জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: ইতিহাস ও বঞ্চনার এক মূর্ত সাক্ষী

প্রকাশিত: ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৬, ২০২০
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : ফাইল ছবি

ফয়সাল আরেফিন
জবি সংবাদদাতা

একটি সাধারণ পাঠশালা থেকে দেশের প্রথমসারির বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠার এক নাটকীয় গল্পের সাক্ষী দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম আদর্শ বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। জবি’র এই গল্পটা আদতে সিনেমার গল্পের মতোই, এ গল্পের প্রেক্ষাপট কখনো স্থবির থাকেনি। কখনো গল্পের নায়ক ‘জগন্নাথ’ এর জীবন গিয়েছে নায়িকা শাবানার মতো অন্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে নিজের সবকিছু উজাড় করে দিতে, আবার কখনো ওমর সানির মতো থেকেও না থাকার মতো।

গল্পের শুরুটা জগন্নাথ রায় চৌধুরী ১৮৬৮ সালে তৈরি করে গেলেও এই গল্পটা আজও লিখে যাচ্ছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অগণিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থী।

নানা প্রতিবন্ধকতার পরও বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য ও একাডেমিক শৃঙ্খলা এখন নতুন সৃষ্টি হওয়া যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রোল মডেল।

ক্ষুদ্র পাঠশালা থেকে স্কুল, স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে আবারও স্কুলে অবনমন, এরপর আবারো কলেজ এবং তা থেকে বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়া ইতিহাস শুধু এদেশেই আছে তা নয় বরং পৃথিবীর জন্যেও এ এক বিরল ঘটনা। সময়ের বিবর্তনে মাত্র সাড়ে ৭ একরের ছোট্ট একটি ক্যাম্পাসে ২০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ক্যাম্পাসে রুপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

পূর্ববঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সমসাময়িক অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই এত অল্প সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চ আসনে বসতে পারেনি।

একঝাঁক তরুণ মেধাবী শিক্ষক ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সঞ্চিত গবেষণা ও অভিজ্ঞতার ঝুড়ি সমৃদ্ধ শতাধিক পিএইচডি ডিগ্রি ধারী অধ্যাপকের পদভারে মুখরিত এই বিদ্যাপীঠ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উচ্চশিক্ষায় আগ্রহীদের প্রথম দিকের পছন্দের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। তাই প্রতিবছরই বাড়ছে ভর্তি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা। প্রতিযোগিতার শতকরা হারে গত কয়েক বছর ধরে যা হার মানাচ্ছে দেশের অন্যসব নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কেও।

বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সময় টা তেমন বড় না হলেও এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বয়স দেড়শো বছরেরও অধিক। আগেই বলা হয়েছে এর ভিত্তি গড়ে দেন মানিকগঞ্জের বালিয়াটি অঞ্চলের জমিদার জগন্নাথ রায় চৌধুরী ১৮৬৮ সালে পুরান ঢাকায় কলেজিয়েট স্কুল ও পোগোজ স্কুলের পাশেই স্বল্প পরিসরে শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন `জগন্নাথ পাঠশালা’, সেই থেকেই পথচলা শুরু।

তবে পাঠশালা থেকে দুই বছরের মাথায় ‘জগন্নাথ স্কুল’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। মাঝে কিছুদিনের জন্য রাখা হয়েছিল ব্রাহ্ম স্কুল। পুনরায় ১৮৭৮ সালে জগন্নাথ স্কুল, ১৮৮৪ সালে জগন্নাথ কলেজ, ১৯২১ সালে জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ, ১৯৬৮ সালে সরকারি জগন্নাথ কলেজ, সর্বশেষ ২০০৫ সালে নতুন নাম হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

১৮৮৪ সালে কলেজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর ১৯১০ সালে ঢাকার কমিশনার স্যার রবার্ট নাথন কলেজটিকে নগদ ৮০ হাজার টাকা অর্থ সাহায্য দেন। আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকন খ্যাত মূল প্রশাসনিক ভবনটি ঐ টাকায়ই নির্মিত। ১৯২০ সালে ভারতীয় লেজিসলেটিভ কাউন্সিল আইন পাসের মাধ্যমে ‘জগন্নাথ কলেজ – আইন’ নথিভুক্ত হবার ৪৮ বছর পর জগন্নাথ কলেজ সরকারি কলেজে রুপান্তরিত হয়।

সরকারি কলেজ হবার দরুন দিনে দিনে কলেজে ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে, এরই সাথে দেখা দিতে থাকে আবাসন সংকট। কর্তৃপক্ষ আবাসন সমস্যা সমাধানে পুরনো ভবন ক্রয় এবং ততকালীন ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছ থেকে বিভিন্ন স্থানে জমি লিজ নিয়ে ছাত্রদের জন্য হল তৈরি করে। ১৯৮৩ সালের মধ্যে মোট ১৫টি হল তৈরি করে মোটামুটি আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। এসময় শুধু পূর্ববঙ্গ নয়, সমগ্র ভারতবর্ষে সবচেয়ে বড় আবাসিক সুবিধাসংবলিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল জগন্নাথ কলেজ।

দেশের অন্যতম শীর্ষে অবস্থান করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠার পেছনেও ছিল জগন্নাথ কলেজের অগ্রণী ভূমিকা। ১৯২১ সালে ঢাবি প্রতিষ্ঠার পর জগন্নাথ কলেজের অধিকাংশ শিক্ষক চলে যান নবগঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

জগন্নাথ কলেজ গ্রন্থাগারের প্রায় ৫০ শতাংশ দুর্লভ ‍ও মূল্যবান বই দিয়ে দেওয়া হয় ঢাবি গ্রন্থাগারে। সবচেয়ে মজার বিষয়, নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ছিল জগন্নাথ ও ঢাকা কলেজের। মূলত এ দুই কলেজের অনার্সের শিক্ষার্থীদের দিয়ে প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয়েছিল বহুল প্রতীক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা যে যে বর্ষে পড়ত তারা একই বর্ষে ঢাবির শিক্ষার্থী হয়ে যায়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এগিয়ে যাচ্ছে জ্যামিতিক হারে। ঈর্ষনীয় আবাসন ব্যবস্থা সহ্য হয়নি পুরান ঢাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের। শুরু হয় জগন্নাথ কলেজের হল দখলের পাঁয়তারা। ছাত্রদের সাথে এলাকাবাসীর সংঘর্ষ বাধে বারবার।

প্রথমে বেদখল হয়ে যায় কুমারটুলি ছাত্রাবাস। এরপর একের পর এক বেদখল হয় ৮৪ জিএল পার্থ লেন, কুমারটুলিতে (ওয়াইজঘাট ষ্টার সিনেমা হলের পিছনে) অবস্থিত হলগুলো। ১৯৯২ সালে ১৪টি হলের মাত্র ৩টি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে। বাকিগুলো পুলিশ ও এলাকাবাসীরা দখল করে নেয়। ৩টি হলের দুটি (মাহমুদা স্মৃতি ভবন ও এরশাদ হল) বর্তমানে ভেঙ্গে মসজিদ ও কলা অনুষদ করা হয়েছে।

বর্তমানে জগন্নাথের হল দখল প্রক্রিয়ায় সব থেকে এগিয়ে আছেন এমপি হাজী সেলিম।

জবিকে এখন অনাবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের লজ্জা বহন করতে হয়। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে কিছু দিন পর পর হলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামতে হয়। যে একমাত্র হল বর্তমানে তৈরি করা হচ্ছে, সেই শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল তৈরিতেও চার দফা সময় পেছানো হয়েছে। যদিও সরকারি প্রজেক্টে দুইবারের বেশি মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ নেই।

শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা ও বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন এবং সংগ্রামের বিজয়ে শামিল হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-তে সামরিক সরকারের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ’৬৬-এর ছয়দফা দাবি, ’৬৮-এর এগারো দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একাট্টা হয়ে জগন্নাথের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বরাবরের মতোই ছিলো উল্লেখ করার মতো। ১৯৪৮ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সংশোধনী প্রস্তাব বাতিল হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রদের মিছিলের মাধ্যমে ঢাকায় প্রথম প্রতিক্রিয়া শুরু হয় ২৬ শে ফেব্রুয়ারি। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ঢাকা শহরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে।

ভাষা আন্দোলনের সময় জগন্নাথ ও মেডিক্যাল কলেজে আলাদা করে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে ফেব্রুয়ারি মাসেই বিশিষ্ট লেখক ও জগন্নাথের সাবেক শিক্ষার্থী অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন যার নাম ছিলো ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’।

মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এই আন্দোলনে সর্বপ্রথম শহীদ হন জগন্নাথের ছাত্র রফিক উদ্দিন আহমদ। তখন তিনি হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ১৯৫২ সালে জগন্নাথ ছাত্র সংসদের (জকসু) তৎকালীন জিএস শফিউদ্দিন আহমদকে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার মূল্য হিসেবে কারাবরণ করতে হয়। ভাষা সৈনিক অজিত কুমার গুহ’কে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের একজন বলিষ্ঠ সংগঠক হওয়ায় গ্রেপ্তার করা হয়। জাতীয় অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দীন আহমেদসহ অন্যান্য শিক্ষকরা এখান থেকেই ছাত্রদের ভাষা আন্দোলনে উৎসাহিত করতেন। জগন্নাথের সাবেক শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা এম. আমিরুল ইসলাম ১৯৫২ সালে চলমান ভাষা আন্দোলন ও পাকিস্থান গণপরিষদে লিয়াকত আলী খানের প্রস্তাবিত ‘Basic Principle Report’ এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও ভাষা আন্দোলনে জগন্নাথের অবদানের প্রমাণ পাওয়ায় যায়। বঙ্গবন্ধুর লিখেছেন, ‘১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চকে ‘বাংলাভাষা দাবি’দিবস ঘোষণা করা হলো। সামান্য কিছুসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাড়া শতকরা ৯০ ভাগ ছাত্র এই আন্দোলনে যোগদান করলো। জগন্নাথ কলেজ, মিডফোর্ড মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বিশেষ করে সক্রিয় অংশগ্রহণ করলো’।

সাবেক এমপি মরহুম আবদুর রব, মৃণাল বারড়ি ও খলিলুর রহমানের মতো জগন্নাথের নাম নাজানা অসংখ্য শিক্ষকও শিক্ষার্থী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জগন্নাথ কলেজে পাকিস্তানী হানাদাররা হামলা চালায়। ছাত্ররা অনেকে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে এবং মুক্তির সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। জগন্নাথ কলেজে হানাদারদের ক্যাম্প করা হয়। যুদ্ধ শেষে এখানে গণকবরের সন্ধান মেলে উদ্ধার করা হয় কয়েক ট্রাক ভর্তি কঙ্কাল।

বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষিত হলে তার সমর্থনে সফল হরতাল পালনে ভূমিকা পালন করে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান কাজী আরেফ আহমেদ ও চিত্র নায়ক ফারুক।

১৭ জানুয়ারি ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হলে জগন্নাথ ছাত্র সংসদের উদ্যোগেই প্রথম প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সর্বশেষ মহান মুক্তিযুদ্ধের ফলাফল হিসেবেই মূলত বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ২৫ মার্চ ১৯৭১, পাক বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট মিশনের প্রথম দিকে হামলা চালানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। শুরু হয় গণহত্যা। জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা হল থেকে বের হয়ে পুরান ঢাকার রাজপথে প্রতিবাদ শুরু করে। পুরান ঢাকা নিজেদের দখলে নিতে ক্যাম্পাসে তৈরি হয় হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প। প্রতিদিন পুরান ঢাকার মুক্তিকামী মানুষদের ধরে এনে হত্যা করার পর গণকবর দেওয়া হয় এই ক্যাম্পাসে। যুদ্ধের পর বেশ ক’টি জাতীয় দৈনিকে জগন্নাথে পাক বাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার ওপর প্রতিবেদন ছাপানো হয়। প্রতিবেদনে ভয়াবহ নারী নির্যাতন ও বিপুল সংখ্যক লোকের কঙ্কাল পাওয়ার খবর প্রকাশ পায়। মুক্তিযুদ্ধে জগন্নাথের বহু ছাত্র ও শিক্ষক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, গনসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া (বীরবিক্রম) ও গণিত বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. আবুল কালাম আজাদ। বিজয় লাভের পূর্ব মুহূর্তে আবুল কালাম আজাদকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় যার সন্ধান আজও মেলেনি। মুক্তিযুদ্ধে এই প্রতিষ্ঠানের অগণিত ছাত্র পাক হানাদারদের নৃশংসতায় শহীদ হন।

স্বাধীনতাকামী বাঙালির ওপর সংঘটিত অবর্ননীয় নির্যাতন এবং গণহত্যার চিত্র তুলে ধরে শহীদদের স্মরণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ২০০৮ সালের ৩১শে মার্চ নির্মাণ করা হয় “মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও একাত্তরের গণহত্যা ভাস্কর্য”। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত যা দেশের একমাত্র গুচ্ছ ভাস্কর্য।

ক্রীড়াক্ষেত্রেও একসময় খ্যাতি ছিলো এই বিদ্যাপীঠের। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয়, আন্তঃকলেজে ধারাবাহিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন ছাড়াও শিক্ষার্থীরা জয় করেছিল রোনাল্ডসে শিল্ড, স্যার এএফ রহমান শিল্ড, ফিরোজ নূন কাপ প্রভৃতি। এই বিদ্যাপীঠেরই শিক্ষার্থী ব্রজেন দাস ৬ বার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে গড়েছেন বিশ্ব রেকর্ড। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই জানে না ক্রীড়ায় তাদের এই গৌরবের কথা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াজগৎ আজ অনেকটাই মলিন। ক্রীড়াচর্চার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় বড় পর্যায়ে সাফল্য দেখাতে পারছেনা জবিয়ানরা। সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধু – বিপিএল এ দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখানো শহিদুল ইসলাম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধূলা-ইটভাটা সমৃদ্ধ ধূপখোলা মাঠে খেলেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নাম করেছেন। আবার ২০১৯ এসএ গেমস এ বাংলাদেশের হয়ে প্রথম স্বর্ণপদক জয়ী মারজান আকতার প্রিয়া এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানেরই শিক্ষার্থী।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব করার মতো অনেক আলোকিত নক্ষত্র আছে তবে তাদের মাঝে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা হলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, ভাষা শহীদ রফিক, মৈয়মনসিংহ গীতিকার লেখক দীনেশচন্দ্র সেন, প্রখ্যাত আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বিশারদ এবং শিক্ষাবিদ যোগেশচন্দ্র ঘোষ, কথা শিল্পী ও চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান, শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান, ব্রিটিশবিরোধী নৌ বিদ্রোহের শহীদ মানকুমার বসু ঠাকুর, ভাষা আন্দোলনের নেতা ও রাজনীতিবিদ শওকত আলী, ইংলিশ চ্যানেল পাঁড়ি দেয়া সাঁতারু ব্রজেনদাস, বাঙালি কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, লেখক ও দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমাদাদুল হক মিলন, সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী রাজিউদ্দীন আহমেদ রাজু, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাইদ খোকন, অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত, লেখক কাজী মোতাহার হোসেন, সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এ.আর.ইউসুফ, সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক, প্রখ্যাত অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান, যাদুকর জুয়েল আইচ, অভিনেতা প্রবীর মিত্র, অভিনেতা মীর সাব্বির, মুক্তিযোদ্ধা ও বিখ্যাত শিল্পী ফকির আলমগীর, বীর বিক্রম আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, বীর প্রতীক এম হামিদুল্লাহ খান, বীর বিক্রম মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনি, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা প্রধান কাজী আরেফ আহমেদ। এই বিদ্যাপীঠের আরও একজন ছাত্র বর্তমান বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও ছিলেন ছাত্ররাজনীতিতে এক পরিচিত নাম।

আবাসন ও যানবাহন সমস্যায় জর্জরিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনোবল, সাহস ও পরিশ্রমী মানসিকতা অবাক করে অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের। ব্যয়বহুল ঢাকা শহরের নানা মেস-বাসা-বাড়িতে কষ্টে দিন পার করা সত্ত্বেও তারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে সর্বদা মাতিয়ে রাখে।

শুধু আন্দোলন আর সংগ্রামেই থেমে নেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। নানা সংকটময় এই পথচলায় জবি দেখিয়ে যাচ্ছে তার সামর্থ্য। হলবিহীন দেশের একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নানা অপ্রাপ্তির দ্বারে দাঁড়িয়েও বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা একের পর এক সাফল্য দেখিয়েছেন। বিসিএস সহ অন্যসকল চাকুরী পরীক্ষার ফলাফলেও প্রায়ই সাফল্যের শিরোনাম হচ্ছে জবি।

এছাড়া অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক ক্যারিয়ারেও ঈর্ষনীয় ফলাফল করছেন জবির শিক্ষার্থীরা। অনেক আগেই ইউজিসির প্রতিবেদনে এ-গ্রেড ভুক্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি।

ভর্তি পরীক্ষাতে গোপন বার-কোড পদ্ধতি চালু করার মাধমে জালিয়াতি রোধে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহন করে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও নতুন ফলপ্রসূ রাস্তা দেখিয়েছে প্রশাসন। বাংলাদেশের জন্ম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালইয়ের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই ইতিহাস কখনোই ভুলবেনা লাল সবুজের বাংলাদেশ। তবেই সার্থকতা লাভ করবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএস

মন্তব্য করুন