পারস্যের নন্দিত রাজাকার বাংলায় কেন নিন্দিত!

প্রকাশিত: ২:৫৭ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৯

গোলাম মাওলা রনি

রাজাকার শব্দটির মধ্যে যে এত প্যাঁচ রয়েছে তা আমার আগে জানা ছিল না। এই শব্দটির ইতিহাস যে ইরান-তুরান-সাহারা পাড়ি দিয়ে হিন্দুকুশ পর্বতমালার চূড়ায় উঠেছে তা-ও আমি জানতাম না। তারপর ভারতের হায়দরাবাদে ঢুকে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করে পাকিস্তানে ঢুকেছে এবং পরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলায় এসে কিভাবে পচে গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে তা জানার পর শব্দটি সম্পর্কে আমি নিদারুণ কৌতূহলী হয়ে পড়ি।

ভাষাবিদরা বলেন যে- রাজাকারের আদি আবাসস্থল হলো পারস্য। এই শব্দটির যে আভিজাত্য-মানমর্যাদা এবং গুরুত্ব রয়েছে তা কেবল পারস্য জাতিই ধারণ করতে পারে। যে কারণে পারস্যমুলুকে রাজাকারের উদ্ভব হয়েছিল এবং সেই জাতির পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে রাজাকাররা যেভাবে সম্মানিত হয়ে আসছেন তা যদি আপনি জানেন তবে আপনিও আমার মতো অবাক না হয়ে পারবেন না। অন্য দিকে, মহান রাজাকার, শব্দটি বঙ্গে এসে কিভাবে কুখ্যাত হলো তা-ও আপনি জানতে পারবেন ভুবনবিখ্যাত ফারসি কবি হজরত শেখ সাদী রহ:-এর একটি রূপকধর্মী কবিতার মাধ্যমে।

পারস্যের মহাকবি শেখ সাদী রহ: এগারো শতকের কবি- অর্থাৎ বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রায় ৮০০ বছর আগে তিনি কাব্যচর্চা করতেন। কাজেই বাংলাদেশের রাজাকারদের নিয়ে তার বক্তব্যে যাতে আপনি গোলকধাঁধার মধ্যে না পড়েন সে জন্য আমি রাজাকারের আদি শব্দ রিজা থেকেই শুরু করতে চাচ্ছি।

ফরাসি শব্দ রিজা এবং কার শব্দমালা থেকে রাজাকারের উদ্ভব। রিজা শব্দের অর্থ হলো- স্বাধীনচেতা, অনুগত, বৈধ এবং পরোপকারী লোকজন; যারা জনগণের কল্যাণের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করে। রিজা শব্দটি আরবি ব্যাকরণের রিদা শব্দের প্রায় সমার্থক। আরবিতে রিদা মূলত নামবাচক শব্দ বা নাউন- যা রাদি শব্দে ক্রিয়াবাচক অর্থ ও ভার্বাল নাউনে রূপান্তরিত হয়ে ফারসি রিজার মতো অর্থবোধক হয়ে ওঠে।

রাজাকারের দ্বিতীয় অংশ অর্থাৎ কারের অর্থ হলে- শুভ কর্ম বা ভালো কাজ। সুতরাং পারস্যে রাজাকার বলতে এমন লোকজনকে বুঝায়, যারা হলেন একটি দেশের বৈধ নাগরিক এবং যাদের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো- দেশপ্রেম, দেশের প্রতি আনুগত্য এবং দায়দায়িত্ব। তারা দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত এবং দেশের জনগণ কর্তৃক নন্দিত হন এবং দেশের স্বার্থে বিদেশী অনুপ্রবেশকারী, আক্রমণকারী অথবা হানাদারদের বিরুদ্ধে যুগ যুগ ধরে লড়াই-সংগ্রাম করেন।

পারস্য দেশে প্রথমবারের মতো রাজাকারের উদ্ভব হয়েছিল সম্রাট তৃতীয় দারায়ুসের জমানায়, যখন তারা ছিল বিশ্বের ১ নম্বর সুপার পাওয়ার। গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার প্রথম যখন পারস্য আক্রমণ করলেন, তখন সম্রাট তৃতীয় দারায়ুস বিষয়টিকে অনেকটা ছেলেখেলা মনে করলেন। কারণ একে তো আলেকজান্ডার ছিলেন বয়সে একেবারেই তরুণ, তার ওপর গ্রিসের একটি নগররাষ্ট্র ম্যাসিডোনিয়ার রাজা।

পারস্য সাম্রাজ্যের তৎকালীন ব্যাপ্তির সাথে যদি ম্যাসিডোনিয়ার অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতার তুলনা করে এই ২০১৯ সালের বাস্তবতায় উদাহরণ দিতে চাই তবে বলতে হবে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খবর জানানো হলো যে, মালদ্বীপ অথবা ভুটানের রাজা একদল সৈন্যসামন্ত নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে মার্কিন মুলুুকে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দখল করার জন্য।

উল্লিখিত ভয়াবহ খবরটি শোনার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যে অবস্থা হবে, ঠিক একই অবস্থা হয়েছিল তৎকালীন পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারায়ুসের। তিনি তার গোয়েন্দাদের কাছ থেকে যখন শুনলেন যে, এক তরুণের নেতৃত্বে ২০-২৫ হাজার সৈন্য পারস্য আক্রমণের জন্য সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে- তখন তিনি বহুক্ষণ ধরে আচ্ছামতো হাসলেন। তারপর বালকের সাথে বালখিল্য করার জন্য এবং তার বিত্ত-বিলাস ও বৈভবের প্রদর্শনীর জন্য প্রায় আড়াই লাখ সৈন্য নিয়ে স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে বিচক্ষণ সম্রাট বুঝতে পারলেন যে, আলেকজান্ডার বালক নন এবং তার সাথে আগমনকারী সৈন্য সংখ্যা ২৫-৩০ নয়, প্রায় ৪০ হাজার। তা ছাড়া আলেকজান্ডারের সৈন্যদের নতুন ধরনের ঢাল-সড়কি এবং যুদ্ধাস্ত্রবহনকারী বিশেষ ঘোড়ার গাড়ির নমুনা দেখে তিনি প্রমাদ গুনলেন। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের বালখিল্যকে আরামদায়ক ও আনন্দমুখর করার জন্য তিনি যে বাদ্যযন্ত্র-সুরা-সাকি-নর্তকী এনেছিলেন সেগুলো বাদ দিয়ে প্রাণপণ যুদ্ধ করার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করলেন।

সম্রাট তৃতীয় দারায়ুস এমনভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করলেন, যাতে করে পারস্যের ভাগ্যে যেন একটি মাত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অমানিশা নেমে না আসে। তিনি বিদেশী হানাদারকে যুদ্ধের পিছু পিছু ছুটিয়ে পারস্যের কৌশলগত দুর্গম এলাকাগুলোতে ঢুকিয়ে স্থানীয় জনগণের সাহায্য নিয়ে যুদ্ধের ফলাফল নিজেদের পক্ষে আনতে চাইলেন। এই কাজের জন্য তিনি রাজাকারদের দায়িত্ব দিলেন- যারা পারস্য সাম্রাজ্যের সাহায্যকারী হিসেবে শত বছর ধরে রাষ্ট্রক্ষমতা ও জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপনের সেতু হিসেবে কাজ করছিল এবং বিদেশী শত্রুদের আক্রমণের সময় আধাসামরিক বাহিনী হিসেবে নিদারুণ দক্ষতার ইতিহাস গড়েছিল।

পারস্যের রাজাকাররা আলেকজান্ডারকে কিভাবে নাস্তানাবুদ করেছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ দিতে গেলে নিবন্ধের পরিধি শেষ করা সম্ভব নয়। কাজেই বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়ে এ কথা বলা যায় যে, রাজাকারদের কারণেই আলেকজান্ডার যুদ্ধজয়ী হয়েও পারস্যে স্থায়ী হতে পারেননি এবং রাজাকারদের শত-সহস্র বছরের অব্যাহত চেষ্টার কারণে আলেকজান্ডারসহ অন্যান্য বিদেশী আক্রমণকারীরা পারস্যে টিকতে পারেনি।

পারস্যের রাজাকাররা কেবল আলেকজান্ডার নন- তারা চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং একইভাবে তুরস্কের আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে শত শত বছর লড়াই-সংগ্রাম করার পাশাপাশি পুরো জাতিকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে জাতীয় সংহতি ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখেছে। পারস্য সাম্রাজ্যের হাজার বছরের ইতিহাসে রাজাকার একটি নন্দিত নাম এবং আভিজাত্যের প্রতীক।

পাক-ভারত উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনামলে ব্রিটিশরা পারস্যের রাজাকারদের অনুকরণে একটি সম্প্রদায় সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন চীরস্থায়ী বন্দোবস্তের নামে; কিন্তু শাসককুলের হীনম্মন্যতা এবং ভারতবর্ষের নব্য ধনীদের লোভ-লালসা ও চরিত্রহীনতার কারণে চীরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেশ-জাতীয় ও শাসকদের জন্য বুমেরাং হয়ে পড়ে। অন্য দিকে, পাক-ভারতের সুদীর্ঘ মুসলিম শাসনামলে জায়গির প্রথার মাধ্যমে পারস্যের মতো একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল; কিন্তু তা-ও কোনোকালে সফল হতে পারেনি।

রাজাকার শব্দটি পারস্য ভাষা থেকে উর্দুতে এসে কিছুটা অপভ্রংশের শিকার হয়। এখানে রাজাকারের সাথে হিন্দুস্তানি রাজা শব্দের অন্তমিল ঘটানো হয়। কিন্তু উর্দু ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে ১৯৪৭ কিংবা ১৯৭১ সালের আগে রাজাকার শব্দটি তেমন অর্থবোধক ছিল না। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের হায়দরাবাদের স্বাধীনচেতা হিন্দু-মুসলমানরা সেখানকার ঐতিহ্যবাহী রাজবংশ নিজামদের ক্ষমতা অব্যাহত রাখা এবং দিল্লির আধিপত্য রুখে দেয়ার জন্য রাজাকার বাহিনী গঠন করে সারা পাক-ভারতে হইচই ফেলে দিয়েছিল।

তারা প্রবল প্রতাপশালী ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসন রুখে দেয়ার জন্য পুরো হায়দরাবাদের জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে এবং স্থানীয়দের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভারতীয় দালাল এবং দেশদ্রোহীদের হায়দরাবাদ থেকে তাড়িয়ে দেয়। তারা হানাদার ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে এবং অসংখ্য কমব্যাট অপারেশনে ব্যাপক সফলতা দেখায়। কিন্তু হায়দরাবাদের সেনাবাহিনী এবং নিজাম সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে হায়দরাবাদকে ভারতের অঙ্গরাজ্য বানাতে সম্মতি দিতে বাধ্য হন। ফলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে ইউনিয়ন চুক্তি সম্পাদনের পর নিজাম এক রাষ্ট্রীয় নির্দেশে রাজাকার বাহিনীর বিলুপ্তি ঘোষণা করেন।

আলোচনার এই পর্যায়ে এবার ১৯৭১ সালের বাংলাদেশী রাজাকার সম্পর্কে কিছু বলা যাক। বাংলাদেশ সরকারের দলিল-দস্তাবেজ অনুসারে এ দেশে রাজাকার বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১ জুন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান গভর্নর কর্তৃক ইস্ট-পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে একটি প্যারা-মিলিটারি বাহিনী গঠনের কথা বলা হয়। তৎকালীন সময়ে চলমান মুক্তিযুদ্ধ মোকাবেলা করার জন্য পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য তিন থেকে চার হাজার রাজাকার সদস্য সংগ্রহ বা নিয়োগ এবং তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্রসজ্জিত করে বিভিন্ন ব্রিগেডে ভাগ করা হবে এবং তারা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের সাথে সাহায্যকারী শক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

রাজাকার বাহিনীর দুটো শাখা ছিল। একটি নাম ছিল আল-বদর এবং অপরটির নাম আল-শামস। সাধারণত বদর বাহিনীতে মাদরাসাছাত্রদের নিয়োগ দিয়ে তাদের দ্বারা বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। অন্য দিকে, আল-শামস সদস্যদের দ্বারা গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো পাহারা বা সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়।

রাজাকার বাহিনীর উভয় শাখার সদস্য মনোনয়নে বা নিয়োগে টার্গেট করা হয় ভারতের বিহার প্রদেশ থেকে বিতাড়িত মুসলিম, যারা মূলত মুহাজির হিসেবে পাকিস্তান সরকারের বদান্যতায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় লাভ করেছিল। এসব বাস্তুচ্যুত বা বিতাড়িত মুসলিমরা নিজেদের মুহাজির বলে পরিচয় দিতেন। অন্য দিকে, স্থানীয়দের মধ্যে এরা বিহারি মুসলমানরূপে পরিচিত ছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নীতিগতভাবে বিহারিদের রাজাকার বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল মূলত বিহারিদের ভারতবিদ্বেষ এবং ভারতের প্রতি তাদের ঘৃণা ও ক্ষোভকে কাজে লাগানোর জন্য।

রাজাকার বাহিনী গঠনের জন্য সেনাবাহিনী প্রয়োজন মনে করলে স্থানীয় অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের সব ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় এবং সংগঠনের পরামর্শ নেবে এবং তাদের সুপারিশে বিহারি মুসলিমদের বাইরেও রাজাকার সদস্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রাজাকার গঠনপ্রক্রিয়া যখন চলছিল, ঠিক তখন ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান রক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শান্তি কমিটি গঠন করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন নূরুল আমিন, গোলাম আযম এবং খাজা খায়ের উদ্দিন।

নূরুল আমিন একসময় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন। অন্য দিকে, খাজা খায়ের উদ্দিন ছিলেন ঢাকার মেয়র এবং গোলাম আযম ছিলেন জামায়াত নেতা। নবগঠিত শান্তি কমিটির নেতারা রাজাকার সদস্যদের মতো প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র লাভের জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং তা লাভ করার পর খুলনার খানহজাহান আলী সড়কে অবস্থিত একটি আনসার ক্যাম্পে শান্তি বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ নিতে আরম্ভ করে।

উপরিউক্ত তথ্য অনুসারে, রাজাকার বাহিনী গঠনপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের জুন মাসের পর। শান্তি বাহিনী হয়তো আরো কিছু দিন পর প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। তবে শান্তি বাহিনীর গঠন রাজাকারদের পরে হলেও শান্তি কমিটি হয়তো আগেই গঠিত হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের তথ্য অনুযায়ী, রাজাকার পুরোপুরি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং তাদের বেশির ভাগ সদস্য ছিল বিহারি মুহাজির মুসলিমদের সম্প্রদায়ভুক্ত এবং সংখ্যায় তারা ছিল তিন থেকে চার হাজার। অন্য দিকে, শান্তি কমিটির গেরিলা যাদের পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়েছিল বটে, কিন্তু তারা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তারা সম্ভবত শান্তি কমিটির নেতাদের নিয়ন্ত্রণে স্বেচ্ছাসেবক প্যারা মিলিটারি রূপে কাজ করে যাচ্ছিল।

২০১৯ সালে এসে বাংলাদেশ সরকার যখন রাজাকারদের তালিকা প্রণয়নে হাত দেয়, তখন এই কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্তাদের বেশির ভাগ সদস্য হয়তো রাজাকার এবং শান্তি কমিটি বিষয়টি গুলিয়ে ফেলে। অন্যদিকে, স্বাধীন বাংলাদেশের দালাল আইন এবং সেই আইনের অধীন গ্রেফতারকৃত লোকজনের তালিকাও গোলকধাঁধার সৃষ্টি করেছে। উপরন্তু বিভিন্ন সিনেমা-নাটক, উপন্যাস-সাহিত্য ও দেশ-বিদেশের লোকমুখের কথাবার্তা, কাহিনী ইত্যাদির কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একধরনের মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। ফলে রাজাকারের তালিকা নিয়ে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

এবার হজরত শেখ সাদীর রূপকধর্মী কবিতার প্রসঙ্গে কিছু বলি। বাংলাদেশে রাজাকার শব্দটি খুবই ঘৃণিত-নিন্দিত এবং বর্জিত একটি শব্দ। পারস্যের নন্দিত রাজাকার কেন বঙ্গে এসে এতটা নিন্দিত হলো তা শেখ সাদীর একটি লেখনীর মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। শেখ সাদী বলেন- এক বুজুর্গ পথ চলতে গিয়ে অনেকখানি বীভৎস ও দুর্গন্ধযুক্ত মনুষ্যমল দেখতে পেয়ে নিজের পাগড়ি দিয়ে তা ঢেকে দেন এবং পরক্ষণে কান্না আরম্ভ করেন। বুজুর্গের সঙ্গী-সাথীরা কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আমি যখন মনুষ্যমল ঢাকছিলাম তখন ওগুলো বলছিল- গত রাত পর্যন্ত আমরা ছিলাম সুগন্ধযুক্ত উপাদেয় খাবার, যার আকর্ষণে মানুষ আমাদের ভক্ষণ করেছে। অথচ সেই মানুষের সংস্পর্শে মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টায় আমাদের কী দশা হয়েছে!

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সাবেক সংসদ সদস্য

মন্তব্য করুন