রজব মাস: বিশুদ্ধতার মাধ্যমে এ মাসের বরকত অর্জন করি

প্রকাশিত: ৮:০৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ৬, ২০২০

চলছে আরবী বর্ষের রজব মাস। বছরের বার মাসের মধ্যে চারটি মাসকে আল্লাহ তাআলা ‘আশহুরে হুরুম’ তথা সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

•কোরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন:-

إِنَّ عِدَّةَ ٱلشُّهُورِ عِندَ ٱللَّهِ ٱثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِى كِتَٰبِ ٱللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضَ مِنْهَآ أَرْبَعَةٌ حُرُمٌۚ ذَٰلِكَ ٱلدِّينُ ٱلْقَيِّمُۚ فَلَا تَظْلِمُوا۟ فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْۚ وَقَٰتِلُوا۟ ٱلْمُشْرِكِينَ كَآفَّةً كَمَا يُقَٰتِلُونَكُمْ كَآفَّةًۚ وَٱعْلَمُوٓا۟ أَنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلْمُتَّقِينَ

-নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। আর মুশরিকদের সাথে তোমরা যুদ্ধ কর সমবেতভাবে, যেমন তারাও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে সমবেতভাবে। আর মনে রেখো, আল্লাহ মুত্তাকীনদের সাথে রয়েছেন। -সূরা তাওবা- ৩৬

এ মাসগুলোর ফযীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:-

السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ؛ ثَلَاثٌ مُتَوَالِيَاتٌ : ذُو الْقَعْدَةِ، وَذُو الْحِجَّةِ، وَالْمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ “.

-বারো মাসে বছর। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি ধারাবাহিক যথা:- জিলকদ, জিলহজ ও মহররম আর চতুর্থটি হলো রজব যা জুমাদাল উখরা ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী মাস। -সহীহ বুখারী-৪৬৬২

•ইসলাম-পূর্ব রজব মাস:
ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগে রজব মাস পালিত হতো বিভিন্ন রসম-রেওয়াজ, নষ্ট-আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে৷ রজব মাসের সম্মান রক্ষার্থে তারা যুদ্ধবিগ্রহ পর্যন্তও বন্ধ রাখত৷ তাছাড়া গোত্রে গোত্রে চলত এ মাসের মর্যাদা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা৷উদযাপনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল দেবতা বা প্রতিমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করা। যা হাদিসের পরিভাষায় বলা হয় ‘আতীরা’ অর্থাৎ প্রতিমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করা৷

•ইসলাম পরবর্তী রজব মাস:
কিন্তু ইসলাম এসে এসব রসম-রেওয়াজ সমূলে মূলোৎপাটন করেছে৷ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন:-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : ” لَا فَرَعَ وَلَا عَتِيرَةَ “

-ইসলামে ‘ফারা’ (উট বা বকরির প্রথম বাচ্চা প্রতিমার উদ্দেশ্যে) জবাই করার কোন প্রথা নেই এবং ‘আতিরা’ও নেই৷ অর্থাৎ রজব মাসে প্রতিমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করার প্রথাও নেই। -সহীহ বুখারী-৫৪৭৩

•খাজার ডেক:
আজকাল রজব মাসে খাজা মইনুদ্দিন চিশতি রহ. এর মাজারে তার ওফাত উপলক্ষে উরস হয়। সেখানে এমন অনেক পশু জবাই করা হয় যা হযরত খাজা রহ. বা তার মাজারের নামে মান্নত করা হয়ে থাকে। তার মাঝে আর জাহেলি যুগের ‘ফারা’ এবং আতীরার মাঝে তেমন কোন পার্থক্য নেই৷ কারণ,আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কারো নামে মান্নত করা- তা যদি কোন পীর বা বুজুর্গের নামেও হয় তবুও তা শিরক।

আমাদের দেশেও আজ আজমিরী রহ. এর ইন্তেকালকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে -‘খাজার ডেগ’ নামের অপসংস্কৃতি৷এসব ডেগে টাকা দেওয়াও হারাম এবং এসব টাকায় যেসব খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করা হয় তা খাওয়াও হারাম৷তাছাড়া এসব উরসকে কেন্দ্র করে এমন সব অশ্লীলতা,বেহায়াপনা ও বেপর্দার প্রদর্শনী হয় যা স্পষ্টত হারাম। তারপরও যদি উরস এসব কর্মকান্ড থেকে মুক্ত হয় তবুও তা শরীয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।

হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে:-
নবীজী বলেন-
” لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُورًا، وَلَا تَجْعَلُوا قَبْرِي عِيدًا، وَصَلُّوا عَلَيَّ ؛ فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ تَبْلُغُنِي حَيْثُ كُنْتُمْ “.

-তোমরা নিজেদের ঘরকে কবর বানিও না। (কবরের ন্যায় ইবাদত-নামাজ ,তেলাওয়াত ও যিকির বিহীন রেখো না) এবং আমার কবরে উৎসব করো না। (বার্ষিক, মাসিক ও সাপ্তাহিক কোন আসরের আয়োজন করো না) তবে আমার উপর দরুদ পাঠ করো৷ নিশ্চয়ই তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তোমাদের দুরুদ আমার কাছে পৌঁছে থাকে। (আল্লাহ তাআলার ফেরেশতারা পৌছিয়ে দেন। -সুনানে আবু দাউদ-৪০৪২

আল্লামা মুনাভী রহ. এই হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন :-

ويؤخذ منه أن اجتماع العامة في بعض أضرحة الأوليلء في يوم أو في شهر مخصوص من السنة ويقولون هذا يوم مولد الشيخ ويأكلون ويشربون وربما يرقصون فيه منهي عنه شرعا وعلى ولي الشرع ردعهم على ذلك وإنكاره عليهم وإبطاله .

এই হাদীস থেকে বুঝা যায় যে সাধারণ মানুষ যারা বছরের কোন নির্দিষ্ট মাসে বা দিনে (উরসের নামে) ওলী- বুযুর্গের মাযারে একত্র হয় এবং বলে আজ পীর সাহেবের জন্মবার্ষিকী বা (মৃত্যুবার্ষিকী) সেখানে তারা পানাহারের আয়োজন করে এবং নাচ-গানের ব্যবস্থা করে-এসবই শরীয়ত পরিপন্থী ও গর্হিত কাজ ৷প্রশাসনের কর্তব্য এসব কাজ প্রতিরোধ করা। -আওনুল মা’বূদ-২/২২

•রজব মাসে নির্দিষ্ট নামাজ-রোজা:
রজব মাসে খাজার ডেগের প্রথা ছাড়াও আমাদের সমাজে অনেক বিদআতী কাজ চালু রয়েছে যার শরীয়তে শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। যেমন রজব মাসের নির্দিষ্ট নামাজ রোজা বা নির্দিষ্ট কোন ইবাদত ইত্যাদি।

একটি বিষয় খুব ভালোভাবে মনে রাখতে হবে যে ,কোন দিন বা রাতের বিশেষ ফজিলত প্রমাণিত হওয়ায় এটা জরুরী নয় যে সে সময়ের কোনো বিশেষ ইবাদত থাকবে থাকতে হবে বরং কোনো বিশেষ ইবাদতকে সুন্নত বা মুস্তাহাব বলতে হলে স্বতন্ত্র দলীল থাকা জরুরী৷ কেবল ফযিলত প্রমাণিত থাকাই যথেষ্ট নয়। যেমন:-জুমার রাতের কত ফযিলত কিন্তু সেই রাতের নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত নেই তাই হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে:-

لَا تَخْتَصُّوا لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ بِقِيَامٍ مِنْ بَيْنِ اللَّيَالِي، وَلَا تَخُصُّوا يَوْمَ الْجُمُعَةِ بِصِيَامٍ مِنْ بَيْنِ الْأَيَّامِ، إِلَّا أَنْ يَكُونَ فِي صَوْمٍ يَصُومُهُ أَحَدُكُمْ “.

-তোমরা( সপ্তাহের) অন্যান্য রাত ব্যতীত শুধু জুমার রাতকে নামাজের জন্য নির্দিষ্ট করো না এবং অন্যান্য দিন ব্যতীত শুধু জুমার দিনে রোজা রেখো না। তবে হ্যাঁ যদি তা অভ্যাসের তারিখ হয়ে থাকে৷। সহীহ মুসলিম-১১৪৪

রজব মাসের নির্দিষ্ট রোজা প্রসঙ্গে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে..

عُثْمَانُ بْنُ حَكِيمٍ الْأَنْصَارِيُّ ، قَالَ : سَأَلْتُ سَعِيدَ بْنَ جُبَيْرٍ عَنْ صَوْمِ رَجَبٍ، وَنَحْنُ يَوْمَئِذٍ فِي رَجَبٍ، فَقَالَ : سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا يَقُولُ : كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ حَتَّى نَقُولَ لَا يُفْطِرُ، وَيُفْطِرُ حَتَّى نَقُولَ لَا يَصُومُ.

উসমান ইবনে হাকিম রহ. প্রসিদ্ধ তাবেয়ী হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের কে রজবের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন:-
আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস কে বলতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম যখন রোজা রাখা শুরু করতেন তখন এত বেশি রোজা রাখতেন যে আমরা ভাবতাম তিনি আর রোজা ছাড়বেন না। আর যখন রোজা ছাড়া শুরু করতেন তখন পূণরায় রোজা রাখবেন বলে মনে হতো না। -সহীহ মুসলিম-১১৫৭

এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি তার প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাগ্রন্থ আল মিনহাজ বলেন:-

أن مراد سعيد بن جبير بهذا الاستدلال أنه لا نهي عنه ، ولا ندب فيه لعينه ، بل له حكم باقي الشهور ، ولم يثبت في صوم رجب نهي ولا ندب لعينه ، ولكن أصل الصوم مندوب إليه ،

-সাঈদ ইবনে জুবায়ের এর উদ্দেশ্য হলো৷ রজব মাসের নফল রোজার ব্যাপারে স্বতন্ত্র কোনো বিধান নেই৷ বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম সকল মাসেই নফল রোজা রাখতেন। তাই রজব মাসেও নফল রোজা রাখার ধারা অব্যাহত রাখতেন। সুতরাং আমাদের জন্য অন্যান্য মাসের নেই রজব মাসেও নফল রোজা রাখা উচিত। আল মিনহাজ খণ্ড-৮,পৃষ্ঠা-৫৭

এ প্রসঙ্গে সুনানে আবু দাউদ হাদীস বর্ণিত হয়েছে:-

صُمْ مِنَ الْحُرُمِ وَاتْرُكْ، صُمْ مِنَ الْحُرُمِ وَاتْرُكْ، صُمْ مِنَ الْحُرُمِ وَاتْرُكْ

-সম্মানিত চার মাসে মাঝেমধ্যে নফল রোজা রাখো। সুনানে আবু দাউদ-২৪২৮

ফযীলতপূর্ণ এই মাসে আমরা কি আমল করব?

শরীয়তের পক্ষ থেকে এ মাসের বিশেষ কোন নামাজ রোজা বা বিশেষ পদ্ধতির কোন আমলের হুকুম দেওয়া হয়নি।

তাই বাজারের অনির্ভরযোগ্য চটি বই-পুস্তকে রজব মাস উপলক্ষে বিশেষ নামাজ ও রোজার যেসব কথা পাওয়া যায় তা সবই ভিত্তিহীন, বানোয়াট বা বর্ণনা সূত্রের দিক থেকে এত অধিক দুর্বল যে তা দ্বারা কোন বিধান প্রমাণিত হয় না। তাই এই ধরনের মনগড়া আমল দ্বারা এই মাসের ফযীলত লাভ করা সম্ভব নয়।

বরং রজব মাসের বরকত ও ফযীলত হাসিল করার জন্য অন্যান্য মাসে পালনীয় ফরজ ইবাদত গুলো যথাযথভাবে পালন করা। পাশাপাশি নফল নামাজ,রোজা ও কোরআন তেলাওয়াতে যত্নবান হওয়া। সবধরণের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা৷ তাহলেই ফযীলতপূর্ণ এই মাসের বরকত আমরা সহজেই অর্জন করতে পারব। ইনশাআল্লাহ।

বিশেষভাবে এ মাসের বরকত পাওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে বেশী বেশী দোয়া করা। মুসনাদে আহমদে বিখ্যাত সাহাবী আনাস বিন মালিক থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন-

যখন মাহে রজবের শুরু হতো তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এই দোয়াটি পড়তেন।

كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ رَجَبٌ قَالَ : ” اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ وَشَعْبَانَ، وَبَارِكْ لَنَا فِي رَمَضَانَ “

-হে আল্লাহ !তুমি আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দাও এবং আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দাও। -মুসনাদে আহমদ-২৩৪৬

হাদীসটির সনদ যদিও দুর্বল কিন্তু দোয়াটির অর্থ অনেক সুন্দর। তাই নিয়মিত এই দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করা।

তাই আসুন রজব মাস কেন্দ্রিক সমাজে প্রচলিত বেদাত রসম-রেওয়াজ পরিহার করে বিশুদ্ধতার মাধ্যমে এই মাসের বরকত অর্জনে সচেষ্ট হই।

মাওলানা ইবরাহীম সুলতান
বিভাগীয় প্রধান, উলূমুল হাদীস বিভাগ
জহুরা কামাল ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাড্ডা, ঢাকা

মন্তব্য করুন