মাহফিলে জুতা তুলে সমালোচিত হওয়া বক্তার বিরুদ্ধে আবু সুফিয়ানের মামলা

ওয়াজ-মাহফিল বিতর্ক

প্রকাশিত: ১০:৩২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০

নিজস্ব গবেষণার কাজে মালয়েশিয়া চলে যাওয়া দেশের আলোচিত-সমালোচিত বক্তা মিজানুর রহমান আযহারীর পক্ষ হয়ে বাংলাদেশের জনপ্রিয় আর এক বক্তা মাওলানা হাফিজুর রহমান সিদ্দিকের ব্যাপারে এক মাহফিলে আপত্তিকর বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত হওয়া মাসুদ ইবনে মুজিব ফারুকী নামে একজনের বিরুদ্ধে ঢাকা সিএমএম আদালতে মানহানী ও ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে মামলা করেছেন ইসলামী সংগীত শিল্পী ও কলরবের একাংশের পরিচালক মাওলানা আবু সুফিয়ান।

আজ সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারী) ঢাকার সিএমএম কোর্টে তিনি এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলার উকিল হিসেবে আছেন মাসউদুর রহমান। সিএমএম কোর্টে মামলা নং – ২৬০ (সিআর)।

মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, বিবাদী মাওলানা মাসউদ ইবনে মুজিব ফারুকী, পিতা : মো. মুজিবুর রহমান, রাজশাহী বায়তুস সালাম জামে মসজিদের খতিব এবং তাজবিদুল কুরআন মাদরাসা রাজশাহীর প্রিন্সিপাল। যিনি বাংলাদেশের জনপ্রিয় বক্তা মাওলানা হাফিজুর রহমান সিদ্দিককে কুত্তার বাচ্চা, নাস্তিক বলে গালী দিয়ে দেশ থেকে তাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন একই ভাবে তিনি ওয়াজের স্টেইজে পবিত্র কোরআন শরীফের উপর জুতা তুলে পবিত্র কুরআনের অবমাননা করেছেন।

বিবরণে আরও বলা হয়, তাঁর এহেন কর্মকান্ড অবশ্যই ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত করে এবং মাওলানা হাফিজুর রহমান সিদ্দিকের ভক্তদের মনে আঘাত দেয় যা একজন জনপ্রিয় বক্তার প্রতি মানহানীকর বিষয়। এ বিষয়ে যথাযোগ্য পদক্ষেপ নিতে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে মামলাটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলার বাদী আবু সুফিয়ান।

আবু সুফিয়ান পাবলিক ভয়েসকে জানিয়েছেন, আদালত মামলাটি গ্রহণ করেছে এবং পিবিআই তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছে। আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারী এই মামলার তদন্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়ার জন্যও বলা হয়েছে বলেও উকিলের উদ্বৃতি দিয়ে জানিয়েছেন তিনি।

মামলার বিবরণী সূত্রে আরও দেখা গেছে, মূলত পেনাল কোডের মানহানি মামলার ধারায় আদলতে মামলাটি করা হয়েছে। যেখানে মামলার বিবাদীকে একজন আইন অমান্যকারী এবং ধর্ম অবমাননাকারী হিসেবে উল্যেখ করে নির্দিষ্ট একটি গোষ্টির এজেন্ট হিসেবে উল্যেখ করা হয়েছে। তবে তিনি ঠিক কোন গোষ্টির এজেন্ট তা এজাহারে উল্যেখ না করা হলেও মাওলানা মিজানুর রহমান আযহারী যার পক্ষ হয়ে বিবাদী মুজিবুর রহমান ফারুকী মাওলানা হাফিজুর রহমান সিদ্দিককে কটাক্ষ করেছেন তাকে বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী জামায়াতের প্রোডাক্ট বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় উক্ত বক্তাকে জামায়াত-শিবির অনুসারী বলেই সকলে মতামত প্রকাশ করেছেন।

মামলা বিষয়ে আবু সুফিয়ানের মতামত শুনতে ক্লিক করুন। (ভিডিও)

প্রসঙ্গত : গত ১৫ ফেব্রুয়ারী মাওঃ মাসুদ ইবনে মুজিব ফারুকী নামের জনৈক বক্তা এক মাহফিলে স্টেজে ওয়াজ করার সময় প্রকাশ্যে জনসম্মুখে আল কোরআনকে টেবিলের উপরে রেখে তার নিজ পায়ের জুতা খুলে হাফিজুর রহমান নামের অপর বক্তাকে কুত্তার বাচ্চা, নাস্তিক এবং দেশ থেকে তাড়ানোর হুমকি দিচ্ছে। এসময় তিনি বারবার কর্কটভাষায় বলেন তোমার গালে জুতা মারি!

তাঁর এই আপত্তিকর বক্তব্যের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে তিনি সমালোচনার শিকার হতে থাকেন এবং এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, এ বিষয়ে অনলাইন এক্টিভিটিস্ট ও লেখক মাওলানা রুহুল আমিন সাদী বলেন,  সাম্প্রতিক সময়ে বয়ানের মঞ্চে জুতো প্রদর্শন করেছেন একজন বক্তা। এবং কিছু শ্রোতা একে সাপোর্টও দিয়েছেন দেখা গেলো। মাহফিলে যে বক্তা এরূপ করেন তিনি এই মঞ্চে উঠার উপযুক্ততা হারিয়ে ফেলেন। তাকে আগে মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিৎ। কারণ চিল্লাচিল্লি করা, প্রতিপক্ষের মুন্ডুপাত করা এক ধরনের মানসিক রোগ। সারাক্ষণ নিজেকে ভাইরাল করার ধান্ধায় থাকা খুবই মারাত্মক ব্যাধি।

আলোচ্য বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারীর পক্ষাবলম্বন করে অনেকেই মাওলানা হাফিজুর রহমান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে গালাগালিতে অংশ নেন। একইভাবে অনেকে সিদ্দিকী সাহেবের পক্ষাবলম্বন করে জামায়াত ঘরানার বক্তাদের বিরুদ্ধে বলেন। সাধারণ মানুষ তা উপভোগ করে।

অথচ জানগণ টাকা পয়সা খরচ করে একটা মাহফিলের আয়োজন করে নসিহত শোনার জন্য। গালাগালি হুমকি ধামকি শোনার জন্য নয়। আমাদের বেওকুফির কারণে মাহফিলের ক্ষেত্রে কোনরূপ নিয়ন্ত্রণ আসে কি না আশংকা করছি।

আলেম সাংবাদিক ও খতিব মাওলানা আলী হাসান তৈয়ব বলেন, সম্প্রতি দেশের একজন বহুল আলোচিত জনপ্রিয় বক্তার আফশীআবিদেশ গমনকে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর অনালোচিত অর্বাচীন বক্তার উন্মক্ত আবেগ আর লাগামহীন ক্ষুব্ধ বক্তব্য আমাদের বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

একজন আলেম কিংবা শিক্ষিত মানুষ দেশের শ্রদ্ধেয় আলেমসমাজকে টার্গেট করে শুধু অনুমান ও অন্ধ আবেগের বশে এভাবে মাতাল ও মূর্খতাপূর্ণ বক্তব্য দিতে পারে তা অবিশ্বাস্য। এতে করে শুধু তাদের টার্গেট আলেমদের ইমেজের ক্ষতি হচ্ছে তাই না, বরং পুরো আলেমসমাজ যার মধ্যে তারাও আছেন, সর্বোপরি ইসলামের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

বস্তুত এসব বক্তব্য থেকে ইসলামের চিহ্নিত শত্রুরা ছাড়া কেউ লাভবান হচ্ছে না। শত্রুরা উল্লসিত ও উপকৃত হচ্ছে। তারা এর সুযোগ নিয়ে ইসলামি মাহফিল তথা সার্বজনীন দাওয়াতের ময়দানের কণ্ঠরোধ ধরতে চাইছে। যা ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে ইসলামের এদেশীয় চেনা শত্রুদের বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে।

তাই আমি মনে করি, এসব অর্বাচীন বক্তাকে মাহফিলের শ্রোতা, আয়োজক ও আলেমসমাজের প্রত্যাখান করা উচিত। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এদের সম্পূর্ণ বয়কট করা উচিত। প্রতিবাদের উদ্দেশেও এসব শেয়ার করলে প্রকারান্তরে তাদের প্রসিদ্ধ করা হয়।

আর মৌলিকভাবে গত কিছুদিন ধরে দেখছি মাহফিলের সংখ্যা যত বাড়ছে, জাহেল বক্তার প্রকাশও ঘটছে তত বেশি। চারদিকে ওয়াজ হচ্ছে ঘরানাভিত্তিক। তাই ওয়াজও হচ্ছে ঘরানা বাঁচানো বা ঘরানা প্রতিষ্ঠার। ইসলামের নীতিমালার আলোকে এসব না ওয়াজ-নসিহত না দাওয়াত বা তাবলিগ। এসবের দ্বারা গ্রুপের ভক্তরা খুশি হয়, আল্লাহ খুশি হন না।

হাদিস বলছে, কিয়ামতের দিন জাহান্নাম উদ্বোধন হবে তিনশ্রেণীর স্পেশাল লোক দিয়ে। তাদের একদল এ ধরনের রিয়াকার হামবড়া আলেম-বক্তা। মাআযাল্লাহ। এসব বরং গজব ডেকে আনছে। এদের কারণে ইসলামের কাজ করার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসছে।

আমি মনে করি, মুত্তাকি দরদি আলেমদের এ নিয়ে কথা বলা দরকার। আমজনতাকে এসব আলেমে সু থেকে সতর্ক করা উচিত। মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও উত্তেজনা ও বিদ্বেষ না উস্কে দিয়ে গঠনমূলক ভাষায় এদের প্রতিহত করার ডাক দেওয়া উচিত।

তরুণ আলেম ও চিন্তক লেখক মাওলানা আবদুল্লাহ আল মাসউদ বলেন, এই ব্যাপারটি আমাদের জন্য ভীষণ রকম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার যে, চারদিকে আদব-শিষ্টাচার ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যৌক্তিক পন্থায় সুন্দরভাবে যে সমালোচনা করা যায় এটা আমরা ধীরেধীরে ভুলে যেতে বসেছি।

আলেমগণ হলেন সমাজের শিক্ষক। সাধারণ মানুষজন তাদের থেকেই আদব-কায়দা ও সভ্যতা-ভদ্রতা শেখার কথা। কিন্তু তা তো হচ্ছেই না, ধীরেধীরে বরং অনেক আলেমের মাধ্যমেই জনসাধারণ ও তরুণ-যুবকদের মধ্যে বেআদবি ছড়িয়ে পড়ছে।

একজন আলেম যখন দীনী কথা বলতে ওয়াজের স্টেজে ওঠেন তখন তিনি আসলে শুধু একজন ওয়ায়েজই নন; বরং একজন শিক্ষক ও পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তার দায়িত্ব তখন অনেক বেড়ে যায়। তার প্রতিটি কথা, বলার ভঙ্গি থেকে মানুষ শিখে।

তরুণ আলেমদের মতামত আওয়ার ইসলাম ডটকম থেকে সংগ্রহিত

মন্তব্য করুন