বিশ্বাসী কবি আল মাহমুদের মৃত্যুভাবনা ও ধর্ম দর্শন

প্রকাশিত: ৫:৪০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০
আল মাহমুদ || ধর্ম দর্শন || পাবলিক ভয়েস

৮২ বছর বয়সে ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরোপারে পাড়ি জমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। প্রথম জীবনে বামপন্থি রাজনীতি তথা সমাজতন্ত্রের দিকে ঝোঁক থাকলেও শেষ বয়সে ধর্মের প্রতি টান অনুভব করেন কবি আল মাহমুদ।

মূলত নব্বইয়ের দশকের দিকে কবির লেখার ধরণে বিষয়টা লক্ষ্যণীয়ভাবে দৃশ্যমান হয়। কবি নিজেও সেটা স্বীকার করেন। বন্ধুবর প্রিয় অগ্রজ, সাংবাদিক আবিদ আজম ভাইকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে কবি নিজেই বলেছেন, ‘একসময় খুব স্বাভাবিক পড়াশোনার মধ্য দিয়ে মার্ক্সবাদের প্রতি আগ্রহী হয়েছিলাম। এই দর্শনের সঙ্গে আমার একধরনের সম্পৃক্ততাও ঘটে গিয়েছিল। তবে অন্য অনেক পড়াশোনা আমাকে এর থেকে সরে আসার প্ররোচণা দিয়েছে। একজন পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসী মানুষে পরিণত করেছে’।

অন্য আরেকটি সাক্ষাতকারে নিজের ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে কবি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে ধর্মে বিশ্বাস করি। যদিও আমি আনুষ্ঠানিকভাবে সেটা করি না। কিন্তু আমি কিছু চাইলেই আল্লাহর কাছে চাই। লোকে বলে আল্লাহকে ডাকলে আল্লাহ কি শুনতে পায়? কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয় তিনি কথা বলেন’।

কবির বার্ধক্য ভাবনাতেও তার পরকাল বিশ্বাসের কথা উঠে আসে এক লেখায়। তিনি লিখেন, ‘এটাই জীবন। বলা চলে চক্রে বাধা। শৈশব থেকে যৌবন, সেখান থেকে বার্ধক্য। তারপর নিঃশেষ। বিশ্বাসীদের কাছে, নিঃশেষ থেকেই শুরু অনন্ত জীবন, পরকাল’।

কবি বলেছেন, ‘মৃত্যুর দুয়ার থেকে কেউ ফিরে এসে বলেনি মৃত্যু এমন। মৃত্যুই সত্য, আর সব মিথ্যা। মরণ এলে মরে যাব। একটা কথা আছে না, ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর সে কোথা কবে?’ হ্যাঁ, আমার মৃত্যু আসবে, গভীর আলোর মধ্য দিয়ে পথ হেঁটে হেঁটে চলে যাব আমি, অজানার উদ্দেশ্যে, মরণের দুয়ারে’।

প্রভুকে তিনি চিনেই বিশ্বাস করেছেন এমন কথাও কবি বলেছেন। এমন দৃঢ় বিশ্বাস থেকে কবি বলেছেন, ‘আমিও জেনে গেছি কে তুমি কখনো অস্ত যাও না/কে তুমি চির বিরাজমান/ তোমাকে সালাম/ তোমার প্রতি মাথা ঝুকিয়ে দিয়েছি/ এই আমার রুকু, এই আমার সেজদা’। এই কবিতা থেকে পুরনো মাক্সবাদী চিন্তা থেকে ফিরে এসে নিজের অস্তিত্বের পরিচয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

‘কবিতার জন্য বহুদূর’ বইয়ে কবি স্পষ্টত ঘোষণা করেন, ‘আমি নিসর্গরাজি অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা সংগুপ্ত প্রেমের মঙ্গলময় ষড়যন্ত্র দেখতে পাই যা আমাকে জগত-রহস্যের কার্যকারণের কথা ভাবায়। এভাবেই আমি ধর্মে এবং ধর্মের সর্বশেষ এবং পূর্ণাঙ্গ বীজমন্ত্র পবিত্র কোরানে এসে উপনীত হয়েছি’।

এরপর কবি আরো স্পষ্ট ভাষায় বিশ্বাস ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমি ইসলামকেই আমার ধর্ম, ইহলোকেই আমার ধর্ম, ইহলোক ও পারলৌকিক শান্তি বলে গ্রহণ করেছি। আমি মনে করি একটি পারমাণবিক বিশ্ববিনাশ যদি ঘটেই যায়, আর দৈবক্রমে মানবজাতির যদি কিছু অবশেষও চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট থাকে তবে ইসলামই হবে তাদের একমাত্র আচরণীয় ধর্ম। এই ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যই আমার কবিস্বভাবকে আমি উৎসর্গ করেছি। আল্লাহ প্রদত্ত কোন নিয়মনীতিই কেবল মানবজাতিকে শান্তি ও সাম্যের মধ্যে পৃথিবীতে বসবাসের সুযোগ দিতে পারে। আমার ধারণা পবিত্র কোরানেই সেই নীতিমালা সুরক্ষিত হয়েছে। এই হলো আমার বিশ্বাস। আমি এ ধারণারই একজন অতি নগণ্য কবি’।

বিশ্বাসী কবি আল মাহমুদ নিজের মৃত্যু নিয়েও রাখঢাক ছাড়াই লিখে গেছেন অপ্রিয় সত্য কথা। বলে গেছেন নির্দ্বিধায় কেমন মৃত্যু চান সে কথা। এক কবিতায় প্রার্থনা করেছেন যেন শুক্রবারে তার মৃত্যু হয়। কবি নজরুল বলেছিলেন, ‘মসজিদের ওই পাশে আমার কবর দিও ভাই যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই’। কবির শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। মসজিদের পাশেই চির নিদ্রায় শায়িত হয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল।

কবি আল মাহমুদও প্রভুর দরবারে বাসনা ব্যক্ত করেছেন নিজের মৃত্যুর ব্যাপারে। কামনা করেছেন যেন শুক্রবারে তার মৃত্যু হয়। ‘স্মৃতির মেঘলাভোরে’ শিরোনামের এক কবিতায় কবি নিজের এ কামনা ব্যক্ত করেন।

কবিতায় যদিও শুক্রবার ভোরে মৃত্যু কামনা করেছিলেন কবি, কিন্তু সময়টা ভোর বেলা না হলেও শুক্রবারেই তার মৃত্যু হয়েছে। যেন পরম প্রিয় প্রভু বান্দার শেষ ইচ্ছা পূরণে স্বীয় উদ্যোগে শুক্রবারেই তার মৃত্যু দিলেন।

‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে/মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ/অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে/ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ’। কবিতায় ভোর বেলা মৃত্যু হওয়াটাই কল্পনা করেছেন কবি। বিশেষভাবে এটাই যে চাওয়া তা সরাসরি না বললেও প্রেমময় প্রভুর কাছে ব্যক্ত করেছেন নিজের পছন্দের কথা। বলেছেন, শুভ শুক্রবারের কোনো এক ভোরবেলা মৃত্যুর ফেরেশতা এলে সেই সময়টাকেই ঈদের আনন্দ হিসেবে মেনে নিবেন কবি।

কবিতার শেষ দিকে কবি বলেছেন, ‘আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার/যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার’। এ যেন পরম মমতার, আদরের, ভালোবাসার বন্ধুর কাছে কৌশলি মিনতি। অভিমান করার মতো করে সরাসরি না বলে কৌশলে কান পর্যন্ত নিজের চাওয়াটা পৌঁছে দেওয়া। আর বিশ্বাসটা এমন যেন, প্রিয়তমের কানে পৌঁছে দিলে এ বাসনা ফিরবে না। এ ছিলো দৃঢ় বিশ্বাস। আত্মার আত্মীয়ের সাথেই এমন বিশ্বাসের খেলা চলে। এ বিশ্বাসের খেলায় জয় হয়েছে কবি আল মাহমুদের। এটাই বিশ্বাসী কবির বিশ্বাসের রুপরেখা।

কবি বলেছিলেন, ‘ধর্ম মানুষকে একটা চিরন্তন আশ্রয়ের আশ্বাস দেয়। এ আশ্বাসের বলেই মানুষ পরকালে বিশ্বাস করে। মৃত্যু–পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করে। আমি মনে করি, এই পার্থিব জীবনই শেষ নয়, মৃত্যুর পরও আমার একটা জীবন শুরু হবে। তবে প্রকৃত সাম্যবাদে বিশ্বাসীদের প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই। ব্যক্তিজীবনে আমি একসময় সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলাম। পরে আমার বিশ্বাসের কাছে ফিরে এসেছি‘।

স্রস্ট্রার প্রতি পরম বিশ্বাসের দাবিতে যেন আবেদন নয় যেন প্রিয়তমের কাছে নিজের বাসনা ব্যক্ত করেছেন। আর সেই বিশ্বাসী হৃদয়ের মনোবাসনা মহান স্রস্টা নিজ দয়ায় পূরণ করেছেন। আর কিছুটা সময় পার হলেই হয়তো আমরা বলতাম কবির মৃত্যু হয়েছে শনিবারে। কিন্তু ভোর পেরিয়ে গেলেও মহান প্রভু তার বান্দার চাওয়া পূরণ করতে শুক্রবারের শুভক্ষণ থাকতেই ঢেকে নিলেন নিজের কাছে।

বিশ্বাসী কবি কারো প্ররোচণা বা হিংসা কিংবা কারো অপবাদে বিশ্বাস নিয়ে ছেলে-খেলা খেলেননি। সেজন্য অনেকের কাছে তিনি অপছন্দের হতে পারেন। সেটা তিনি জানতেনও। ধর্মবিশ্বাসের কারণে তাকে সইতে হয়েছে রাজনৈতিক অপবাদ। অথচ তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাও।

ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা রেখে খেটেছেন জেল-জুলুম। পালিয়ে বেড়িয়েছেন দীর্ঘদিন। পুরস্কার স্বরুপ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ বিশ্বাসী কবিকে শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

এতোকিছুর পর কবিকে শুনতে হয়েছে তীর্যক নানান মন্তব্য। নিন্দাকারীদের অভিযোগের জবাবে কবি বলেছিলেন, ‘আমি একজন কবি, আমি রাজনৈতিক নেতা নই। আমি সোজা-সরল মানুষ। আপনি যদি আমাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন, আমিও আপনাকে হৃদয় দিয়েই ভালোবাসব। আপনার সঙ্গে আমার বিনিময় হবে’।

তবুও কখনো নিজের বিশ্বাস থেকে কবি সরে আসেননি। যে বিশ্বাসের আলোকে পরম প্রিয়তমের কাছে সঁপেছিলেন নিজেকে। দীপ্ত কন্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমার  বিশ্বাসের কারণে যদি আমাকে মৌলবাদী বলা হয় তবে আমি অবশ্যই  মৌলবাদী’।

শাহনূর শাহীন
কবি, লেখক ও সাংবাদিক
যুগ্ম সম্পাদক, পাবলিক ভয়েস।

মন্তব্য করুন