ইসলামী আন্দোলন নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন ও গাজী আতাউর রহমানের বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক মতামত

প্রকাশিত: ৬:২১ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০

গত ৮ ফেব্রুয়ারী জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাকের লীড কলামে প্রকাশিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিয়ে সুদীর্ঘ একটি বিশ্লেষণ মতামতের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে তার প্রতিবাদ বিশ্লেষন করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান। বিশ্লেষণে গাজী আতাউর রহমান লেখেন,

… দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার শামছুদ্দিন আহমেদ কে আজ বিকেলে ফোন দিয়েছিলাম, ধন্যবাদ জানানোর জন্য। তিনি ইত্তেফাকের মতো দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও প্রভাবশালী পত্রিকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিয়ে যে বিশাল প্রতিবেদন করেছেন, তাতে তিনি অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।

তবে ইসলামী আন্দোলনকে নিয়ে সমালোচনা করার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি তার প্রতিবেদনের অসঙ্গতি এবং স্ববিরোধী বক্তব্য গুলোও ধরিয়ে দিয়েছি। আমি বলেছি, ‘আপনার সমালোচনার জন্য ধন্যবাদ। সমালোচনা আরো করুন, আপনাদের সমালোচনা আমাদের রাজনীতিকে আরো পরিশীলিত করবে। তবে আপনাদের বক্তব্যে যদি অসঙ্গতি ও স্ববিরোধীতা থাকে, তাহলে আপনারাই প্রশ্নবিদ্ধ হবেন।’

আসলে আমাদের দেশের মূল ধারার গণমাধ্যমগুলো কোন সময়ই কোন ইসলামী শক্তির সাফল্যের স্বীকৃতি দিতে চায় না। ইসলামী শক্তির ছোটখাটো অর্জনগুলোকেও তারা কোন না কোনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। তারা সবসময়ই লুটেরা, দুর্নীতিবাজ ও ভোগবাদী রাজনৈতিক শক্তিকে প্রমোট করে আসছে।

আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন না আসার পেছনে আমার মনে হয়, আমাদের গণমাধ্যমও অনেকাংশে দায়ী। আজ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্য কে কেন্দ্র করে ‘রাজনীতিতে হঠাৎই হাত পাখার বাতাস’ শিরোনামে যে বিশাল লিড আইটেম ছাপা হয়েছে -এর কোথাও ইসলামী আন্দোলনকে বা এর নেতৃত্ব কে বিন্দুমাত্র সাফল্যের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।

বরং বিভিন্নভাবে ইসলামী আন্দোলনের গঠনমূলক রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমন চেষ্টা করতে গিয়ে প্রতিবেদক কয়েক জায়গায় স্ববিরোধিতারও আশ্রয় নিয়েছেন।

প্রতিবেদনের এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘রাজনীতির মাঠে সাংগঠনিকভাবে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে না থাকলেও এবং নির্বাচনের আগে ২০ দিনের প্রচারণায় দৃশ্যমান তেমন কোনো শক্ত অবস্থান দেখা না গেলেও ভোটের ফলাফলে জাপাকে টপকে ইসলামী আন্দোলন তৃতীয় স্থান দখল করে চমক দেখালেও এ নিয়ে সাধারণ্যের মাঝে নানা প্রশ্নেরও উদ্রেক হয়েছে।’

অথচ একই প্রতিবেদনে আবার বলা হয়েছে, “ঢাকার দুই সিটির এবারের নির্বাচনেও রাজধানীজুড়ে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে দুই মেয়র প্রার্থীর প্রায় সমতালে হাতপাখার বিপুলসংখ্যক পোস্টার দেখা গেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, বিএনপি’র দুই মেয়র প্রার্থীর পোস্টার এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি পোস্টার ছিল ইসলামী আন্দোলনের দুই মেয়র প্রার্থীর।
সিটি নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীরা নগরীর অলি-গলিতে বাধাহীনভাবে অবাধে মিছিল প্রচারণা করেছে। কোথাও হাতপাখার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার প্রচারণায় হামলার কিংবা নির্বাচনী ক্যাম্প গুঁড়িয়ে ফেলার খবর পাওয়া যায়নি।”

একবার বলা হলো, ২০ দিনের প্রচারণায় দৃশ্যমান শক্ত কোনো অবস্থান দেখা যায়নি আবার বলা হলো, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা বিএনপি প্রার্থীদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পোস্টার লাগিয়েছে এবং নেতাকর্মীরা নগরীর অলি-গলিতে ব্যাপকভাবে অবাধে প্রচারণা চালিয়েছে।

প্রতিবেদনের আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, “রাজনৈতিক বিশ্লেষক-পর্যবেক্ষক কারো কারো মতে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিজের শক্তিতে ভোটের রাজনীতিতে এ অবস্থান করতে পেরেছে – এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ভোটের রাজনীতিতে কোন দল আচমকা অবিশ্বাস্য চমক সৃষ্টি করতে পারে না। এর জন্য একটা ধারাবাহিকতা কিংবা সাংগঠনিক শক্তি অপরিহার্য। কার্যত ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্যে হয়তো এবারের সিটি ভোটসহ বিগত কয়েকটি নির্বাচনে চরমোনাই পীরের দল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছে। কোন ধরনের ভয়-ভীতি ও মামলা-হামলার শিকার না হয়ে নির্বিঘ্নে নিরাপদে দলটির প্রচার-প্রচারণা এবং বিপুল সংখ্যক পোস্টার লাগানোর চিত্রে সরকারি আনুকূল্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।”

কোন সচেতন ব্যক্তি প্রতিবেদনটি আগাগোড়া মনোযোগ দিয়ে পড়লে প্রতিবেদকের স্ববিরোধী বক্তব্যগুলো সহজেই ধরা পড়বে। আমাদের কথা হলো, ইসলামী আন্দোলনের সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি। সিটি নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের এই সাফল্য ইসলামী আন্দোলনের কাছে কোনো চমক নয়। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বরং জনগণ আসল চমক দেখতে পারত। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আরো ১০ বছর আগেই বরং এর চেয়ে ভাল রেজাল্ট করেছে।

এমনকি ২০০২ সালে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মেয়রপ্রার্থী মরহুম অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিন বিএনপির প্রার্থী মরহুম সাদেক হোসেন খোকার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৯৪ হাজার ভোট পেয়েছিলেন।

আরও পড়ুন :ঢাকা সিটি নির্বাচনে জাপার চেয়েও পাঁচগুন ভোট পেয়েছে হাতপাখার প্রার্থীরা

ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য এবং অবাধ প্রচারণার সুযোগ যদি সাফল্যের মূল কারণ হতো, তাহলে জাতীয় পার্টি এবং সিপিবি ইসলামী আন্দোলনের চেয়ে কম ভোট পেত না। তাদের সাথে সরকারের সখ্যতা অনেক গভীর এবং তারা অবাধ প্রচারণার সুযোগও পেয়েছে। এমনকি মিডিয়া কভারেজও পেয়েছে তারা ইসলামী আন্দোলনের চেয়ে বেশি। ফলাফলের দিক থেকে ইসলামী আন্দোলন তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও সকল মিডিয়ায় ইসলামী আন্দোলনকে দেখানো হয়েছে চার নাম্বারে। নির্বাচন কমিশনও ইসলামী আন্দোলনের নাম উচ্চারণ করেছে ৪ নাম্বারে।

প্রমাণিত বাস্তবতা হল, আওয়ামী লীগের সাথে যাদের কোনো না কোনো সময় সখ্যতা তৈরি হয়েছে, এদেশে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ চিরদিনের জন্য অন্ধকার হয়ে গেছে। ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে তারা অনেকটা নিঃশেষের পথে। এর প্রমাণ হলো আজকের জাসদ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় পার্টি। বিএনপি’র সারথিদের পরিণতিও তথৈবচ। এ দেশের জাতীয় রাজনীতিতে বিকাশ লাভ করতে হলে, এই দুই রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

আজ থেকে এক বছর আগে নয়াপল্টনের হোটেল গোল্ডেন প্লেটে সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ইত্তেফাকের সাংবাদিক শামছুদ্দিন আহমেদ এর এক প্রশ্নের জবাবে আমিই বলেছিলাম, “যতদিন পর্যন্ত আমরা বেগম জিয়ার নেতৃত্বে জোটবদ্ধ না হব, ততদিন পর্যন্ত জামায়াত-বিএনপির অনুরাগীরা এই প্রচারণা চালিয়ে যাবে যে, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্যতা রয়েছে। এই অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে, আমরা আমাদের রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন করবো না।

পরিশেষে ইসলামী আন্দোলন নিয়ে একটি বিশাল বিশ্লেষণ প্রকাশ করায়, দৈনিক ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এবং প্রত্যাশা করি, স্বাধীনতা অর্জনে ইত্তেফাক যে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিল, মানুষের ভোটাধিকার অর্জন -এর ক্ষেত্রেও যাতে সেভাবে ভূমিকা পালন করে।

দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদনটিও এখানে হুবহু তুলে দেওয়া হলো।

রাজনীতিতে হঠাৎ হাতপাখার বাতাস

শামছুদ্দীন আহমেদ : দেশে ভোটের রাজনীতিতে হঠাৎই কৌতূহল সৃষ্টি করেছে ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’। সর্বশেষ গত শনিবার অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মেয়র পদে ভোটের অঙ্কে বাংলাদেশের বড়ো দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরেই তৃতীয় স্থান করে নিয়েছে চরমোনাই পিরের প্রতিষ্ঠিত দলটি।

বিশেষ করে, ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে সংসদের প্রধান বিরোধীদল জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থীর চেয়ে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ‘হাতপাখা’ প্রতীকে পাঁচ গুণ বেশি ভোট পেয়ে এখন দেশ জুড়ে আলোচনায়। রাজনীতির মাঠে সাংগঠনিকভাবে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে না থাকলেও এবং নির্বাচনের আগে ২০ দিনের প্রচারণায় দৃশ্যমান তেমন কোনো শক্ত অবস্থান দেখা না গেলেও ভোটের ফলাফলে জাপাকে টপকে ইসলামী আন্দোলন তৃতীয় স্থান দখল করে চমক দেখালেও এ নিয়ে সাধারণ্যের মাঝে নানা প্রশ্নেরও উদ্রেক হয়েছে।

এর আগে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনেও কৌতুহলের জন্ম দেয় ইসলামী আন্দোলন। ঐ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে এককভাবেই সর্বোচ্চসংখ্যক, অর্থাত্ ২৯৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে চমক সৃষ্টি করে চরমোনাইর পীরের প্রতিষ্ঠিত দলটি। অথচ একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৬০, বিএনপি ২১৯ এবং জাপা মহাজোটগতভাবে ২৫টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল।

দলগতভাবে সর্বাধিক আসনে শুধু প্রার্থী দেওয়াই নয়, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে রাজধানীসহ সারাদেশে ‘হাতপাখা’র বিপুলসংখ্যক পোস্টার দেশের মানুষের নজর কাড়ে। বিএনপি ও দলটির পৃথক দুটি জোট ২০ দল এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংসদ সদস্য প্রার্থীরা প্রচারণায় নানা ধরনের বাধা, হামলা-মামলার মুখে পড়লেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নির্বিঘ্নে ‘মধুর’ প্রচার-গণসংযোগ চালিয়েছে। তবে দলটির কোনো প্রার্থীই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি, একাদশ সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে দলটির প্রার্থীরা সর্বসাকুল্যে পেয়েছিলেন ১২ লাখ ৫৪ হাজার ৮০০ ভোট। ঢাকার দুই সিটির এবারের নির্বাচনেও রাজধানী জুড়ে আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকে দুই মেয়র প্রার্থীর প্রায় সমতালে ‘হাতপাখা’র বিপুলসংখ্যক পোস্টার দেখা গেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থীর পোস্টারের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি পোস্টার ছিল ইসলামী আন্দোলনের দুই মেয়র প্রার্থীর। সিটি নির্বাচনেও ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা নগরীর অলিগলিতে বাধাহীনভাবে অবাধে মিছিল-প্রচারণা করেছে। কোথাও ‘হাতপাখা’র পোস্টার ছিড়ে ফেলার, প্রচারণায় হামলার কিংবা নির্বাচনি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক-পর্যবেক্ষকদের কারো কারো মতে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিজের শক্তিতে ভোটের রাজনীতিতে এ অবস্থান করতে পেরেছে—এটা তেমন বিশ্বাসযোগ্য নয়। ভোটের রাজনীতিতে কোনো দল আচমকা অবিশ্বাস্য চমক সৃষ্টি করতে পারে না। এর জন্য একটা ধারাবাহিকতা কিংবা সাংগঠনিক শক্তি অপরিহার্য। কার্যত, ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্যেই হয়তো এবারের সিটি ভোটসহ বিগত কয়েকটি নির্বাচনে (স্থানীয় সরকারের নির্বাচনসহ) চরমোনাই পিরের দল উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট পেয়েছে। কোনো ধরনের ভয়ভীতি ও মামলা-হামলার শিকার না হয়ে নির্বিঘ্নে-নিরাপদে দলটির প্রচার-প্রচারণা এবং বিপুলসংখ্যক পোস্টার লাগানোর চিত্রেই সরকারি আনকূল্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রাজনীতির এই বিশ্লেষক-পর্যবেক্ষকরা এও বলছেন, বিএনপির জোট সঙ্গী জামায়াতের শীর্ষ নেতারা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ায় রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে জামায়াত। দেশীয়-আন্তর্জাতিক বহুমুখী চাপে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে চরমোনাই পীরের পার্টিকে দেশের প্রধান ইসলামী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একটা প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাশাপাশি সংসদ ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে বিএনপি এবং জাপা কোনো কারণে না এলেও বিকল্প হিসেবে ‘হাতপাখা’ মার্কায় প্রার্থীদের মাঠে রাখার কৌশলও টের পাওয়া যায়। ২০১৫ সালের মতো এবারও ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে বিএনপি মাঝপথ থেকে সরে যেতে পারে—এমন একটি আশঙ্কার কথা খোদ আওয়ামী লীগের নেতাদেরই কেউ কেউ উচ্চারণ করেছেন। বিএনপি সরে গেলেও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসলামী আন্দোলনকে মাঠে রাখার কৌশল প্রতীয়মান ছিল।

যদিও একাদশ সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন পর রাজধানীর নয়াপাল্টনে একটি রেস্তোরাঁয় এই প্রতিবেদকসহ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতারা বলেছিলেন, ইসলামী আন্দোলন সম্পূর্ণ নিজের সাংগঠনিক শক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্যে কিংবা আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ইসলামী আন্দোলন ভোটের মাঠে বিস্তৃতভাবে থাকছে এবং অবাধে প্রচারণা চালাচ্ছে; এসব বিএনপি-জামায়াতের অপপ্রচার।

ঢাকার দুই সিটির গত শনিবারের ভোটে ভোটারের খরার মধ্যেও ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী আবদুর রহমান ২৬ হাজার ৫২৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। অথচ দক্ষিণে জাপার মেয়র প্রার্থী হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন পেয়েছেন ৫ হাজার ৫৯৩ ভোট। এই ভোটে গণফ্রন্টের প্রার্থীর চেয়েও কম ভোট পেয়ে জাপার হাজী মিলন পঞ্চম হন। এবার ঢাকা উত্তরেও ইসলামী আন্দোলনের মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে বারী ‘হাতপাখা’ মার্কায় ২৮ হাজার ২০০ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। উত্তরে অবশ্য এবার মেয়র পদে জাপার প্রার্থী ছিল না, দলটি ব্রি. জে. (অব.) জি এম কামরুল ইসলামকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) তার প্রার্থিতা বাতিল করে।

২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের পরই তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদ্বয়। ঐ নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে দলটির মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে বারী পেয়েছিলেন ১৮ হাজার ভোট, আর দক্ষিণে আবদুর রহমান পান ১৫ হাজার ভোট। ২০১৫ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার মেয়র পদে দলটি উত্তরে ১০ হাজার এবং দক্ষিণে সাড়ে ১১ হাজার ভোট বেশি পেয়েছে।

‘দল হিসেবে অন্তত ইসলামী আন্দোলনের তুলনায় জাপা বড়ো দল হিসেবে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত, এরপরেও এবার ঢাকা সিটির ভোটে জাপাকে পিছনে ফেলে ইসলামী আন্দোলনের মেয়র প্রার্থীরা তৃতীয় হয়েছেন, এর রহস্য কি?’ এমন প্রশ্নের জবাবে ইসলামী আন্দোলনের মিডিয়া সমন্বয়ক শহিদুল ইসলাম কবির গতকাল শুক্রবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা যেভাবে ভোট পাওয়ার কথা ছিল, সেভাবে পাইনি। আমরা সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করি। এজন্য আমাদের পার্টি সম্পর্কে জনগণের মাঝে আস্থা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যে ভোট পাওয়ার আশা করেছিলাম সেটির ২০ পার্সেন্টও পাইনি। সুষ্ঠু ভোট হলে আমাদের দুই মেয়র প্রার্থী আরো অনেক বেশি ভোট পেতেন।’

সাড়ে ৩২ বছর বয়সি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২০১৮ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলেও তৃতীয় হয়। ঐ নির্বাচনে দলটির মেয়র প্রার্থী মো. নাসিরউদ্দিন ‘হাতপাখা’ প্রতীকে ২৬ হাজার ৩৮১ ভোট পেয়েছিলেন। এটিই ছিল দলটির প্রথম সিটিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ। গাজীপুর সিটি ভোটে তখন ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী ১৬৫৯ ভোট এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী পান ৯৭৩ ভোট। খুলনা সিটির সর্বশেষ নির্বাচনেও প্রথমবার অংশ নিয়ে ইসলামী আন্দোলন পায় ১৪ হাজার ৩৬৩ ভোট। এটিও ছিল ঐ নির্বাচনে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট। খুলনা সিটি নির্বাচনে জাপার মেয়র প্রার্থী পেয়েছিলেন ১ হাজার ৭২৩ ভোট। আর ঐ নির্বাচনে সিপিবির প্রার্থী পান ৫৩৪ ভোট।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪০টির মতো। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নীরবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। রাজনীতিতে তেমন কোনো আলোচনায় না থেকেও ইসলামী শাসনতন্ত্রে বিশ্বাসী এই দলের ভোটের হিসাব রীতিমতো চমক তৈরি করছে।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৭ সালে চরমোনাই পীর মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এর আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তারা সাত দল মিলে ইসলামী ঐক্যজোটের অধীনে নির্বাচন করে। এ দুবারই তাদের দুজন প্রতিনিধি এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ এর নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট বাঁধে এরশাদের জাপার সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জোট থেকে বের হয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়। সেবার ১৬০ আসনে প্রার্থী দিয়ে তারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের বাইরে একমাত্র দল হিসেবে মোট ভোটের ১ শতাংশের বেশি ভোট পায়।

২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে দলটির একজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার কমলাবাড়ী ইউপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আলাউদ্দিন আলাল, নৌকার প্রার্থীকে ২১৮ ভোটে হারান তিনি। নারায়ণগঞ্জ, রংপুর, খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও দলটি চমক দেখিয়েছে। সেখানেও তাদের প্রার্থীরা অন্যদের চেয়ে ভালো ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহী সিটি নির্বাচনেও তাদের প্রার্থী ছিল।

ভোটের রাজনীতিতে ইসলামী আন্দোলনের হঠাত্ উত্থান সম্পর্কে দলটির আমীর মুফতি সৈয়দ মো. রেজাউল করিম পীরসাহেব চরমোনাই সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে এখন আর ছোটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই, আমরা বর্তমানে বাংলাদেশের ৩ নম্বর দল।

মন্তব্য করুন