ভালোবাসা দিবস, ইসলাম কী বলে : তরুণ দুই আলেমের ভাবনায়

প্রকাশিত: ৬:১৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০

১৪-ই ফেব্রুয়ারী। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। পশ্চিমা সাংস্কৃতির তল্পিবাহকরা এই দিবসটিকে মহা সমারোহে পালন করে থাকে। তরুণ-তরুণীরা মহা উৎসাহে দিনটি পালন করে। কমার্শিয়াল কোম্পানীগুলো এই দিন উপলক্ষে বিশেষ বিশেষ আয়োজনও করে থাকে।

তথাকথিত এই ভালোবাসা দিবস সম্পর্কে ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত তরুণদের ভাবনা কী সেটাও জানা উচিত আমাদের। এই প্রতিবেদনে দুজন তরুণ আলেমের ভাবনায় ভালোবাসা দিবস সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারা ফুঁটে উঠেছে।

হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষানবিশ ছাত্র আবু জোবায়ের ভালোবাসা দিবস সম্পর্কে তাঁর ভাবনা প্রকাশ করতে গিয়ে বেশ বড় একটি তাত্বিক ও যুক্তিপূর্ণ আলোচনার অবতারণা করেছেন। তিনি লিখেছেন,

নির্দোষ ও পরিশীলিত ভালোবাসা শুধু পবিত্র নয়, পূণ্যময়-ও বটে। ইসলাম শুধু নিজেকে নয়, পরিবারকে নয়; বরং প্রতিবেশীসহ সকলকেই ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছে। একে অন্যকে ভালোবাসার এমন অবিনাশী চেতনা ইসলাম ছাড়া আর কোথাও নেই।

ইসলাম শুধু অন্যকে ভালোবাসার কথাই বলেনি; নিষ্ঠার সঙ্গে ভালোবাসাকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে লালন করতে বলেছে। আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন— কোনো মানুষ ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না, যে পর্যন্ত না সে মানুষকে কেবল আল্লাহর জন্যই ভালবাসবে। ( বুখারী: ৬০৪১)।

সুতরাং একজন প্রকৃত মুসলমানের হৃদয় সততই অপরের জন্য নিবেদিত ভালোবাসায় টইটুম্বুর থাকবে। তাই ভালোবাসা কোনো পঙ্কিল শব্দ নয়, নয় কোনো বস্তাপঁচা বর্ণগুচ্ছ। ভালোবাসা এক পূণ্যময় ইবাদতের নাম। ভালোবাসতে হবে প্রত্যেক সৃষ্টিজীবকে, প্রতিটি মুহূর্তে। তাই একে সীমিতকরণে নির্দিষ্ট কোনো দিনে বিশেষ পন্থায় ভালোবাসা উদযাপন করা অমানুষী কাজ।

ভালোবাসার আমদানি : বাংলাদেশে ১৪ ফেব্রুয়ারী ‘ভালোবাসা দিবস’ নামে এমন কাজটিই বেশ কয়েক বছর ধরে চলছে। তথাকথিত প্রগতিশীল সাংবাদিক শফিক রেহমান এ দিবসটি বাংলাদেশে আমদানি করেন বলে জানা যায়। তিনি ১৯৯৩ সালে সর্বপ্রথম তা উদযাপন করেন। এবং তাঁর ‘যায় যায় দিন’ পত্রিকার মাধ্যমে তা প্রচার করেন। এর পরের বছর থেকে সুযোগসন্ধানী নীতিহীন ব্যবসায়ীরা এবং সস্তা জনপ্রিয়তাকামী মিডিয়ারাও দিবসটির প্রচারণায় নামে। ফলে ধীরে ধীরে এ দিবসটির পরিচিতি বাড়তে থাকে।

গোঁড়ায় গলদ : পশ্চিমা দেশগুলোতে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘ সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ বলা হয়। এ দিনটিকে ‘লাভ ডে’ বা ‘লাভার্স ফেস্টিভ্যাল’ বলা হয় না। অথচ আমাদের দেশে সুচতুরতার সাথে সেন্ট শব্দটিকে বাদ দিয়ে তার অনুবাদ করা হচ্ছে ‘ভালবাসা দিবস’ নামে। এই বিকৃত অনুবাদের কারণে সাধারণ মুসলমানরা এর প্রকৃত অর্থ, উৎপত্তির কারণ ও ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাচ্ছে।

ইতিহাসের দোরগোড়ায় : সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন ও ভ্যালেন্টাইন’স ডে; দুটিরই ইতিহাস রহস্যাবৃত হয়ে আছে। নিশ্চিতভাবে কেউ জানেনা—
১. কে এই ভ্যালেন্টাইন?
২. কোত্থেকে এলো এই ভ্যালেন্টাইন’স ডে?
৩. তাঁর সাথে এ দিবসের কী সম্পর্ক?
৪. এবং ১৪ ফেব্রুয়ারিই কেনো তা উদযাপন করা হয়?

তাই ১৮৫৩ সালে নিউ ইর্য়ক টাইমস-এ প্রকাশিত এক অনুসন্ধিৎসু প্রতিবেদনে বলা হয়, “এটি তেমনি এক রহস্যময়, ঐতিহাসিক বা প্রত্নতত্ত্বীয়/পৌরাণিক সমস্যা; যার নিয়তিতে কখনও সমাধান নেই”। তবে বর্তমানে যে ভ্যালেন্টাইন’স ডে উদযাপিত হয়, তার সঙ্গে যে জড়িয়ে রয়েছে খ্রিস্ট ধর্ম ও প্রাচীন রোমের ঐতিহ্য; এ ব্যাপারে সবাই একমত।

সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন : সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন হচ্ছেন: খৃস্টান গীর্জা কর্তৃক ‘পবিত্র সত্তা’ হিসেবে ঘোষিত একজন ধর্ম-যাজক। যিনি পরবর্তীতে প্রেমিক-যাজক হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়েছেন। তাকে নিয়ে সেই প্রাচীন রোম থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রচলিত আছে বেশ কিছু তত্ত্ব-গল্প-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু এখানে দেওয়া হলো।

কথিত আছে রোমান ক্যাথলিক চার্চ ভ্যালেন্টাইন বা ভ্যালেন্টিনাস নামের তিন জন সেইন্টকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এদের প্রত্যেকেই হত্যা বা ফাঁসির শিকার হয়েছেন। তবে ১৯২৩ সালে টাইমস-এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দুজন সেইন্ট ছিলো ‘ভ্যালেন্টাইন’ নামে। যায় হোক তাদের গুলিয়ে ফেলা হয়েছে এবং সবার গল্প এক হয়ে একজন ভ্যালেন্টাইনের সাথে মিলে গিয়েছে। তবে তাদের কারো গল্পের সাথে রোমান্টিসিজমের কোনো সম্পর্ক ছিলো কি না; তা নিশ্চিত জানা যায় না।

এক শ্রুতি অনুসারে, ভ্যালেন্টাইন তৃতীয় শতকে রোমে যাজক হিসেবে কাজ করতেন। তখন রোমের সম্রাট ছিলেন পৌত্তলিক শাসক দ্বিতীয় ক্লডিয়াস। তাঁর শাসনকালের এক পর্যায়ে এসে তিনি ঘোষণা দিলেন, তরুণরা বিয়ে করতে পারবে না। তাঁর যুক্তি ছিল, বিবাহিতরা স্ত্রীর মায়াজালে জড়িয়ে যুদ্ধে জীবন বাজি রেখে লড়তে আগ্রহী হবে না।

ক্লডিয়াসের এই ঘোষণা মেনে নেননি সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। কেননা তা ছিল খ্রিস্টধর্মের শিক্ষার বিপক্ষে। তাই তিনি এই অন্যায় আদেশের বিরুদ্ধে গোপনে তরুণ-তরুণীদের বিয়ে দিতে শুরু করেন। ক্লডিয়াসের কানে এই খবর পৌঁছলে ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন ।

অন্য এক তথ্য অনুসারে, মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে ভ্যালেন্টাইনকে কারাদণ্ড দেন ক্লডিয়াস। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় কারারক্ষীর এক অন্ধ মেয়ের সঙ্গে। সেই অন্ধ মেয়েকে তিনি সুস্থ করেন এবং একপর্যায়ে তাঁর প্রেমে পড়ে যান। মৃত্যুদণ্ডের দিন (১৪ ফেব্রুয়ারি) সেইন্ট তাকে একটি চিঠি লেখেন তিনি। চিঠির সর্বশেষে লিখেছিলেন- ‘তোমার ভ্যালেন্টাইনের পক্ষ হতে।’

ভিন্ন আরেক তথ্য অনুসারে, রোমান কারাগার থেকে খ্রিস্টান বন্দিদের পালাতে সাহায্য করায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। তাই কোনটি যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুর আসল গল্প তা আজও রহস্য হয়েই আছে। তবে প্রতিটি গল্পেই তাকে উপস্থাপন করা হয়েছে একজন সহানুভূতিসম্পন্ন, বীর ও রোমান্টিক মানুষ হিসেবে।

ঐতিহাসিকদের মতে, প্রথম ভ্যালেন্টাইন’স ডে শুরু হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে। সে সময় ইংরেজি কবি জিওফ্রে চসার তার এক কবিতায় সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন নামটি প্রথম ব্যবহার করেন। তাঁর এই কবিতা প্রকাশের পর থেকেই ইউরোপজুড়ে ভ্যালেন্টাইন রোমান্সের প্রতীক হয়ে ওঠেন।

ভ্যালেন্টাইন’স ডে : সাধারণত একজন খ্রিস্টান ধর্ম যাজকের নামানুসারে যে দিবসটি চলে আসছে তা একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা কীভাবে এবং কী কারণে প্রেমিক-প্রেমিকাদের উৎসবে পরিণত হয়েছে, তা জানতে হলে ইতিহাসের পেছনে ফিরতে হবে।

প্রাচীন রোমানদের লুপারকালিয়া (Lupercalia) নামক একটি ধর্মীয় উৎসব ছিল। তাঁরা খ্রিস্টের জন্মেরও ২৫০ বছর পূর্ব থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারিতে (১৩-১৫) দেব-দেবীদের পূজা-অর্চনা করার জন্য একটি উৎসব পালন করত‌। এই উৎসবের একটি উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি ছিল— প্রেমের দেবী জুনু ফেব্রুয়াটার (Juno Februata) আশির্বাদ কামনায় যুবকদের মধ্যে যুবতীদের বন্টনের জন্য লটারির আয়োজন করা হত। এই লটারিতে যুবক যে যুবতীকে পেত তাঁর সাথে পরবর্তী একবছর লিভ টুগেদার করতো। তাঁরা বিশ্বাস করতো প্রেমের দেবীর আশির্বাদে যুগলরা ধন্য হবে। এবং ভবিষ্যত সন্তান ধারণে সক্ষম হবে।

একসময় খ্রিস্টানরা রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতা দখল করলে, এই উৎসবকে পৌত্তলিক কুসংস্কার বলে ঘোষণা দেয় এবং তা বন্ধের আদেশ জারি করে। কিন্তু তাদের আদেশ কার্যকরী প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়। ফলে পাদ্রীরা অপারগ হয়ে উৎসবটিকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেন। এবং তাঁরা ‘লুপারকালিয়া’ নামকে পরিবর্তন করে ‘সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ নামে নামকরণ করেন।

ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো বুল্ডারের অধ্যাপক নওয়েল লেন্সকি ২০১১ সালে ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও-তে বলেন, “পোপ প্রথম গ্যালাসিয়াস পঞ্চম শতাব্দীতে এটিকে খ্রিস্টানদের পবিত্র দিন ঘোষণার আগ পর্যন্ত এ উৎসবটি লাম্পট্য, ব্যাভিচার ও নগ্নতার জন্য পরিচিত ছিল। তিনি আরো বলেন, “এটি ছিলো মূলত মদ্যপানোৎসব, শুধু খ্রিস্টানরা তাদের পোশাক পুনরায় পরিধান করেছিল। কিন্তু তা এই দিনটিকে উর্বরতা ও ভালোবাসার দিন হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি।”

সুতরাং ‘সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ সেই যুবতী বন্টনের মত নির্লজ্জ উৎসব লুপারকালিয়ার পোশাকি নাম। যা এখনো প্রচ্ছন্নভাবে যুবতীদের বন্টন করে চলেছে— তাঁর ক্ষণিকের বয়ফ্রেন্ডের কাছে। নির্লজ্জে।

ইসলাম কী বলে : ইমাম তাইমিয়া রহ. বলেন: বিধর্মীদের উৎসবের নিদর্শন রয়েছে এমন কিছুতে অংশ নেয়া মুসলমানদের জন্য জায়েয নয়। বরং তাদের উৎসবের দিন মুসলমানদের নিকট অন্য সাধারণ দিনের মতই। মুসলমানেরা এ দিনটিকে কোনভাবে বিশেষত্ব দিবে না। [মাজমুউল ফাতাওয়া (২৯/১৯৩)]

এছাড়াও আরো যে কারণে ভালোবাসা দিবস উদযাপন করা জায়েয হবে না—

ক) এটি একটি বিজাতীয় উৎসব, ইসলাম বিজাতীদের অনুসরণ করতে নিষেধ করেছে।
খ) এটি মানুষকে হারাম প্রেম-ভালোবাসায় জড়ায়।
গ) এটি মানুষকে জিনা-ব্যাভিচারে লিপ্ত করে।
ঘ) এটি মানুষের সময় ও অর্থের অপচয় ঘটায়।
ঙ) এটি মানুষের পাপবোধকে বিলুপ্ত করে দেয়।
চ) এগুলো ছাড়াও মানুষকে ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী অনেক অনর্থক কাজে ব্যস্ত রাখে।

সুতরাং এ দিনের কোন একটি নিদর্শন ফুটিয়ে তোলা জায়েজ হবে না। সে নিদর্শন খাবার-পানীয়, পোশাকাদী, উপহার-উপঢৌকন ইত্যাদি যে কোন কিছুর সাথে সংশ্লিষ্ট হোক না কেন।

ভালোবাসার কথা : প্রিয় ভাই ও বোন! ভালবাসার জন্য কোন বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না। কোনো বিশেষ সঙ্গীর প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু বেলেল্লাপনা, বেহায়াপনা করার জন্য বিশেষ সময়, দিবস লাগে; বিশেষ সঙ্গী লাগে। কাজেই আপনি কোন দিকে যাচ্ছেন তা একটু ভেবে দেখুন!

এবং এসব ইতিহাস জানার পর আপনি একজন মুসলিম হয়ে পৌত্তলিকদের উদ্ভাবিত ও খ্রিস্টানদের সংস্কারকৃত কোন অনুষ্ঠান উদযাপন করতে পারেন না।

এবং আপনারা জাতির প্রাণ। দেশের ভবিষ্যৎ। আপনাদের নৈতিকতার পতন হওয়া মানে বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হওয়া। তাই আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে— বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উৎসবের নামে নৈতিকতা ধ্বংসের যে উন্মত্ত প্রতিযোগিতা চলছে, তা থেকে বিরত থাকুন।

আর একজন তরুণ আলেম ও মাদরাসা শিক্ষক মুফতী মাহমূদ হাসান এই দিবসটি সম্পর্কে তাঁর ভাবনা তুলে ধরেছেন এভাবে,

নিজেকে অল টাইম ভালোবাসুন। আনলিমিটেড ভালোবাসুন সারা বিশ্বের মুসলমানদেরকে। সীমাহীন ভালোবাসুন চারপাশের গরীব দুঃখী অসহায় মানুষদেরকে। বাস্তবিকপক্ষে নিজের আপন কাউকে ভালবাসতে হলে দিবসের প্রয়োজন হয় না। রক্তের বন্ধনে যারা আবদ্ধ তাদেরকে ভালবাসতে কোন সময় বা দিন নির্দিষ্ট করার আবশ্যকীয়তা নেই। বৈবাহিক কারণে যারা নতুন করে জীবনে আসে তাদেরকেও ভালবাসতে দিবসের দরকার হয় না। সর্বোপরি মনে রাখুন যে, যাদেরকে দেখা জায়েয তাদেরকে ভালবাসাও জায়েয। আর জাদেরকে দেখা নাজায়েয তাদেরকে ভালবাসাও নাজায়েয। তবে আল্লাহর সকল সৃষ্টিজীব একে অপরকে কারণ ছাড়াই ভালবাসতে পারে। এতে দোষের কিছু নেই।

মানবতার বহিঃপ্রকাশে মানুষ মানুষের প্রতি ভালবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা নিষেধ নয়। কারণ, ক্ষণস্থায়ী জীবনে একে অন্যের সৌহার্দ ও ভালবাসা ছাড়া জীবনযাপন করা অসম্ভব। আর যাদেরকে দেখা নাজায়েয তাদেরকে ভালবাসাও নাজায়েয। তবে আল্লাহর সকল সৃষ্টিজীব একে অপরকে কারণ ছাড়াই ভালবাসতে পারে। এতে দুষের কিছু নেই। মানবতার বহিঃপ্রকাশ্যে মানুষ মানুষের প্রতি ভালবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা নিষেধ নয়। কারণ, ক্ষণস্থায়ী জীবনে একে অন্যের সৌহার্দ ও ভালবাসা ছাড়া জীবনযাপন করা অসম্ভব। সামাজিক জীবনে মানুষ একজন অপরজনের ভালবাসা উপেক্ষা করে চলতে পারে না। সকল শ্রেণী পেশার মানুষের ভালবাসা ও সহমর্মিতা ব্যতিরেকে পৃথিবীর কেউ কোন জাতিকে আদর্শ সমাজ ও অনুসরণীয় মানুষ উপহার দিতে পারবেনা বলেই ভালোবাসা ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা কঠিন ও অস্বস্তিকর। বৈধ ভালবাসার বিনিময় ছাড়া সমাজের সুন্দর কাঠামোও নষ্ট হয়। একে অপরের প্রতি বৈধ মোহাব্বত না থাকলে কোন কালো মানুষ হয়ে যাবে একদম পাষাণ ও নিষ্ঠুর। হালাল ভালোবাসা ছাড়া মানুষ হয়ে যাবে নির্জীব নিষ্প্রাণ।

কিন্তু অত্যন্ত আফসোস ও পরিতাপ এই জন্য যে, রাষ্ট্রের সুশীল শ্রেণীরা মানুষের অন্তরে আল্লাহ দেওয়া দয়া ও উদারতাকে ভালবাসার নাম দিয়ে যুবক-যুবতিদেরকে অবৈধ প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে উৎসাহিত করে। বড় কষ্ট অনুভব হয় তখন, যখন দেখি টিভি-সিনেমা-চলচিত্রেও সমাজের শিক্ষিত নামের জ্ঞানপাপীরা ভালবাসার নামে মর্ডান ছেলে-মেয়েদের অবাধ যৌনাচার ও অশ্লীলতার পন্থা শিক্ষায়। এমনকি প্রায়ই শুনা যায় যে, কোন কোন এফএম রেডিও ও টিভি সিরিয়ালের প্রধান কাজই হচ্ছে নারীপুরুষের মুক্ত চিন্তা ও স্বাধীনতার নামে পুরুষ-মহিলার অবৈধ প্রেম-ভালাবাসার বৈধতা দেওয়ার ফন্দি আঁটতে তারা নিত্যদিন নতুন নতুন নানা অপসাংস্কৃতি সমাজে পরিচিতি লাভ করায়। ফলে সেই অসভ্যতা ও অপকর্ম কখনো আসে ভ্যালেন্টাইন ডে নাম ধারণ করে। আবার কখনো বিশ্ব ভালবাসা দিবস নামে সমাজে জায়গা দখল করে। আবার কখনো কখনো এসব নোংরামি উদযাপিত হয় থার্টি ফাস্ট নাইট হিসাবে।

প্রিয় পাঠক! আপনি কি কখনো চিন্তা করেছেন যে, ভালবাসা দিবসকে কেন ভ্যালেন্টাইন ডে বলা হয়? কেন ওরা ভালবাসা দিবসের ইংরেজী Love day বলে না? আর ভ্যালেন্টাইন-ই বা কে? কি তার পরিচর?

ওরা এসবের ইতিহাস আপনার সামনে কখনো উপস্থাপন করবে না। খারাপ লোকের ইতিহাস কেউ শুনে না বিধায় ওরা আপনার কাছে ভ্যালেন্টাইনকে অপরিচিত রাখে। অসভ্যরা গোপন রাখে আপনার নিকট ভ্যালেন্টাইন ও কুকর্মসমূহ। আর আপনারও এসবের সঠিক ও সত্য ইতিহাস জানার আগ্রহ নেই। নেই আপনার ভিতরে এসব বিষয়ে চিন্তা করার মত মন-মানসিকতা। আপনি তো আজকাল অনেক ব্যস্ত। আপনি তো আজ যৌবনের আগুনে পুড়ে পাগল সেঁজে বসে আছেন। আপনার দেহমনে তো আজ অবৈধ প্রেমের নেশা।

আপনি তো ভালোবাসা দিবসে নানা অপকর্ম সম্পাদনে বিভিন্ন কৌশল তৈরিতে মশগুল। নিজের বৈধ ভালোবাসার মানুষদের ভুলে আজ আপনি অবৈধ ভালোবাসার মানুষদের নিয়ে দিবা স্বপ্ন দেখেন। আপনি তো রক্তের বন্ধনে যারা আবদ্ধ তাদের ভালোবাসার কথা ভুলে অপরের হারাম ভালোবাসার ভিখারী। আপনি ভালোবাসার নামে আপনকে পর করে পরকে আপন করে কেন গুনাহে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা করেন? কেন অন্যের মেয়েকে ভালোবাসার ফাঁদে ফেলে যিনা- ব্যভিচারের লিপ্ত হবার আশা অন্তরে পোষণ করেন? কেন পরকীয়া করে অন্যের সুখের সংসারে অশান্তির দাবানল জালিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন? কেন অন্যের মেয়ের সাথে জোরপূর্বক প্রেমের অভিনয় করেন? আপনি কি চান যে, আপনার মেয়েকে নিয়ে অন্য ছেলে ভালোবাসার নামে তার সতিত্ব নষ্ট করুক? আপনার কি এটাই চাওয়া যে, আপনার আপন কাউকে দুষ্ট ছেলেরা প্রেমের নামে ঠোট, মুখে চুমু দিয়ে তার সম্ভ্রম অপবিত্র করুক? আপনার কামনা কি এটাই যে, আপনার প্রিয়জন দিনশেষে নিঃস্ব হয় ঘরে ফিরে আসুক?

আমার মনে হয় না যে, আপনি এমন আশা অন্তরে পোষণ করেন। আর আমার মতো আপনিও পবিত্র মনের মানুষ হলে এসবরে কোনটিই আপনার চাওয়া হতে পারে না। আপনি ভদ্র ও ধর্মীয় চেতনায় বিশ্বাসী হলে আপনার এসবের প্রতি ঘৃণা প্রকাশই উচিত। ভালোবাসার নামে ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন পরিহার করা উচিত।

সবশেষে আধুনিক যুগের ডিজিটাল যুবক-যুবতিদেরকে বলি যে, যদি ভালোবাসতে চান তবে সর্বপ্রথম আল্লাহ ও তাঁর নবীজিকে ভালোবাসুন। পৃথিবীর কারো সাথে মায়ার বন্ধনে জড়াতে হলে সে যেন হয় আপনার মা-বাবা, ভাই-বোন ও আপন আত্মীয়স্বজন। যদি খোদার সন্তুষ্টির আশায় কারো প্রেমে পড়তে চান তাহলে আপনি আপনার বিবাহিতা স্ত্রী-এর প্রেমে পড়ুন। ভালোবাসুন নিজের কলিজার টুকরা সন্তানদের। ভালোবাসুন পৃথিবীর সবাইকে সবসময়। এমনকি বন্ধুত্বের নামে প্রিয়জন হতে পারে আপনার অনুস্মরণীয় দ্বীনদার কোন বন্ধু। এছাড়া পবিত্র ভালোবাসার নামে সমাজে প্রচলিত প্রেম- মোহাব্বত ইসলামে নিষেধ ও বর্জনীয়। এসবই হচ্ছে ভালোবাসার নামে প্রকাশ্য অশ্লীলতা ও যৌনাচার।

[পাবলিক ভয়েসে প্রকাশিত মতামত বিভাগের যে কোন লেখার দায়ভার লেখকের। এখানে পাবলিক ভয়েসের সম্পাদনা পরিষদ এই লেখার দায় নেয় না]

মন্তব্য করুন