ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াতী মাস এবং চরমোনাইর মাহফিল

প্রকাশিত: ৪:০৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩, ২০১৯

বিশ্বের অন্যতম বড় ইসলামী মিলন মেলা চরমোনাইর বার্ষিক মাহফিল (অগ্রহায়ণ) শেষ হয়েছে। প্রতিবারের ন্যায় এবারও ব্যাপক মুসল্লীর সমাগম হয় এ মাহফিলে। মাহফিলের মধ্যমনি বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটির আমীর মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমসহ দেশ বিদেশের গ্রহণযোগ্য আলেমগণ এতে বয়ান করেছেন। মানুষের হৃদয়ে দীনের বাতি জ্বালানোর চেষ্টা করেছেন।

চরমোনাই মাহফিলের অন্যতম একটা লক্ষণীয় বিষয় হলো প্রতিবছরই এই মাহফিলে মানুষের সমাগম বাড়ছে। বলা যেতে পারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কথিত আছে চরমোনাইর এক মাহফিলে যে পরিমাণ মানুষের সমাগম হয় এত মানুষ যদি দেশের বা বিদেশের কোনো বামপন্থী দল যোগাড় করতে পারতো তবে একদিনেই তারা বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলতো। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বা বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি সেই অর্থে কিছুই করতে পারে না।

এতবড় জনসমর্থন নিয়েও তারা আজ পর্যন্ত সংসদে যেতে পারেনি। দেশের শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে কাম্যমানের প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ৬৮ হাজর গ্রামে অন্তত একটি করে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বিশ্বমানের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেনি। এর কারন কী? এগুলো নিয়ে কী কখনো চিন্তা করা হয়, গবেষণা হয়?

গোটা নভেম্বর মাসকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের দাওয়াতী মাস হিসাবে ঘোষণা করেছে। দাওয়াতী মাসের ডাক হিসাবে সকল প্রকারের অন্যায় অন্যায্য কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরী করার আহবান জানানো হয়েছে। সর্বপরি বাংলাদেশকে একটি কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে যোগ দিতে বলা হয়েছে।

দীর্ঘ এক মাসের দাওয়াতী মিশনে ইসলামী আন্দোলনে মোট কতো জন যোগ দিয়েছে? কোন কোন শ্রেণী-পেশার কতো মানুষের কাছে কী কী পদ্ধতিতে দাওয়াত পৌছানো সম্ভব হয়েছে, এর কী কোনো সঠিক হিসাব আছে? জেলা, থানা, ওয়ার্ড ভিত্তিক কী কোনো হিসাব করা হয়? সংগঠনের কোন শাখা এই কাজে কতো বেশি এগিয়েছে, পারদর্শিতা দেখিয়েছে সে হিসাব কী নেয়া হয়? নাকী এই দাওয়াতী কর্মসূচিও অন্য দশটি কর্মসূচির মতো গতানুগতিক একটি কর্মসূচিমাত্র?

দাওয়াতী মাসের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হলো চরমোনাইর মাহফিল। নতুন কতো মানুষ এবারের মাহফিলে যোগ দিয়েছে, কাদের দাওয়াতে যোগ দিয়েছে, নতুন যোগদানকারীদের বয়স, পেশা বিবেচনায় কী ভিন্ন ভিন্ন হিসাব কষা হয়, হয়েছে? যদি না হয় দাওয়াতী মাসের সফলতা বিফলতা বোঝার উপায় কী?

দেশের কোন কোন স্তরের মানুষের কাছে কী কী উপায়ে দাওয়াত পৌছানো হয়েছে? তাদের কাছ থেকে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে? যারা দাওয়াত নিয়ে গিয়েছেন তাদের দাওয়াতী যোগ্যতা কতোটুকু এসব কী মিলিয়ে দেখা হয়? দাওয়াতী মাস ঘোষণার আগে কী প্রতিটি সাংগঠনিক শাখায় দাওয়াত কাজের জন্য যোগ্য মানুষ তৈরী করা হয়, প্রশিক্ষণ দেয়া হয়? তাদের যোগ্যতা অনুসারে কী নির্দিষ্ট টার্গেট বেধে দেয়া হয়?

দেশের কজন লেখক, সাংবাদিক, গবেষক, প্রফেসর, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংস্কৃতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবীর কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়া হয়েছে? তারা কে কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, এগুলোর কী রেজুলেশন করা হয়? প্রতি বছরের স্টাটিক করা হয়?

দেশের প্রতিরক্ষা বিভাগে কী কখনো দাওয়াত পৌছানো হয়েছে? রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ইসলামী আদর্শই একমাত্র উত্তম আদর্শ, এই আদর্শের পক্ষে যে সকল মুসলমানের কাজ করা উচিত, প্রয়োজন হলে তারা যেনো ইসলামী আদর্শের পক্ষে সমর্থন দেয় এই দাওয়াত কী তাদের কাছে সঠিক পদ্ধতিতে এবং কাম্যমানে পৌছানো হয়েছে বা চেষ্টা করা হয়েছে? পীর সাহেব চরমোনাইর পক্ষ থেকে তাদের কাছে কী কখনো কোনো আহবান জানানো হয়েছে? প্রয়োজনে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে?

চরমোনাই মাহফিলে প্রতি বছর লাফিয়ে লাফিয়ে মানুষ বাড়ছে। কিন্তু কতজন কোয়ালিটিসম্পন্ন মানুষ বাড়ছে তা কী হিসাব করা হয়? তাদের কী উপায়ে কাজে লাগানো যায় সে বিষয়ে কী গবেষণা হয়, চেষ্টা হয়?’

চরমোনাই মাহফিলের অন্যতম একটা বৈশিষ্ট হলো এই মাহফিলে একবার যে যোগ দেয় সে ইসলামের পক্ষে কাজ না করুক অন্তত বিরোধীতা করে না। এ থেকে বোঝা যায় এই মাহফিল বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য অন্যতম এক নেয়ামত। কিন্তু এই নেয়ামত সঠিকভাবে শুদ্ধ কাজে লাগাতে না পারলে কী মুক্তি মিলবে?

গত জাতীয় নির্বাচনের পরে ঢাকার সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাঁচ দফায় ৪৬০টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু ওইসব নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী দেয়নি। তখন এ দলের অন্যতম নীতিনির্ধারক অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, বর্তমান সরকারের অধীনের সকল নির্বাচন ইসলামী আন্দোলন প্রত্যাখান করতে চায়। কারণ এই সরকারের অধীনে দেশে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে জনগণ সে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে।

সে সময় অভিজ্ঞমহল বলেছিলেন, কোনো গণমুখী রাজনৈতিক দল নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না বলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারে না। এতে দলের নেতাকর্মীরা বেকার হয়ে পড়ে। নেতাকর্মীর উদ্দীপনা হারিয়ে যায় এবং সরকার বাড়তি সুবিধা পায়। দুর্নীতি দলীয়করণ প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায়। জনগণের কল্যাণকামী কোনো দল সরকারকে ফাঁকা মাঠে গোল করার সুযোগ করে দিতে পারে না। বরং নির্বাচনের মাঠে থেকে, রাজনীতির মাঠে থেকে জনগণের পক্ষে শেষ পর্যন্ত লড়াই করাই গণমুখী রাজনৈতিক দলের প্রধান কর্মসূচি হওয়া উচিত।

এবারের মাহফিল থেকে আন্দোলনের আমীর দলের নেতাকর্মীদের জন্য নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। তিনি সারাদেশের ৪ হাজার দুইশ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এবং ৩৮ হাজার ওয়ার্ড মেম্বার নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।

আন্দোলনের আমীর সৈয়দ রেজাউল করীমের এই ঘোষণা যদি ইসলামী আন্দোলন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, পরিকল্পিত ভাবে দেশের প্রতিটি ওয়ার্ড ইউনিয়নের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করতে পারে তবে দলের তৃণমূল শক্ত হবে। একদম গোড়া থেকে সংগঠন মজবুত হবে। নেতাকর্মীরা উজ্জিবিত হবে। দেশের গণমানুষের কাছে এই দলের গণদাওয়াত পৌঁছাবে।

তবে সচেতন ভাবে, বিচক্ষণ ভাবে দলকে উপস্থাপন করতে হবে। গণমানুষের মনের ভাষা পড়তে হবে। মানুষের নিত্য সুবিধা অসুবিধার সাথে মিলেমিশে যেতে হবে। বিগত দিনের সিটি নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। ওয়ার্ড ইউনিয়ন ভিত্তিক মানুষের সুবিধা অসুবিধার তালিকা করতে হবে। সময় উপযোগী সমাধানের উপায় তুলে ধরতে হবে। দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা করতে হবে।

বিগত নির্বাচনগুলোয় যারা অংশগ্রহণ করেছেন, নির্বাচনের মাঠে যারা সক্রিয় কাজ করেছেন জেলা থানা ওয়ার্ড ভিত্তিক তাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা, সুবিধা অসুবিধার কথা শুনতে হবে এবং সেভাবে সারাদেশের নেতাকর্মীদের কাছে নির্দেশনা পাঠাতে হবে। যোগ্য অভিজ্ঞদের নিয়ে দলীয় নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে।

চরমোনাইর মাহফিলে প্রতি বছর যে পরিমানে মানুষের সমাগম হয় সেই তুলনায় মাহফিলের পরিবেশ এত বছরেরও সন্তষজনক করা সম্ভব হয়নি। মাহফিলের পরিবেশ মোটেও স্বাস্থকর নয়। নিরাপদ নয়। শৃঙ্খলার বড় অভাব। যে কোনো ধরনের অঘটন মোকাবিলার জন্য যথেষ্ঠ প্রস্তুতি দেখা যায় না।

এত মানুষ এক জায়গায় করা মানে তাদের দায়িত্ব নিজ কাধে তুলে নেয়া। এ বিষয়ে মুজাহিদ কমিটির নায়েবে আমির মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এক ঘরোয়া আলোচনায় বলেছিলেন, তিন দিনের মাহফিল শেষ হলে মনে হয় মাথার উপর থেকে পৃথিবীসম ওজনের এক বোঝা নেমে গেলো। খোদার প্রেমে মশগুল এত মানুষের দায় দায়িত্ব মাথায় নিয়ে আমাদের ঘুম হয় না, ঘুমাতে পারি না। বিশাল এক দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে রাত দিন কাটাতে হয়। কিন্তু তার কথার দৃশ্যমান প্রতিফলন হতে দেখা যায় না। মাহফিলকে নিরাপদ এবং স্বাস্থবান্ধব করতে গতানুগতিক ধারার বাইরে বিশেষ কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।

আমি মনে করি এ বিষয়ে আরো বেশি সচেতন এবং উদ্যোগী হওয়া দরকার। আন্তর্জাতিক মানের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সাথে যোগাযোগ করা দরকার। তাদের সহযোগিতায় মাহফিলকে আরো বেশি নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যবান্ধব করা দরকার।

মাহফিলে দীনি এবং রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আরো বেশি সচেতন হওয়া দরকার। গবেষণামূলক আলোচনা হওয়া দরকার। বিশেষ করে ছাত্রদের অনুষ্ঠান এবং ওলামাদের অনুষ্ঠানের মান বৃদ্ধি করা দরকার।

অনেকেই বলে চরমোনাইর মাহফিল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ইসলামী জমায়েত। কেউ বলে দ্বিতীয়। কিন্তু এসব দাবীর পক্ষে যৌক্তিক কোনো প্রমাণ নেই, স্বীকৃতি নেই। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো মেথডে পরিসংখ্যান করা হয় না।

এসব বিষয়ে কাজ করা দরকার। আন্তর্জাতিক মানদন্ডে গবেষণা করা দরকার। বিশ্বমানের মুসলিম সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার। গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে সঠিক পরিসংখ্যান করা দরকার।

প্রত্যাশা করি বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই বিষয়গুলো আগামীতে বিশেষ ভাবে বিবেচনা করবে।

পলাশ রহমান
ইতালি প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক

মন্তব্য করুন