নর্দমায় পাওয়া শিশু

প্রকাশিত: ৮:৫১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০২০

উম্মে ওয়াকিয়া

প্রতিদিন সকালে নামাজ পড়ে আমার আরেকটু ঘুমাতে হয়। না হয় ক্লাস করার সময় ঝিমুনি ঝিমুনি একটা ভাব থাকে। সেদিনও নামাজ পড়ে শুয়েছিলাম। চোখে একটু ঘুম আসতেই বাসার নিচে চিৎকার-চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে!।শহরে সাধারণত এত ভোরে বুয়া ছাড়া তেমন কেউ ঘুম থেকে উঠে না। এত চেঁচামেচি শুনে একটু ঘাবড়ে গিয়েছি।

আমাদের বাসার পাশে খালের মত একটা বড় নালা আছে। বৃষ্টির সময় নালা দিয়ে পানির স্রোত থাকে অনেক, আর পানিও প্রচুর। এমনিতে বেশি পানি থাকে না হালকা হালকা পানি থাকে। নিচে কি হয়েছে দুইতলা থেকে জানালা দিয়ে ঠিকভাবে বুঝা যাচ্ছে না। বাসার সবাই ঘুম। বাসা থেকে বের হব কি হব না করে শেষমেশ দরজা খুলে নিচে গেলাম।

নিচে অনেক গুলো মানুষ জড়ো হয়ে আছে। সেখানে পাশের বিল্ডিং এর বাড়ীওয়ালাও দাঁডিয়ে আছেন। জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কি হয়েছে? এক আপু বলল, ওই যে একটা বাজারের থলে দেখা যাচ্ছে থলেটার ভিতর একটা শিশু। শিশুটি এতক্ষণ অনেক কান্নাকাটি করেছে এখন আর কাঁন্নার শব্দ শুনা যাচ্ছে না। মনে হয় শিশুটি মারা গেছে।

অহ আল্লাহ কি বলেন! শিশুটুর কথা শুনে বুকের ভিতর কেমন যেন ছেদ করে উঠল! আপনারা এত্তগুলো মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শিশুটাকে নিয়ে গবেষণা করছেন অথচ শিশুটাকে কেউ বাঁচানোর চেষ্টা করছেন না।কেমন পাষণ্ড মানুষ আপনারা ? কেমন আপনাদের বিবেক? আমরা কোথায় বাস করছি, কেমন আমাদের সমাজ.?

আমার কথা শুনে একটা ছেলে বলে উঠল, নালার বাচ্চাটাকে নিয়ে কে বিপদে পড়বে? মা-বাবার পরিচয় নাই কার বলা-মসিবত কার উপর আসে আবার কে জানে? ছেলেটার কথা শুনে এতই মেজাজ খারাপ হল, যা বুঝানো যাবে না। ইচ্ছে করেছে দুগালে দুটা থাপ্পড় লাগিয়ে দিতে।

আপনারা নিজেকে রক্ষা করার জন্য সদ্য জন্ম নেওয়া একটি অসহায় শিশুকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছেন?আপনারাওতো দেখি শিশুটির মায়ের মত খুনি। সবাই শিশুটার মাকে কলঙ্কিত, খুনি আরও অনেক কিছু বলে বকাঝকা দিচ্ছে। যার মুখে যা আসছে তাই বলতে লাগলো। আমি বললাম, আপনারাও তো এই নিষ্পাপ শিশুটির সাথে জানোয়ারের মত আচরণ করলেন। অপরাধ আপ্নারাও কম করেননি। তখন সবাই চুপ হয়ে যায়।

আমি স্যান্ডেল পরে, নালায় নেমে শিশুটাকে নিলাম। শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে কাঁদার মত আর শক্তি নেই। আমি শিশুটাকে থলে থেকে বের করলাম। শিশুটার মুখ আর নাভি দিয়ে ব্লাড বের হচ্ছে, নাভিটা কেটে সুতা দিয়ে বেঁধেছে। নাভি দেখেই মনে হচ্ছে ঘরোয়া ভাবে ডেলিভারি হয়েছে। শিশুটার একটু একটু করে শুধু বুকের অংশটা নড়ছে, তাও ভাল করে খেয়াল করলে বোঝা যাচ্ছে শিশুটি এখনো বেঁচে আছে।

আমি তাড়াতাড়ি ড্রাইভারকে গাড়ী বের করতে বলি। সাথে আমার মেজ ভাইয়াকে নিয়ে যাই। একটা সরকারি মেডিকেলে শিশুটিকে ভর্তি করে দিই! শিশুটির সাথে আমি মেডিকেলে অনেকক্ষণ থাকার পর একটা বুয়াকে ফোন করে এনে শিশুটার সাথে মেডিকেলে থাকার ব্যবস্থা করি।

ডাক্তার জিজ্ঞাস করছেন..শিশুটার মা কোথায়? শিশুটার অবস্থা তেমন ভাল না। আমি ডাক্তারকে সত্যটাই বলে দিয়েছি, -শিশুটিকে আমি একটি বাজারের থলের ভেতর নালায় পেয়েছি। এই অসহায় শিশুটি এখন মৃত্যু-পথের যাত্রী। একটি প্রাণ বাঁচানো আমাদের সবার দায়িত্ব। প্লিজ! আপনি শিশুটি কে ভাল ট্রিটমেন্ট দেন। খরচ-খচরা আমি বহন করবো।

শিশুটির জন্য দুধের টিন, ফিডার আর কিছু কাপড় কিনে বুয়ার হাতে কিছু টাকা দিই ট্রিটমেন্ট এর জন্য। প্রয়োজনে আমাকে ফোন দিতে বলে আমি বাসায় আসি। চারদিন ধরে আমি প্রতিদিন মেডিকেলে আসা-যাওয়া করছি। আজ ভোরে শিশুটি না ফেরার দেশে চলে গেল। হাসপাতালাতে গিয়ে দেখলাম বেডে পড়ে আছে শিশুটির প্রাণশূন্য দেহ।

আই.এ/

মন্তব্য করুন