হিজড়াদের মাঝে দ্বীনের মেহনত : প্রশংসায় ভাসছেন একদল তরুণ আলেম

হিজরাদেরকে কুরআনের দাওয়াত

প্রকাশিত: ২:৫৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২, ২০২০

হিজড়া তথা তৃতীয় লিঙ্গের লোকদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার কাজ করে প্রশংসিত হচ্ছেন একদল তরুণ আলেম। যারা নিজেদের নাম পরিচয় গোপন রেখে বেশ গোছালোভাবে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে হিজড়াদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন এবং তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন।

যারা এই কাজ করে যাচ্ছেন তারা সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গনে প্রশংসায় ভাসছেন। এমন ব্যতিক্রমধর্মী কাজ করে তারা প্রশংসিত হচ্ছেন সবার কাছে।

হিজড়াদের মধ্যে দীনের কাজ করা নিয়ে তরুণ আলেম, লেখক ও সংকলক এহসান সিরাজ লিখেছেন,

ফতোয়া ও গালি দেওয়ার আগে ভাবুন! হিজড়াদের জন্য আমি-আপনি কী করেছি? ‘ক্বুল হুওয়াআল্লাহু আহাদ’ [বল, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়]

সিঁড়ি বেয়ে যখন সাত তলার করিডোরে দাঁড়াই, ভেতর থেকে সম্মিলিত কণ্ঠে কুরআন মশকের আওয়াজ ভেসে আসছিল! কলিং বেল টিপতেই মাথায় ঘোমটা দিতে দিতে সালাম দিয়ে একজন এসে দরজা খুলে দিল।

ভেতরে ঢুকে দেখলাম অবাক করা বিষয়, হোওয়াইড বোর্ডে লিখে একজন পড়াচ্ছেন বাকিরা সমস্বরে পড়ছেন। এমন দৃশ্য কখনো কল্পনা করা যায়? যারা পড়ছেন তারা সবাই হিজড়া!
ঢুকতেই বসার জন্য জায়গা করে দিলেন। বসতে বসতে দেখলাম, কাপড়ের ফাঁকে একজনের পেট দেখা যাচ্ছে, আরেকজন তা ঢাকতে কাপড় টেনে নিচে নামিয়ে দিলো। যার কাপড়টা নিচে নামানো হলো সেও একটু লজ্জা পেল!

দৃশ্যটা আসলে সামনে থেকে না দেখলে কল্পনাও করা যায় না, অবাক বিস্ময়! যারা মানুষের সামনে নিচের কাপড় পর্যন্ত খুলতে কার্পণ্য করে না, সেই তারাই পেট ঢাকতে কাপড় ঝুলিয়ে দেয়!
তাদের সঙ্গে কথা বলে যা জানলাম।

এক. খুব কষ্ট নিয়ে তাদের একজন অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন, ‘আমার বাবার মৃত্যুর পর দোয়া করানোর জন্য কোনো আলেম/মাওলানা খুঁজে পাইনি। কয়েকজনের কাছে গেলাম, হিজড়া বলে তাদের কেউ এলেন না! নিজের পরিচয় গোপন করে পরিচিত একজনকে দিয়ে, বাসায় কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্র এনে কোরআন তেলাওয়াত এবং দোয়া করিয়েছি। আর আমরা দূর থেকে সে দোয়ায় অংশ নিয়েছি। সামনে যাইনি, যদি তারাও চলে যায়!

দুই. তাদের দলের কেউ মারা গেলে তার গোসল বা জানাযায় কোনো হুজুর বা আলেম আসেন না। দলের দু’তিনজন হাজি আছেন, তারাই হিজড়াদের গোসল, জানাযা থেকে করব পর্যন্ত নিয়ে যায়!

তিন. আলেমদের অযত্ন-অবহেলার কারণে তাদেরই একজন বাপ মারা যাওয়া এক ছেলেকে নিজ খরচে হাফেজী মাদরাসায় পড়াচ্ছেন! উদ্দেশ্য, এ ছেলে যদি তাদে দ্বীনি কাজের দায়িত্ব নেয় তাহলেই তারা ধন্য।

মূল ঘটনা : গত ২৭-২৮ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি সমাজ থেকে অবহেলিত ও বিচ্ছিন্ন, তৃতীয় লিঙ্গ বলে পরিচিত হিজড়া ভাই-বোনদের মাঝে কিছু ভাইদের সহযোগিতায় দ্বীনি কাজ করার সুযোগ হয়েছে। [আমি শেষদিন অংশ নিয়েছি]

তাদের মধ্যে যেটা পাওয়া গেল, অধিকাংশই পড়ালেখার সুযোগ পায়নি। কালেমা,নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত জানে এমন সংখ্যা একেবারেই কম! আলহামদুলিল্লাহ, তাদের উৎসাহ ও আগ্রহ ছিল ব্যাপক। তিনদিনে অনেকেই কালিমা দু’তিনটি সুরা এবং জরুরী মাসআলা রপ্ত করেছে। প্রশিক্ষণ শেষে একটা পরীক্ষা নিয়ে তাদের মাঝে কিছু পুরস্কারও দেয়া হয়েছে। কোরআনে শরিফ, আহকামে জিন্দেগী, আত্মার পরিচর্যা, কেমন ছিল নবীজির আচরণ, নূরানী কুরআন শিক্ষা, মিসওয়াক ইত্যাদি।

তারা দল বেঁধে থাকে এবং দলীয় প্রধানকে খুব মানে। তাদের অনূভুতি হলো, আমাদের মাঝে এতো ওলামায়ে কেরাম স্বেচ্ছায় এসেছেন। আমরা ইনশাআল্লাহ, আপনাদের নিয়ামত হিসেবে মূল্যায়ন করবো এবং আমাদের সমস্ত জায়গায় আপনাদের নিয়ে যাবো।

শুরুটা যেভাবে :

কিভাবে এই কাজের শুরু হয়েছে এবং তারা কেন এই ব্যাতিক্রমধর্মী কাজের উদ্যোগ নিলেন সে বিষয়ে লিখেছেন তরুণ আলেম মাওলানা হাবিবুর রহমান।

হিজড়াদের মাঝে ঈমানের আলো ছড়িয়ে দিন, অনাদর অবহেলা নয়; সহমর্মিতার হাত প্রসারিত করুন। রাস্তাঘাটে হিজড়াদের বিড়ম্বনার শিকার হয়নি এমন মানুষেরর সংখ্যা নিতান্তই কম। অনেকে ফেসবুকে প্রতিবাদী পোস্ট দেয়। আমারও খুব ইচ্ছা একদিন কোন হিজড়াকে ধোলাই দেব।

সমাধানের চেষ্টা না করে সমস্যার আলোচনা করে কি লাভ? এ সমস্যার সমাধান কীভাবে হতে পারে, সেই চিন্তা ছমাস আগে মাথায় আসে। প্ল্যানিং আসা মাত্রই দেরী না করে কাজ শুরু।

প্রথমে সিদ্ধান্ত হল, তাদের মাঝে দ্বীনি বিষয়ে কাউন্সিলিং করবো। যদি ঈমানের আলো ছড়ানো যায় আশা করা যায়, আচরণে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসবে। সেখান থেকেই কাজ শুরু।

প্রাথমিক কাজ হিসাবে তাদের সম্পর্কে জানাশোনা বাড়ানোর চেষ্টা। কীভাবে জানা যায় সেই সন্ধান শুরু হলো। তাদের সম্পর্কে জানার জন্য মাসিক আল কাউসারের মার্চ ২০১৫ সংখ্যা সংগ্রহ করে, হিজড়া সম্পর্কিত লেখা পুনরায় পাঠ করলাম। ইন্টারনেট থেকেও তাদের সম্পর্কে আরো কিছু জানার চেষ্টা করা হলো।

এবার শুরু হলো মাঠ পর্যায়ের কাজ। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, রাস্তায় ঘুরে ঘুরে অনেকবার তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও সাহস হলো না। বারবার সাহস নিয়ে সামনে গেলেও কীভাবে কথা শুরু করা যায় সেই কৌশল পেলাম না। ফিরে আসতে হলো।

এবার কৌশল পরিবর্তন ছোট্ট একটি কাগজে লেখা হলো “হিজড়াদের জন্য পবিত্র কোরআন শিক্ষা” সঙ্গে ফোন নাম্বার। এরকম ছোট কাগজ দশ টাকার একটি নোটের সাথে ভাজ করে মানিব্যাগে রাখা হলো। আরো কিছু কাগজ কয়েকজনকে দেয়া হলো। যখনই হিজড়াদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে তখনই ১০ টাকাসহ একটি কাগজ দেয়া হবে। এরকম কাগজ বিতরন চলছে। হঠাৎ একদিন এক হিজড়ার ফোন থেকে কল আসে। সে কোরআন শিখতে আগ্রহী।

তার সঙ্গে দীর্ঘ কথা হলো। তাদের জীবনাচার সম্পর্কে, তাদের দ্বীন-ধর্ম সম্পর্কে আলোচনা হলো। একটা বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তার চোখ থেকে পানি ঝরলো। সে বলল, ভাই আমাদের পরিচিত একজন হিজড়া গত কয়দিন আগে মারা গেছে। তার কাফন-দাফন করার মতো কেউ এগিয়ে আসেনি। এমনকি তার পরিবারকে খবর দেয়া হলে তারাও লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তার আকুতি! হুজুর, আমাদের কি জানাজা হবে না? মৃত্যুর পর আমাদের অবস্থা কী হবে? হুজুর আপনি কি আমাদেরকে সত্যিই কোরআন শিখাবেন? বললাম, অবশ্যই শিখাবো। আপনারা তিন-চারজন একত্রিত হবেন। আমরা অবশ্যই শিখাবো।

এই আলোচনাগুলো আরো কয়েকজনের সাথে শেয়ার করলাম। একজন বলল, আমার পরিচিত একজন হিজড়া সর্দার আছে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করো। তার সাথে যোগাযোগ করে প্রায় ১৫ জনকে নিয়ে বসা হলো। বসার পরে তাদের আলাপন এবং আপ্যায়ন ছিল আমাদের জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা। বাহির ভিতর সম্পুর্ণ বিপরিত আচরন। মজলিসে কিছু দ্বীনি আলোচনা হলো, অনেকের চোখে পানি আসলো।

একজন বলেই ফেলল, আমি এই এলাকায় পনের বছর যাবত থাকি। আমাকে কেউ কোনদিন নামাজের কথা বলেনি। অন্য একজন অভিযোগ করল, আমরা তো নামাজ পড়তে পারি না, কেউ শিখায় না। মসজিদে গেলে লোকজন ঢুকতে দেয় না, তাড়িয়ে দেয়, বাজে কথা বলে। একজন বলল, আমাদের এভাবে রাস্তাঘাটে টাকা কালেকশন করতে ভালো লাগে না। কিন্তু কী করব? কাজও তো কেউ দেয় না। চায়ের দোকানে বসলে অন্য কেউ সেই দোকানে বসে না। আমাদের সঙ্গে কেউ কথা বলে না। আমাদের কোন আপনজন নেই। আরো অনেক আক্ষেপের কথা।

সেই মজলিস থেকে ফিরে এসে কীভাবে মেহনত বাড়ানো যায় সেই চেষ্টা চলতে থাকলো। পরে অন্য স্থানে আরো কিছু হিজড়ার সাথে বসা হলো। সেখান থেকেও একই রকম কথা, তাদেরকে কেউ কাছে টানে না। কে তাদের দ্বীন শিখাবে? একজন বলেই ফেলল আমি যে আমার প্রয়োজনীয় মাসআলা কোন হুজুরের কাছ জানবো, কথা বলতে গেলেই তো সে ভয় পাবে। এই জন্য আমরা যখন পারি চুপিচুপি ঘরের মধ্যে কিছু নামাজ পড়ার চেষ্টা করি অথবা মাঝেমধ্যে ছদ্মবেশে মসজিদে যাই।

তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হলো। আমরা আপনাদেরকে দ্বীন শিখাবো। প্রাথমিক ভাবে আপনারা তিনদিন একত্র হবেন। আমরা আপনাদের এই তিন দিনের মধ্যে কিছুটা হলেও নামাজ জরুরতে দ্বীন সম্পর্কে কিছু শিক্ষা দিবো। এরপর আস্তে আস্তে আমরা এই কার্যক্রম বাড়াবো।

এরপর ২৭, ২৮, ২৯ ফেব্রুয়ারী হিজড়াদের নিয়ে কুরআনের আসর বসানো হয়েছে এবং তাদেরকে কুরআন শিক্ষার প্রাথমিক কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। এবং এটা ধারাবাহিকভাবে চলমান থাকবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।

মন্তব্য করুন