চরমোনাইর মাহফিল ও হিংসুক সমালোচক

প্রকাশিত: ১১:১৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২০

মুফতি শাইখ মাহমূদ হাসান

চরমোনাই একটি ইউনিয়নের নাম। বাংলাদেশের ৪৫৭১টি ইউনিয়নের অন্যতম প্রসিদ্ধ একটি ইউনিয়ন হল চরমোনাই। আর এই ইউনিয়নেই আজ থেকে শত বছর আগে উজানীর ক্বারী ইবরাহীম সাহেব রহ. -এর রূহানী সন্তান ও খলীফা ক্বারী ইসহাক রহ.- এর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চরমোনাইর খানকা ও চরমোনাইর মাদরাসা।

মাশহুর এই খানকা ও মাদরাসার সম্মিলিত উদ্যোগে বছরে দু’বার চরমোনাই ইউনিয়নে সারা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ আগমন করে থাকেন। শয়তানের ধোকা থেকে নিজেকে বাঁচাতে রুহানি খোরাক নিতে চরমোনাইর ইসলাহি মাহফিলে বিশ্বের অসংখ্য মুসলমান কীর্তনকলা নদীর তীর অবস্থিত পুণ্যভূমিতে আগমন করেন।

উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ চিশতিয়া-ছাবেরিয়া তরিকার বরকত নিতে চরমোনাইর মুজাহিদগণ অগ্রহায়ণ ও ফাল্গুনের বাৎসরিক মাহফিলে প্রসিদ্ধ এই ইউনিয়নে পদচারণ করে থাকেন। মাওলার মেহেরবানিতে চরমোনাইর মাহফিলে অধমের ৭ বার অংশগ্রহণের তাওফিক হয়েছে। ৭ বারের এই অংশগ্রহণে কখনো কখনো মাদরাসার সাথি ভাইদের জন্য জায়গা রাখতে মাহফিল শুরু হওয়ার ২/৩ দিন আগে ময়দানে হাজির হয়েছি। আবার কোন কোন বছর মাহফিল শুরুর দিন ফজরের সময় মাঠে উপস্থিত হয়েছি। মাহফিল চলাকালীন অবস্থায় বেশিরভাগ সময় নিজ আসনে বসে চরমোনাইর হযরতদ্বয়ের আলোচনা শুনলেও মাঝেমধ্যেই একদম স্টেইজের সামনে গিয়ে পীর সাহেব ও শায়খে চরমোনাইর বয়ান শুনেছি। কখনো এমন হয়েছে যে, সন্ধার পরবর্তী বয়ান শুনতে আসরের পরই স্টেইজের কাছাকাছি অবস্থান করেছি। প্রায়ই বন্ধুদের সাথে চরমোনাইর কয়েকটা ময়দানের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ঘুরে বেড়ালেও কখনো শরীয়ত বিরোধী কোন কার্যকলাপ দৃষ্টিগোচর হয়নি। বরং চরমোনাইর মুজাহিদগণের দ্বিনী বিভিন্ন আমল নজরে পড়েছে। কাউকে দেখেছি নামায পড়তে। আবার কাউকে দেখেছি বসে বসে মাওলার জিকির করতে।

চরমোনাই ময়দানে সাড়ে তিনদিনের এই ইসলাহী মাহফিলে কেউ কেউ মাওলাকে পাবার আশায় দিনরাত সবসময় তাঁর ধ্যান ও প্রেমে মশগুল থাকে। বিশেষত চরমোনাইর মুজাহিদগণ শেষরাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে মাওলার কুদরতি পায়ে সেজদা করে। পৃথিবীর সকল মানুষগুলো যখন গভীর রাতে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় তখন চরমোনাইর ময়দানে মাওলার প্রেমিকগণ মাবুদকে পাবার আশায় তার দরবারে দু’হাত তুলে চোখের পানিতে বুক ভাসায়। শেষ রাত্রের এই জান্নাতি পরিবেশে চরমোনাইর মাহফিলে চরমোনাইর মুজাহিদগণ শুধু নিজেদের জন্যই আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ চায়না বরং সারা বিশ্বের মুসলমানদের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যই তারা খোদার কাছে মোনাজাত করে।

বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সার্বিক কল্যাণ ও মুক্তির লক্ষে চরমোনাইর পীর সাহেব হাজারো আল্লাহর পাগল মুরিদগণকে নিয়ে মাহফিলের শেষ দিন খোদার দরবারে বিশেষ মোনাজাত করে। হাজারো মুমিনের পদচারণায় ধন্য যে ময়দান ঐ ময়দানে প্রতিষ্ঠিত চরমোনাইর মাহফিলের বেশিরভাগ কাজগুলো কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ ও বিশ্বের বড় বড় হক্কানী আলেমগণের চিন্তা-চেতনায় সুবিন্যস্ত চরমোনাইর মাহফিলের সকল কর্মসূচি ও কার্যক্রম। বিশেষত ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসার আদর্শ ও মতবাদ চরমোনাইর মাহফিলের আলোচ্য বিষয়। এমনকি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মতাদর্শে বিশ্বাসী অধিকাংশ আকাবির উলামায়ে কেরামগণের নজরিয়্যাত ও দৃষ্টিভঙ্গির সীমা অদ্যাবধি চরমোনাইর মাহফিলে অতিক্রম করা হয়নি। বরং চরমোনাইর মাহফিলে চরমোনাইর পীর সাহেব ও শায়খে চরমোনাই সবসময় কুরআন- সুন্নাহর আলোকে মানুষকে ইসলাম ধর্মের কথা শুনান। উভয়ই পথ ভুলা মানুষগুলোকে আল্লাহর পথে চলতে উৎসাহিত করেন। হযরতদ্বয় জান্নাত- জাহান্নাহের আলোচনা করে মানুষের অন্তরে খোদার ভয় সৃষ্টি হতে মরমি বয়ান করেন। গুনাহমুক্ত জীবন তৈরির জন্য চরমোনাইর মাহফিলে চরমোনাইর পীর- মাশায়েখগণ ইসলাহী ওয়াজ করেন।

চরমোনাইর ওয়ালাদের সোহবতে মানুষ ধর্ম পালনের প্রতি আগ্রহী হয়। সাধারণ জনতা চরমোনাইর শায়েখগণের সান্নিধ্যে সাড়ে তিন অবস্থান করে নিজেদের চিন্তা-চেতনা ও মনমানসিকতায় যতটুক পরিবর্তন আনে ততটুক চেইঞ্জ সাধারণ মানুষেরা অন্য কোথাও গিয়ে হয় বলে আমার জানা নেই। জানিনা, আপনাদের জানা আছে কি না! চরমোনাইর ওয়ালাদের বয়ানের মানুষের চোখে আল্লাহর ভয়ে পানি আসলেও চরমোনাইর হিংসুক সমালোচকদের তা সহ্য হয় না।

বর্তমান সমাজের যারা আত্নসমালোচনার নামে বিভিন্ন সময় চরমোনাইর তরিকার অনুসারীদের নিন্দাবাদ করে তাদেরকে চরমোনাইর হিংসুক সমালোচক ছাড়া আর কি-বা বলা যায়? যারা নিজ দলের দলান্ধ হয়ে চরমোনাইর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ও অসত্য সংবাদ প্রচার করে তারা কি কখনো চরমোনাইর মঙ্গলকামী সমালোচক হতে পারে? আমার মনে হয় শুধু চরমোনাইর কেন, তারা কখনো উলামায়ে দেওবন্দ যোগ্য অনুসারীও হতে পারে না। বিশেষত কওমী মাদরাসায় পড়ে চরমোনাইর সমালোচনার নামে যারা হর- হামেশায় অনলাইন ও অফলাইনে সাধারণ মানুষকে অবাস্তব কথা বলে বিভ্রান্ত করে যাচ্ছে তারা কি কখনো কওমীর আদর্শ সন্তান হতে পারে? দ্বিনের দরদ বুকে লালন করে গঠনমূলক সমালোচনা করতে না পারলে চরমোনাইর সমালোচনা করতে আপনি এত আগ্রহী কেন? কেন আপনি চরমোনাইর হিতাকাঙ্খী সেঁজে ফেসবুক লাইভে চরমোনাই ওয়ালাদের মনগড়া নসীহত করেন?

বিশেষত যারা ইউটিউব চ্যানেলে জনসাধারণের সচেতনতার নামে বিভিন্ন কাল্পনিক ভিডিও প্রচার করে তারা চরমোনাইর প্রকৃত সুভাকাঙ্খী হলে সরাসরি চরমোনাইর নেতৃস্থানীয়দেরকে তাদের অসংগতি ও অনিসলামিক কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করে না কেন? আসলে এমন সমালোচকদের নিয়ত ভাল নেই। এরা ইহুদী ও মওদূদী জামাতের এজেন্ড। এদের সমালোচনার শেষ মাকসাদ চরমোনাইকে বিতর্কিত ও কোনঠাসা করা। তাই এমন দলান্ধ ও মিথ্যুক সমালোচকদের জন্যই উলামায়ে দেওবন্দের নিন্দা ও তিরস্কার। আর তাদের জন্যই নকল করছি ফতোয়া শামীর আরবী ইবারত বঙ্গানুবাদসহ।

ﺣﺴﺪ ﻳﺼﺪ ﺑﺎﺏ ﺍﻹﻧﺼﺎﻑ ﻭ ﻳﺮﺩ ﻋﻦ ﺟﻤﻴﻞ ﺍﻷﻭﺻﺎﻑ ﺁﻻ ﻭ ﺇﻥ ﺍﻟﺤﺴﺪ ﺣﺴﻚ ﻣﻦ ﺗﻌﻠﻖ ﺑﻪ ﻫﻠﻚ ﻭ ﻛﻔﻲ ﻟﻠﺤﺎﺳﺪ ﺫﻣﺎ ﺁﺧﺮ ﺳﻮﺭﺓ ﺍﻟﻔﻠﻖ ﻓﻲ ﺇﺿﻄﺮﺍﻣﻪ ﺑﺎﻟﻘﻠﻖ অর্থাৎ হিংসা ইনসাফের দরজা বন্ধ করে দেয় এবং অন্যের সুন্দর গুণাবলী প্রত্যাখ্যান করে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। শোনে রাখ, হিংসা এমন এক কাটা; যার সাথে তা বিদ্ধ হয় সে ধ্বংস হয়ে যায়। আর হিংসুকের নিন্দাবাদ বর্ণনায় কুরআনে বর্ণিত সূরা ফালাক্বের শেষ আয়তই যথেষ্ট। উল্লেখ্য যে, হিংসুক নিজ হিংসার আগুনে পুড়ে পুড়ে হিংসার সীমাহীন কষ্টের যন্ত্রণায় কাতরিয়ে একদিন মৃত্যুবরণ করে।

তবে যে সকল পর্যালোচকগণ বাস্তবিকপক্ষেই ইসলাম ও চরমোনাইর শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে দ্বিনের দরদে নিজেদের মতামত মিডিয়ায় ও ফেইসবুকে প্রকাশ করেন সে সকল মহান মনীষীদের উদ্দেশ্যে বলব যে, দূর থেকে স্বগোত্রের সমালোচনা না করে দ্বীন বিজয়ের মাকসাদে চরমোনাইর মাহফিলে অন্তত একবার অংশগ্রহণ করুন। চরমোনাইর মাহফিল ও চরমোনাইর তরিকা সম্পর্কে আপনার সমালোচনার সচ্ছতা ও নিজেকে দ্বিনের খাঁটি দায়ী হিসাবে প্রমাণ করতে চরমোনাইর অগ্রহায়ণ অথবা ফাল্গুনের মাহফিলে সাড়ে তিন ময়দানে অবস্থান করুন। চরমোনাইর মাহফিলকে দ্বিনের বড় খেদমত ভেবে নিজের বড়ত্ব ভুলে কাছ থেকে স্বচক্ষে চরমোনাইর তরিকা দেখুন ও জানুন। আর শান্তিকামী মুজাহিদগণের ভুলত্রুটি দীনি স্বার্থে সংশোধন করুন।

হে প্রিয় শান্তিকামী সালেকীনগণ ! আপনার কোন চিন্তা নেই। চরমোনাইর মুজাহিদ হয়ে কুরআন- সুন্নাহর আলোকে যদি নিজের জীবন গঠন করে সাহাবাদের পথে চলতে পারেন তবে অবশ্যই আল্লাহর রহমে আশা করি আপনি দুনিয়ায় পাবেন শান্তি আর আখেরাতে পাবেন চির মুক্তি ইনশাআল্লাহ। আপনি হিংসুক সমালোচকদের মিথ্যা তথ্যে সত্যের পথ থেকে কখনো বিভ্রান্ত হবেন না। আর মনে রাখবেন যে, শুধু চরমোনাইর নয়; বরং যুগে যুগে সত্যের পতাকাবাহী বড় বড় মহান মনীষীগণ সমকালীন হিংসুক সমালোচকদের সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুুতে পরিণত হয়েছেন। এবং পরিশেষে আল্লাহর অশেষ রহমতে তারাই সফলতার সুউচ্চ মাকামে সমাসীন হয়েছেন বিধায় আমার এলেখা আল্লামা শামী রহ.- এর বর্ণিত ঐতিহাসিক উক্তি দ্বারা শেষ করছি।

ইবনে আবেদীন আল্লামা শামী রহ. বলেন যে, ﻭ ﻣﺎ ﺃﻧﺎ ﻣﻦ ﻛﻴﺪ ﺍﻟﺤﺴﻮﺩ ﺑﺂﻣﻦ ﻭ ﻻ ﺟﺎﻫﻞ ﻳﺰﺭﻱ ﻭ ﻻ ﻳﺘﺪﺑﺮ ﻫﻢ ﻳﺤﺴﺪﻭﻧﻲ ﻭ ﺷﺮ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻛﻠﻬﻢ ﻣﻦ ﻋﺎﺵ ﻓﻲ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻳﻮﻣﺎ ﻏﻴﺮ ﻣﺤﺴﻮﺩ ﺇﺫ ﻻ ﻳﺴﻮﺩ ﺳﻴﺪ ﺑﺪﻭﻥ ﻭﺩﻭﺩ ﻳﻤﺪﺡ ﻭ ﺣﺴﻮﺩ ﻳﻘﺪﺡ — ﻓﺎﻟﻠﺌﻴﻢ ﻳﻔﺼﺢ ﻭﺍﻟﻜﺮﻳﻢ ﻳﺼﻠﺢ অর্থাৎ হিংসুকদের ষড়যন্ত্র থেকে আমি নিজেও মুক্তি পাইনি। সমাজের মূর্খরা শুধুই নিন্দা প্রচার করে বেড়ায়। কিন্তু সবশেষে হিংসুক সমালোচকের পরিণাম কি হয়- তা সে চিন্তা করে না। তারা আমায় নিয়েও হিংসা করে। তবে জেনে রাখ, পৃথিবীতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সে ব্যক্তি, যে সমাজে একদিন নিন্দনীয় হওয়া ব্যতীত বসবাস করে। কেননা কোন নেতা-ই নেতা হতে পারেনা এমন সমর্থক ছাড়া, যারা তার প্রশংসা করে নতুবা এমন হিংসুকদের ছাড়া যারা তার সমালোচনা করে।

অতএব বুঝা গেল যে, (হিংসুক সমালোচক) সংকীর্ণমনা ব্যক্তি মানুষকে অপমান করে আর (প্রশস্ত দিল ওয়ালা) সম্মানিত ব্যক্তি মানুষকে সংশোধন করে।

লেখক: তরুণ আলেম, শিক্ষাবিদ ও আলোচক

এমএম/ওয়াইপি

মন্তব্য করুন