জবি শিক্ষার্থী হাফিজুরের হার না মানা গল্প

প্রকাশিত: ৯:১৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

ফয়সাল আরেফিন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : জন্মগতভাবেই বিকল দুই হাত ও দুই পা, অন্যের সাহায্য ছাড়া যে ছেলেটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানেই যেতে পারেনা, সে কি না মুখে কলম ধরেই সম্মানেরসহিত অতিক্রম করেছে সম্মান ও মাস্টার্স পরীক্ষা। বলছিলাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিপরিচিত মুখ হাফিজুর রহমান এর কথা।

২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে কোনো ভর্তি কোচিং না করেই জবির ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান করে নেন হাফিজুর। ভর্তি হন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে। তখন থেকেই অচেনা এই নগরীতে একাকী সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তিনি। পরীক্ষার হলে মেঝেতে পাটিতে বসে ছোট টুলে খাতা রেখে মুখ দিয়ে লিখে পরীক্ষা দিয়ে গেছেন এই শিক্ষার্থী।

বিকল দুই হাত ও দুই পা নিয়ে ১৯৯৩ সালে বগুড়ার ধুনট উপজেলার বেলকুচি গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম নেন হাফিজুর রহমান। বাবা সদ্য প্রয়াত মো. মফিজ উদ্দিন পেশায় ছিলেন সাধারণ কৃষক , মা ফিরোজা বেগম গৃহিণী। চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট তিনি। বিয়ে করে সংসার নিয়ে ব্যস্ত হাফিজের তিন ভাই, তারাও কৃষি কাজ করেই নিজ নিজ সংসার কোনোমতে চালাচ্ছেন ।

এ প্রসঙ্গে হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা চার ভাই। সবাই বিয়ে করে তাদের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। কেউ বাবা-মাকে সাহায্য করতে পারে না। আমি যদি ভালো কিছু করতে পারি, তাহলে আমার ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার যাবতীয় খরচ আমি বহন করব।’

ছোটবেলা থেকেই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া হাফিজুরের পড়ালেখা ও যাবতীয় ভরণপোষণ কেটেছে পরনির্ভরশীলতায়। মাঝে সরকারের দেয়া প্রতিবন্ধী ভাতা, গ্রামের লোকজনের সাহায্য সহযোগিতা ও ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের টিউশনি করিয়ে নামমাত্র অর্থ উপার্জন করেছেন।

ছোটবেলায় বাবার কাছেই ‘বর্ণ পরিচয়’ শেখা হাফিজুরের। মূলত সুশিক্ষিত হবার প্রয়াস সেখান থেকেই। বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ব্র্যাক স্কুলে শুরু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন। সে সময় বেয়ারিংয়ের গাড়িতে করে সহপাঠীরা স্কুলে নিয়ে যেত তাঁকে। এভাবেই স্কুলে যাওয়া-আসার মধ্যে ২০০৯ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.১৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হন জ্ঞানপিপাসু হাফিজুর। তারপর অত্র উপজেলার ধুনট ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১১ সালে এইচএসসিতে জিপিএ ৩.৬০ পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি।

হাফিজুর বলেন, ” একসময় সবাই বলত আমার পক্ষে উচ্চশিক্ষা নেয়া সম্ভব নয়, হাল ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো পরিকল্পনা করতে। কিন্তু আজ আমি মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি, এটা জেনে আমার এলাকার অনেকেই গর্ব বোধ করে।”

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উদ্দেশে হাফিজুর বলেন, ‘নিজের দিকে না তাকিয়ে আমাদের উচিত লক্ষ্য স্থির করা। তাহলে আমরা সমাজের বোঝা হয়ে থাকব না। আমরা প্রতিযোগিতার সাধারণ মানুষের মতোই অংশগ্রহণ করতে পারব।’

বর্তমানে তিনি বেঁচে থাকার তাগিদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বসে আপাতত নিজের পড়ালেখার খরচ ও অসুস্থ বাবা-মাকে সহযোগিতা করার জন্য ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো সম্বলিত ব্যাগ, টি-শার্ট, হুডি, ব্যাজ ও বগুড়ার দইও বিক্রয় করছেন হাফিজুর, পাশাপাশি মানসম্মত চাকুরি প্রাপ্তির প্রত্যাশায় সাধ্যানুযায়ী পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

হাফিজুর বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইবোনদের যত ব্যাগ ও শার্ট লাগে, তা আমার এখান থেকেই কিনবেন । এতে আমি একজন অসহায় ভাই হিসেবে কিছু উপার্জন করার সুযোগ পাব। ভালোভাবে শেষ করতে পারব নিজের অবশিষ্ট পড়ালেখাও।’

তিনি বলেন, “বন্ধুরা যখন লাইব্রেরিতে বসে চাকুরির পড়ালেখায় মনোনিবেশ করছে,আমি তখন দুটো টি-শার্ট বিক্রির জন্য ছাত্রদের সাথে কথোপকথনে ব্যস্ত। আমি জানিনা আমার এই দুঃসহ জীবনের শেষ কোথায়?”

এদিকে ২০০৯ সালে মুখে কলম ধরে লিখে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারণার সুবাদে বেশ ক’জন মানব কল্যাণ হিতৈষী ব্যক্তি ও সংস্থা তার লেখাপড়া চালিয়ে যাবার জন্য সাহায্যের বাড়িয়ে দেয়। উপজেলা সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে মাঝে মাঝে সরকারের দেয়া কিছু শিক্ষাবৃত্তিও পেতেন এই মেধাবী যুবক। তবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তির সাথে সাথেই সহযোগী ব্যক্তি ও সংস্থাগুলো স্বাভাবিকভাবে হাফিজুরের দিক থেকে সহযোগিতার হাত গুটিয়ে নেয়।

আবার ঢাকায় তার দৈনন্দিন চলাফেরা ও অন্যান্য বিষয় দেখার জন্য ভাতিজা মো: ইব্রাহিম উচ্চমাধ্যমিকে অধ্যয়নরত, তার পড়ালেখার খরচও বহন করেন হাফিজুর। হাফিজুর জানান, তাঁর উচ্চশিক্ষা অর্থের অভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নিজের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। যদিও নিজের পাশাপাশি বাড়িতে পঙ্গু বাবার চিকিৎসার খরচ, মায়ের ভরণপোষণ এবং ভাতিজা ইব্রাহিমের লেখাপড়ার দায়িত্বও নিয়েছেন তিনি।

এদিকে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মজীবন শুরু করার প্রয়াসে চলতি বছরের এপ্রিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে সেকশন অফিসারের পদের জন্য আবেদন জানালেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাড়া পাননি তিনি।

একদিকে ঢাকায় ভাতিজার যাবতীয় খরচ ও টি-শার্ট বিক্রি করে দৈনন্দিন জীবন যাপনেই হাফিজুর ক্লান্ত, অন্যদিকে গ্রামে বার্ধক্যগ্রস্থ ও পক্ষাঘাত রোগাক্রান্ত পিতা ও বৃদ্ধা মা নূন্যতম খেয়ে পরে ভালো কিছুর আশায় এই হাফিজুরের দিকেই চেয়ে আছে।

তবুও হাল ছাড়েননি হাফিজুর, নিজের লেখাপড়া সম্পন্ন করে যত দ্রুত সম্ভব গ্রামের মা-বাবার ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ করতে চান, পাশাপাশি ভাতিজাদের পড়াশোনায়ও রাখতে চান অবদান।

একজন শারিরীক প্রতিবন্ধী মানুষ হয়েও এত লম্বা পথ পাড়ি দেয়া সম্পর্কে হাফিজুর বলেন, “ইচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব। আমার ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিলো শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করব ও অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হবো। আমি কারো বোঝা হয়ে বাঁচতে চাইনি। আমার বর্তমান অবস্থানে আসতে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে, এই বাধা পার হওয়ায় অনেকেই আমার পাশে ছিলেন, নানা ভাবে অনেকেই আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন তাদের প্রতি আমি চির কৃতজ্ঞ।”

সাধারণত হাত বা পা বিকল হওয়া মানুষগুলো সমাজের বোঝা হয়েই বাঁচে, এক্ষেত্রে সকল হাত-পা অকেজো হওয়া জবি শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান ছিলেন ব্যতিক্রম। নিজের অদম্য সাহস, প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় সংকল্প আজ হাফিজুরকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে এসেছে, সমাজের আর দশজন প্রতিবন্ধী লোকের জন্য সে আজ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছে।

মন্তব্য করুন