আতঙ্ক ও ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাত: সিপিডি

প্রকাশিত: ৬:১৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, এই খাতে একটা আতঙ্ক, ভয়ংকর, ভঙ্গুর পরিস্থিতির দিকে আমরা তাকিয়ে আছি।

ব্যাংক কমিশন গঠন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে শনিবার সিপিডির এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন এই অর্থনীতিবিদ। রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারের ব্র্যাক ইনে সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজন করা হয়।

দেবপ্রিয় বলেন, ‘খেলাপি ঋণ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। আর লুকিয়ে আছে মূলধন ঘাটতি, নিরাপত্তা সঞ্চিতির মতো আরও অনেক সূচক। এর ফলে মানুষের ব্যাংকে টাকা রাখার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। সুদহার নিয়েও সমস্যা হচ্ছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতিমালা দিচ্ছে, তার বরখেলাপ হচ্ছে প্রতিনিয়ত।’

গুটিকয়েক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছে এখন পুরো ব্যাংক খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে সিপিডির ফেলো বলেন, ‘এ পরিস্থিতি যখন ক্রমান্বয়ে বিকাশ লাভ করছিল, সে রকম একটি পরিস্থিতিতে ২০১২ সালে হলমার্কের কেলেঙ্কারি উদঘাটিত হয়। তখন থেকে আমরা ব্যাংক কমিশনের বিষয়ে বলে আসছি। এখন যেহেতু এটা কিছুটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে আমরা অত্যন্ত প্রীত, খুশি এবং সম্পূর্ণ সাফল্য কামনা করছি।’

অনেক জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে ব্যাংক খাত নিয়ে একটি কমিশন গঠিত হচ্ছে। আর এই কমিশনের চেয়ারম্যান হচ্ছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। এজন্য সরকারের ব্যাংক কমিশন গঠনের উদ্যোগকে সমর্থন ও সাধুবাদ জানিয়েছেন তিনি।

দেবপ্রিয় বলেন, ‘এ ব্যাংক কমিশন গঠন করতে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে আশীর্বাদ ও সম্মতি এসেছে। এ জন্য আমরা খুবই উচ্ছ্বসিত। আমরা মনে করি, এটা অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। এ কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে, তথ্যনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে কাজ করতে পারে; তার জন্য তাদের পরিবেশ, ক্ষমতা ও সুযোগ দিতে হবে। কমিশনকে জরুরি বিষয়ে দ্রুত সমাধানের জন্য অন্তর্বতীকালীন প্রতিবেদন দিতে হবে। এগুলো আগামী বাজেটের আগেই দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনৈতিক সমস্যা একসময় রাজনৈতিক অর্থনীতি সমস্যায় উপনীত হয়েছিল। রাজনৈতিক অর্থনীতি সমস্যা এখন রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে রাজনৈতিক সমর্থন বাদ দিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব নয়।’

‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ যে সীমিত তা প্রমাণ পায় নতুন ব্যাংক দেয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন ব্যাংক হবে না, তারপরও নতুন তিনটি ব্যাংক হয়েছে।’

গত বুধবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ব্যাংক কমিশন করব। এ জন্য অনেকের সঙ্গেই কথাবার্তা বলতে হবে। যারা সময় দিতে পারেন, দেশের স্বার্থে কাজ করতে পারেন, তাদের মধ্য থেকেই কেউ এই কমিশনের দায়িত্ব নেবেন।’ অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে কিছু না বললেও ব্যাংক কমিশন গঠনের বিষয়ে শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে জানা গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কমিশনকে সমস্যার গভীরে যেতে হবে। আমরা দেখতে চাই কমিশনে কাদের ডাকা হবে, তাদের কাজ করার ক্ষেত্রে কী ধরনের ক্ষমতা দেয়া হবে।

ব্যাংক খাতের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদের সমস্যা আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে দিচ্ছি। এই যে গভীরতর যেসব সমস্যা তার সমাধান যদি করতে না পারে তাহলে তা কাজে আসবে না। এজন্য সরকারের আলোকিত সমর্থনের পাশাপাশি আলোকিত স্বার্থপরতাও থাকতে হবে, তা না হলে অর্জনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।

ব্যাংক কমিশনের কার্যপরিধির তথ্য তুলে ধরতে গিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘ব্যাংক কমিশন সাময়িক। এ কমিশন তিন-চার মাসের মধ্যে তাদের কাজ শেষ করবে। কমিশনের কার্যপরিধি খুবই সুনির্দিষ্ট হবে।’

‘এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের গ্রাহক এবং অর্থনীতির জন্য ব্যাংক খাত কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা নিরূপণ করা, তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, ব্যাংক খাতের সমস্যা কী এবং সামনের দিনে চ্যালেঞ্জগুলো কী হতে পারে তা চিহ্নিত করা, ব্যাংকিং খাতের সমস্যার জন্য কারা ও কোন কোন গোষ্ঠীর দায় তা চিহ্নিত করা এবং স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে ব্যাংক খাতের সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কী ধরনের প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ প্রয়োজন সেগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করা।’

আই.এ/

মন্তব্য করুন