণভাবে বিসর্জন দেয়া হয়েছে এবং এই বিসর্জন দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ইসলামকে আক্রমণ করার মাধ্যমে। সরকার বুঝতে পেরেছিল যদি ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় থাকে তাহলে সমাজে একরকম শৃঙ্খলা থাকে কাজেই গত ১২ বছর ধরে এই সরকার ২০০৮ সালের সেই পাতানো নির্বাচনে জয়লাভ করার পর থেকেই তারা ইসলামকে প্রতিপক্ষ হিসেবে ধরে নিয়েছিল। কারণ তারা জানত যে ইসলামী মূল্যবোধ যদি সমাজ থেকে সরিয়ে ফেলা যায় তাহলে সমাজে দুর্নীতিকে বিস্তার লাভ করবে এবং প্রকৃতপক্ষে তাই হয়েছে।

বিরোধী দলের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যার্থতার উল্যেখ করে তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে যে বাংলাদেশের যে প্রথাগত বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ আছে তারা বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি এটা তাদের ব্যর্থতা। আজকে সেই ব্যর্থতা ঢাকতে এগিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে আলেমসমাজ। তারা এখন বিক্ষোভ করছেন, রাস্তায় নামছেন এবং বিপুল সংখ্যায় মানুষ তাদের সাথে অংশ নিচ্ছেন সাথে সাথে তাদের সাথে অংশ নিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বেশকিছু দেশপ্রেমীরা। যে কারণে আবার যেন বাংলাদেশে আমরা আশার আলো দেখতে শুরু করেছি উল্লেখ করে বলেন, ‘হয়তো বাংলাদেশ একটা বিপ্লবের প্রক্রিয়ার মধ্যে উপস্থিত হয়েছে’।

মাহমুদুর রহমান বলেন, এ অবস্থার মধ্যে আমি আলেম সমাজের প্রতি আহবান জানাবো আপনার ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। আপনারা ঐক্যবদ্ধ যদি থাকতে পারেন তাহলেই আপনাদের এবারকার আন্দোলনের বিজয় লাভ করা সম্ভব হবে। আপনাদের মধ্যে অনেক অনৈক্য সৃষ্টি করবার নানারকম প্রচেষ্টা করা হবে কিন্তু আপনারা সে সমস্ত অনৈক্যের দিকগুলো থেকে এড়িয়ে চলবেন এটাই আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ।

২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আন্দোলনকে উল্লেখ করে বলেন তিনি, এই প্রসঙ্গে আমি মনে করিয়ে দিতে চাই ২০১৩ সালের হেফাজতের আন্দোলনের কথা। আলেমদের সেই উত্তাল আন্দোলনের কথা। সেই বিপ্লবের কথা। যদিও তখন চূড়ান্ত বিজয় তারা ছিনিয়ে আনতে পারেনি কিন্তু সে বিপ্লবের কারণে শাহবাগের হিন্দুত্ববাদীরা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তারপরে সেই আন্দোলনে সফলতা এসেছিল কারণ তারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন।

হেফাজতের আন্দোলনে চূড়ান্ত বিজয় কেন আনা যায়নি তার অনেকগুলো কারণ আছে। শুধু এটুকু মনে রাখেন যে, সরকারের গনহত্যার কারণেই এই চূড়ান্ত বিজয় বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

মুজিববর্ষের সমালোচনা করে মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে এক ধরনের পূজার কালচার তৈরি করা হয়েছে। আপনারা শুনতে পাচ্ছেন একজন মৃত মানুষের পূজা চলছে মুজিববর্ষে নামে। শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রতিদিন বাংলাদেশ এখন পূজা করা হয়।

মুজিব শতবর্ষ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশে আনতে যাওয়ার বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ঘটনা যেদিকে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের একজন আলেমদের গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ভারতীয় মুসলমানদের গণহত্যাকারী মোদিকে বাংলাদেশ নিয়ে আসছেন পূজা করবার জন্য এবং বাংলাদেশে কতটা ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের খাটের নিচে নিয়ে আসা হয়েছে তার প্রমাণ হচ্ছে বাংলাদেশের র‍্যাবের প্রধান বেনজির আহমেদ কিছুদিন আগে বলেছিলেন কাশ্মীরের পক্ষে বা ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি অত্যাচার অবিচার বা যে গণহত্যা চালানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে কোন প্রতিবাদ করা হলে তিনি নাকি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে এতটা ধৃষ্টতা এই কারনেই হতে পারে যে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে হিন্দুত্ববাদের শাসন চলছে।

ভারতে মুসলিম নির্যাতন সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় এমন দাবির ব্যাপারে মাহমুদুর রহমান বলেন, ভারতের সেবাদাস সরকার এবং তাদের তাবেদার বুদ্ধিজীবীগণ বলার চেষ্টা করেন যে ভারতের মুসলমান গণহত্যা চলছে সেটা সে দেশের একান্তই অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং বাংলাদেশের মুসলমানদের এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য থাকতে পারেনা। তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, কোন দেশের কোন গণহত্যায় সে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হতে পারে না। যদি তাই হতো তাহলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহত্যা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হতো। কিন্তু কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমার এবং অংসান সুচির বিচার হয় এবং তাদের হয়তো আরও কঠিন সাজা হচ্ছে।

তেমনি ভাবেই কাশ্মীরের মুসলমানদের উপর গণহত্যা চালানোর জন্য, ভারতের মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালানোর জন্য ইনশাল্লাহ নরেন্দ্র মোদীর আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হবে এবং বাংলাদেশের আলেমদের উপর গণহত্যা চালানোর জন্য শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক আদালতে সাজা হবে। মাহমুদুর রহমান বলেন, আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় আছি যেদিন হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদী এবং শেখ হাসিনাকে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতে তোলা হবে এবং তাদেরকে তাদের উপযুক্ত সাজা শোনানো হবে। বলেন মাহমুদুর রহমান।

বাংলাদেশে ব্যাংকব্যাবস্থা সম্পূর্ণরুপে দেউলিয়া হয়ে গেছে দাবি করে মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আজকে কতগুলো ব্যাংকে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আপনাদের কোন ধারণা নেই। এই সরকার এ গুলো লুকিয়ে রাখছে। আপনারা যেগুলো দেখতে পাচ্ছেন, যে কয়েকটা ব্যাংকের নাম আসছে সেগুলো শুধুমাত্র আইওয়াশ। প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক খারাপ।

এসব টাকা নিয়ে তারা বিদেশে পাচার করছে। আপনারা জানেন যে, জাতিসংঘ থেকে একটা হিসেব দেয়া হয়েছে এবং সেই হিসেবে বলা হচ্ছে যে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। এবং এ সমস্ত টাকা পাচার করেছে আমলারা, রাজনীতিবিদরা, এবং সরকারদলীয় যারা আছে তারা। এবং এ পাচার করে বাংলাদেশকে দেউলিয়া করে দিয়েছে। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন একজন ওয়ার্ড লেভেলের আওয়ামী লীগ নেতার বাসায় ২৫/৩০ কোটি টাকা অনায়াসে পাওয়া যাচ্ছে। যার পরিণতিতে বাংলাদেশ আজকে এক অতল গহ্বরের একেবারে কিনারায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বলেন তিনি।

তিনি বিচার বিভাগের সমালোচনা করে বলেন, বাংলাদেশে কথা বলার অধিকার হরণ করার জুলুমের প্রক্রিয়ায় যারা সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন তারা হলেন বাংলাদেশের আদালতে উঁচু চেয়ারগুলোতে বসে থাকা ক্লাউনের দল যারা জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারী, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎকারী এবং যারা দুর্নীতিবাজ, ফাসিস্ট শেখ হাসিনার পদতলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকে অথচ বেগম খালেদা জিয়াকে দুর্নীতি বানোয়াট মামলায় বছরের পর বছর জেলে পুরে রেখে তাকে ক্রমাগতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

প্রসঙ্গত : আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বাংলাদেশের একজন আলোচিত ব্যক্তিত্ব । বিভিন্ন সময় সরকারের কঠোর সমালোচনা করে তিনি আলোচিত ছিলেন। নির্ভীক লিখনি এবং প্রতিবাদী ভূমিকার কারণে অনেকের কাছেই তিনি জনপ্রিয়। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আন্দোলনের সময়ে মাহমুদুর রহমান জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান করেছিলেন। এরপর তাকে গ্রেফতার করা হলে হেফাজতের পক্ষ থেকে তার পক্ষে আন্দোলন করা হয়েছিল।

তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীদের করা প্রায় ৭০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। ২০১৩ সালের ১১ই এপ্রিল মাহমুদুর রহমানকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে দৈনিক আমার দেশ কার্যালয় থেকে আটক করেছিলো আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারপতির কথোপকথন পত্রিকায় ফাঁস করার অভিযোগ ওঠার পর মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে দু’টি মামলা ছিল বলে পুলিশ আটকের পর জানিয়েছিলো।

তবে এর আগে ২০১০ সালের জুন মাসেও আটক হয়েছিলেন তাকে। আদালত অবমাননার একটি মামলায় সে বছর ১৯শে অগাস্ট মাহমুদুর রহমানকে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ১ মাসের কারাদণ্ডাদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সবমিলিয়ে নয়মাস পর কারাগার থেকে ছাড়া পান তিনি।

এরপর ২০১৯ সালের ২২ জুলাই কুষ্টিয়ায় একটি মানহানি মামলায় জামিন নিতে গিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলার শিকার হন মাহমুদুর রহমান। হামলায় তাঁর মাথা ও মুখ জখম হয়েছে। এ ছাড়া তাঁকে বহনকারী গাড়িটি ভেঙে দেয় হামলাকারীরা। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে আদালত চত্বর ছেড়ে চলে যান মাহমুদুর রহমান। এরপর থেকে মাহমুদুর রহমান কিছুটা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি অথবা বিএনপি’র কোন কর্মসূচিতেও তাকে তেমন দেখা যায় না।

ভিডিও দেখুন :

মন্তব্য করুন