হালজমানার ওয়াজ ও জামায়াত প্রসঙ্গ

প্রকাশিত: ২:৫৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০২০

ইসলামি আন্দোলনের নেতা সৈয়দ ফয়জুল করীম বলেছেন, জামায়াতে ইসলামির সাথে ঐক্যের প্রধান অন্তরায় হলো একটি মান্দার গাছ। কাঁটাযুক্ত ওই গাছটি না উপড়ানো পর্যন্ত দুই দলের মধ্যে ঐক্য সম্ভব নয়। তিনি ‘মান্দার গাছ উপড়ানো’ বলতে বুঝিয়েছেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর সাথে আকাবির ওলামায়ে কেরামের আকিদাগত যে মতনৈক্য আছে, ছিল সেগুলোর সমাধান আগে করতে হবে। এরপর ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হতে পারে’ তিনি বলেছেন।

আমি সৈয়দ ফয়জুল করীমের এই কথার সাথে কোনোভাবেই একমত নই। জামায়াত যদি ওলামায়ে কেরামের সাথে বসে বিতর্কিত বিষয়গুলোর সমাধান করে নেয় তবু তাদের সাথে ইসলামী আন্দোলনের রাজনৈতিক ঐক্য হওয়া উচিৎ হবে না। কারন আমরা জানি বাংলাদেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’ যারা ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে রাজনীতি করে।

সুতরাং আকিদাগত বিষয়ে জামায়াতের সংশোধনের সুযোগ থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। ইসলামী আন্দোলনের সাথে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দল জামায়াতের রাজনৈতিক ঐক্য কোনো দিনই গ্রহণযোগ্য হবে না। দেশের তৌহিদী জনতা গ্রহণ করবে না। তারা যদি কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায়, অনুশুচনা করে জাতী তাদের ক্ষমা করতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার বা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জামায়াতের তরুণ যুবক নেতারা যদি ইসলামকে আদর্শ মেনে রাজনীতি করেন বা করতে চান তবে জামায়াত ছাড়তে হবে। বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই।

কেউ কেউ যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয় সামনে আনতে পারেন। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার বিচার হলেই সবকিছু শেষ বা সমাধান হয়ে যায় না। জামায়াত আমাদের স্বাধীনতা বিরোধী দল, ৭১ এর অভিশপ্ত দল। তাদের সাথে রাজনৈতিক ঐক্যের কথা চিন্তা করাও ইসলামী আন্দোলনের জন্য শুভ হবে না।


হালজামানার ওয়াজ নসিহত আমাকে দারুণভাবে আহত করে। অধিকাংশ তরুণ যুবক বক্তার ওয়াজ নসিহতকে এখন আর ওয়াজ বলে মনে হয় না। মনে হয় ওগুলো ওয়াজের কুস্তি।

ছোট বেলায় আমরা অনেক দূরে দূরে ওয়াজ শুনতে যেতাম। নাম করা আলেম ওলামাদের ওয়াজ নসিহত শুনতাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো। তাদের ওয়াজে দরদ ছিল। মোলায়েম সুর ছিল। তাদের ওয়াজ শুনলে মন নরম হয়ে যেতো। মনে হতো তারা মুখ দিয়ে কথা বলতেন না, কথা বলতেন হৃদয় দিয়ে।

দরদ ভরা সুরের ওয়াজগুলো শ্রোতাদের কানে নয়, হৃদয় গিয়ে আঘাত করতো। বহু মানুষ বদলে যেতো। আমল আখলাখে শুদ্ধ হতো। তখন ওয়াজ নসিহতকে সমাজ সংস্কারের অন্যতম মাধ্যম হিসাবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এখন আর তেমনটা হয় না। এখনের ওয়াজগুলো বদলে গেছে। বক্তারা হৃদয় দিয়ে কথা বলেন না। শ্রোতাদেরও হৃদয় স্পর্শ করে না। বরং এ সময়ের তথাকথিত ওয়াজ সমাজে বিশৃংক্ষলা সৃষ্টির অন্যতম কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলে গেছে, বদলে যায়, আপগ্রেড হয়। এখন কোরআন হাদীস নিয়ে অনেক বেশি গবেষণা হয়। এখনের তরুণ যুবক আলেমদের বিদ্যা বুদ্ধি সে সময়ের আলেমদের থেকে অনেক বেশি অগ্রসর। কিন্তু ওয়াজ নসিহতে এর বাস্তব প্রতিফলন হচ্ছে না। আমাদের ওয়াজ সংস্কৃতি হাইজ্যক হয়ে গেছে। আমলদার আলেম, পীর মাশায়েখদের পরিবর্তে চলে গেছে ওয়াজব্যাবসায়ীদের দখলে।

এখনের ওয়াজ মানেই চিল্লাপাল্লা, হাসাহাসি, ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ আর পরচর্চা। কোনো কোনো বক্তার ওয়াজ শুনে বুঝতে পারি না ওগুলো ওয়াজ নাকী ভানু মতির কৌতুক। ওয়ায়েজরা গলার রগ ফুলিয়ে, শরীরের সর্ব শক্তি এক জায়গায় করে চিৎকার করেন। হুমকি ধামকি দেন। চোখ রাঙ্গিয়ে কথা বলেন। গিবত শেকায়েত করেন। সিনেমা বায়েস্কোপের গান করেন। তিরস্কার করেন। ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করেন। আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি করেন। যা কোনোভাবেই আমাদের ঐতিহ্যবাহী ওয়াজ সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় আদর্শের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ওগুলো পরিস্কার অশ্লীলতা। সামাজিক, নৈতিক ও শিক্ষাগত অবক্ষয়।

অধিকাংশ ওয়ায়েজের কথা শুনে সাধারণ শ্রোতাও সহজে বুঝে যায় কোরআন হাদিসের আলো তাদের মধ্যে নেই। গলার সুর বা গলার শক্তির উপর নির্ভর করে তারা ওয়াজব্যাবসা করেন। ঘুরেফিরে একই কথা বারবার বলেন। ভুল-বানোয়াট তথ্য দেন। অশুদ্ধ, অশালীন ভাষায় কথা বলেন। ব্যক্তিগত গল্প, পারিবারিক কেচ্ছা আর অন্যের দোষ ধরা, গিবত করা ছাড়া বিশেষ কিছু খুজে পাওয়া যায় না তাদের ওয়াজে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ওয়াজ করেন নাকী মাস্তানি করেন তাও বুঝতে পারি না।

আমি মনে করি বাংলাদেশে ওয়াজ নসিহতের জন্য এখন সব থেকে বেশি খারাপ সময় যাচ্ছে। ওয়াজের নামে যার যা ইচ্ছা তাই বলছে, করছে। কোরআন হাদিসের বয়ান নেই, রাসুলের (সা.) সিরাত নেই, শুধু চিৎকার চেচামেচি আর পরনিন্দা, পরচর্চা করা হচ্ছে। ইসলামে নারীর অধিকার, শিশুর অধিকার, সন্তানের অধিকার, মা বাবার অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, শিক্ষার গুরুত্ব, অর্থনীতি, সমাজনীতি, নৈতিকতা বা খুন, ধর্ষণ, মাদক নিয়ে কেউ মৌলিক আলোচনা করে না, করতে পারে না। পরস্পরকে আক্রমণ করে, পরস্পর বিরোধী মনগড়া ফতোয়া দিয়ে সময় পার করে আর ধর্মপ্রাণ মানুষের পকেট লুট করে।

আমাদের দেশে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সুফিবাদের একটা বড় ভূমিকা আছে। যারা পীর মুরিদ ধারায় ইসলাম প্রচার করেন তারা সুফিবাদ নির্ভর ওয়াজ করেন। আরেক পক্ষ তাদের সহ্য করতে পারেন না। খুব নিচু ভাষায় তাদের আক্রমণ করেন। সে সব আক্রমণের উত্তর দিতে গিয়ে সুফিবাদীরাও কম যান না। পাল্টা আক্রমণ করেন।

যেসব বক্তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত তারাও অভিন্ন কাজ করেন। ওয়াজের নামে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রচার করেন। রাজনৈতিক বিরোধীদের আক্রমণ করতে গিয়ে এত নিচু লেভেলে নেমে কথা বলেন- যা কোনো সভ্য সমাজে আলোচনা করা যায় না। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, পর্দা, জিকির আজকারের মতো মৌলিক ইবাদত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন। অথচ ওয়াজ নসিহত হওয়া উচিৎ ছিল আমলদার হক্কানি আলেমদের মাধ্যমে সহি কোরনআ হাদিস নির্ভর। রাসুলের (স) সিরাত নির্ভর। সাহাবিদের জীবনী নির্ভর। নৈতিকতা নির্ভর। আদব, তমিজ, সভ্যতা নির্ভর। কোমল, মোলায়েম, হৃদয় স্পর্শী। কিন্তু তা হচ্ছে না।

আমি মনে করি ওয়াজের নামে বর্তমান সময়ের তরুণ যুবক আলেমরা খুব কুৎসিত পথে ধাবিত হয়েছেন। নোংড়া প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছেন। এই ধারা থেকে এখনি বেরিয়ে আসা দরকার। পরিবর্তন দরকার। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে কিছু সজ্জন মানুষের এগিয়ে আসা দরকার। না হলে অচিরেই বাংলাদেশে দীন প্রচারের এই মহতি ধারা বন্ধ হয়ে যাবে। মানুষ ওয়াজ নসিহতের মজলিস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। যা হবে সমাজ, নৈতিকতা ও পরকালের জন্য চুড়ান্ত রকমের ক্ষতিকর।

দেশের হক্কানি আলেমগণ এগিয়ে আসতে পারেন। ওয়াজ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করা যেতে পারে। যেখানে শিক্ষিত আলেমদের বিষয় ভিত্তিক ওয়াজ প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। ওয়াজের আদব, মজলিসের আদব শেখানো হবে। ওয়াজের অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত শব্দযন্ত্র ব্যাবহার করে শব্দদুষণ বিষয়ে সচেতন করা হবে। আবাসিক এলাকায় বেশি রাত পর্যন্ত ওয়াজ করে রোগী শিশুদের ক্ষতি না করার বিষয়ে সচেতন করা হবে। অর্থাৎ ওয়াজের পরিবেশ বান্ধব, সমাজ বান্ধব, শ্বাস্থ্য বান্ধব দিক শেখানো হবে। ওয়াজের মাধ্যমে উপার্যনের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। ইনকাম ট্যাক্সের আওতায় এর আইনগত বৈধতা থাকতে হবে।

শুধুমাত্র প্রশিক্ষিত আলেমরাই ওয়াজ নসিহত করতে পারবেন। কেউ ভুল তথ্য দিলে, ভুল ফতোয়া দিলে ব্যাক্তিগত আক্রমণ না করে বরং সঠিকটা সহজ করে তুলে ধরতে হবে। শুধুমাত্র সঠিক বিষয় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেও যে অন্যের কথার বা ভুলের উত্তর দেয়া যায় এই ধারনা কায়েম করতে হবে। তাতেও কাজ না হলে ওয়াজ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহণ করবে।

এভাবেই চিৎকার চেচামেচি করা, অদরকারী কেচ্ছা কাহিনী বলা, অন্যকে আক্রমণকারী, ওয়াজের পরিবেশ নষ্টকারীদের সরিয়ে দিতে হবে। ওয়াজ নসিহতের সঠিক রুপ ফিরিয়ে আনতে হবে। অতীতের মতো বর্তমানেও ওয়াজকে সমাজ সংস্কারের অন্যতম মাধ্যম বানাতে হবে। অন্যথায় দীন প্রচারের এই মহতী সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।


উদাহরণ হিসাবে একজন আমীর হামজার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি সম্প্রতি চরমোনাইর পীর সাহেব এবং তাদের তরিকা সম্পর্কে চরম বিদ্বেষপূর্ণ কথা বলেছেন। অপরাধ মুফতী ফয়জুল করমী জামায়াতের কড়া সমালোচনা করেছেন, নারীর পর্দা ইস্যুতে মিজানুর রহমানের সমালোচনা করেছেন। আর এতেই চটেছেন ‘ভার্সিটির মাল’ খ্যাত ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের ভক্ত ওই যুবক বক্তা।

তিনি মনের সবটুকু খ্যাদ ঢেলে চরমোনাইর পীর সাহেবের সমালোচনা করেছেন। এর আগেও তিনি বহুবার ওয়াজের নামে বিতর্কিত বক্তব্য রেখেছেন। নারীদের অসম্মান করে কথা বলেছেন। রিকশা চালক, ভ্যান চালকসহ খেটে খাওয়া মানুষকে অসম্মান করে কথা বলেছেন। তিনি কথায় কথায় নিজেকে আওয়ামী পরিবারের সন্তান বলে পরিচয় দিয়ে মানুষকে চোখ রাঙ্গিয়ে কথা বলেন, হুমকি দেন।

অভিযোগ আছে আমীর হামজা জামায়াতে ইসলামীর পেমেন্ট বক্তা। জামায়াতের ক্যানভাস করার জন্যই তাকে মাঠে নামানো হয়েছে। কোরআন হাদিসের বিষয় ভিত্তিক বই থেকে কিছু আয়াতের পৃষ্ঠা নাম্বার মুখস্ত করে তিনি নিজেকে বাংলাদেশের জাকির নায়েক সাজাতে চেষ্টা করেন। অথচ তার একজন শিক্ষক বলেছেন, আমীর হামজা ছিলেন পেছনের বেঞ্চে বসে থাকা এক অমেধাবী ছাত্র।

ওয়াজের মাঠে এখন অনেক আমীর হামজা আছেন। যাদের ব্যাসিক শিক্ষা খুব দূর্বল। কিছু মুখস্ত বিদ্যা, অদরকারী কিছু বিদেশি ভাষা বলে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন। তারা কখন কী বলেন তা নিজেরাও ঠাওর করতে পারেন না। কেউ নাসায় যান, কেউ হোয়াইট হাউজের দাওয়াত ক্যান্সেল করেন, অক্সফোর্ডের সেরা শিক্ষক নির্বাচিত হন, এইডসের ভাইরাস গবেষণা করেন, চাঁদের দেশে পিকনিক করেন, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে নিজের নামও বদলে ফেলেন, আরো কতো কী! অথচ এদের ওয়াজে কোরআন হাদিসের মৌলিক আলোচনা খুঁজতে রীতিমতো মাইক্রস্কোপ ভাড়া করতে হয়।

আমি মনে করি এই আমীর হামজাদের সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভালো মানের আলেম বক্তা হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব। আদব লেহাজ, মানুষের প্রতি সম্মান শ্রদ্ধা শেখানো সম্ভব। পরিমার্জিত ভাষায় কথা বলা, সমালোচনা করা শেখানো সম্ভব। বিতর্ক এড়িয়ে কোরান হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ শেখানো সম্ভব। শুধুমাত্র সঠিক উদ্যোগ এবং সৎ নিয়ত প্রয়োজন।

পলাশ রহমান
প্রবাসী লেখক, সমালোচক

মন্তব্য করুন