নারীরা অধিকার চাইতে পারে, সমানাধিকার নয়!

প্রকাশিত: ১১:১৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৯

আলেমা আরিফা তাবাসসুম সাকী

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার সৃষ্টির নেজামে মানুষকে পুরুষ ও নারী দুই ভাগে বিভক্ত করে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিগত স্বভাব ও অধিকার থেকেও দু’টি জাতিকে সম্পূর্ন আলাদা করে রেখেছেন। নারী পুরুষের পরস্পরের দৈহিক গঠন যেমন ভিন্ন, কর্মক্ষেত্রও ভিন্ন। স্বভাব যেমন ভিন্ন, অধিকারও তেমন ভিন্ন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ করছি, আমাদের মুসলিম সমাজের নারীরা আজ আত্মপরিচয় ভুলে আল্লাহর দেয়া বিধিবিধান অমান্য করে, নিজেদের সীমিত আকলের নির্দেশ মেনে পশ্চিমা নারীদের মতো সমানাধিকারের দাবী করছে। বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এদেশের কিছু তসলিমা ভক্ত লেখক -লেখিকা দীর্ঘদিন যাবত কলমবাজির মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে এসেছে, ‘ইসলাম হল পুরুষতান্ত্রিক ধর্ম,এ ধর্মে নারীদের কোনো অধিকার নিশ্চিত করাহয়নি। অত্যন্ত সুকৌশলে এ সকল নারীবাদিরা পুরুষবিদ্বেষের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েয়েছে এদেশের সরলমনা নারীদের মধ্যে।

বর্তমানে নারী-পুরুষ সমঅধিকারের দাবীদাররা নারী-পুরুষের সৃষ্টিগত বৈষম্য ভুলে এমন ভিত্তিহীন যুক্তিতর্ক ও কার্যকলাপ শুরু করেছে যা রীতিমতো হাস্যকর। সেদিন দেখলাম, এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের একজন টপ সুন্দরীকে প্রশ্ন করা হল, আপনি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছেন কেন? সে ঝটপট উত্তর দিল, নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ হাস্যকর মনে হল।

সত্য বলতে গেলে আমি বলি এগুলো পাগলের প্রলাপ বৈ কিছুই নয়। যারা নারীর অধিকার ও মর্যাদা কী এটাই জানেনা, যারা অভিনয়ের ছলে দেহ প্রদর্শনীর বাজার গরম করে, নাচগান করে যেভাবে খুশি নিজের দেহটাকে তুলে দেয় ভোগের বস্তু হিসেবে আরেকজনের হাতে, যারা ফ্যাশন শো‘র নামে নগ্নতা ও অশ্লীলতার বিষবাষ্প ছড়ায় সমাজে, তারা করবে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা?

তথাকথিত ওই সকল নারীবাদীদের প্রতি আমার জিজ্ঞাসা, যারা কুরআনী আইন লঙ্ঘন করে নিজেদের মনগড়া আইন দ্বারা সুশীল সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে,তারা কি পেরেছে নারীর পূর্ণ অধিকার প্রদান করতে? নারী নির্যাতন রোধ করতে? একটি কোমল চেহারাকে এসিড দগ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা
করতে? নারীকে শ্লীলতাহানী থেকে বাঁচাতে? পারেনি! পারবেও না।

আমি আরো জিজ্ঞেস করতে চাই,যে সব নারীবাদীরা বলে,ইসলামই নারী জাতিকে পিছনে সরিয়ে রেখেছে।ইসলামী আইনের কারনেই তারা আজ লাঞ্ছিত ও পরাধীনতার শিকার, তবে পাশ্চাত্যসহ যে সমস্ত দেশে নারীরা সমঅধিকার প্রাপ্ত সেসব দেশে কেন প্রতি সেকেন্ডে ধর্ষিত হচ্ছে নারীরা?

এক জরিপে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ৫০ ভাগ নারী ও বৃটেনের শতকরা ৫৩ ভাগ নারী যৌন নিপীড়নের শিকার? ওসব দেশে কেন ডাষ্টবিনে পাওয়া অহরহ পাওয়া যায় নবজাত? প্রতিনিয়ত পত্রিকার পাতায় কেন পাওয়া যায় যৌতুকের অভিশাপে স্ত্রী আত্মহত্যার খবর? কেন চলন্ত বাসে ধর্ষিত হয় স্কুল ছাত্রী? কেন নাবালিকা ধর্ষনের নিষ্ঠুর ভিডিওর ছড়াছড়ি? এসব অপ্রীতিকর ঘটনা কোন আইনের ভিত্তিতে ঘটে?

অথচ ইসলামের সোনালী যুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এমন একটি ধর্ষিতা মেয়ের কাহিনীও পাওয়া যাবেনা। বর্তমানেও ইসলামী বিধানের অনুগত কোন মেয়েকে এরূপ নির্যাতিত হতে দেখা যায় না। বরং নারী মুক্তি, নারী অধিকার,নারী স্বাধীনতার শ্লোগান নিয়ে যারাই মাঠে নেমেছে তারাই আজ চরমভাবে নির্যাতিতা, ধর্ষিতা ও এসিডদগ্ধা।

সকল মুসলিম মা-বোনদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, নারীরা কী নিজের প্রকৃত অধিকার চায় না সমঅধিকার? পুরুষের ন্যায় কর্ম সাধন করতে পারাটাই কী তবে নারীর প্রকৃত অধিকার? আমাদের মত মুসলিম নারীদের মান- মর্যাদা কী এতে বৃদ্ধি পাবে, না হিতে বিপরীত হবে! নারীমুক্তি, নারী আন্দোলন,নারী স্বাধীনতা, সমঅধিকার ও বাবার সম্পদে ছেলে -মেয়ের সমঅংশের আইন প্রণয়ন,এসব কিছুতেই রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি।

আমার মুসলিম মা-বোনদেরকে বিনীতভাবে বলছি, আমাদেরকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে, ইসলামের বিধানগুলো নিঁখুত।এবং আমাদের স্বভাবের সাথে মানানসই। নারী – পুরুষের সৃষ্টিগত যে অস্বাভাবিক পার্থক্য আছে সেটাকে আমরা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারবো না। আমাদের বুঝতে হবে, স্রষ্টার পক্ষ থেকে এটাই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত যে, উভয় শ্রেণীকে পৃথক পৃথক কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

এবং সৃষ্টিগত এই শারীরিক পার্থক্যের দিকে লক্ষ রেখেই ইসলাম আমাদের পৃথক পৃথক দায়িত্ব অর্পণ করেছে। যদিও সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানব জাতি হিসেবে মান- সম্মানে উভয়ে সমান, এবং পরকালীন প্রতিদানে আমরা এক ও অভিন্ন।

ইসলাম ঘরের বাইরের দায়িত্ব যথা রাষ্ট্র পরিচালনা, দেশ রক্ষা ও সামাজিক – রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব দিয়েছে পুরুষকে। ঘরের অভ্যন্তরীণ কাজের দায়িত্ব দিয়েছে নারীকে। বাইরের কাজে পুরুষ যেমন পারদর্শী তেমনি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নারীর যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বেশি। পুরুষ যেমন ঘরের কাজে আনাড়ি তেমনি বাইরের বহু কাজে নারী শত চেষ্টা করেও দূরদর্শী হতে পারে না। পুরুষকে নেতৃত্ব ও বাইরের কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তারা নারীর তুলনায় উত্তম । আর এ জন্য নারীকে রীতিমতো যুদ্ধ করে পুরুষের অধিকার অর্জন করতে হবে। পুরুষের কাজে নারীর সম্মান নয়, নারীর নারীত্ব বজায় রাখাটাই নারীর জন্য চরম উন্নতি। সর্বক্ষেত্রে পুরুষের ন্যায় অধিকার নারীর জন্য চরম বিপত্তি এবং মোটেই সফলতা নয়।

পরি শেষে একজন নারী হয়ে সকল নারীর প্রতি আমার এ আবেদন থাকবে, আমরা নারীর অধিকার চাইতে পারি , সমঅধিকার নয়। পুরুষ যা করে বিপরীতে নারীরা তা করতে চাওয়া নারীর অধিকার নয় , এতে নারীর প্রকৃত অধিকার সংরক্ষণ হয় না ।

ইসলাম আমাদের যে অধিকার প্রদান করেছে আমরা সে বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞানার্জন করব এবং তা বাস্তবায়নের লক্ষে কাজ করে যাব। আমাদেরকে সদা সর্বদা মনে রাখতে হবে আমরা মুসলিম। প্রাশ্চাত্যের অনুকরণে আমাদের মর্যাদা-সম্মান ফিরে পাবো না। ইসলামি আদর্শেই আমাদের মুক্তি। ইসলামের বিধানে আমাদের উপর কোন জুলুম করা হয়নি।বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়নি। মনুষত্যের ধর্ম ইসলামই নারী জাতির অধিকার নিশ্চিত করেছে এবং নারীকে প্রকৃত মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছে। আল্লাহ আমাদের সকলকে বুঝার তাওফীক দিন।

লেখিকা: মুহাদ্দিসা ও সহকারী মুহতামিম জামিয়াতুস সালিহাত বোর্ড বাজার, গাজীপুর।

আই.এ/

মন্তব্য করুন