যৌনকর্মী : জানাজার আবেগ নয়, মুক্তির অধিকার দিন

প্রকাশিত: ৫:২১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০

বিশেষ প্রতিবেদন : দৌলতদিয়া পতিতালয়ের একজন পতিতার মৃত্যুর পর জানাজা হয়ে দাফন কাফন হয়েছে এটা এখন দেশ পেরিয়ে আলজাজিরা-বিবিসির হট নিউজ আর আমাদের ভাইরাল দেশের নতুন ভাইরাল টপিক! নাস্তিক-আস্তিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ও সন্তুষ্টির জায়গা ! বিস্ময়কর হচ্ছে আনেক ধার্মিক মুসলমানও বেশ সস্তির সাথে এই নিউজ শেয়ার করছেন! মতামত দিচ্ছেন আর নিজেদের সন্তুষ্টির কথা অকপটে জানাচ্ছেন !

অথচ একজন মুসলমান নারী পতিতা থেকে মৃত্যবরণ করলেন এর কোন কষ্ট আমাদের স্পর্শ করছে না !! পতিতাদের নানাবিধ মানবাধিকার নিয়ে দেশে বিদেশের নামকরা গণমাধ্যমে নিউজ হয় শুধু এঁদের মুক্তির বার্তা নিয়ে কোন নিউজ হয় না। আমরা যতবেশী সোচ্চার হবো সামাজিক অধিকার, শারীরিক অধিকার ও ধর্মীয় অধিকার নিয়ে ততবেশী চাপা পড়ে যাবে মুক্তির অধিকার। অধিকারের গল্পের মোহনীয় সোনালী শিকলে আটকে যাবে স্বাধীনতার সফেদ পায়রা। পরিবর্তনের বাণীরা মাথা ঠুকে ঠুকে হয়রান হয়ে যাবে তবুও আমার বোনেরা কোনদিনই পাবেনা মুক্তির দিশা।

কোন যৌনকর্মীই একজন মানবাধিকার নারীকর্মীর কাছ থেকে কনডম বা জন্ম নিয়ন্ত্রণের পিল চায় না বরং তাঁরা এই খাঁচা থেকে মুক্তি পেতে চায়। এইডস থেকে বাঁচার জন্য তার কোন প্রশিক্ষণ বা কর্মশালার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন প্রতি মূহুর্ত মৃত্যুবরণ করার চাইতে একেবারে মরে যাওয়াটা সহজ তাঁদের জন্য কিন্তু তাঁদের কপালে মৃত্যুরও অধিকার নেই।

মানবাধিকারকর্মী, এনজিও, নারী অধিকার নেত্রিরা তাঁদের মরতে দিবেনা, বাচতেও দিবেনা। তাঁদের জীবমৃত হয়েই বেঁচে থাকতে হবে এটাই এঁদের নিয়তি। তাঁদের এই নিয়তির উপর ভরসা করেই বেঁচে আছে দেশ বিদেশের অসংখ্য এনজিও প্রতিষ্ঠান আর এঁদের নেতা নেত্রীরা ।

পতিতাকে পতিতা বলা অন্যায় না ন্যায় এই আলোচনা অরেক দিনের জন্য তোলা থাকুক। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে এঁদের নিয়ে লিখতে সাহস করতে। যতবারই লিখতে গেছি ততবারই মাথা ঘুরে যেতো! দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে নামতো কষ্টের জল। একজন সাম্রাজ্যবাদীর কাছে ‘শী’ (She) একটি লাভজনক প্রডাক্ট মাত্র। যার দেহ যখন তখন খুবলে খাওয়া যায়। যাকে প্রয়োজন মত একহাত থেকে অন্যহাতে বিক্রি করা যায়। যাকে উপলক্ষ করে একটা বাজার গড়ে তোলা যায়। দেশ বিদেশ থেকে আয় করা যায় কোটি কোটি ডলার। ঠিক যেন একটা পুতুল! আর আমার কাছে আমার অচেনা অজানা কোন একজন বোন যাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে কতিপয় মানব রূপী নরপিশাচ। কিভাবেই আমি আমার বোনদের নিয়ে লিখতে পারি?

বাংলাদেশে পতিতার সংখ্যা বেশি না পতিতাদের নিয়ে কাজ করে এমন এনজিও সহ বিভিন্ন সংঘঠনের সদস্য বেশি এনিয়ে আমার বেশ ডাউট আছে। সমগ্র বাংলাদেশ মিলিয়ে নিবন্ধিত পতিতালয়ের সংখ্যা মাত্র ১৪/১৮ টি । এর বাইরে অনেক গুলো জেলা শহরের প্রশাসনের চোখের নিচে আর সাধারণের চোখের আড়ালে বড়জোর ২০ টা আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া যৌনপল্লী (১) যেখানে প্রায় ১২০০-১৬০০ মেয়ে কর্মরত আছে।এর বাইরে আরো কয়েকটা পল্লীতে ৫০০-৭০০ মেয়ে কর্মরত আছে বাকি সবগুলিতেই ৫০-২০০ করে মেয়ে আছে বলে ধরে নেই । নিবন্ধিত অনিবন্ধিত প্রায় ৪০-৪৫ টা পল্লী মিলিয়ে সর্বমোট সংখ্যা কোনমতেই ৩০০০০ ক্রস করবে না। ধরে নিন এখানে সেখানে ভাসমান আরো ১০০০০ হাজার আছে। সবমিলিয়ে ৪০০০০ হলো। এই চল্লিশ হাজার মানুষের সচেতনতা, সেবা সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দিতে সরকার ও এনিজিও মিলে প্রতি বছর যে পরিমাণ লোকবল ও অর্থবল ব্যায় করে তা দিয়ে এঁদের জন্য ১০ বার পুনর্বাসন সম্ভব।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ (২) নারী। এঁদের শ্রমটা অনেকটাই সস্তা বিক্রি হলেও মোটামুটি একটা সম্মান, সম্ভ্রম ও পরিবার নিয়েই কষ্টেসৃষ্টে খেয়ে না খেয়ে বসবাস করছে। এরা পতিতা নয় এটাই এঁদের সবচেয়ে বড় সম্মান।এঁদের সাথে বাইরে আরো ৫০ হাজার নারী সম্মানজনক উৎপাদনে অংশ নিতে পারে সহজেই কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয় !

কেন সম্ভব না তা জানতে নিচের লেখাটা মনপযোগ দিয়ে পড়ুন-

“যৌনব্যবসা একটা সংগঠিত, প্রতিষ্ঠিত ও লাভজনক মুনাফা আনয়নকারী ব্যবসা। এই ব্যবসার প্রসারের লক্ষ্যে মালিকপক্ষের নিযুক্ত চক্র সবসময় কাজ করে যায়। দালাল/অপহরণসহ বিভিন্ন অসাধু উপায়ে সংগ্রহ করা মেয়েদের চেহারা, বয়স ও আরো কিছু শর্তের ওপর ভিত্তি করে ২০,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকায় তাদের বিক্রি করা হয় যৌনপল্লিতে।(৩,৪)

এই বানিজ্যের মাধ্যমে যে শুধু মালিক, দালাল, যৌনকর্মীর পরিবার অর্থ উপার্জন করেন তা নয়, ব্রোথেল ভিত্তিক জনপদ যেমন পল্লীর সীমানার মধ্যে থাকা দোকান পাট, ফার্মেসী, কাঁচাবাজার এইসব মিলিয়ে এক বিরাট অর্থনৈতিক এলাকা লাভবান হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় যৌনপল্লী দৌলতদিয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্টানের সংখ্যা প্রায় ৫০০ এর মতো। একই এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩০০০ ক্রেতা অর্থ ব্যয় করেন। এর থেকেই এই ব্যবসার আর্থিক উপযোগীতা বোঝা যায়। তাছাড়া আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, আইনজীবী সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ পরোক্ষভাবে এই পেশার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনে সমর্থ হন।

নোবল বিজয়ী মানবাধিকার কর্মী কৈলাশ সাতিয়ার্থির করা সমীক্ষা অনুযায়ী পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে যৌনব্যবসায় ফলে অর্জিত বাৎসরিক আয় প্রায় ৩৪৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশেও একটা বিশাল অংকের অর্থ এই বানিজ্যের সাথে জড়িত। এই রিপোর্টে বলা হচ্ছে টানবাজার-নিমতলী থেকে বাড়িওয়ালারা প্রতি মাসে ১২ মিলিয়ন টাকা আয় করতেন”।

একজন সমাজকর্মীর লেখা। কি সুন্দর করে অমানবিক এই কাজটাকে একটা লাভজনক ব্যাবসা প্রমাণ করে দিলেন! অথচ এই ব্যাবসার মূলধন যে মানুষ তা তার লেখায় খুঁজে পাওয়া গেলো না । যেন লাভজনক এই ব্যাবসা বাঁচিয়ে রাখতে মানুষ বলি দেয়া রীতিমত পুণ্যের কাজ ! এর পক্ষে সাফাই গাইতে একজন নোবেল লরিয়েন্ট মানবাধিকার কর্মীর রেফারেন্সও উল্যেখ করলেন যদিও লাভজনক এই ব্যাবসার জন্য জনাব নোবেল লরিয়েন্ট সাবের পরিবারের অংশগ্রহণ কতটুকু তা সমীক্ষায় পাওয়া যায় নি !

এটা শুধু একজনের মানুষিকতা নয়। বাংলাদেশ সহ পৃথিবী জোরে যারাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িয়ে আছে তাঁদের সকলেরই । তাঁরা চায়না যৌনপল্লী বন্ধ হয়ে যাক । চায়না পুনর্বাসিত হোক খাঁচায় বন্দী থাকা অসহায় নির্যাতিত নিষ্পেষিত এই মানুষগুলো। মুক্তিপাক জাহান্নামের এই যন্ত্রণা থেকে।

পুরুষ তার প্রয়োজন মিটাতে নানা ছল কষে নারীকে উন্মুক্ত রাখতে চায়। পুরুষের চোখের সুখ দরকার এজন্য নারীকে মডেল হতে হবে! বিকিনি পরে হাটতে হবে একদল কামুক পুরুষ চোখের সামনে ।বালিতে শুয়ে থাকতে হবে !সাবান শ্যাম্পু নিয়ে বাথটাব বা সুইমিংপিলে সাতার কাটতে হবে!গাড়ির সামনে, বাড়ীর সামনে, খাবারের সামনে, মোবাইল হাতে, কলম-টুথব্রাশ-বিস্কিট হাতে নানা অঙ্গভঙ্গিমায় শরীর প্রদর্শন করতে হবে!বিজ্ঞাপনের বাজারে নারী ছাড়া ইন্ডাস্ট্রি অচল বলা চলে। পুরুষের কানের সুখ দেয়ার জন্য কিন্নর গলায় দাঁড়িয়ে শুয়ে বেঁকে কথা বলতে হবে, গাইতে হবে।আর শরীরের সুখের জন্য পতিতালয়তো আছেই ! কেউ নিজে নিচ হয়ে পতিতালয়ে গিয়ে শরীর আর হাতের সুখ মিটায় কেউ ভদ্র সেজে বাড়িতে, অভিজাত হোটেলে পাবে ভদ্র সাজের মেয়েদের সাথে ।চকচকে আধুনিকতা, তথাকথিত প্রগতিশীলতা, মুক্তচিন্তা, সমান অধিকার নারীবাদ দিন শেষে সব মেয়েকে বিছানাতেই নিয়ে যায় এটাই চরম বাস্তবতা।কাগজে কলমে দাস প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক আগেই কিন্তু বাস্তবে এর রূপ পরিবর্তন করে আধুকিতার বর্ম ধারণ করে দিব্যি টিকে আছে এই প্রথা।

নারী অধিকার কর্মীদের হাত থেকে নিপীড়িত নিষ্পেষিত অত্যাচারিত এসব মেয়েদের মুক্তি নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে লজ্জাজনক ও কষ্টকর এই পেশায় মেয়েদের বেঁচে থাকতে হবে এসব নারীবাদীদের পেটের ভাতের জন্য। সমাজে সুশীল সেজে বক্তৃতা বিবৃতি দেয়ার জন্য। পুরুষের প্রয়োজনে, পুরুষের স্বার্থে নারীদের এই জলাঞ্জলি তাঁদের ভাগ্য লিখন । কথায় বলে নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু আরেকজন নারীই।

আমি চিৎকার করে কাঁদতে চাই । সরোষে বলতে চাই আমার বোনকে মুক্তি দাও এই জাহান্নাম থেকে । নয়তো এঁদের হত্যাকরে ফেল । মিটিয়ে দাও দুনিয়ার মাটিতে। প্রতিদিন একটু একটু করে এঁদের হত্যা করোনা । এঁদের জানাজার অধিকারের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন বাঁচার এবং মুক্তির।

হে বোন ! আসুন মুক্তির কথা বলি। সত্যিকারের স্বাধীনতার কথা বলি । সম্মান ও সম্ভ্রমের কথা বলি।

তথ্যসুত্রঃ

১. shorturl.at/fhtGS
২. shorturl.at/CLUW8
৩. http://xn--37b.shorturl.at/TVY46
৪. http://xn--47b.shorturl.at/fgwCE
৫। ইন্টারনেট

মন্তব্য করুন