মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রভাবশালী জামায়াত নেতা আবদুস সোবহানের ইন্তেকাল

প্রকাশিত: ৮:৫৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমীর ও জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী নেতা আবদুস সুবহান (৮৬) মারা গেছেন। আজ শুক্রবার বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। (ইন্নালিল্লাহি ও-ইন্না ইলাইহী রাজিয়ুন)। ঢাকার কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা অবস্থায় গত ২৪ জানুয়ারি তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. বাচ্চু মিয়া সুবহানের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ময়নাতদন্তের জন্য মৃতদেহ মর্গে রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি। আবদুস সুবহান বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে দীর্ঘ সাত বছর ধরে সোবহান কারান্তরীণ ছিলেন। সবশেষ তিনি কাশিমপুর কারাগারে বন্দি ছিলেন। সেখানে বাথরুমে পড়ে গিয়ে আহত হন। এর পর আর সুস্থ হয়ে উঠেননি তিনি। গত ২৪ জানুয়ারি আবদুস সোবহানকে কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। আজ সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

পাবনা জেলা জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আমীর আবদুস সুবহান একাত্তরে দলটির কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর পাবনায় শান্তি কমিটি গঠিত হলে সুবহান প্রথমে ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পরে সহসভাপতি হন বলে তাঁর ব্যপারে আনিত অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সুবহানকে আটক করে। ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর পর থেকে তিনি কারাগারেই ছিলেন।

জামায়াতে ইসলামীর ওই সময়ের নায়েবে আমীর আবদুস সুবহানের মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন।

অভিযোগ গঠনের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সুলতান মাহমুদ জানিয়েছিলেন, আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে মূলত পাবনা জেলায় সংঘটিত ঘটনা নিয়ে। “পাবনা সদর, ঈশ্বরদী এবং সুজানগর, এই তিনটি থানায় মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যাসহ যে সব অপরাধ সংঘঠিত হয়েছে, সে বিষয়গুলোই অভিযোগ হিসেবে এসেছে মোহাম্মদ আ. সুবহানের বিরুদ্ধে।”

তিনি জানান, ৭১ এ আবদুল সুবহান পাবনা জেলা জামায়াতের আমীর ছিলেন। এছাড়া তিনি প্রথমে শান্তি কমিটির সম্পাদক এবং পরে ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন।

কে এই আবদুস সোবহান : পাবনা সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল বাশার মোহাম্মদ আবদুস সোবহান মিয়া ওরফে আবদুস সোবহান ওরফে মাওলানা সোবহানের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। পাবনার সুজানগর থানার মানিকহাটি ইউনিয়নের তৈলকুণ্ডি গ্রামে তার জন্ম। তার বাবার নাম শেখ নাঈমুদ্দিন, মায়ের নাম নুরানী বেগম।

১৯৫৪ সালে সিরাজগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসা থেকে তিনি কামিল পাস করেন। পরে তিনি পাবনা আলিয়া মাদ্রাসার হেড মাওলানা এবং আরিফপুরের উলট সিনিয়র মাদ্রাসার সুপারিনটেন্ডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। পাবনা জেলা জামায়াতের কমিটি গঠনের সময় সোবহানকে আমিরের দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে তিনি নিখিল পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য হন।

১৯৬২ থেকে ৬৫ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন সোবহান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আমজাদ হোসেনের কাছে তিনি পরাজিত হন। একাত্তরে শান্তি কমিটি গঠন করা হলে পাবনা জেলা কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পান সোবহান। পরে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হন।

তার নেতৃত্বেই পাবনা জেলার বিভিন্ন থানায় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও মুজাহিদ বাহিনী গঠিত হয়। এসব বাহিনীর সদস্য ও পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে পাবনার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে সোবহান হত্যা, লুটপাট, অপহরণ, নির্যাতনের মতো অপরাধ ঘটান বলে এ মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যে উঠে আসে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ইয়াহিয়া সরকারের পতন দেখে জামায়াত নেতা গোলাম আযমের সঙ্গে সোবহানও পাকিস্তানে চলে যান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশে ফেরেন এবং পরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আবদুস সোবহান জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করায় সংগঠনে তার প্রভাব ছিল উল্লেখ করার মতো। তিনি দলীয় টিকিটে পাবনা-৫ আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সবশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের মনোনয়ন নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন।

২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের এই প্রভাবশালী নেতাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে প্রাণদণ্ড দেন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মোহাম্মদ আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, নির্যাতন আর লুটপাটের মোট নয়টি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউশনের আনা ৯টি অভিযোগের মধ্যে ছয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাকে ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।

সোবহান হলেন জামায়াতের নবম শীর্ষ নেতা, যিনি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। রায়ের দিন বিমর্ষ দৃষ্টি নিয়ে কাঠগড়ায় চেয়ারে বসেছিলেন সোবহান। তার পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা। গায়ে খাঁকি হাফ স্যুয়েটারের সঙ্গে মাথায় টুপিও ছিল।

প্রসিকিউশনের আনা ১ নম্বর অভিযোগে ঈশ্বরদী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে বের করে ২০ জনকে হত্যা; ৪ নম্বর অভিযোগে সাহাপুর গ্রামে ছয়জনকে হত্যা এবং ৬ নম্বর অভিযোগে সুজানগর থানার ১৫টি গ্রামে কয়েকশ মানুষকে হত্যার দায়ে সোবহানকে দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ড।

২ নম্বর অভিযোগে পাকশী ইউনিয়নের যুক্তিতলা গ্রামে পাঁচজনকে হত্যা এবং ৭ নম্বর অভিযোগে সদর থানার ভাড়ারা ও দেবোত্তর গ্রামে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দেয়া হয় আমৃত্যু কারাদণ্ড।

এ ছাড়া ৩ নম্বর অভিযোগে ঈশ্বরদীর অরণখোলা গ্রামে কয়েকজনকে অপহরণ ও আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় সোবহানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। প্রসিকিউশন ৫, ৮ ও ৯ নম্বর অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব অভিযোগ থেকে সোবহানকে খালাস দেন আদালত।

রায়ের দিন সোবহানকে নির্দোষ দাবি করে তার ছেলে নেছার আহমদ নান্নু বলেছিলেন– রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে মিথ্যা মামলায় তাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। আদালতে মোহাম্মদ আবদুস সুবহানও নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন।

মন্তব্য করুন