বিশ্ব ইজতিমায় নতুন সূর্য

প্রকাশিত: ৬:৫১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০২০

সম্পাদকীয় : বিশ্ব ইজতিমা মানেই মুসলিম মিল্লাতের এক তৃপ্তির জায়গা। যেখানে নেই রেষারেষি, নেই কোনো হিংসা-বিদ্বেষ। সকল শ্রেণীপেশার মানুষ যেখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মহান মালিকের সান্নিধ্য লাভের আশায় গভীর রজনীতে চোখের পানিতে বুক ভাষায়। লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসুল্লী ইজতিমার আখেরী মুনাজাতে শরীক হতে মুখিয়ে থাকেন। প্রত্যেকটি মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দীনের যাবতীয় দিকনির্দেশনার এক অনন্য মজমা এই বিশ্ব ইজতেমা।

বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে কারও কোনো আক্ষেপ নেই, নেই অভিযোগও। বছরের এই সময়টা এলেই দলমত নির্বিশেষে আল্লাহর মেহমানদের খেদমতে হাজির হন মাসখানেক আগে থেকেই। দিন যত ঘনিয়ে আসে, দেশী-বিদেশী মেহমানদের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে তুরাগ পাড়। তালীম, মাশক, বয়ান আর দোয়ায় দোয়ায় পুরো ময়দান রুপ নেয় জান্নাতী পরিবেশে।

এভাবেই চলছে বহুবছর ধরে। কিন্তু হঠাৎ করে কালো অন্ধকার নেমে আসে শান্ত ও নীরব পথচলা এই কাফেলায়! মাওলানা সা‘দ নামক এক ঝড়ে ওলটপালট দৃশ্যপট। যা কোনোদিন কেউ ভাবেওনি, তাই ঘটেছে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। যেই ময়দান কান্নায় ভিজে যেত, সেই ময়দান রঙিণ হলো আল্লাপ্রেমীদের রক্তে! চারিদিক থেকে অতর্কিত ও পরিকল্পিত হামলায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কয়েকশ মাদরাসাছাত্র ও সাধারণ মুসুল্লী।

নিষ্ঠুরতার সে নির্মম দৃশ্য দ্বিতীয়বার কেউ স্মরণ করতে চাইবে না নিশ্চয়ই। মূল গেট থেকে হামলা শুরু করলে মাঠে খেদমতরত মাদরাসাছাত্র ও সাধারণ সাথীরা উপায়ান্তর না দেখে তুরাগ নদীতে ঝাঁপ দিয়েও রক্ষা পায়নি। সেদিন মাদরাসার ছোট ছোট বাচ্চার কান্না আর অসহায়ত্বের দৃশ্য আপনাকে ঘুমুতে দেবে না। এক বিভীষিকাময় কালো ইতিহাস রচিত হয়েছে সেদিন। যেন এপ্রিলফুলের সেই নির্মম ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখেছে বিশ্ব। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ওলামায়ে কেরাম এভাবে হামলার শিকার হয়েছেন।

কাকরাইল মসজিদও বাদ যায়নি বর্বরতা থেকে। একসময় মনে হয়েছিল বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ও কাকরাইল বুঝি শকুনের দখলে চলে গেলো! কিন্তু রক্ত যে বৃথা যায় না এবং ওলামায়ে কেরামের বিচক্ষণ নেতৃত্ব যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় পূর্ণ যোগ্য তা পুরোনো কথা, তবে এবার নতুন করে প্রমাণ পেলো বিশ্ব। বাধভাঙ্গা জোয়ারের মত মানুষ উপস্থিত হয়েছে তুরাগ তীরে।

মাঠে জায়গা না থাকায় ইজতেমামাঠের বাইরেও দেওয়া হয়েছে মাইক, যাতে করে মানুষ ঠিকমতো বয়ান শুনতে পারেন। পুরো টঙ্গী এলাকায় তিল ধারণের ঠাই নেই। আশপাশের মসজিদ-মাদরাসা ইজতেমায় আগত মুসুল্লীদের দখলে। নির্দিষ্ট সময়ের একদুইদিন আগ থেকেই বয়ান শোনার ব্যবস্থা করেছেন কর্তৃপক্ষ। ধারাবাহিকভাবে বয়ান করবেন ওলামায়ে কেরাম ও বিশ্ব মুরুব্বীরা। ভারতের মাওলানা ইবরাহিম দেওলা, আহমদ লাট, রায়বেন্ডের মাওলানা ফাহীম, মাওলানা খুরশীদুল হক, মাওলানা এহসানুল হক, মাওলানা জিয়াউল হক, কাকরাইলের মাওলানা কাজী জুবাইরসহ তাবলীগের বরেণ্য মুরুব্বীরা থাকছেন এবার।

যারা ভেবেছিল বা খুশি হয়েছিল এই ভেবে, তাবলীগ গেলো রে! তাদের চিন্তায় পানি ঢেলে নতুন সূর্য উদিত হলো বিশ্ব ইজতেমায়। রিপোর্ট বলছে, ২০২০ সালের ওলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে এই ইজতিমা ইজতেমার ইতিহাসে সর্বদিকের সেরা।

প্রথম দিন থেকেই যেভাবে মানুষের ঢল নেমেছে এবং পুরো টঙ্গী ময়দান পেরিয়ে কামারপাড়া এলাকাসহ জয়দেবপুর পর্যন্ত মাইক টানিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে মাঠের বাহিরে থেকেও বয়ান শুনতে পারেন দীনি ও আমলী তৃষ্ণার্ত মুসুল্লীরা। এই ধারা অব্যহত থাকলে ইজতেমা বিষয়ে সরকার আরও গঠনমূলক কার্যক্রম হাতে নিতে পারে এবং ওলামায়ে কেরামের ইজতেমা দুই পর্বে করার চেষ্টা করবেন বলে বিশ্বাস করি।

মন্তব্য করুন