যেভাবে এলো ভালোবাসা দিবস!

প্রকাশিত: ৮:২৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

মুহাম্মাদ আরিফ রব্বানী : দরজায় কড়া নাড়ছে ১৪ ফেব্রুয়ারি বা ভালোবাসা দিবস; যা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। প্রতি বছর এ দিনে অনেক দেশের মতই বাংলাদেশেও উদযাপন করা হয় এ ‘ভালোবাসা দিবস’। রাষ্ট্রীয়ভাবে এর স্বীকৃতি না থাকলেও সরকারি বিধিনিষেধ না থাকায় এর জনপ্রিয়তা এখন আকাশছোঁয়া।

যদিও বলা হয় ভালোবাসার জন্য কোনো বিশেষ দিন নেই বা ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট দিনের সাথে সম্পৃক্ত নয়, ভালোবাসা প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত। তবুও একশ্রেণির মানুষের কাছে এই বক্তব্য অর্থহীন। তারা চায় ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্যও আলাদা একটা দিন ধার্য করা চাই। এই চাওয়াটা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ছোট-বড় সকলে এর প্রতি এখন ব্যাপকহারে ঝুঁকছে।

এই ভালোবাসা দিবসের পিছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। অর্থাৎ ঠিক কী কারণে এই দিবসের সূচনা—এ নিয়ে রয়েছে মতানৈক্য।   ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করে যেসব কারণ পাওয়া যায় তার কয়েকটি নিম্নরূপ–সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্লাডিয়াসের বিশাল এক সেনাবাহিনীর প্রয়োজন পড়ে। এতে সে যুবকদের অংশগ্রহণকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু যুবকশ্রেণি এ বাহিনীতে যোগ দিতে অনাগ্রহী প্রকাশ এবং বিবাহের ফলে যুদ্ধের স্পৃহা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় যুবকদের বিবাহের ওপর রোমসম্রাট নিষেধাজ্ঞা জারি করে বসে।

এই ঘোষণার পরপরই সে দেশের যুবক-যুবতিরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। তৎকালীন খ্রিষ্টীয় ধর্মযাজক ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’ও এ আদেশ মেনে নেয়নি। তাই সে স্বীয় গীর্জায় গোপনে বিয়ের কাজ চালিয়ে যায়।

ফলে এই ধর্মযাজককে ‘ভালোবাসার বন্ধু’ বা ‘Friend of Lovers’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কিন্তু তার এ গোপনভাবে বিয়ে পড়ানোর বিষয়টি বেশিদিন গোপন থাকেনি। রোমসম্রাটের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে সে তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়। সৈন্যরা সেই ধর্মযাজককে টেনে-হিচঁড়ে সম্রাটের সামনে হাজির করে আনে। অতঃপর সম্রাট তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় এবং তার মৃত্যু হয়ে যায়। ঘটনাটি ছিল ২৬৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে।

আরেকটি কারণ পাওয়া যায় এমন- ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’ তদীয় জমানার ধর্মযাজক হলেও সাথে সাথে চিকিৎসাশাস্ত্রও জানতো। সে যখন কারারুদ্ধ ছিল তখন অনেকেই শুভেচ্ছা জানাতে আসত। সেই সুবাদে কারারক্ষীর এক অন্ধ মেয়েও ফুলের তুড়া নিয়ে ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে আসতো। একপর্যায়ে ভ্যালেন্টাইন সেই মেয়েটির প্রেমে পড়ে যায়। পরে ’সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’ সে মেয়েটির চিকিৎসা করলে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসে। এই ঘটনা জানতে পেরে বাদশাহ তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সেটিও ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি।

তবে ‘উইকিপিডিয়া’র তথ্যমতে জানা যায়, ২৬৯ সালের দিকে তৎকালীন রোমসম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস ধর্ম প্রচারের অভিযোগ এনে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’কে গ্রেফতার করে। কারণ তখন রোমরাজ্যে খ্রিষ্টধর্ম প্রচার করা নিষেধ ছিল। অতঃপর কারাগারে থাকাকালীন জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তুলে। এতে ভ্যালেন্টাইনের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। ফলে তার প্রতি সম্রাটের হিংসা প্রকট হয় এবং তাকে হত্যা করে।

‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’র ইতিহাস খুঁজলে ঘুরেফিরে এই কয়েকটি কারণই পাওয়া যায়। তবে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’কে কেন্দ্র করেই আজকের ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বা ’ভালোবাসা দিবস’এর সূচনা—এ নিয়ে  কারো দিমত দেখা যায় না। তবে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে ৪৯৬ সালে। অর্থাৎ ‘পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইন’স স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন’ দিবস ঘোষণা করেন। খৃষ্টানজগতে পাদ্রী-সাধু সন্তানদের স্মরণ ও কর্মের জন্য এ ধরনের অনেক দিবস রয়েছে। যেমন: ২৩ এপ্রিল – সেন্ট জজ ডে, ১১ নভেম্বর -সেন্ট মার্টিন ডে, ২৪ আগস্ট – সেন্ট বার্থোলোমিজম ডে, ১ নভেম্বর – আল সেইন্টম ডে, ৩০ নভেম্বর – সেন্ট এন্ড্রু ডে, ১৭ মার্চ – সেন্ট প্যাট্রিক ডে।

বাংলাদেশে এ দিবসের সূচনা : ভালোবাসা দিবসের আমদানিকারক হিসেবে ধরা হয় সাংবাদিক শফিক রেহমানকে। কোনো এক কারণে এই শফিক রেহমান ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত লন্ডনে নির্বাসিত থাকে। কেউ বলে, সে এই সময় লেখাপড়া করার জন্য সেখানে ছিল। এই সময়টাতে লন্ডনে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’ ব্যাপকভাবে উদযাপন করা হতো। ফলে শফিক রেহমান সিদ্ধান্ত নেয় স্বদেশে এসে সে এ দিবসকে পুরো বাংলায় ছড়িয়ে দিবে। কারণ দর্শাতে গিয়ে বলা হয়, সে নাকি এ দিবসের মাঝে ভালোবাসার বাণী খুঁজে পেয়েছিল।

ঘনবসতির এই বাংলাদেশে নাকি ভালোবাসার খুব দরকার ছিল বলেও জানায় সে। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে এ দিবসটি শুরু করার আগে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’ থেকে ধর্মীয় কারণে ‘সেন্ট’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। অতঃপর ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভালোবাসা দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করে ব্যাপক প্রচার চালানো হয় সেসময়কার ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকায়। এরপর ধীরে ধীরে এ দিবসের প্রতি মানুষের ঝুঁক বেড়ে যায় এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে নেয়।

ভালোবাসা দিবস পালন নিষিদ্ধ যেসব দেশে: পরস্পরের মাঝে সম্প্রীতির বন্ধন গভীর করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এ দিবসের সূচনা হলেও তা বেশিদিন টিকেনি। কারণ পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে জন্মদিনের উৎসব বা ধর্মোৎসব যা-ই বলেন না কেন সবক্ষেত্রেই ভোগের বিষয়টি ছিল মুখ্য। তাই ভালোবাসা দিবসে গির্জা অভ্যন্তরেও মদ্যপানে তারা মত্ত থাকতো। তাই ভ্যালেন্টাইন দিবসের চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ভ্যালেইটাইন উৎসব নিষিদ্ধ করা হয়। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে বিভিন্ন সময়ে এ দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়। সম্প্রতি পাকিস্তানেও ২০১৭ সালে ইসলামবিরোধী হওয়ায় ভ্যালেন্টাইন উৎসব নিষিদ্ধ করে সেদেশের আদালত। [সূত্র,উইকিপিডিয়া]

বাবা-মা, ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে ভালোবাসার যদিও কোন নির্ধারিত দিনের প্রয়োজন নেই। তবুও অন্যান্য দিবসের মতো ভালোবাসার জন্য একটা দিবস থাকাটা খুব খারাপ কিছু ছিল না। কিন্তু বর্তমানে ভালোবাসা প্রদর্শনের ক্ষেত্র একমুখী হয়ে পড়েছে। এ দিনটি এলেই একশ্রেণির মানুষ ভুলে যায় তার বাবা-মা ও ভাইবোনের কথা। ভুলে যায় বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের কথা।

পড়ে থাকে শুধু প্রেমিকার সাথে। পার্কগুলোতে  ঘণ্টারপর ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দেয় তরুণ-তরুণীরা। প্রেমসাগরে হাবুডুবু খেতে থাকে দুজন। ক্ষেত্রবিশেষ দেখা যায়, ভালোবাসাদিবসে যুগলপ্রেমিদের অনেকেরই বিশেষ কিছু চাওয়াপাওয়া থাকে। প্রেমে বুদ হয়ে থাকা প্রেমিকা কোনপ্রকার আপত্তি ছাড়ায় তার প্রেমিকের তৃষ্ণার্ত অন্তর তৃপ্ত করতে সুযোগ করে দেয়। গানবাজনা এবং অশ্লীল ডান্সের আয়োজনও করা হয় কোথাও কোথাও। নষ্টামি, নোংরামি  আর দুরন্তাপনার যা আছে তার সবটাই এখন এ দিবসে দেখা যায়। এ দিবসসের সুযোগ নিয়ে উঠতি বয়েসের ছেলেমেয়েরা নানান অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। যেগুলো ইসলাম ও দেশের জন্য খুবই লজ্জার। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে বাংলাদেশেও এ দিবসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।

লেখক : ছাত্র, জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম, ঢাকা।

মন্তব্য করুন