একঝাঁক সৈয়দ বেলায়েত, সিদ্দিকী, মিছবাহ ও নেছার উদ্দিন চাই!

প্রকাশিত: ৪:৫৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০২০

কিছু দিন আগে দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকায় ইসলামী আন্দোলনের নেতা (নায়েবে আমীর) সৈয়দ ফয়জুল করীমের একটি সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। প্রচন্ড রকমের বুদ্ধিদীপ্ত ভাষায় তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। একজন দেশপ্রেমিক ঝানু রাজনীতিকের ফ্লেভার ছিল তার সাক্ষাৎকারে।

অল্প কথায় খুব গোছালো ওই সাক্ষাৎকার পড়ে প্রভাবিত হয়েছিলাম। দেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশান্বিত হয়েছিলাম। সে কথা অকপটে লিখেছিলাম জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম পাবলিক ভয়েসে। অল্প দিনের ব্যাবধানে ঢাকার একটি রেডিও‘র সাথে ফয়জুল করীমের আরেকটি সাক্ষাৎকার শুনলাম। ভয়েজ রেকর্ডের পাশাপাশি সাক্ষাৎকারটির ভিডিও রেকর্ডও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এবার আশান্বিত হতে পারিনি। বরং পত্রিকার সাক্ষাৎকারে যতোটা প্রভাবিত হয়েছিলাম এখানে ততটা না হলেও বেশ খানিকটা আশাহত হয়েছি।

এবার তিনি একেবারেই গোছালো বা বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলতে পারেননি। সাধারণ স্বভাবসুলভ এক জায়গায় ঘুরপাক খেয়েছেন। এক কথা বারবার পেচিয়েছেন, রিপিট করেছেন। ইসলামপন্থী রাজনীতি নিয়ে, অর্থনীতি নিয়ে, শিক্ষা নিয়ে, নৈতিকতা নিয়ে, প্রচলিত শাসনব্যাবস্থা নিয়ে, অন্তরায় নিয়ে কথা বলার সময় তিনি কোনো বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারেননি। তার কথায় কোনো মৌলিক চিন্তা ভাবনা প্রকাশ পায়নি। প্রশ্নকারীর কৌশল বুঝে, রেডিও শ্রতাদের চিন্তা চেতনার জায়গা বুঝে কথা বলেননি। কিছু উত্তর দিতে হয় তাই গতানুগতিক ভাষায় দিয়েছেন, যা অনেক শ্রোতাকে হতাশ করেছে।

জানি না কেনো তিনি শ্রোতাদের হতাশ করলেন। হয়তো সাক্ষাৎকারের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। ব্যাস্ততার কারনে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেননি। প্রশ্নগুলোয় আগে থেকে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেননি, ইত্যাদি।

আমি মনে করি আপাতত এ জাতীয় সরাসরী সাক্ষাৎকারে না যাওয়াই ভালো। বরং বেশি বেশি লিখিত সাক্ষাৎকার দেয়া উচিত। সরাসরী সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে আগে থেকে প্রশ্নগুলো দেখে নেয়া উচিৎ। কথা বলার আগে একটু চিন্তা করার, পরামর্শ করার সময় নিয়ে উচিৎ। ভিডিও রেকর্ডের ক্ষেত্রে আরো বেশি সতর্ক হওয়া উচিৎ।

সৈয়দ ফয়জুল করীম গড় আলোচনা ভালো করেন। পাবলিক মিটিং-এ মানুষকে উজ্জিবিত করতে তার অনেকগুলো ভালো মানের বক্তৃতা আছে। একজন দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী নেতার মতো বক্তৃতা করে তিনি ইতোমধ্যে দেশের চিন্তাশীল মহলের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু বিষয় ভিত্তিক আলোচনায়, সাক্ষাৎকারে কেমন যেন গন্ডিবদ্ধ হয়ে থাকেন। একই জায়গায় ঘুরপার করেন। কোনো বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করেন না। সমাধানের কথা বলেন না। মৌলিক কথা বলেন না। কিছু গদবাঁধা অভিযোগমূলক কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেন।

আমি মনে করি এই সাধারণ সীমাবদ্ধতা, গন্ডিবদ্ধতা তাকে ভাংতে হবে। তিনি যে গতিতে দেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির ঝান্ডা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তাকে আরো বেশি বিস্তর হতে হবে। উদারতা, বিশালতা নিয়ে কথা বলতে হবে। হুটহাট যে কোনো জটিলতায়, বিতর্কে জড়ানো যাবে না। সব বিষয়ে একা কথা বলার মানষিকতা পরিবর্তন করতে হবে। গণমানুষের চোখের ভাষা, মনের ভাষা পড়ে কথা বলতে হবে। হুট করে কারো প্রতি বেশি আবেগ প্রকাশ করা যেমন তার জন্য ক্ষতিকর, তেমন তিরস্কার করা, প্রতিক্রিয়া দেখানোও ক্ষতিকর।

আধুনিক সমাজে সমালোচনা করার একটা ভাষা আছে, প্যাটার্ন আছে; যা রক্ষা করা তার স্তরের মানুষের জন্য অপরিহার্য। কেউ অন্যায় করলে, শরীয়তের বাইরে গিয়ে কথা বললে, দেশের স্বার্থ বিরোধী কথা বললে যেমন সমালোচনা বা প্রতিবাদ জানাতে হবে তেমন মানুষের গুনবাচক দিক নিয়েও কথা বলতে হবে। যোগ্যতার প্রশংসা করতে হবে। কিন্তু তা না করে তিনি যদি যত্রতত্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বসেন, অতি আবেগি হয়ে বা রাগান্বিত হয়ে মানুষের সুরেলা কন্ঠ নিয়ে, বিদেশি ভাষা জানার যোগ্যতা নিয়ে তিরস্কার করেন তা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য হয় না। বরং নিজের অযোগ্যতা বা মনের দৈন্যতা প্রকাশ পায়। চিন্তাশীল মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করে না। আধুনিক সমাজে স্থান পায় না।

আমি মনে করি সৈয়দ ফয়জুল করীমকে আরো সংযত, শালিন এবং বুদ্ধিদীপ্ত ভাষায় কথা বলতে হবে। সমালোচনা বা প্রতিবাদের ভাষায় কৌশলী হতে হবে। দরদ মিশিয়ে কথা বলতে হবে। কাউকে ঠেলে ধাক্কিয়ে শত্রু বানানো যাবে না বা বিপরীত শিবিরে তুলে দেয়া যাবে না। মানুষের যোগ্যতার, প্রতিভার মূল্যায়ন করতে হবে। সব বিষয়ে, সবার বিষয়ে, সব কথা একা বলার মানষিকতা পাল্টাতে হবে। মনে রাখতে হবে তার স্তরে বসে সব কথা, সবার কথা একা বলা বা বলার চেষ্টা করা মানানসই হয় না। গ্রহণযোগ্যতা পায় না।

তিনি যে দায়িত্ব, যে মিশন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সেখানে দাঁড়িয়ে সব বিতর্কে নিজে জড়াতে পারেন না। বরং তার ডানে বায়ে, সামনে পেছনে একঝাঁক সৈয়দ বেলায়েত হোসেন, হাফিজুর রহমান সিদ্দিকী, হাবিবুর রহমান মিছবাহ, নেসার উদ্দিন, ইব্রাহিম খলিলদের সক্রিয় করতে হবে। কথা বলার, লেখার স্পেস তৈরী করে দিতে হবে। নতুন নতুন বক্তা, লেখক তৈরী করতে হবে। যারা দূরে সরে আছে তাদের টেনে এনে কাজে লাগাতে হবে। কিছু বিষয়ে কথা বলার ভার তাদের উপর ছেড়ে দিতে হবে।

ওয়াজ নসিহতের ক্ষেত্রে চরমোনাই তরিকার প্যাটার্নে জিকিরের বয়ান, কবরের বয়ানের পাশাপাশি কিছু বিষয় ভিত্তিক বয়ানে মনোযোগ দেয়া দরকার।

যেমন ইসলামে নারীর অধিকার, যুব সমাজের দায়িত্ব, খুন, ধর্ষণ, মাদকসহ সমাজের জন্য বিভিষিকাময় বিষয়ে ইসলামের হুকুম, ঘুষ, দূর্নীতির বিষয়ে ইসলামের হুমুক, নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, ইসলামের অর্থনীতি, বিশ্বনীতি, সমাজনীতি, পরিবারনীতি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুনীতি, শিশু অধিকার, অভিভাবকের দায়িত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলোতে একদম বিষয় ভিত্তিক বয়ান হওয়া দরকার। যেকোনো একটি বিষয়ে কমপক্ষে এক ঘন্টার মৌলিক এবং দক্ষ বয়ান হওয় দরকার। প্রয়োজনে সিলেবাস করে এসব বিষয়ে বয়ান বা আলোচনা বাড়ানো দরকার।

পলাশ রহমান
ইতালী প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট, প্রডিউসার রেডিও বেইস ইতালী

[পাবলিক ভয়েসের মতামত বিভাগে প্রকাশিত যে কোনো লেখার দায় লেখকের নিজের। পাবলিক ভয়েসের সম্পাদনা পরিষদ এ লেখার দায় গ্রহণ করে না। তাই এই লেখার জন্য পাবলিক ভয়েসের সম্পাদনা পরিষদকে দায়ী করবেন না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে পাবলিক ভয়েসের সম্পাদনা পরিষদের নীতির সাথে অসামঞ্জস্য লেখাও এখানে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। কেবল ধর্ম এবং রাষ্ট্রবিরোধী কোনো লেখা প্রকাশ করা হয় না। চাইলে আপনিও তথ্য বা যুক্তিসমৃদ্ধ লেখা এখানে পাঠাতে পারেন।]

মন্তব্য করুন