একবিংশ শতাব্দীতে নারীরা ভালো নেই : ইসলামে নারীর অধিকার

প্রকাশিত: ৭:০৮ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৮, ২০২০

নারী… শব্দটাতেই আকর্ষণ জাগে। সম্মান, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা_প্রেমের অমূল্য এক চাওয়া-পাওয়া তৈরি হয়। এক তথ্যমতে পৃথিবীতে নারীর সংখ্যা বর্তমানে ৩৭৫ কোটি ১০ লাখ ০৭ হাজার ৪০০ জন আর পুরুষের সংখ্যা ৩৮১ কোটি ৭৭ লক্ষ ৩১ হাজার জন। এ তথ্য একশ পার্সেন্ট সঠিক তা বলা যাবে না তবে বিশ্বে নারী পুরুষ অনুপাত এমনই হবে। আজ (৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতি বছর ৮ মার্চ তারিখে সারা বিশ্বব্যাপী নারীরা একটি প্রধান উপলক্ষ হিসেবে এই দিবস উদযাপন করে থাকেন। বিশ্বের এক এক প্রান্তে নারীদিবস উদযাপনের প্রধান লক্ষ্য এক এক প্রকার হয়। কোথাও নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা উদযাপনের মুখ্য বিষয় হয়, আবার কোথাও মহিলাদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠাটি বেশি গুরুত্ব পায়।

এই দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে সরকার লাঠিয়াল বাহিনীর দমন-পীড়ন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হল। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয়ঃ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল।

বাংলাদেশেও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। অতঃপর ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অভিপ্রায় নিয়ে। বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারী ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। তন্মধ্যে – আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, কিউবা, জর্জিয়া, গিনি-বিসাউ, ইরিত্রিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজিস্তান, লাওস, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনিগ্রো, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উগান্ডা, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম এবং জাম্বিয়া। এছাড়া, চীন, মেসিডোনিয়া, মাদাগাস্কার, নেপালে শুধুমাত্র নারীরাই সরকারী ছুটির দিনভোগ করেন।

পৃথিবীতে পুরুষের সবচেয়ে বড় চাহিদার বস্তু এ নারীই! কেবল পুরুষই নয়_নারীদেরও পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিকৃত যৌনাচার হিসেবে হলেও ‘সমকামি নারী’দের সংখ্যা কম নয়। মানুষ স্বভাবগতভাবেই চায়_একজন নারী অন্তত তাকে সঙ্গ দিক, ভালোবাসুক। পৃথিবীব্যাপী তাই নারী অধিকার নিয়েও সোচ্চার সবাই। সবাই নারীর অধিকার চায়_নারী ভালো থাকুক তা চায়। কিন্তু তারপরও নারী নিগৃহের হার কম নয়। ধর্ষণ, কটুবাক্য বলা, উত্যক্ত করা এসবের জরিপ টানতে গেলে বিশাল গবেষণার কলম নিয়ে বসতে হবে তাই এক কথায় বলে দেয়া যায়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে নারীরা ভালো নেই। তারা ধর্ষণের শিকার ব্যাপকহারে।

এ শতাব্দীকে নারী জাগরণের শতাব্দি বলা হয়। নারীর জাগরণ হয়েছে। জেগেছে তারা। নেমেছে তারা। আরো পরিস্কার বললে_প্রকাশিত হয়েছে তারা। নারীরা আজ সর্বক্ষেত্রে আছে। বিশ্বের ২৭টি দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছে নারীরা। দেশে দেশে পশ্চিমা দেশগুলোতে নারীর জাগরণের জন্য মহারণ চলছে যেন। নারী ঘুমাচ্ছে_তাকে জাগাতে হবে! টেনে তুলতে হবে_এই যেন অবস্থা। ফলাফলেও নারীরাও জাগছে। কিন্তু তার ফাকে ছোট্ট একটা বিষয় থেকে যাচ্ছে। তা হল, এই শতাব্দীতে নারী সবচেয়ে বেশি নিগৃহের শিকার হয়েছে। নারীরা পৃথিবীব্যাপী সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হয়েছে এ শতাব্দীতেই। তারমানে এ শতাব্দী কেবল নারী জাগরণেরই নয়_নারী নিগৃহের শতাব্দীও।

নারীর অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বেশকিছু কথা আছে। পৃথিবীতে বর্তমান সভ্যতা নারীর অধিকার কোথা থেকে পেয়েছে? এই সভ্যতার সাথে নারীর অধিকারের “মেলবন্ধন” কারা তৈরি করে দিয়েছে? ১০০ খ্রিষ্টাব্দের পরবর্তি সময়টাতে বিশ্বব্যাপী নারীরা কেমন ছিলো ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে এসে তারা কেমন হয়েছে_কী অধিকার পেয়েছে তা একটু সত্য-সুন্দরের সাথে টেনে আনলেই পাওয়া যাবে অনেক কিছু।

এই পৃথিবীতে যত সভ্যতা আর যত জাতি এসেছে তার মধ্যে ইসলামই নারীকে সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান আকারে সম্মান দিয়েছে। তাদের জন্য অধিকার নিশ্চিত করেছে। পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে নারীর অধিকার বিষয়ে দীর্ঘতম আলোচনা হয়েছে। বর্ণনা হয়েছে।

আজ ৮মার্চ “বিশ্ব নারী দিবস” হিসেবে পবিত্র কোরআন এবং হাদীসের আলোকে নারীর অধিকার বিষয়ে আলোকপাত করা হল, স্পষ্টভাবে পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে নারীর অধিকার সম্পর্কে কী বলা হয়েছে তা বর্ননা করা হল।

ইসলাম নারীকে মহান মর্যাদা দিয়েছে। ইসলাম মা হিসেবে নারীকে সম্মান দিয়েছে;

মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করা, মায়ের আনুগত্য করা, মায়ের প্রতি ইহসান করা ফরয করেছে। মায়ের সন্তুষ্টিকে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি হিসেবে গণ্য করেছে। ইসলাম জানিয়েছে, মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত। অর্থাৎ জান্নাতে যাওয়ার সহজ রাস্তা হচ্ছে- মায়ের মাধ্যমে। মায়ের অবাধ্য হওয়া, মাকে রাগান্বিত করা— হারাম; এমনকি সেটা যদি শুধু উফ্‌ উফ্‌ শব্দ উচ্চারণ করার মাধ্যমে হয় তবুও। পিতার অধিকারের চেয়ে মায়ের অধিকারকে মহান ঘোষণা করেছে। বয়স হয়ে গেলে ও দুর্বল হয়ে গেলে মায়ের খেদমত করার উপর জোর তাগিদ দিয়েছে।

আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন,

“আমি মানুষকে তার মাতা-পিতা সম্বন্ধে নির্দেশ দিয়েছি তাদের সাথে সদাচরণ করতে। তার মাতা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং দু’বছরে তার দুধ ছাড়ানো হয়। সুতরাং শোকরগুজারী কর আমার এবং তোমার মাতা-পিতার।” (লুকমান ৩১:১৪)

মুয়াবিয়া বিন জাহিমা আল-সুলামি (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আমি আপনার সাথে জিহাদে যেতে চাই; এর মাধ্যমে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও আখেরাত অর্জন করতে চাই। তিনি বললেন: তোমার জন্য আফসোস! তোমার মা কি জীবিত? আমি বললাম: হ্যাঁ। তিনি বললেন: ফিরে গিয়ে তার সেবা কর। এরপর আমি অন্যভাবে আবার তাঁর কাছে এসে বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আমি আপনার সাথে জিহাদে যেতে চাই। এর মাধ্যমে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও আখেরাত অর্জন করতে চাই। তিনি বললেন: তোমার জন্য আফসোস! তোমার মা কি জীবিত? আমি বললাম: হ্যাঁ। তিনি বললেন: তার কাছে ফিরে গিয়ে তার সেবা কর। এরপরও আমি তাঁর সামনে থেকে এসে বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আমি আপনার সাথে জিহাদে যেতে চাই। এর মাধ্যমে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও আখেরাত অর্জন করতে চাই। তিনি বললেন: তোমার জন্য আফসোস! তোমার মা কি জীবিত? আমি বললাম: হ্যাঁ। তিনি বললেন: তোমার জন্য আফসোস! তুমি তার পায়ের কাছে পড়ে থাক। সেখানেই জান্নাত রয়েছে। (ইবনে মাজাহ (২৭৮১)

[মুহাদ্দিসিনে কেরাম সহিহ সুনানে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। হাদিসটি সুনানে নাসাঈ গ্রন্থেও (৩১০৪) রয়েছে। সেখানে হাদিসটির ভাষ্য হচ্ছে- “তার পায়ের কাছে পড়ে থাক। তার পায়ের নীচে রয়েছে – জান্নাত।”]

অন্য হাদীসে রাসুল স. বলেন,

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশি অধিকার কার? তিনি বললেন: তোমার মায়ের। লোকটি বলল: এরপর কার? তিনি বললেন: তোমার মায়ের। লোকটি বলল: এরপর কার? তিনি বললেন: তোমার মায়ের। লোকটি বলল: এরপর কার? তিনি বললেন: তোমার পিতার।” সহিহ বুখারী (৫৯৭১) ও সহিহ মুসলিমে (২৫৪৮)।

ইসলাম সন্তানের উপর মায়ের যে অধিকার নির্ধারণ করেছে এর মধ্যে রয়েছে মায়ের খোরপোষের প্রয়োজন হলে খোরপোষ দেয়া; যদি সন্তান শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান হয়। এ কারণে মুসলমানেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী নারীকে ওল্ড হোমে রেখে আসা, কিংবা ছেলের বাড়ী থেকে বের করে দেয়া, কিংবা মায়ের খরচ দিতে ছেলের অস্বীকৃতি জানানো কিংবা সন্তানেরা থাকতে ভরণপোষণের জন্য নারীকে চাকুরী করা ইত্যাদির সাথে পরিচিত ছিল না।

স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েও ইসলাম নারীকে সম্মানিত করেছে।

ইসলাম স্বামীদেরকে নির্দেশ দিয়েছে স্ত্রীর সাথে ভাল আচরণ করার, জীবন ধারণের ক্ষেত্রে নারীর প্রতি ইহসান করার। ইসলাম জানিয়েছে স্বামীর যেমন অধিকার রয়েছে তেমনি স্ত্রীরও অধিকার রয়েছে; তবে স্বামীর মর্যাদা উপরে। যেহেতু খরচের দায়িত্ব স্বামীর এবং পারিবারিক বিষয়াদির দায়িত্বও স্বামীর। ইসলাম ঘোষণা করেছে, সর্বোত্তম মুসলমান হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর সাথে আচার-আচরণে ভাল। স্ত্রীর অনুমতি ব্যতীত তার সম্পদ গ্রহণ করাকে নিষিদ্ধ করেছে।

আল্লাহ্‌র তায়ালা বলেন:

“তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর” [সূরা নিসা, আয়াত: ১৯] আল্লাহ্‌র বাণী: “আর নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের; আর নারীদের উপর পুরুষদের মর্যাদা রয়েছে। আর আল্লাহ্‌ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা নিসা, আয়াত: ২২৮]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

“তোমরা নারীদের সাথে ভাল ব্যবহার করার ব্যাপারে ওসিয়ত গ্রহণ কর।”[সহিহ বুখারী (৩৩৩১) ও সহিহ মুসলিম (১৪৬৮)]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন:

“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম।”[সুনানে তিরমিযি (৩৮৯৫), সুনানে ইবনে মাজাহ (১৯৭৭), মুহাদ্দিসিনে কেরাম সহিহুত তিরমিযি গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

মেয়ে হিসেবেও ইসলাম নারীকে সম্মানিত করেছে।

ইসলাম মেয়ে সন্তান প্রতিপালন ও শিক্ষা দেয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। মেয়ে সন্তান প্রতিপালনের জন্য মহা প্রতিদান ঘোষণা করেছে।

এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

“যে ব্যক্তি বালেগ হওয়া পর্যন্ত দুইজন মেয়েকে লালন-পালন করবেন সে ও আমি কিয়ামতের দিন এভাবে আসব (তিনি আঙ্গুলসমূহকে একত্রিত করে দেখালেন)”।[সহিহ মুসলিম (২৩১)]

উকবা বিন আমের (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন:

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেন: “যে ব্যক্তির তিনজন মেয়ে রয়েছে। তিনি যদি মেয়েদের ব্যাপারে ধৈর্য্য ধারণ করেন, তাদেরকে সচ্ছলভাবে খাওয়ান ও পরান; এ মেয়েরা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নামের আগুনের মাঝে বাধা হবে।” ইবনে মাজাহ (৩৬৬৯)

ইসলাম নারীকে বোন হিসেবে, ফুফু হিসেবে ও খালা হিসেবেও সম্মানিত করেছেন। ইসলাম সিলাতুর রেহেম বা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে ও এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা— হারাম হওয়ার কথা অনেক দলিল-প্রমাণে এসেছে।

যেমন- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

“হে লোকেরা! তোমরা সালামের প্রচলন কর, মানুষকে খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কর, রাতের বেলা নামায আদায় কর যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাক; তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: আল্লাহ্‌ তাআলা রেহেম বা আত্মীয়তার সম্পর্ক সম্পর্কে বলেন: “যে তোমার সাথে সম্পর্ক রাখবে আমিও তার সাথে সম্পর্ক রাখব। আর যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব।” সহিহ বুখারী (৫৯৮৮)।

অনেক সময় একজন নারীর মধ্যে উল্লেখিত সবগুলো মর্যাদার দিক একত্রিত হতে পারে। একজন নারী হতে পারেন তিনি স্ত্রী, তিনি মেয়ে, তিনি মা, তিনি বোন, তিনি ফুফু, তিনি খালা। তখন তিনি এ সকল দিকের মর্যাদা লাভ করেন।

মোটকথা, ইসলাম নারীর মর্যাদা সমুন্নত করেছে। অনেক বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীকে সমান অধিকার দিয়েছে। পুরুষের ন্যায় নারীও ঈমান আনা ও আল্লাহ্‌র আনুগত্য করার জন্য আদিষ্ট। আখিরাতে প্রতিদান পাওয়ার ক্ষেত্রেও নারী পুরুষের সমান। নারীর রয়েছে- কথা বলার অধিকার: নারী সৎ কাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে ও আল্লাহর দিকে আহ্বান করবে। নারীর রয়েছে মালিকানার অধিকার: নারী ক্রয়-বিক্রয় করবে, পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিক হবে, দান-সদকা করবে, কাউকে উপঢৌকন দিবে। নারীর অনুমতি ছাড়া কারো জন্য তার সম্পদ গ্রহণ করা জায়েয নয়। নারীর রয়েছে সম্মানজনক জীবন যাপনের অধিকার। নারীর উপর অন্যায়, অত্যাচার করা যাবে না। নারীর রয়েছে জ্ঞানার্জনের অধিকার। বরং নারী তার দ্বীন পালন করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন করা ফরয।

কেউ যদি ইসলামে নারীর অধিকারগুলোর সাথে জাহেলী যুগে নারীর অধিকারগুলো তুলনা করে দেখে কিংবা অন্য সভ্যতাগুলোর সাথে তুলনা করে দেখে তাহলে ইসলাম নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়ার ক্ষেত্রে সত্যতা দেখতে পাবে। বরং দৃঢ়তার সাথে বলা যায়, ইসলামে নারীকে যে মহান মর্যাদা দেয়া হয়েছে অন্য কোথাও সে মর্যাদা দেয়া হয়নি।গ্রীক সমাজে, পারসিক সমাজে কিংবা ইহুদি সমাজে নারী কেমন ছিল সেটা উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। খোদ খ্রিস্টান সমাজেও নারীর অবস্থান খুবই খারাপ ছিল। বরং খ্রিস্টান ধর্মগুরুরা ‘ম্যাকন কাউন্সিলে’ সমবেত হয়েছিল এ বিষয়ে গবেষণা করার জন্য: নারী কি শুধু একটি দেহ; নাকি রূহ বিশিষ্ট দেহ?! শেষে তারা অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে আসে যে, নারী হচ্ছে- রূহবিহীন; শুধু ব্যতিক্রম হচ্ছেন মরিয়ম আলাইহিস সালাম। ৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে নারীকে নিয়ে গবেষণার জন্য একটি সেমিনার ডাকা হয়: নারীর কি রূহ আছে, নাকি নেই? যদি নারীর রূহ থাকে সে রূহ কি পশুর রূহ; নাকি মানুষের রূহ? সবশেষে তারা সিদ্ধান্ত দেয় যে, নারী মানুষ! তবে, নারীকে শুধুমাত্র পুরুষের সেবার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

অষ্টম হেনরির শাসনামলে ইংরেজ পার্লামেন্ট একটি আইন পাস করে, সে আইনে নারীর জন্য ‘নিউ টেস্টমেন্ট’ পড়া নিষিদ্ধ করা হয়; কারণ নারী নাপাক। ইংরেজ আইনে ১৮০৫ সাল পর্যন্ত পুরুষের জন্য নিজের স্ত্রীকে বিক্রি করে দেয়া বৈধ ছিল। স্ত্রীর মূল্য নির্ধারণ করা হয় ছয় পেনি। নারীর এ অবস্থার সাথে ইসলামে নারীর মর্যাদাকে কিভাবে তুলনা করা যেতে পারে! যেখানে ইসলাম নারীর সাথে সদ্ব্যবহার করা, তার প্রতি দয়া করা, তাকে সম্মান করা ও তার জন্য খরচ করার নির্দেশ দিয়েছে?

নারীদের নিয়ে পবিত্র কোরআনে বেশ কিছু বিষয় উল্যেখ করা হয়েছে। আলাদা করে একটি সুরাও রয়েছে নারীদের বিষয়ে_সুরাতুন-নিসা নামে। লেখা দীর্ঘ না করে পবিত্র কোরআনের আয়াতের অর্থগুলো এখানে সংযোজন করে দেয়া হল_যাতে করে ইসলাম কতটা গুরুত্ব দিয়ে নারীর অধিকার সম্পর্কে বর্ণনা করেছে তা কিছুটা হলেও যেন বোঝা যায়।

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত নারী সম্পর্কিত কিছু আয়াতসমূহ :

“হে মানব-জাতি! তোমরা ভয় কর তোমাদের রবকে, যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের এক আত্মা থেকে এবং যিনি সৃষ্টি করেছেন তার থেকে তার জোড়া, আর ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের দু’জন থেকে অনেক নর ও নারী।” (আন-নিসা ৪:১)

আল্লাহ তায়ালা পুরুষ এবং নারীকে সমান ভাবে বর্ণনা করেছেন তার প্রতিটি আয়াতে। মানুষ সৃষ্টির রহস্য তে আল্লাহতালা পুরুষ এবং নারী কে সমান চিন্তায় এবং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। নারীকে দিয়েছেন নারীর স্থান এর মর্যাদা এবং পুরুষকে দিয়েছেন তার অবস্থানগত মর্যাদা। যার যার স্থানে উভয়ই সমান ভাবে অধিকার প্রাপ্ত এবং সম্মানিত।

অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন;

“যে ব্যক্তি ভাল কাজ করবে, হোক সে পুরুষ কিংবা নারী, এবং সে ঈমানদার হবে, এরূপ লোক জান্নাতে দাখিল হবে, আর তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার করা হবে না।” (আন-নিসা ৪:১২৪)

এখানে আল্লাহ তায়ালা নেক আমলের ক্ষেত্রে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের জন্য আলাদা কোন কিছু বর্ণনা করেননি বরং উভয়কে সমান দৃষ্টিতে দেখে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ভালো কাজ যে করবে হোক সে নারী কিংবা পুরুষ সমান প্রতিদান পাবে আল্লাহ তায়ালার কাছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্যে থেকে সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ কর এবং সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া।” (আর-রূম ৩০:২১)

নারী পুরুষ পরস্পর পরস্পরকে উভয়ের জন্য পরিপূরক এবং ভালোবাসার সঙ্গী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং আল্লাহ তা’আলার আদেশ অনুযায়ী ইসলামই নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে স্ত্রীর আসনে বসিয়ে। স্ত্রীর অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ সচেতন হতে বলেছে ইসলাম।

অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আমি বিনষ্ট করি না তোমাদের কোন পরিশ্রমকারীর কর্ম, তা সে হোক পুরুষ কিংবা নারী। তোমরা একে অন্যের সমান।” (আল-ইমরান ৩:১৯৫)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ আরও বর্ণনা করেন,

“বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভাল কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে, তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আনুগত্য করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। এদেরই উপর আল্লাহ রহমত বর্ষণ করবেন।” (আত-তওবা ৯:৭১)

স্বামী-স্ত্রীর সাথে পরস্পর সম্পর্কের বর্ণনায় আল্লাহ বলেন,

“তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।” (আল-বাকারা ২:১৮৭)

সৃষ্টি রহস্যে আল্লাহ তায়ালা নারী পুরুষকে সমান মর্যাদায় রেখেছেন উল্ল্যেখ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদেরকে পরিণত করেছি বিভিন্ন জাতিতে ও বিভিন্ন গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক মোত্তাকী।” (আল-হুজরাত ৪৯:১৩)

নেক আমল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে নারী পুরুষ সমানভাবে আল্লাহ তায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য তা বর্ণনা করে বলেন,

“যে ভাল কাজ করে এবং বিশ্বাসী, হোক সে পুরুষ কিংবা নারী, আমি তাকে অবশ্যই দান করব এক পবিত্র শান্তিময় জীবন এবং তারা যা করত তার জন্য তাদেরকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।” (আন-নাহল ১৬:৯৭)

নারী পুরুষের অধিকার বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার প্রাপ্য অংশ।” (আন-নিসা ৪:৩২) “পুরুষদের জন্য অংশ আছে সে সম্পত্তিতে যা পিতা-মাতা ও নিকট-আত্মীয়রা রেখে যায়; এবং নারীদের জন্যও অংশ আছে সে সম্পত্তিতে যা পিতা-মাতা ও নিকট-আত্মীয়রা রেখে যায়, হোক তা অল্প কিংবা বেশী। তা অকাট্য নির্ধারিত অংশ।” (আন-নিসা ৪:৭)

নারীর অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষায় আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে বলেন,

“যারা কোন ভাল নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। এরাই প্রকৃত দুষ্ট ও মিথ্যাবাদী।” (আন-নূর ২৪:৪)

ইসলাম নারীর অধিকার রক্ষায়_খোদ নারীকে রক্ষা করতে পর্দা বিধান দিয়েছে। নারীর অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হতে বলেছে। নারীরা তাদের অধিকার নিশ্চিত করে_নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যে কোন ধরণের কাজ করার অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের প্রচেষ্টা করার এই যুগে কেবলমাত্র যদি নারীর সার্বিক অধিকারের সাথে ক্ষমতায়নের সাথে ইসলামে দেয়া নারীর অধিকারগুলো একত্রিত করে নেয়া যায় তবে নারীরা পাবে একটি সুস্থ সুন্দর উন্নত সমাজ। যেখানে তারা নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচবে। বাঁচবে তাদের অধিকার নিয়ে।

সূত্র : আল কোরআন, হাদিসে নববী, ড. আয়াজ আল করনী আর্টিকেল, তুমি সেই নারী : ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী, উইকিপিডিয়া।

মন্তব্য করুন