তুরাগ তীরের বিশ্ব ইজতেমার ইতিহাস; মুফতী এইচ এম আবু বকর সিদ্দীক

মাহিন মাহিন

মুহসিন

প্রকাশিত: ৮:২৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০২০

তুরাগ তীরের বিশ্ব ইজতেমা সাধারণ মুসলমানদের আবেগ ও ভালোবাসার নাম। বিশ্বব্যাপী ইসলামের দাওয়াতের মিশনারী তাবলীগী জামাতের সর্ববৃহৎ জমায়েত এটি। ধারণা করা হয় পবিত্র হজের পরে মুসলিম জাতির সবচেয়ে বড় সম্মেলন এই তুরাগ তীরের ইজতেমা। কোথায় এই আয়োজনের উৎপত্তি এবং বাংলাদেশ কীভাবে এর অংশীদারত্ব পেল তা জানতেই বক্ষমান নিবন্ধের প্রয়াস।

বাংলাপিডিয়ায় দেয়া তথ্য বলছে, “১৯২৬ সালে হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) ভারতের উত্তর প্রদেশের মেওয়াত এলাকায় তাবলীগী জামাতের গোড়াপত্তন করেন এবং একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক সম্মিলন বা ইজতেমার আয়োজন করেন। কেউ অবশ্য এর শুরুটা ১৯১০ সাল আবার কেউ ১৯২০ সালের কথাও বলেছেন। শুরু যখনই হোক কালক্রমে তাবলীগ সমগ্র উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করে এবং উপমহাদেশের বাইরেও এর প্রভাব পড়ে। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে ইজতেমার ধারণা শুরু হয়েছিল ভারতে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সূত্র ধরে উপমহাদেশের ভারত, পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান – এ তিনটি অঞ্চলে মুসলমানদের অবস্থান সাপেক্ষে তাবলীগের তিনটি কেন্দ্র স্থাপিত হয়। ভারত ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে ইজতেমা হতো। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এটি ভারত, পাকিস্তান বা অন্য কোন দেশে না হয়ে বাংলাদেশেই স্থায়ী হয়েছে।

তাবলীগী জামাতের শূরা কমিটির সদস্য খান শাহাবুদ্দিন নাফিস বাংলাদেশে ইজতেমা স্থায়ী হওয়ার কারণ হিসেবে বলছিলেন, “এর একটা কারণ ছিল সে সময়ে বাংলাদেশের ভিসা পাওয়া সহজ ছিল। ইজতেমার নামে কেউ ভিসা আবেদন করলে কেউ ফেরত যেত না। এটা সরকারের একটা ভালো পলিসি ছিল”। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার এই ইজতেমাকে সমর্থন করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির শিক্ষক এবং লেখক একেএম খাদেমুল হক বলেন যে দুটো কারণে বিশ্ব ইজতেমার স্থায়ী ঠিকানা বাংলাদেশে হয়েছে। “একটি বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ। আরেকটি তাবলীগ জামাতের যে আন্দোলন সেটা পুরো দক্ষিণ এশিয়া-কেন্দ্রীক। যদিও ভারতে এর শুরু কিন্তু ভারতে মুসলিম-প্রধান দেশ না হওয়ার কারণে অনেক দেশের মুসলিমরা সেদেশে যেতে কমফোর্ট ফিল করেননি। আবার পাকিস্তানকে নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে।”

একেএম খাদেমুল হক আরও বলেন, তাবলীগের জামাত বাংলাদেশে শুরু থেকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা যতটা পেয়েছে ততটা ভারত বা অন্য কোথাও পায়নি। এছাড়া সবচেয়ে কম খরচে মানুষ বাংলাদেশে আসতে পারতো। গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমা হওয়ার পিছনে কিছু রাজনৈতিক কারণও ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আব্দুর রশিদ বলেন, ভারতের কিছু স্থানে তখনো মুসলমানদের মধ্যে শিয়া-সুন্নি মতবিরোধ ছিল। সে তুলনায় বাংলাদেশে মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল, যাকে একটা নিরাপদ পরিবেশ বলে মনে করেছিলেন তারা।

ভারত এবং পাকিস্তান – এই দুটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ তুলনামূলক নিরপেক্ষ একটা স্থান ছিল।

কারণ হিসেবে বলা হয়, রাজনৈতিক কারণে তখন ভারতের নাগরিকরা যেমন সহজে পাকিস্তানে যেতে পারতেন না, তেমনি পাকিস্তানের নাগরিকদের জন্য ভারতে পাওয়া ছিল কঠিন একটি বিষয়। ফলে বাংলাদেশই ছিল ওই দেশ যেখানে সহজে সবাই আসা-যাওয়া করতে পারতেন বলে গবেষকরা মনে করেন।

তবে তাবলীগের ইজতেমা যে বিশ্বের অন্য কোথাও হচ্ছে না তা নয়। পাকিস্তানের রাইবেন্ড এবং ভারতের ভোপালে বড় আকারে ইজতেমা হয় বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতেমার ঠিক আগে ও পরে।

তবে যে সংখ্যায় বিদেশীরা বাংলাদেশের ইজতেমায় আসেন, তাতে করে তুরাগ তীরের ইজতেমাই ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে।

বাংলাদেশে ইজতেমা
১৯৫০-এর দশকে বাংলাদেশে তাবলিগের দাওয়াতি কাজ শুরু হয়। আর তা ১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনা পার্ক সংলগ্ন কাকরাইল মসজিদ থেকে যাত্রা শুরু করে। তৎকালীন সময়ে মাওলানা আব্দুল আজিজ (রাহ.) বাংলাদেশে ইজতিমার হাল ধরেন। তখন থেকেই বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় মারকাজ বা প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদ থেকে এই সমাবেশ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা আরম্ভ হয়।

১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনা পার্ক সংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে প্রথমবারের মতো তাবলিগ জামাতের বার্ষিক সম্মেলন বা ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়।

২ বছর অতিক্রম হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে চট্টগামে তৎকালীন হাজি ক্যাম্পে দ্বিতীয়বারের মতো তাবলিগের সম্মেলন বা ইজতেমার আয়োজন করা হয়।

তার ১০ বছর পর ১৯৫৮ সালে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতিমা অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন সময়ে তাবলিগের এ সম্মেলন শুধুমাত্র ইজতেমা নামেই প্রচার ও পরিচিত ছিল।

তাবলিগের প্রচার-প্রচারণা দিন দিন প্রসারিত হতে থাকে। বাড়তে থাকে তাবলিগের সাথী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সংখ্যা।

এ কারণে ৮ বছর পর ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে ইজতিমা আয়োজন করা হয়। সে বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাবলিগের এ ইজতেমায় ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও তাবলিগের সাথীরা অংশ গ্রহণ করে।

আর সে বছর থেকেই এ ইজতেমাকে বিশ্ব ইজতেমা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আর বিশ্বব্যাপী ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে থাকে এ ইজতেমা।

১৯৬৬ সালের পর থেকে প্রতি বছরই টঙ্গীর তুরাগ নদীর উত্তর পূর্ব তীর সংলগ্ন ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু জমি মিলিয়ে রাজউকের হুকুমদখলকৃত ১৬০ একর জায়গার বিশাল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এ ইজতেমা। যা বিশ্ব ইজতেমা নামে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

সে হিসাবে ২০১৮ সালে ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিদেশি মেহমান ও রাষ্ট্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বছর ১০১ দেশ থেকে ইজতেমা অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করে এ ইজতিমায়।

এমএম/পাবলিকভয়েস

মন্তব্য করুন